সরকারি দপ্তরের দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে অসত্য প্রত্যয়নপত্র দাখিল করে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগ তুলে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাসিন্দা মো. রকি হাসান। একই সঙ্গে প্রাণনাশের হুমকি ও হয়রানির অভিযোগে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ উপ-সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আ. রহমান (বর্তমানে ঢাকা গণপূর্ত ই/এম বিভাগ-১০) এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী শিরিনা পারভীন (বর্তমানে ফরিদপুরে কর্মরত) তার দায়ের করা একাধিক মামলায় আদালতে মিথ্যা তথ্য উপস্থাপন করেছেন।
তিনি দাবি করেন, যশোরের আমলী আদালতে দায়ের করা পি-৫৭১/২৩ এবং পি-৯২৭/২৪ নম্বর মামলায় উক্ত দুই কর্মকর্তা ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর স্বাক্ষরযুক্ত প্রত্যয়নপত্র জমা দেন, যেখানে উল্লেখ ছিল যে, ঘটনার দিন ২৯ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে তারা কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তারা ওইদিন কর্মস্থলে ছিলেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রকি হাসানের ভাষ্য, “সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তারা আদালতে অসত্য প্রত্যয়নপত্র দিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করেছেন। এতে আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।”
তিনি আরও জানান, এ বিষয়ে তিনি প্রথমে গণপূর্ত অধিদপ্তর এবং পরে মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। পরবর্তীতে সরকারি অভিযোগ ব্যবস্থাপনা (GRS) প্ল্যাটফর্মে ট্র্যাকিং নম্বরসহ অভিযোগ করলেও সেখানে “ঘটনার সত্যতা পাওয়া যায়নি” বলে জানানো হয়।
তবে অভিযোগকারী দাবি করেন, পরবর্তীতে একই ঘটনায় দায়ের করা সি আর মামলা নং CR-১৪৭২/২৫ তদন্তের জন্য যশোর সিআইডি দপ্তরে পাঠানো হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা ঘটনার সত্যতা পেয়েছেন বলে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। ইতোমধ্যে মামলায় সমন জারি হয়েছে এবং শুনানির তারিখও নির্ধারিত হয়েছে।
এ অবস্থায় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পুনরায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন তাকে অবহিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুরোধ জানান।
এদিকে, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় থেকেও বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ২১ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে জারি করা এক পত্রে অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিন তদন্ত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, একই ব্যক্তি গত ১২ আগস্ট ২০২৫ তারিখে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, যেখানে তিনি হুমকি ও শারীরিক হয়রানির অভিযোগ তোলেন।
জিডি সূত্রে জানা যায়, ওইদিন সকালে ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে ফরিদপুরগামী একটি বাসে করে আদালতে হাজিরা দিতে আসেন তিনি। আদালতের কার্যক্রম শেষে দুপুরে ফেরার সময় ফরিদপুর গোল্ডেন লাইন বাস কাউন্টারে অবস্থানকালে নামাজের সময় একাধিক অজ্ঞাত নম্বর থেকে তাকে কল দেওয়া হয়। পরে নিজেকে বাসের সহকারী পরিচয় দিয়ে একজন ফোন করে দ্রুত বাসে উঠতে বলেন।
নামাজ শেষে বের হলে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে জোরপূর্বক একটি অফিস কক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় তারা তার বিরুদ্ধে প্রাক্তন স্ত্রীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে একটি অডিও রেকর্ডিং শোনায়, যা তিনি ‘সাজানো’ বলে দাবি করেন।
রকি হাসান অভিযোগ করেন, “পূর্বেও আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন নম্বর থেকে আমাকে ও আমার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আমাকে হয়রানি করা হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, ঘটনার সময় বাস কাউন্টার ও আশপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল, যেখানে পুরো ঘটনা রেকর্ড থাকার কথা। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ফরিদপুর কোতয়ালী থানার ডিউটি অফিসার জিডিটি গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানা গেছে। জিডি নম্বর ৮৬৩ এবং ট্র্যাকিং নম্বর DMAF87 হিসেবে এটি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা তথ্য প্রদান গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া যেতে পারে।
এদিকে ভুক্তভোগী রকি হাসান সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের প্রতি দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৩:৩০ পিএম