জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, দীর্ঘ প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “দীর্ঘ সময় পর একটি অংশগ্রহণমূলক, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”
🇧🇩 নির্বাচন ও গণতন্ত্রে নতুন অধ্যায়:
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন সূচনা। জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সকল পক্ষের সহযোগিতা এ নির্বাচনকে ঐতিহাসিক করেছে।
তিনি বিজয়ী ও পরাজিত সকল প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, “গণতন্ত্রে হার-জিতই সৌন্দর্য। যারা জয়ী হয়েছেন তারা যেমন জনগণের আস্থা পেয়েছেন, তেমনি যারা জয়ী হননি তারাও উল্লেখযোগ্য সমর্থন অর্জন করেছেন।”
⚖️ তিন অঙ্গীকার:
সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের সংকটময় পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি প্রধান লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে—সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন।
তিনি বলেন, প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করা হয়েছে প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি হয়েছে যার ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত
তিনি দাবি করেন, এসব পদক্ষেপ নাগরিক অধিকার, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।
🚨 আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার:
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনর্গঠনের কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “একসময় থানাগুলো ছিল জনশূন্য, মানুষের মধ্যে ভয় কাজ করত। এখন সেই অবস্থা বদলেছে।”
তিনি আরও বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
👩 নারী ও শিশুর সুরক্ষায় উদ্যোগ:
নারীর ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, “নারীর অগ্রযাত্রা ছাড়া নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।”
💰 অর্থনীতি: সংকট থেকে উত্তরণ:
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাংকিং খাত দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং অর্থপাচার ছিল ব্যাপক। তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করতে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে তিনি প্রবাসীদের অবদানকে “অর্থনীতির প্রাণশক্তি” হিসেবে উল্লেখ করেন।
🌍 পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক:
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন আর নতজানু পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে না। জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে এবং সমাধানের প্রচেষ্টা চলছে।
🛡️ প্রতিরক্ষা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি:
সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
🚀 সম্ভাবনার বাংলাদেশ:
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেন, “বাংলাদেশ এখন শুধু সংকট কাটিয়ে ওঠার গল্প নয়, এটি সম্ভাবনার দেশ।” তিনি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং সততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
📜 জুলাই সনদ: বড় অর্জন:
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম বড় অর্জন হলো “জুলাই সনদ”, যা গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে। তার মতে, “এই সনদ বাস্তবায়িত হলে স্বৈরাচারের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।”
🕊️ আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা:
গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “তাদের আত্মত্যাগের কারণেই এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।” তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান।
🏛️ গণভবন হবে স্মৃতি জাদুঘর:
তিনি ঘোষণা দেন, পলাতক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবনকে “জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস জানতে পারে।
🤝 ঐক্যের আহ্বান:
বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, “গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার যে চর্চা শুরু হয়েছে তা যেন অব্যাহত থাকে।” তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
🙏 বিদায়ের মুহূর্ত:
সবশেষে দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমার জন্য দোয়া করবেন। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।” এর মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নেন এবং নতুন সরকারের জন্য শুভকামনা জানান।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৬:০৬ এএম