“অন্তহীন এ জীবন”

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১২:৩২ পিএম

বৃষ্টিভেজা বিকেলের শেষে আকাশটা আজ অদ্ভুত রকমের বিষণ্ন। জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রাহাত চুপচাপ তাকিয়ে আছে দূরের কুয়াশা ঢাকা মাঠের দিকে। মাঠটা একসময় ছিল তার শৈশবের হাসি-আনন্দের কেন্দ্র, কিন্তু এখন যেন সবকিছু ফাঁকা, নির্জন—একদম তার নিজের জীবনের মতো।

রাহাত ভাবছিল—জীবনটা কি সত্যিই এতটা দীর্ঘ, নাকি শুধু টেনে নেওয়া কিছু নিঃশ্বাসের হিসাব?
তার মনে পড়ে, একসময় এই জীবনটাই ছিল স্বপ্নে ভরা। ছোট্ট গ্রাম, নদীর ধারে কাশবন, বিকেলে বন্ধুদের সাথে দৌড়ঝাঁপ—সবকিছুই যেন ছিল রঙিন। মা তখন বেঁচে ছিলেন। বাবার মুখে হাসি ছিল। সংসারে ছিল অভাব, কিন্তু ছিল শান্তি।
“জীবন মানে তো সুখ-দুঃখের মিশেল,”—মা প্রায়ই বলতেন।

কিন্তু তখন কে জানত, এই দুঃখ একদিন এতটা গভীর হয়ে উঠবে!

মায়ের মৃত্যুর পর থেকেই রাহাতের জীবনটা যেন থমকে যায়। বাবা হয়ে ওঠেন নিরব মানুষ। কথা বলা কমে যায়, হাসি তো একেবারেই হারিয়ে যায়। আর রাহাত? সে ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—জীবন আসলে কোনো গল্প না, এটা এক ধরনের যুদ্ধ।
একদিন রাতে বাবার পাশে বসে রাহাত বলেছিল,
“আব্বা, মা থাকলে সবকিছু অন্যরকম হতো, না?”
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলেছিলেন,
“মানুষ চলে যায়, কিন্তু জীবন থামে না। এইটাই সবচেয়ে কঠিন সত্য।”

সেদিন কথাটা বুঝতে পারেনি রাহাত। আজ বুঝতে পারে।
সময় গড়িয়ে যায়। রাহাত শহরে আসে পড়াশোনার জন্য। নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন স্বপ্ন। সে ভাবতে শুরু করে—হয়তো জীবন আবার নতুন করে শুরু করা যায়।

শহরের ব্যস্ততা তাকে ধীরে ধীরে ভুলিয়ে দেয় গ্রামের স্মৃতি। কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি থাকে—যেগুলো কখনো মুছে যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার জীবনে আসে মায়া।

মায়া—নামের মতোই রহস্যময়। চোখে ছিল গভীরতা, হাসিতে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। প্রথম দিন ক্লাসে দেখা, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব।
একদিন বিকেলে ক্যাম্পাসের গাছতলায় বসে মায়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল,
“তুমি এত চুপচাপ কেন?”
রাহাত হেসে বলেছিল,
“চুপ থাকলেই কি খারাপ?”
মায়া বলেছিল,
“না, কিন্তু তোমার চুপ থাকায় একটা কষ্ট লুকিয়ে থাকে।”
সেদিন প্রথমবার কেউ তার ভেতরের কষ্টটা চিনে ফেলেছিল।

এরপর থেকে তাদের সম্পর্কটা ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে। বন্ধুত্বের সীমা পেরিয়ে সেটা একসময় ভালোবাসায় রূপ নেয়।
মায়া বলত, “জানো, জীবনটা যতই কঠিন হোক, পাশে যদি একজন মানুষ থাকে, সবকিছু সহজ হয়ে যায়।”

রাহাত বিশ্বাস করতে শুরু করে—হয়তো তার জীবনও সুন্দর হতে পারে।
কিন্তু জীবন কি কখনো এত সহজ হয়?
একদিন হঠাৎ করেই মায়া দূরে সরে যেতে শুরু করে। ফোন ধরত না, মেসেজের উত্তর দিত না। দেখা হলে এড়িয়ে যেত।

রাহাত বুঝতে পারছিল না—কি হচ্ছে?
অবশেষে একদিন মায়া নিজেই দেখা করতে চাইল।
ক্যাম্পাসের সেই পুরোনো গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল সে।

রাহাত কাছে যেতেই মায়া বলল,
“আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।”
কথাটা যেন বজ্রপাতের মতো আঘাত করল।
“কি?”—রাহাত শুধু এইটুকুই বলতে পারল।
মায়া মাথা নিচু করে বলল,
“বাড়ির সিদ্ধান্ত। আমি কিছু করতে পারিনি।”
“আর আমাদের ভালোবাসা?”—রাহাতের কণ্ঠ কাঁপছিল।

মায়া চোখ তুলে তাকাল। চোখে পানি।
“সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না, রাহাত।”
সেদিন আকাশে রোদ ছিল, কিন্তু রাহাতের ভেতরটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল।
মায়ার বিয়ের পর রাহাত পুরোপুরি ভেঙে পড়ে। পড়াশোনায় মন বসে না, বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
রাতে ঘুম আসে না। বারবার মনে পড়ে মায়ার কথা, তার হাসি, তার চোখ।
একদিন সে নিজেকে প্রশ্ন করে—
“এই জীবনটা কি সত্যিই বেঁচে থাকার মতো?”
কিন্তু তারপরই বাবার কথা মনে পড়ে—
“জীবন থামে না।”
সে বুঝতে পারে, জীবন থেমে থাকলেও সময় থামে না। সময় তাকে টেনে নিয়ে যায় সামনে।

বছর পেরিয়ে যায়।
রাহাত এখন চাকরি করে। একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে একা থাকে। বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক—চাকরি আছে, টাকা আছে, একটা স্থির জীবন।
কিন্তু ভেতরে?
ভেতরে এখনো সেই শূন্যতা।
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়। রাহাত ভিজতে ভিজতে হাঁটতে থাকে।
তার মনে হয়—জীবনটা ঠিক এই বৃষ্টির মতো। কখন যে শুরু হয়, কখন যে থামে—কেউ জানে না।

হঠাৎ রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট মেয়ে তাকে ডাকল,
“ভাইয়া, ফুল নিবেন?”
রাহাত থেমে গেল।
মেয়েটার বয়স খুব বেশি হলে আট-নয় বছর। ভেজা কাপড়, হাতে কিছু ফুল।
“তুমি এখানে কেন?”—রাহাত জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটা হেসে বলল,
“ফুল বিক্রি করি। না হলে খাই কী?”
এই ছোট্ট মেয়েটার হাসি দেখে রাহাত অবাক হয়ে গেল। এত কষ্টের মধ্যেও সে হাসতে পারে!
রাহাত সব ফুল কিনে নিল।

মেয়েটা খুশিতে বলল,
“আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক ভাইয়া!”
কথাটা শুনে রাহাতের চোখে পানি চলে এল।
সে ভাবল—
“আমার তো সব আছে, তবুও আমি সুখী না। আর এই মেয়েটার কিছুই নেই, তবুও সে হাসতে পারে!”
সেদিন রাতে রাহাত প্রথমবার নিজের জীবনকে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করল।
সে বুঝতে পারল—
জীবন শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকার নাম না। জীবন মানে অন্যের জন্য কিছু করা, অন্যের হাসিতে নিজের সুখ খুঁজে পাওয়া।

পরের দিন থেকেই সে বদলে যেতে শুরু করে।
প্রতিদিন অফিস শেষে সে রাস্তার সেই বাচ্চাদের সাথে সময় কাটায়। তাদের পড়ায়, তাদের জন্য খাবার নিয়ে যায়।
ধীরে ধীরে তার জীবনে নতুন এক আলো আসতে শুরু করে।
একদিন সেই ছোট্ট মেয়েটা—যার নাম ছিল রিমি—হেসে বলল,
“ভাইয়া, আপনি আসলে ভালো লাগে।”
রাহাত হেসে বলল,
“আমারও ভালো লাগে।”
সেদিন অনেকদিন পর সে সত্যিকারের হাসল।
বছর কেটে যায়।

রাহাত এখন একটা ছোট্ট স্কুল চালায় পথশিশুদের জন্য। তার জীবনের লক্ষ্য বদলে গেছে।
একদিন সন্ধ্যায় স্কুলের ছাদে দাঁড়িয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার মনে পড়ে মা, মায়া, তার অতীত।
সবকিছুই যেন এখন একেকটা গল্প।

সে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে—
জীবন কখনো থামে না। এটা চলতেই থাকে।
কখনো সুখে, কখনো দুঃখে।
কখনো হারিয়ে, কখনো খুঁজে পেয়ে।
হঠাৎ একদিন সে শুনতে পেল, কেউ তার নাম ধরে ডাকছে।
“রাহাত?”
পেছনে ফিরে সে অবাক হয়ে গেল।
মায়া দাঁড়িয়ে আছে।
সময়ের সাথে সে বদলে গেছে, কিন্তু চোখ দুটো আগের মতোই আছে।
“কেমন আছ?”—মায়া জিজ্ঞেস করল।

রাহাত একটু হেসে বলল,
“ভালো আছি।”
“তুমি?”—সে জিজ্ঞেস করল।
মায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“ভালো থাকার চেষ্টা করছি।”
তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা।
তারপর মায়া বলল,
“তুমি বদলে গেছ।”
রাহাত হেসে বলল,
“জীবন বদলে দিয়েছে।”
মায়া চারপাশে তাকিয়ে বলল,
“এই স্কুলটা তোমার?”
“হ্যাঁ।”
মায়া মৃদু হেসে বলল,
“তুমি সত্যিই বড় কিছু করেছ।”
রাহাত কিছু বলল না।

সে বুঝতে পারছিল—সব কথা বলা যায় না।
মায়া চলে যাওয়ার আগে বলল,
“জানো, আমি অনেক সময় ভাবি—যদি সবকিছু অন্যরকম হতো?”
রাহাত শান্তভাবে বলল,
“সবকিছু যেমন হয়েছে, সেটাই ঠিক ছিল।”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
রাহাত বলল,
“কারণ এই পথেই আমি নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।”
মায়ার চোখ ভিজে উঠল।
সে কিছু না বলে চলে গেল।
রাতের আকাশে চাঁদ উঠেছে।
রাহাত ছাদের উপর বসে আছে।
তার মনে হচ্ছে—জীবনটা আসলে শেষ হওয়ার মতো না। এটা চলতেই থাকে, একের পর এক অধ্যায় নিয়ে।
কিছু মানুষ আসে, কিছু মানুষ চলে যায়।
কিছু স্বপ্ন ভেঙে যায়, কিছু স্বপ্ন নতুন করে জন্ম নেয়।

কিন্তু জীবন?
জীবন কখনো থামে না।
এটা এক অন্তহীন যাত্রা।
রাহাত চোখ বন্ধ করে।
তার মুখে এক শান্তির হাসি।
সে মনে মনে বলে—
“অন্তহীন এ জীবন… তবুও সুন্দর।”

 

লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন