যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মিসাইল ফুরিয়ে আসছে, যুদ্ধ চালাতে পারবে কতদিন?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬ । ৬:৫৩ এএম

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। এরই মধ্যে তুমুল আলোচনা উঠেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের সঙ্গে সংঘর্ষ টানা ১০ দিন অব্যাহত থাকলে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রভাণ্ডারে ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে ১০ দিনের বেশি সময় ধরে হামলা চললে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদে সংকট তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া পেন্টাগন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছে, ইরানে সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হলে গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে দ্রুত কমতে থাকা অস্ত্রভাণ্ডার পুনরায় পূরণের উচ্চ ব্যয়ের হিসাব-নিকাশও রয়েছে।

তবে মঙ্গলবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রভাণ্ডারে যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ ‘মাঝারি ও উচ্চতর মাঝারি গ্রেডে কখনও এত বেশি বা উন্নত ছিল না।’ তার ভাষায়, ‘আমাদের কাছে এই অস্ত্রের কার্যত সীমাহীন সরবরাহ রয়েছে। কেবল এই সরবরাহ ব্যবহার করেই যুদ্ধ ‘চিরকাল’ সফলভাবে চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।’

ইরান যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রসমূহ

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানে চলমান অভিযানে আকাশ, সমুদ্র, স্থল ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা মিলিয়ে ২০টিরও বেশি অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বি-১ ও বি-২ বোমারু বিমান, এফ-৩৫ লাইটনিং II, এফ-২২ র‍্যাপ্টর, এফ-১৫ এবং ইএ-১৮জি গ্রোলার যুদ্ধবিমান। পাশাপাশি ব্যবহার করা হচ্ছে ড্রোন ও দূরপাল্লার স্ট্রাইক সিস্টেম যেমন লুকাস ওয়ান-ওয়ে ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, এম-১৪২ হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল।

অভিযান শুরুর সময় মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন ছিল দুটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী- ইউএসএস আবরাহাম লিঙ্কন এবং ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড।

কোন অস্ত্র ঘাটতির আশঙ্কা

ইসরায়েল ও ইউক্রেনের মতো মিত্রদের টেকসই সামরিক সহায়তার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের ওপর চাপ বেড়েছে। সংঘর্ষ দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা দিতে পারে উচ্চমানের নির্ভুল অস্ত্র ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থায়—বিশেষত থাড সিস্টেমের মতো প্রতিরক্ষা মিসাইলের।

গত বছর ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের শেষ দিকে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলায় ওয়াশিংটন ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দেয়। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলে তাদের উন্নত থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুটি ব্যাটারি মোতায়েন করে। পরে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, ইরান থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ১৫০টির বেশি থাড মিসাইল নিক্ষেপ করা হয়েছিল—যা দেশটির মোট মজুদের প্রায় ২৫ শতাংশ।

একটি থাড ব্যাটারিতে সাধারণত ৯৫ জন সৈন্য, ছয়টি ট্রাক-মাউন্টেড লঞ্চার, ৪৮টি প্রতিরক্ষা মিসাইল (প্রতিটি লঞ্চারে আটটি), একটি রাডার এবং একটি অগ্নি-নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ইউনিট থাকে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে নয়টি সক্রিয় থাড ব্যাটারি রয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষকালে বিপুল পরিমাণ জাহাজভিত্তিক প্রতিরক্ষা মিসাইলও ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জয়েন্ট ডাইরেক্ট অ্যাটাক মিনিশন (JDAM)—যা জিপিএস-নির্দেশিত কিটের মাধ্যমে সাধারণ বোমাকে নির্ভুল ‘স্মার্ট’ অস্ত্রে রূপান্তরিত করে।

বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চমানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো প্রতিপক্ষের সীমিত, উচ্চ তীব্রতার হামলা মোকাবিলার জন্য নকশা করা- সস্তা ক্ষেপণাস্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ব্যারেজ প্রতিহত করার জন্য নয়। ফলে সময়ের সঙ্গে উন্নত প্রতিরক্ষা মিসাইলের সীমিত মজুদ দ্রুত নিঃশেষ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিটি প্রতিরক্ষা মিসাইলের দাম কয়েক লক্ষ থেকে কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যেখানে প্রতিপক্ষের ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কয়েক হাজার ডলার।

অস্ত্র সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র কী করবে

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র অন্য অঞ্চল থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র পুনর্মোতায়েন বা উৎপাদন বাড়াতে পারে। স্টিমসন সেন্টারের সিনিয়র ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবল বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা বাজেটের কারণে ওয়াশিংটন যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় বহন করতে সক্ষম হলেও প্রকৃত সীমাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে ইন্টারসেপ্টর মজুদে—বিশেষত প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম এবং এমএস-৬ ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে।

তিনি উল্লেখ করেন, এসব ইন্টারসেপ্টরের কিছু ইউক্রেনকে রাশিয়ার হামলা থেকে রক্ষায় বরাদ্দ ছিল। অন্যগুলো ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন রয়েছে, যেখানে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তরিত হলে অন্য অঞ্চলের প্রতিরোধ সক্ষমতা দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

চলমান যুদ্ধের ব্যয় কত

পেন্টাগন অভিযানের মোট ব্যয় প্রকাশ করেনি। তবে অনুমান বলছে, ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরানে অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৭৭৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। হামলার আগের প্রস্তুতিতে অতিরিক্ত ৬৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়—যার মধ্যে ছিল বিমান চলাচল, এক ডজনের বেশি নৌজাহাজ মোতায়েন এবং আঞ্চলিক সম্পদের সংহতকরণ।

সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটি-এর হিসাব অনুযায়ী, ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডের মতো একটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়।

সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে অস্ত্রভাণ্ডার, ব্যয় ও কৌশলগত ভারসাম্য—তিনটিই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।

সূত্র : টাইমস অফ ইন্ডিয়া

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন