‘একটি বাড়ির ইতিহাস ও বেদনা’

তন্ময় উদ্দৌলা
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ৩:৫৬ পিএম

এটা আমার দাদাবাড়ি। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার ফলিয়া গ্রামের এই বাড়িটি ‘ফলিয়া জমিদার বাড়ি’ নামে পরিচিত। প্রায় এক শতাব্দী আগে আমার প্রপিতামহ, প্রয়াত জমিদার মুন্সী দুদু মিয়া এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।

বর্তমানে বাড়িটিতে এখনও তাঁর দুই ছেলে—সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম আরকান উদ্দৌলা (বাকা মিয়া) এবং সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম সোজা উদ্দৌলার স্ত্রী-সন্তানরা (আমাদের দাদিরা, বাবা-চাচারা ও তাদের সন্তানেরা) বসবাস করছেন।

এক সময় এই বাড়ি ছিল এলাকার মানুষের জন্য উন্মুক্ত দরজা—আতিথেয়তা, সহায়তা ও সামাজিক বন্ধনের একটি কেন্দ্র। আশেপাশের দুই-তিন উপজেলার এমন মানুষ খুব কমই আছেন, যারা কোনো না কোনোভাবে এই বাড়ির আতিথেয়তা পাননি বা উপকৃত হননি। আশেপাশের উপজেলার অনেক সম্মানিত ও সমৃদ্ধ মানুষের কাছ থেকেই আমি নিজে এই কথাগুলো শুনেছি।

এই বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা জমিদার মরহুম মুন্সী দুদু মিয়া শিক্ষা বিস্তারের জন্য নিজ বাড়ির পাশেই একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী গ্রাম গঙ্গানন্দপুর (বোয়ালমারী উপজেলায়) একটি মসজিদ, মাদ্রাসা ও ঈদগাহ নির্মাণ করেন। নড়াইলের জমিদার বাবু বন বিহারীর কাছ থেকে জমিদারির গোড়াপত্তন কেনার পর তিনি নড়াইল জেলা শহরের উন্নয়নের জন্যও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিজের জমি দান করেন—যা আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।

জমিদারের বড় ছেলে বাকা মিয়া এবং সোজা মিয়া কেমন মানুষ ছিলেন, তাঁদের চলাফেরা কেমন ছিল, কতটা আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যবোধ তাঁদের মধ্যে ছিল—সেসব গল্প আজও আশেপাশের উপজেলার মুরব্বিদের মুখে শোনা যায়। চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। শুধু তাই নয়, বহু গৃহহীন মানুষকে বসবাসের সুযোগ করে দিতে তারা দুই ভাই অনেক জমিও দান করেছেন।

এই বাড়ির তৃতীয় প্রজন্ম (আমাদের বাবা-চাচারা) এবং চতুর্থ প্রজন্ম (আমরা ও আমাদের কাজিনরা) এখন দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে আছি। কেউ আমেরিকায়, কেউ অস্ট্রেলিয়ায়; কেউ দেশের সুনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করছেন, কেউ জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা করছে, কেউ ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, কেউ নামকরা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ছে, আবার কেউ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। সবাই নিজের জায়গা থেকে পরিশ্রম করে নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে—এটাই আমাদের গর্ব।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমাদের মধ্যেই কেউ কেউ এই বাড়ির সম্মান ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে। উপকার তো দূরের কথা, বর্তমানে এই বাড়ির কিছু মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে বহু সাধারণ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে—কেউ কেউ প্রায় নিঃস্ব হয়ে পথে বসার উপক্রম। এমনকি এখন এই ঐতিহ্যবাহী বাড়ির ইট খুলে বিক্রি করার চেষ্টাও কেউ কেউ করছে। ইতিমধ্যে তারা বাড়ির ভেতরের কিছু জমিজমা বিক্রি করা শুরু করেছে, যা এই বাড়ির ঐতিহ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

এ কারণেই আমরা চাই, আমাদের পরিবারের ওইসব খারাপ মানুষ যেন তাদের যা কিছু আছে সব বিক্রি করে দিয়ে চিরতরে এই গ্রাম এবং আমাদের পরিবার থেকে সরে যায়। তা না হলে আমাদের পূর্বপুরুষদের নাম ভাঙিয়ে তারা একের পর এক অন্যায় করে যাবে আশেপাশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে, যার দায় শেষ পর্যন্ত আমাদের সবার ওপরই এসে পড়বে।

তাই তাদের অপকর্মের কোনো দায় আমরা নিতে চাই না। বরং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমরা আমাদের পরিবারকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে চাই।

হয়তো খুব বেশি দিন আর এই বাড়িটি থাকবে না।
তাই বুকভরা কষ্ট নিয়েই, ইতিহাসের এই শেষ স্মৃতিটুকু ধরে রাখার জন্য আজ বাড়িটির ছবি প্রকাশ করলাম।

কারণ একটি বাড়ি শুধু ইট-পাথরের গাঁথুনি নয়—এটি একটি পরিবারের ইতিহাস, স্মৃতি এবং পরিচয়ের অংশ।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন