রাত বারোটা কিংবা একটার কাছাকাছি। চারদিকে নিস্তব্ধতা, অথচ আপনার চোখে ঘুম নেই। পেটে যেন এক অস্বস্তিকর শূন্যতা, মনে হচ্ছে এখনই কিছু একটা খেতে না পারলে শান্তি মিলবে না। ফ্রিজ খুলে একবাটি আইসক্রিম, কিংবা এক প্যাকেট চিপস হাতে নেওয়ার ইচ্ছা তীব্র হয়ে ওঠে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায়, এই অনুভূতি অনেক সময় সত্যিকারের পেটের খিদে নয়; বরং এটি হতে পারে ‘মস্তিষ্কের খিদে’।
গবেষকদের মতে, মাঝরাতে ঘন ঘন খিদে লাগা অনেক সময় এক ধরনের ইটিং ডিসঅর্ডার-এর লক্ষণ, যা প্রায়ই ডিপ্রেশন বা উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। অর্থাৎ শরীর নয়, বরং মস্তিষ্কই তখন খাবারের মাধ্যমে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মাঝরাতে খেতে ওঠেন তারা সাধারণত প্রোটিন বা সবজি নয়, বরং কার্বোহাইড্রেট বা চিনিযুক্ত খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। এর পেছনে রয়েছে শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক প্রক্রিয়া। আমাদের শরীরে সেরোটোনিন নামের একটি ‘ফিল-গুড’ হরমোন থাকে। চিনি বা কার্বোহাইড্রেটজাত খাবার খেলে এই হরমোনের নিঃসরণ বাড়ে। ফলে সাময়িকভাবে মন শান্ত হয় এবং ঘুম আসতে সুবিধা হয়। সহজভাবে বললে, শরীর তখন খাবারের মাধ্যমে নিজেকে ‘সেলফ-মেডিকেট’ করার চেষ্টা করছে।
তবে এই সাময়িক স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের প্রতিটি অঙ্গের একটি নির্দিষ্ট ‘ডিউটি টাইম’ রয়েছে। যেমন- লিভার ও প্যানক্রিয়াস রাতে বিশ্রামের প্রস্তুতি নেয়। এই সময় যদি নিয়মিত খাবার গ্রহণ করা হয়, তাহলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে।
হার্ভার্ডের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, মাঝরাতে খাবার খেলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে। প্যানক্রিয়াস তখন বিশ্রাম নেওয়ার বদলে কাজ করতে বাধ্য হয়। ফলে ধীরে ধীরে শরীরের ইনসুলিন সেনসিটিভিটি কমে যেতে পারে, যা ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। শুধু তাই নয়, এ ধরনের অভ্যাসের কারণে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমে ‘ফ্যাটি লিভার’-এর সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে ঘুমের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন হলো মেলাটোনিন। এটি শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের শরীরে মেলাটোনিনের মাত্রা কম থাকে, তাদের রাত জাগার প্রবণতা বেশি হয়। আর রাত জাগলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে ঘেরলিন; যাকে বলা হয় ‘খিদের হরমোন’। ফলে গভীর রাতে হঠাৎ খিদে লাগার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
কীভাবে এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
প্রোটিনসমৃদ্ধ ডিনার করুন
রাতের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও ফাইবার থাকলে তা দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখে। এতে মাঝরাতে হঠাৎ খিদে লাগার সম্ভাবনা কমে যায়।
স্ক্রিন টাইম কমান
মোবাইল ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপের নীল আলো শরীরে মেলাটোনিনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় এবং খিদের অনুভূতি বাড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে গ্যাজেট ব্যবহার বন্ধ রাখা ভালো।
পানি পান করুন
অনেক সময় শরীর জলতেষ্টাকে খিদের সংকেত হিসেবে ভুল করে। মাঝরাতে খিদে পেলে আগে এক গ্লাস পানি পান করে ১০-১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, তখন খিদের অনুভূতিটা ধীরে ধীরে কমে যায়।
সব মিলিয়ে, মাঝরাতে বারবার খিদে লাগা বিষয়টি একেবারে সাধারণ অভ্যাস ভেবে অবহেলা করার মতো নয়। এটি অনেক সময় শরীরের হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা মানসিক চাপের ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই নিয়মিত এমন সমস্যা হলে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা এবং প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই হতে পারে সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।
সূত্র : টিভি নাইন বাংলা

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬ । ৭:১৮ এএম