ভোটের মাঠে শৃঙ্খলা ফেরাতে সেনাবাহিনীর যে কার্যকর ভূমিকা সত্যিই প্রশংসনীয়?

আব্দুল্লাহ আল মামুন
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৭:২৬ এএম

একটি নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সে ভোট প্রদান বা ফলাফল ঘোষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা, সামাজিক সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতারও পরীক্ষা। সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচন সেই পরীক্ষারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

নানা আশঙ্কা, রাজনৈতিক উত্তাপ ও গুজবের ভেতর দিয়ে দেশ যখন ভোটের দিনে উপনীত হয়, তখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল একটাই—নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন ভোটগ্রহণ। সেই প্রত্যাশা পূরণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল লক্ষণীয়।

নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার, সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা এবং অতীতের অভিজ্ঞতা ভোটারদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি করেছিল। এ প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর মোতায়েন কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ছিল না; এটি ছিল জনআস্থার বার্তা। ভোটকেন্দ্রের আশপাশে তাদের দৃশ্যমান উপস্থিতি ভোটারদের আশ্বস্ত করেছে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং কোনো অপশক্তি অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারবে না।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তাদের দক্ষতাকে আরও পরিণত করেছে। দেশের ভেতরে দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো নির্মাণ ও জরুরি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাদের সাফল্য রয়েছে। ফলে নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন ছিল সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রয়াসের ধারাবাহিকতা।

ভোটের দিন ভোর থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে দেখা গেছে, সেনাসদস্যরা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও অযথা হস্তক্ষেপ নয়, আবার প্রয়োজনীয় মুহূর্তে দ্রুত উপস্থিতি—এই ভারসাম্যই ছিল কার্যক্রমের বৈশিষ্ট্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিতভাবে তারা নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলেন, যা ভোটারদের নির্ভয়ে কেন্দ্রে আসতে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও সংঘাতপ্রবণ এলাকায় তাদের উপস্থিতি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে কার্যকর ছিল।

গুজব প্রতিরোধ ছিল আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভিত্তিহীন তথ্য মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়াতে পারে। সেনাবাহিনীর টহল ও নজরদারি গুজব-প্রসূত বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধে সহায়ক হয়েছে। কোথাও বিচ্ছিন্ন উত্তেজনা দেখা দিলেও দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে, যা পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির সমন্বয়কে নির্দেশ করে।

তবে এই সাফল্যের বড় দিক হলো নিরপেক্ষতা বজায় রাখা। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা সহায়ক—প্রভাব বিস্তারকারী নয়। ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ত না হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক চর্চাকে শক্তিশালী করে। এবারের নির্বাচন সেই সীমারেখা রক্ষার একটি দৃষ্টান্ত হতে পারে।

নির্বাচন নিয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। তবে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছে—এ কথা অনস্বীকার্য। নির্বাচন-পরবর্তী বড় ধরনের সহিংসতা না হওয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এর পেছনে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টা কাজ করেছে।

ভবিষ্যতের জন্য এ অভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, জনআস্থা অর্জন এবং বাহিনী মোতায়েনের যৌক্তিকতা—এসব প্রশ্নের উত্তরে এবারের অভিজ্ঞতা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধিই টেকসই সমাধান। সংবেদনশীল সময়ে সেনাবাহিনীর সহায়ক ভূমিকা কার্যকর হলেও গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয় বেসামরিক কাঠামোর উন্নয়নে।

সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন একটি সামষ্টিক প্রয়াস। সেই প্রয়াসে সেনাবাহিনী শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাদের পেশাদার আচরণ, সংযম ও দায়িত্ববোধ একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে—রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে সক্ষম। এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকবে—এমনটাই প্রত্যাশা।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন