সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সতর্ক করে বলেছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে যদি হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে, তাহলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরবের এই কোম্পানি জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ বন্ধ থাকলেও তারা তাদের স্বাভাবিক উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ তেল বাজারে সরবরাহ করতে পারবে। তবে কোম্পানির প্রধান নির্বাহী সতর্ক করে বলেছেন, এই অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার পর থেকে গত ১১ দিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেলবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালী দিয়ে যেতে পারছে না।
এতে প্রতিদিন বৈশ্বিক বাজার থেকে প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ কমে গেছে।
তবে এই সতর্কবার্তার মধ্যেই মঙ্গলবার তেলের দাম কিছুটা কমেছে, কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রায় ১৪ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৫ ডলারে নেমে আসে। যদিও এটি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের হামলার আগে থাকা ৭২ ডলারের তুলনায় বেশি, তবে এ সপ্তাহে ছুঁয়ে যাওয়া ১১৯ ডলারের সর্বোচ্চ দামের তুলনায় কম।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ দাম।
এদিকে আটলান্টিকের দুই পাশের শেয়ারবাজারেও আংশিক স্বস্তি ফিরে আসে। লন্ডনের এফটিএসই ১০০ সূচক মঙ্গলবার ১.৬ শতাংশ বেড়েছে, জার্মানির ডিএএক্স সূচক ২.৪ শতাংশ এবং ফ্রান্সের সিএসি ৪০ সূচক ১.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিউইয়র্কের ওয়াল স্ট্রিটেও লেনদেন ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
আরামকোর প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের বলেন, ‘আগেও আমরা নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু এটি এই অঞ্চলের তেল ও গ্যাস শিল্পের জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকট।’
হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় আরামকো উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরাসরি তেল পাঠাতে পারছে না। তবে তারা পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পাঠিয়ে লোহিত সাগরের তীরে ইয়ানবু বন্দর থেকে রপ্তানির পরিকল্পনা করছে।
কোম্পানিটি জানিয়েছে, কয়েক দিনের মধ্যেই এই পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের শোধনাগারে যাবে এবং বাকি ৫০ লাখ ব্যারেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো হবে।
সাধারণত ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত এই সরু নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১০০টি তেলবাহী জাহাজ চলাচল করে। কিন্তু ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) হুমকি দেওয়ার পর এই সংখ্যা এখন এক অঙ্কে নেমে এসেছে। অথচ এই পথ দিয়ে বিশ্বে সরবরাহ হওয়া তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহন হয়।
আরামকো জানিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরে সংরক্ষিত তেলের মজুত ব্যবহার করে তারা আপাতত গ্রাহকদের চাহিদা মেটাচ্ছে। তবে এই মজুত দীর্ঘ সময় ব্যবহার করা সম্ভব নয়।
আমিন নাসের বলেন, ‘বৈশ্বিক তেলের বাজারে ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে। আর এই অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ততই মারাত্মক হবে।’
এদিকে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর জোট জি-৭ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি পর্যবেক্ষক সংস্থাকে জরুরি তেল মজুত বাজারে ছাড়ার সম্ভাব্য পরিকল্পনা তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।
এই কাজটি করে থাকে ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ), যা ১৯৭০-এর দশকের মধ্যপ্রাচ্য তেল সংকটের পর গঠিত হয়েছিল। সংস্থাটির ৩২টি সদস্য দেশকে কমপক্ষে ৯০ দিনের তেল মজুত ধরে রাখতে হয়, যাতে সরবরাহে বড় ধাক্কা এলে তা বাজারে ছাড়তে পারে।
বর্তমানে আইইএ সদস্য দেশগুলোর কাছে মোট ১.২ বিলিয়ন ব্যারেল সরকারি তেল মজুত রয়েছে, পাশাপাশি শিল্পখাতে সরকারের বাধ্যবাধকতায় রাখা আরও ৬০০ মিলিয়ন ব্যারেল মজুত আছে। এর বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ চীনের কাছেও প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বৈশ্বিক নেতারা তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে হস্তক্ষেপ করতে পারেন—এমন প্রত্যাশার কারণে সপ্তাহের শুরুতে চার বছরের সর্বোচ্চ দামে ওঠা তেলের দাম পরে কিছুটা কমে যায়। দিনের শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের নিচে নেমে আসে।
সূত্র: গার্ডিয়ান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬ । ৭:৪০ এএম