জাতীয় নাগরিক পার্টির সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ গত মঙ্গলবার এমপি হিসেবে শপথ নেন একটি স্পোর্টস জার্সি পরে যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে আলোচনা-বিতর্ক।
অনেকের মতে, সংসদের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইনপ্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানে এমন পোশাক পরা ছিল ‘অপেশাদারি ও অসম্মানজনক’।
অন্যদিকে হাসনাতের সমর্থকদের দাবি, আন্দোলনের সময় তিনি যে জার্সি পরতেন সেটিই তিনি শপথের দিন বেছে নিয়েছেন যা জনগণের সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করে।
তবে সংসদ সদস্য কী পরছেন, বাংলাদেশ এই আলোচনা নতুন নয়। এর আগেও একই ধরনের বিতর্কের জন্ম হয়েছে।
সংসদের আচরণবিধি নিয়ে জানাশোনা আছে এমন বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সংসদে উপস্থিত হওয়ার জন্য পোশাক সংক্রান্ত কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই, তবে রেওয়াজ আছে।
বিশ্বের অনেক দেশেই সংসদ বা আইনসভায় উপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে লিখিত-অলিখিত ড্রেসকোড আছে এবং সেগুলো মানাও হয়। কারণ সংসদ বা আইনসভার মতো প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রের মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
কী ভেবে ওই জার্সি পরেছিলেন হাসনাত
হাসনাত আবদুল্লাহ ঠিক কী ভেবে শপথগ্রহণের দিন ওই জার্সিটিই পরেছিলেন, তা জানতে তার সাথে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সাড়া দেননি।
এর আগেও জুলাই গণঅভ্যুত্থান এবং তারপর বিভিন্ন সময়ে নানা অনুষ্ঠানে তাকে এই জার্সি গায়ে দেখা গেছে।
জার্সিটির সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো রয়েছে, ইংরেজিতে লেখা ‘ইংলিশ’ যা মূলত বিভাগের নাম এবং জার্সির পেছনেও ইংরেজিতে তার নাম লেখা আছে ‘হাসনাত’, তার নিচে ইংরেজি অক্ষরে লেখা ১০।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে বড় ব্যবধানে জয়ী হন হাসনাত আবদুল্লাহ। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমর্থনে এনসিপির দলীয় প্রতীক শাপলা কলি নিয়ে নির্বাচন করেছেন তিনি।
এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য মুহাম্মদ ইউনূস যেদিন ফ্রান্স থেকে ঢাকায় আসেন, সেদিনও শাহজালাল বিমানবন্দরে তাকে বরণ করতে এই ধরনের জার্সি পরে গিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
এমনকি গত বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে সেই চিরচেনা জার্সি পরেই মঞ্চে উঠেছিলেন তরুণ এই এনসিপি নেতা।
বর্তমানে তিনি এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠকের দায়িত্বে রয়েছেন।
জার্সি পরা নিয়ে আলোচনা কেন
সংসদ বিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, “কাজটা (জার্সি পরা) ঠিক হয় নাই। কারণ গতানুগতিক নিয়মে ফর্মাল অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমাজের একটা গ্রহণযোগ্যতা থাকে”।
“তবে যেহেতু তারা একটা বিপ্লব করেছেন, তাই তিনি হয়তো জার্সি পরার মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে দেখাতে চেয়েছেন। হয়তো জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন যে বিপ্লব কিন্তু এখনো চলে যায়নি। যেহেতু জুলাই নিয়ে অলরেডি একটা বিতর্ক শুরু হয়ে গেছে,” যোগ করেন তিনি।
লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ সংসদে জার্সি পরা নিয়ে আপত্তিকে ‘শুচিবায়ু’ বলে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, “হাসনাতের হয়তো এখানে কিছুটা স্টান্টবাজি থাকতে পারে। কিন্তু একেবারে অবাক হওয়ার কিছু নাই, টি-শার্টে আমি সমস্যা দেখি না। আস্তে আস্তে এটা হতেই পারে। আমাদের এখানে আমজনতার পোশাক কেউ পরে না, পরে কলোনিয়াল মেন্টালিটির শাসকদের পোশাক। মনে করে, স্যুট টাই পরলে জেন্টলম্যান হওয়া যায়”।
এ সময় তিনি উদাহরণ হিসেবে আরও বলেন, “মওলানা ভাসানী তো লুঙ্গি পরে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন। তার তো সমস্যা হয়নি”।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী এক চরিত্র আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, যিনি তার অনুসারীদের কাছে মওলানা ভাসানী হিসেবে পরিচিত।
২৫ বছর ধরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কাভার করা সাংবাদিক ও গবেষক কামরান রেজা চৌধুরী বলছিলেন, হাসনাত আব্দুল্লাহ’র জার্সি পরাটা “বোধহয় অ্যাটেনশন ড্র করার উপায়”।
তার মতে, “হাসনাত আব্দুল্লাহ হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে আমি আগের মতোই আছি, আমি আমার মতো যাবো। সেজন্যই সবাই পাঞ্জাবি-পাজামা পরে গেলেও তিনি জার্সি পরে গেছেন। এটা পলিটিক্সের পার্ট। উনি বোঝাতে চেয়েছেন, আমি জনগণের মানুষ”।
এতে “মানুষের কাছে হাসনাত আব্দুল্লাহ’র গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। কারণ মানুষ মনে করবে, সে জনগণের সঙ্গেই আছে,” যোগ করেন এই সাংবাদিক।
সংসদের নির্দিষ্ট ড্রেসকোড আছে?
গতকাল ১৭ই ফেব্রুয়ারি বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোলা আকাশের নিচে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে ড্রেসকোড ছিল।
সাংবাদিকদের জন্য দেওয়া আমন্ত্রণপত্রগুলোতে মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ‘অফিসিয়াল/লাউঞ্জ স্যুট/মানানসই’ পোশাক পরে আসার কথা বলা হয়।
লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিকেলের মন্ত্রিসভার অনুষ্ঠানে মন্ত্রী থেকে শুরু করে সবার জন্য ড্রেসকোড ছিল।
কিন্তু সকালে এমপিদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে কোনো ড্রেসকোড ছিল কি না, সে বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি তিনি।
এদিকে, সংসদ বিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ বলছিলেন, তার জানা মতে সংসদে কোনো ড্রেসকোড নেই। তবে সেখানে সবাই গ্রহণযোগ্য পোশাক পরেন।
একই তথ্য পাওয়া যায় দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় সংসদের অধিবেশন কাভার করা সাংবাদিক ও গবেষক কামরান রেজা চৌধুরীর সাথে কথা বলার পরেও।
তিনিও বলছিলেন, অফিসিয়ালি (কাগজে-কলমে) সংসদের জন্য কোনো ড্রেসকোড নেই।
“গত ২৫ বছরে আমি সংসদ সদস্যদের পরতে দেখেছি পাঞ্জাবি-পাজামা। এমপিদের অনেকে প্যান্ট-শার্ট, কেউ কেউ ব্লেজার পরেন। নারীদের প্রায় সবাই শাড়ি পরেন। এটা নিজস্ব রুচির বিষয়। তবে সাধারণত এমপিরা সংসদে একটু সুন্দর ড্রেস পরেই যান”।
এর আগেও সংসদের ড্রেসকোড নিয়ে বিতর্ক
বাংলাদেশের সংসদে পোশাক পরা ঘিরে এর আগে কিছু ঘটেছিলো কি না, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে লিখিত কিছু পাওয়া না গেলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসেছে কিছু আলোচনা।
বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সিনিয়র সাংবাদিক গোলাম মর্তুজা অন্তুর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সাবেক সংসদ সদস্য মকিম হোসাইন হাওলাদারের পোশাক নিয়ে একটি পোস্ট দেওয়া হয়েছে।
১৯৭৩ সালের সাতই মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জানা যায়, সেসময় বাকেরগঞ্জ-৬ থেকে এমপি হয়েছিলেন ওই মকিম হোসাইন হাওলাদার।
মকিম হাওলাদার সবসময় লুঙ্গি পরেই চলাফেরা করতেন উল্লেখ করে মি. মর্তুজা লিখেছেন, তিনি “সংসদেও যাওয়া শুরু করলেন লুঙ্গিটা পরেই। তো এই নিয়ে তারই সহকর্মী কিছু এমপি অস্বস্তিতে পড়লেন। এক পর্যায়ে বিষয়টি সংসদে অফিসিয়ালি আলোচিত হলো”।
“একজন এমপি পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সংসদে ড্রেসকোডের বিষয়টি তুললেন, সংসদের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় লুঙ্গি পরে আসা যায় কি না সেই প্রশ্নও রাখলেন”।
“লুঙ্গির বিষয়টি নিয়ে অফিসিয়ালি প্রশ্ন ওঠার পর মকিম হাওলাদারও ছেড়ে কথা বললেন না। যদিও তার নাম কেউ উল্লেখ করেনি, তবুও বুঝলেন আলোচনা আসলে তাকে নিয়েই। সংসদ নেতার উদ্দেশে মকিম হাওলাদার বললেন, তিনি লুঙ্গি পরেন এটা জেনেই তো তাকে নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। এখন এমপি হওয়ার পর তাকে কেন প্যান্ট পরতে হবে?” লিখেছেন গোলাম মর্তুজা অন্তু।
মকিম হোসাইনের জবাব মেনে নিয়ে সংসদে লুঙ্গি পরে যাওয়ার বিষয়ে কোনো বিধি-নিষেধ না রাখার সিদ্ধান্ত হয় বলেও লিখেছেন তিনি।
তবে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এবং অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ, দু’জনের কেউ-ই এই ঘটনার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।
তবে সাংবাদিক কামরান রেজা চৌধুরী বলেছেন যে তিনিও এরকম একটি ঘটনার কথা শুনেছেন। তার ভাষ্যে, “উনার কথা শোনা যায়, কিন্তু আমি কোনো রেকর্ডে পাইনি”।
তবে সেই প্রথম সংসদের ঘটে যাওয়া আরেকটি ঘটনার কথা বিবিসিকে বলেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছ থেকে তিনি সরাসরি এই কথা শুনেছিলেন উল্লেখ করে বলেন, “প্রথম সংসদে আব্দুল হামিদ রিকশা নিয়ে সংসদে গিয়েছিলেন, কারণ তার গাড়ি ছিল না। তখন তাকে আটকানো হয়। তখন শেখ মুজিবুর রহমান চিফ হুইপকে ডেকে বলেছিলেন যে তাকে একটা গাড়ি দেওয়া যায় কি না। তখন তাকে একটা পুরোনো গাড়ি দেওয়া হয়”।
অন্যান্য দেশে সংসদে কী পরতে হয়
যুক্তরাজ্যের সংসদে এমপিদের জন্য স্পষ্ট ফরমাল ড্রেস পরার বিধান রয়েছে।
দেশটিতে পুরুষদের জন্য সাধারণত স্যুট ও টাই এবং নারীদের জন্য ফরমাল পোশাক। টি-শার্ট, স্পোর্টস জার্সি, স্লোগানযুক্ত টি-শার্ট বা অতিরিক্ত ক্যাজুয়াল পোশাক অনুচিত হিসেবে ধরা হয়।
সে দেশে পোশাককে “রেসপেক্ট অব দ্য হাউজ” বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা বলে মনে করা হয়।
অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সংসদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সংসদের আনুষ্ঠানিক নিয়ম-নীতিতে পুরুষ ও নারীদের জন্য একই মাত্রার ফরমাল ড্রেসের কথা বলা হয়েছে।
সেখানেও বলা হয়েছে যে স্পোর্টসওয়্যার, স্লোগান লেখা পোশাক বা অতিরিক্ত ক্যাজুয়াল পোশাক প্রত্যাশিত না। কারণ এগুলো সংসদের মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না।
তবে এতে আরও বলা হয়েছে যে গরম বা জরুরি পরিস্থিতিতে জ্যাকেট খুলে রাখা যেতে পারে। কিন্তু নিয়মকে একেবারেই অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই।
কমনওয়েলথের অনেক দেশেই মূলত সংসদে রাজনৈতিক স্লোগান বা স্টেটমেন্ট ছাপা পোশাক পরা নিষিদ্ধ। নারী-পুরুষ উভয়কেই ফরমাল পোশাক পরতে হয়।
তবে অনেক দেশে ঐতিহ্যবাহী পোশাককে ফরমাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্রগুলো নিজেদের পরিচয় তুলে ধরতে নিজস্ব ড্রেসকোড তৈরি করে।
যেমন, আফ্রিকার দেশ জাম্বিয়ায় ‘কাউন্ডা স্যুট’ জনপ্রিয় হলেও কেনিয়ার সংসদে তা নিষিদ্ধ।
ক্যারিবিয়ানে ঔপনিবেশিক পোশাকের বদলে ‘কারিবা স্যুট’ চালু হয়, যা একসময় জ্যামাইকার প্রধানমন্ত্রী মাইকেল ম্যানলে পরলেও পরে আর সংসদীয় পোশাক হিসেবে গ্রহণযোগ্য থাকেনি।
দক্ষিণ আফ্রিকায় নেলসন ম্যান্ডেলার রঙিন ‘মাদিবা স্যুট’ রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে এবং ভারতে স্বাধীনতার পর ‘নেহরু কলার’ সাংস্কৃতিক মর্যাদার অংশ হয়।
এ থেকে এটি স্পষ্ট হয় যে পোশাকের সঙ্গে সময়, রাজনীতি ও জাতীয় পরিচয়ও গভীরভাবে যুক্ত।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৭:৫০ এএম