ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলা দীর্ঘদিন ধরেই জেলার অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার হাজার হাজার কৃষকের জীবিকা অনেকটাই নির্ভর করে এই ফসলের ওপর। প্রতিবছরের মতো এবারও দুই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নে বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক পরিসরে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এই দুই উপজেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ করা হয়েছে।
তবে ভালো ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও হঠাৎ করে বাজারে দাম কমে যাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বিশেষ করে রমজান মাসের আগে নগদ টাকার প্রয়োজন মেটাতে অনেক কৃষক অপরিপক্ক পেঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু বাজারে আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় তারা এখন লোকসানের মুখে পড়েছেন।
গত বছরের লাভ, এ বছরের হতাশা:
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর মৌসুমের শুরুতেই পেঁয়াজের দাম তুলনামূলক বেশি ছিল। অনেক কৃষক তখন অপরিপক্ক পেঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করে বেশ লাভবান হয়েছিলেন।
গত মৌসুমে প্রতিমণ পেঁয়াজ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়েছিল। এতে কৃষকেরা উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ পেয়েছিলেন। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও অনেকে আগাম পেঁয়াজ তুলে বাজারে নিয়ে আসেন।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পাইকারি বাজারে দাম কমে যাওয়ায় বর্তমানে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৯৫০ থেকে ১১০০ টাকায়। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
বাজারে ক্রেতা কম, হতাশ কৃষক:
শুক্রবার (৬ মার্চ) সকালে সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই অনেক কৃষক মাথায় বা ভ্যানে করে পেঁয়াজ নিয়ে বাজারে এসেছেন। কিন্তু ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।
পাইকাররা কম দামে পেঁয়াজ কিনছেন, আবার অনেক সময় দরদাম না মেলায় কৃষকেরা পণ্য নিয়ে বসে থাকছেন দীর্ঘ সময়। শেষ পর্যন্ত সংসারের প্রয়োজনে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে হতাশ মনে বাড়ি ফিরছেন।
উৎপাদন খরচই উঠছে না:
বালিয়া বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “এবার পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ অনেক বেশি হয়েছে। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক মজুরি, সেচ এবং পরিবহন খরচ মিলিয়ে প্রতিমণ পেঁয়াজ উৎপাদনে প্রায় ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৯০০ থেকে ১১০০ টাকা দরে। ফলে প্রতিমণে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা লোকসান হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “রমজান মাসে সংসারের খরচ বেশি থাকে। সেই কারণে বাধ্য হয়েই আগাম পেঁয়াজ তুলে বাজারে আনতে হয়েছে। এখন কম দামে বিক্রি করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সংসার তো চালাতে হবে।”
অপরিপক্ক পেঁয়াজ সংরক্ষণও সম্ভব নয়:
কৃষকেরা জানান, বর্তমানে যে পেঁয়াজ বাজারে আসছে সেগুলো পুরোপুরি পরিপক্ক হয়নি। এসব পেঁয়াজ পরিপক্ক হতে আরও এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে।
অপরিপক্ক অবস্থায় তোলা পেঁয়াজ দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না। ঘরে রেখে দিলে দ্রুত পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে হলেও বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরাও বিপাকে:
পেঁয়াজের বাজার খারাপ হওয়ায় ব্যবসায়ীরাও খুব বেশি লাভ করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন পাইকাররা।
স্থানীয় পেঁয়াজ ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক বলেন,
“গত এক সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের বাজার খুব খারাপ। আমরা বর্তমানে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতিকেজি ২৫ থেকে ২৬ টাকা দরে পেঁয়াজ কিনছি। পরে এসব পেঁয়াজ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে হচ্ছে। সেখানে অনেক সময় প্রতিকেজিতে ১ থেকে ২ টাকা কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”
তিনি বলেন, “কৃষক ভালো দাম পেলে আমাদের ব্যবসাও ভালো হয়। কিন্তু বাজার খারাপ থাকলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়েন।”
ভালো দামের প্রত্যাশা:
ব্যবসায়ী আব্দুল খালেক মনে করেন, যদি পেঁয়াজের দাম প্রতিমণ ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকার মধ্যে থাকে, তাহলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা চালাতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি।
কৃষি বিভাগের পরামর্শ:
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুদর্শন সিকদার বলেন, “সাধারণত পেঁয়াজ উত্তোলনের মূল সময় আর এক মাস পর শুরু হবে। কিন্তু অনেক কৃষক এখনই পেঁয়াজ তুলে বাজারে বিক্রি করছেন। এতে ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি দামও কম পাচ্ছেন।”
তিনি আরও বলেন, “অপরিপক্ক অবস্থায় পেঁয়াজ তোলা হলে এর আকার ছোট হয় এবং সংরক্ষণক্ষমতাও কমে যায়। তাই কৃষকদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি, যতটা সম্ভব পরিপক্ক হওয়ার পরই পেঁয়াজ তুলতে।”
বিপুল উৎপাদনের সম্ভাবনা:
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সালথা ও নগরকান্দায় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পেঁয়াজের ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং রোগবালাই কম হয়, তাহলে এবার দুই উপজেলায় বাম্পার ফলনের আশা করছেন কৃষি কর্মকর্তারা। তবে বাজারদর স্থিতিশীল না থাকলে সেই সুফল কৃষকেরা নাও পেতে পারেন।
কৃষকের দাবি:
স্থানীয় কৃষকেরা মনে করেন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে বাজারে অস্থিরতা কমাতে সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি।
কৃষকেরা জানান, যদি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা যায়, তাহলে পেঁয়াজ চাষে কৃষকের আগ্রহ আরও বাড়বে এবং দেশের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই অঞ্চল।
সার্বিক পরিস্থিতি:
ফরিদপুরের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলার কৃষি অর্থনীতির বড় অংশই নির্ভর করে পেঁয়াজ চাষের ওপর। তাই বাজারে দাম কমে গেলে এর প্রভাব সরাসরি পড়ে হাজারো কৃষক পরিবারের ওপর।
বর্তমানে আগাম পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করে অনেক কৃষক লোকসানে পড়লেও তারা আশা করছেন, মৌসুমের মূল সময়ে বাজারদর কিছুটা বাড়বে।
তবে কৃষক, ব্যবসায়ী ও কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশের সময়: শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬ । ১০:৫৮ এএম