কিডনি ভালো আছে তো? এই ৪টি বিষয়েই মিলবে উত্তর

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ । ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ

স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বললে আমরা সাধারণত হৃদ্‌পিণ্ড, পাকস্থলী কিংবা ফুসফুসের কথাই বেশি ভাবি। কারণ এসব অঙ্গের সমস্যা হলে তা দ্রুত বোঝা যায়। কিন্তু শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ হলো কিডনি, যা নীরবে প্রতিদিন প্রায় ২০০ লিটার রক্ত পরিশোধন করে চলেছে। অথচ কিডনির সমস্যা অনেক সময় দীর্ঘদিন অজানাই থেকে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কিডনি রোগকে প্রায়ই ‘সাইলেন্ট ডিজিজ’ বলা হয়। কারণ লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগেই রোগ অনেকটা এগিয়ে যায়। তাই শরীরের ছোট ছোট কিছু পরিবর্তনের দিকে নজর দিলেই কিডনির সমস্যা আগেভাগে বোঝা সম্ভব।

স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট অনলি মাই হেলথ-এর সম্পাদকীয় টিম এ বিষয়ে কথা বলেছে নিরা ব্যালান্সের চিফ সায়েন্স অফিসার রিতেশ বাওরি–র সঙ্গে। তার মতে, কিডনি সমস্যার কিছু সূক্ষ্ম সংকেত আছে, যেগুলোকে আমরা প্রায়ই অবহেলা করি।

কেন কিডনির সমস্যা দ্রুত ধরা পড়ে না?

রিতেশ বাওরি বলেন, মানুষের কিডনির গঠনই এমন যে, এটি অনেকটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও প্রথম দিকে কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না।

তার ভাষায়, ‘কিডনি তার প্রায় ৪০ শতাংশ কার্যক্ষমতা হারানোর আগ পর্যন্ত অনেক সময় কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায় না। এটি কোনো ত্রুটি নয়, বরং শরীরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। শুরুতে কিডনি অসাধারণভাবে ক্ষতিপূরণ করে কাজ চালিয়ে যায়। এ কারণেই বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ে দেরিতে।’

তবে তিনি বলেন, শরীর যে সংকেত দেয়, শুধু সেই সংকেতগুলো বোঝার চেষ্টা করতে হবে।

কিডনি সমস্যার সূক্ষ্ম ৪ লক্ষণ

১. প্রস্রাবে পরিবর্তন

কিডনি সমস্যার প্রথম লক্ষণ অনেক সময় ধরা পড়ে প্রস্রাবের পরিবর্তনে। রিতেশ বাওরি বলেন, রাতে ঘন ঘন প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়া, প্রস্রাবে ফেনা বা বুদবুদ দেখা দেওয়া কিংবা রঙের পরিবর্তন হওয়া গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হতে পারে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, সুস্থ কিডনি সাধারণত রক্তে থাকা প্রোটিন ধরে রাখে। কিন্তু কিডনির ফিল্টারিং ঝিল্লি দুর্বল হলে প্রোটিন প্রস্রাবে চলে আসে। আর সেই কারণেই প্রস্রাবে ফেনা দেখা যায়।

২. অকারণ ক্লান্তি

পর্যাপ্ত ঘুমের পরও যদি সব সময় ক্লান্ত লাগে, সেটিও কিডনি সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনি শরীরে এরিথ্রোপয়েটিন নামের একটি হরমোন তৈরি করে, যা লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সাহায্য করে। কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেলে এই হরমোনের উৎপাদনও কমে যায়, ফলে শরীরে দুর্বলতা ও ক্লান্তি বাড়তে পারে।

৩. সকালে চোখ বা পা ফোলা

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর চোখের নিচে বা পায়ের গোড়ালিতে ফোলাভাব দেখা দিলে সেটিও কিডনি সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। রিতেশ বাওরি বলেন, কিডনি যখন অতিরিক্ত তরল ও সোডিয়াম বের করে দিতে পারে না, তখন তা শরীরের নিচের অংশে জমে যায়। অনেকেই এটাকে ক্লান্তির কারণে মনে করেন, কিন্তু নিয়মিত হলে বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

৪. অকারণে রক্তচাপ বাড়া

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিডনির সমস্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হলো হঠাৎ বা ধীরে ধীরে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। কারণ কিডনি শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই কিডনি দুর্বল হয়ে পড়লে রক্তচাপ বাড়তে পারে এবং আবার উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, এভাবে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়।

কিডনি পরীক্ষা করতে কোন টেস্ট জরুরি?

কিডনির অবস্থা জানতে দুইটি পরীক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান বিশেষজ্ঞরা—

eGFR (Estimated Glomerular Filtration Rate) : এটি রক্তের একটি পরীক্ষা, যা কিডনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে বর্জ্য ছেঁকে বের করছে তা জানায়। স্কোর ৬০–এর নিচে হলে দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগের আশঙ্কা থাকে।

Urine Albumin-to-Creatinine Ratio : এটি প্রস্রাবের একটি পরীক্ষা, যার মাধ্যমে অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ প্রোটিন লিক হওয়া ধরা পড়ে।

এ ছাড়া ইউরিক অ্যাসিডের মাত্রাও নজরে রাখা উচিত, কারণ এটি বেড়ে গেলে কিডনির টিউবুল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কিডনি সুস্থ রাখতে ৪টি অভ্যাস

বিশেষজ্ঞদের মতে, দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই কিডনির ওপর চাপ অনেকটা কমানো সম্ভব—

১. লবণ কম খান

প্রসেসড খাবার ও অতিরিক্ত রেস্তোরাঁর খাবার কমালে কিডনির ওপর চাপ কমে।

২. নিয়মিত হাঁটুন বা শরীরচর্চা করুন

অল্প সময় হাঁটলেও রক্তসঞ্চালন ও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

৩. পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন

ঘুম কম হলে কর্টিসল ও রক্তচাপ বাড়ে, যা কিডনির জন্য ক্ষতিকর।

৪. খাবারের সময়সূচি ঠিক রাখুন

অনেকে রাতে দেরিতে ভারী ও লবণাক্ত খাবার খান। এতে রাতে কিডনির ওপর চাপ বেড়ে যায়।

শেষ কথা

কিডনি আমাদের শরীরের সবচেয়ে নীরব অথচ পরিশ্রমী অঙ্গগুলোর একটি। এটি দিনরাত কাজ করে শরীরকে পরিষ্কার রাখে, অথচ সমস্যা না হওয়া পর্যন্ত আমরা এর দিকে তেমন নজর দিই না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত পানি পান করা, লবণ কম খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং বছরে অন্তত একবার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করালে কিডনি সুস্থ রাখা অনেকটাই সহজ। ছোট ছোট এসব অভ্যাসই বড় রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

© স্বর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। এই ওয়েবসাইটের লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

প্রিন্ট করুন