ফরিদপুর থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী—যেভাবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক উত্থান?

হারুন-অর-রশীদ ও মো. নুর ইসলাম, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৮:৪২ পিএম

ফরিদপুর-২ (সালথা–নগরকান্দা) আসন থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে অবশেষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর শপথ নিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম।

নতুন সরকারের ২৪ সদস্যের প্রতিমন্ত্রী তালিকায় তার নাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনা নয়; বরং তৃণমূল রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতৃত্বে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

শপথ গ্রহণের এই মুহূর্তে শামা ওবায়েদ শুধু একজন সংসদ সদস্য বা দলের সাংগঠনিক নেতা নন, বরং দেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যুক্ত একজন নীতিনির্ধারক। ফলে তার ওপর প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি দায়িত্বও হয়েছে বহুগুণ বেশি।

উত্তরাধিকার থেকে নেতৃত্বে উত্তরণ:

শামা ওবায়েদ ইসলামের রাজনৈতিক পরিচয় শুরু হয় পারিবারিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে। তিনি বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও প্রভাবশালী রাজনীতিক কে এম ওবায়দুর রহমানের কন্যা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কে এম ওবায়দুর রহমান ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক ও দূরদর্শী নেতা হিসেবে পরিচিত। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নেতৃত্বগুণ এখনো দলীয় নেতাকর্মীদের অনুপ্রাণিত করে।

তবে শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক পথচলা কেবল উত্তরাধিকার নির্ভর নয়। বাবার মৃত্যুর পর তিনি যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হন, তা তাকে নতুনভাবে রাজনীতির ময়দানে দাঁড়াতে বাধ্য করে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম অংশগ্রহণ করে পরাজিত হলেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাননি। বরং পরাজয়কে শক্তিতে পরিণত করে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছেন।

তৃণমূল রাজনীতির শক্ত ভিত:

রাজনীতিতে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে শামা ওবায়েদ বেছে নেন তৃণমূলকেন্দ্রিক কৌশল। ফরিদপুরের নগরকান্দা ও সালথা উপজেলায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে সংগঠন পুনর্গঠন, কর্মীসংগ্রহ এবং স্থানীয় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন। বিশেষ করে নারী ও তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তার উদ্যোগ দলীয়ভাবে প্রশংসিত হয়।

দলীয় সূত্র জানায়, তিনি মাঠে নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন, কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন এবং স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করতেন। ফলে ধীরে ধীরে তিনি একজন ‘মাঠমুখী নেতা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তার সক্রিয় ভূমিকা দলের উচ্চপর্যায়ের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিপুল ভোটে জয়, জনসমর্থনের প্রতিফলন:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর-২ আসনে শামা ওবায়েদ ইসলাম ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে ৩২ হাজার ৩৮৯ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিজয়ী হন। এই জয় শুধু একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিশ্রম ও জনসংযোগের প্রতিফলন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, শামা ওবায়েদের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তাকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। ফলে তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হতে সক্ষম হন।

তার বিজয়ের পর থেকেই এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। শপথ গ্রহণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে।

মন্ত্রিসভায় নারী নেতৃত্বের প্রতীক:

নতুন মন্ত্রিসভায় তিনজন নারী প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে একজন শামা ওবায়েদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশের নারী নেতৃত্বের অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। বিএনপির মতো বড় রাজনৈতিক দলে নারী নেতৃত্বের বিকাশে তার অন্তর্ভুক্তি ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

সালথা উপজেলা বিএনপি সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শামা শুধু ওবায়দুর রহমানের কন্যা নন, তিনি নিজেই একজন দক্ষ সংগঠক। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে কাজ করে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন। তার এই পদোন্নতি প্রাপ্য।”

শিক্ষিত ও আধুনিক নেতৃত্বের প্রতিচ্ছবি:

শামা ওবায়েদ ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা। ১৯৭৩ সালের ১৪ মে ফরিদপুরের নগরকান্দায় লস্করদিয়ায় জন্মগ্রহণ করা শামা ওবায়েদ ঢাকার ভিকারুননিসা নুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পড়াশোনা শেষে প্রায় ছয় বছর করপোরেট খাতে কাজ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনা ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা তাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে রাখবে।

ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক ভারসাম্য:

রাজনৈতিক ব্যস্ততার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও শামা ওবায়েদ একজন সফল নারী। তার স্বামী সোভন ইসলাম একজন ব্যবসায়ী। তিনি দুই সন্তানের জননী। পারিবারিক দায়িত্ব ও রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে চলার সক্ষমতা তাকে আরও দৃঢ় নেতৃত্বে পরিণত করেছে।

তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ব্যস্ত রাজনৈতিক জীবনেও তিনি পরিবারকে সময় দেন এবং সন্তানদের শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। এই ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন তার ব্যক্তিত্বকে আরও পরিপূর্ণ করেছে।

অঙ্গীকার ও দায়িত্বের নতুন অধ্যায়:

নির্বাচনের আগে এক সাক্ষাৎকারে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছিলেন, “আমি রাজনীতিতে সুবিধা নিতে আসিনি; মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাই। কাজের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনই আমার লক্ষ্য।”

এখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তার সামনে রয়েছে নতুন চ্যালেঞ্জ। দেশের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বৈদেশিক কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি তাকে নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রত্যাশাও পূরণ করতে হবে।

বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ:

সালথা উপজেলা বিএনপির সদস্য ও সাবেক উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান মো. আসাদ মাতুব্বর ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, শামা ওবায়েদের এই পদোন্নতি ভবিষ্যতে তাকে আরও বড় দায়িত্বের পথে নিয়ে যেতে পারে। তার সাংগঠনিক দক্ষতা, মাঠমুখী রাজনীতি এবং জনসংযোগের ক্ষমতা তাকে বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অনেকে মনে করছেন, যদি তিনি সফলভাবে তার বর্তমান দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবেও তার সম্ভাবনা উজ্জ্বল।

ফরিদপুর থেকে জাতীয় মঞ্চে:

ফরিদপুরের আঞ্চলিক রাজনীতি থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ—শামা ওবায়েদের এই যাত্রা অনেক তরুণ নেতার জন্য অনুপ্রেরণার গল্প। তার রাজনৈতিক জীবন প্রমাণ করে, শুধু পারিবারিক পরিচয় নয়, বরং অধ্যবসায়, পরিশ্রম এবং জনগণের সঙ্গে সংযোগই একজন নেতাকে প্রতিষ্ঠিত করে।

শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার সামনে এখন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এই অধ্যায়ে তাকে প্রমাণ করতে হবে—তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী নন, বরং একজন দক্ষ নীতিনির্ধারক ও জননেত্রী।

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন চোখ শামা ওবায়েদের দিকে—তিনি কতটা সফলভাবে এই নতুন দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সেটিই দেখার বিষয়।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন