ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের নেই পূর্ণাঙ্গ তালিকা, হারাচ্ছে ইতিহাস, রক্ষায় নেই উদ্যোগ

হারুন-অর-রশীদ ও এস.এম. মাসুদুর রহমান তরুন, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৯:৫৯ এএম

মাতৃভাষা বাংলার জন্য ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এই আন্দোলনের বীর শহীদদের নাম—সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার—জাতীয়ভাবে স্মরণ করা হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অসংখ্য ত্যাগী ভাষা সৈনিক আজও অজানাই রয়ে গেছেন। তেমনি এক বিস্মৃত অধ্যায়ের নাম ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকরা। তাদের অবদান ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের স্রোতে, আর নতুন প্রজন্ম জানতেই পারছে না নিজ জেলার এই বীরত্বগাথা।

ফরিদপুরে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও তৈরি হয়নি। স্থানীয় গবেষক, প্রবীণ নাগরিক ও সচেতন মহল বলছেন, সরকারি বা বেসরকারি কোনো উদ্যোগেই এখনো এই ইতিহাস সংরক্ষণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে একসময় যারা ঢাকার রাজপথ কাঁপানো আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন কিংবা জেলার বিভিন্ন স্থানে ভাষার দাবিতে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন, তাদের স্মৃতিচিহ্ন আজ প্রায় বিলীন।

বিস্মৃতির আড়ালে ফরিদপুরের বীরেরা:

ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের স্মৃতি এখন মূলত শহরের দু-একটি সড়কের নাম, কিছু স্মৃতিফলক এবং জেলা জাদুঘরের কয়েকটি ছবির ফ্রেমে সীমাবদ্ধ। অথচ এই জেলার অনেক তরুণই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ফরিদপুর শহরের সন্তান ডা. মোহাম্মদ জাহেদ ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি থেকেই ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সে সময় তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। পরে ১৯৫২-৫৩ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদের সক্রিয় সদস্য ছিলেন।

একইভাবে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলীর বাসিন্দা ডা. ননী গোপাল সাহা ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই ঐতিহাসিক সকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের আমতলায় ছাত্র-জনতার সমাবেশে যোগ দেন এবং মিছিলে অংশ নেন। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি চালালে বহু মানুষ আহত হন, শহীদ হন অনেকে। এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন ফরিদপুরের আরেক কৃতি সন্তান অ্যাডভোকেট এ.কে.এম. শামসুল বারী (মিয়া মোহন)।

তিনি নিজেও আহত হন, তবুও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তিনি শহীদ আবদুল বরকতকে কাঁধে তুলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। ভাষার জন্য জীবন বাজি রাখা এই সাহসিকতার গল্প আজ প্রায় বিস্মৃত।

জেলার আরও ভাষা সৈনিক:

ফরিদপুরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে আরও অনেক নাম উঠে আসে। তাদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক আবদুল গফুর, মহিউদ্দিন আহমেদ, ইমাম উদ্দিন আহমেদ, রওশন জামাল খান, এজহারুল হক সূর্য মিয়া, সাংবাদিক লিয়াকত হোসেন, সামসুদ্দিন মোল্যা, মনোয়ার হোসেন, এস.এম. নুরুন্নবীসহ আরও অনেকে।

তাদের কেউ সরাসরি ঢাকায় আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন, কেউবা ফরিদপুরে সংগঠিত করেছেন প্রতিবাদ, মিছিল ও জনমত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের জীবনী, অবদান বা সংগ্রামের পূর্ণাঙ্গ কোনো দলিল আজও সংরক্ষিত হয়নি।

ফরিদপুরেও হয়েছিল প্রতিবাদ:

অনেকে মনে করেন ভাষা আন্দোলন কেবল ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুরেও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। সে সময় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীরা মিছিল বের করেন। মিছিলটি জেলা স্কুল হয়ে থানা রোড ও জেলখানার সামনে গেলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এতে কয়েকজন আহত হন এবং দু-একজনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানা যায়।

এই ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে যে, ভাষার দাবিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মানুষ একযোগে প্রতিবাদে নেমেছিল। অথচ সেই ইতিহাস এখন পাঠ্যবই বা গবেষণায় খুব একটা জায়গা পায় না।

নতুন প্রজন্ম জানে না নিজেদের ইতিহাস:

ফরিদপুরের তরুণদের বড় একটি অংশ নিজ জেলার ভাষা সৈনিকদের নামই জানে না। এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিকরা।

ভাষা সৈনিক সাংবাদিক লিয়াকত হোসেনের ছেলে সাজ্জাদ হোসেন রনি বলেন, “মাতৃভাষার জন্য যারা জীবন বাজি রেখেছেন, তাদের স্মরণ করা আমাদের দায়িত্ব। ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের স্মৃতি সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে একটি স্থায়ী স্মৃতিফলক নির্মাণ করা জরুরি। একুশে বইমেলায় তাদের স্মৃতিগাথা তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।”

গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক পান্না বালা বলেন, “ঢাকার পাশাপাশি ফরিদপুরেও ভাষা আন্দোলনের জোয়ার ছিল। রাজেন্দ্র কলেজের শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হয়ে বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সচেতনতা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তাদের অবদান সেভাবে স্বীকৃতি পায়নি। অনেকের নামে রাস্তার নাম থাকলেও সেখানে ‘ভাষা সৈনিক’ পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি।”

তিনি আরও বলেন, “ডা. ননী গোপাল সাহার বাড়ির সামনে যে নামফলক ছিল, সেটিও এখন আর দেখা যায় না। আমরা যদি আমাদের বীর সন্তানদের ভুলে যাই, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে কীভাবে?”

গবেষণা ও সংরক্ষণে ঘাটতি:

স্থানীয় ইতিহাসবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীরা মনে করেন, ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের নিয়ে এখনও কোনো বিস্তৃত গবেষণা হয়নি। ফলে অনেক তথ্য হারিয়ে গেছে, অনেক নাম অজানা রয়ে গেছে।

ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মফিজ ইমাম মিলন জানান, নব্বইয়ের দশকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা শাখার উদ্যোগে কয়েকজন ভাষা সৈনিককে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ ধারাবাহিকতা পায়নি।

তার মতে, এখনই যদি উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে খুব শিগগিরই এই ইতিহাস পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।

শিক্ষার্থীদের দাবি:

বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরাও ভাষা সৈনিকদের স্মরণে কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চান। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থী আবরার নাদিম ইতু বলেন, “আমরা আমাদের জেলার ভাষা সৈনিকদের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানি না। তাদের নাম, ঠিকানা, অবদান—কিছুই সংরক্ষিত হয়নি। অথচ তাদের ত্যাগের কারণেই আমরা বাংলায় কথা বলতে পারছি।”

তিনি বলেন, “স্মৃতিফলক নির্মাণ, বইমেলায় বিশেষ স্টল এবং ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি করা জরুরি।”

শিক্ষার্থী জেবা তাহসিন বলেন, “শুধু সড়কের নামকরণে সীমাবদ্ধ না থেকে স্কুল-কলেজে তাদের নিয়ে আলোচনা, কুইজ, রচনা প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে। এমনকি শ্রেণীকক্ষ বা হোস্টেলের নামও ভাষা সৈনিকদের নামে রাখা যেতে পারে।”

করণীয় কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের ইতিহাস সংরক্ষণে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—

– ভাষা সৈনিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়ন

– মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ করে ডিজিটাল আর্কাইভ তৈরি

– কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাশে স্মৃতিফলক নির্মাণ

– শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা

– একুশে বইমেলায় ভাষা সৈনিকদের স্মৃতি তুলে ধরা

– গবেষণা ও প্রকাশনার উদ্যোগ গ্রহণ

ইতিহাস বাঁচানোর আহ্বান:

ভাষা আন্দোলন শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়, এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। সেই আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অবদানই এই সংগ্রামকে শক্তিশালী করেছে। ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের অবদানও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিন্তু যথাযথ সংরক্ষণ ও স্বীকৃতির অভাবে তাদের স্মৃতি আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। এখনই যদি উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের সম্পর্কে জানার সুযোগ হারাবে।

জেলাবাসীর দাবি—ফরিদপুরের ভাষা সৈনিকদের ইতিহাস নতুন করে তুলে ধরতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে এবং সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করতে হবে। কারণ, যে জাতি তার বীর সন্তানদের ভুলে যায়, সে জাতি কখনোই সামনে এগিয়ে যেতে পারে না।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন