গাঁয়ের গোরস্থানটা আজ অদ্ভুত শান্ত। রাতের হালকা বৃষ্টিতে মাটিগুলো নরম হয়ে সমতল হয়ে গেছে, যেন কেউ যত্ন করে সব কবরের দাগ মুছে দিয়েছে। ভোরের মিষ্টি হাওয়া গায়ে এসে লাগে, আর পাশের মেহগনি গাছটায় বসে ‘বউকথা কও’ পাখিটা একটানা ডেকে চলেছে। এই নির্জনতার মাঝেই, এক টুকরো মাটির নিচে নিঃশব্দে শুয়ে আছেন আমাদের গ্রামের কাসেম সরদার—যার জীবনের গল্প কেউ আর মনে রাখেনি, অথচ ভুলে যাওয়ার মতো ছিল না তার কষ্টগুলো।
একসময় এই মানুষটিই ছিলেন গ্রামের চেনা মুখ। মাটির বাড়ির সামনে বাঁশের বেঞ্চে বসে থাকতেন, পরনে মলিন লুঙ্গি আর পুরনো গেঞ্জি। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে গিয়েছিল, কিন্তু চোখে ছিল এক ধরনের আশা—যে আশা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে শেষ পর্যন্ত। আমি যখনই ওনার বাড়ির পাশ দিয়ে যেতাম, দূর থেকে ডাক দিতেন, “মিয়াসাব, একটু শুনবেন?”
আমি কাছে গেলে ধীরে ধীরে বলতেন, “চেয়ারম্যানরে কইয়া দেন না, একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড পাইলে বাঁচতাম। আর কতো দিন মানুষের কাছে হাত পাতুম?” কথাগুলো বলার সময় তার গলায় কাঁপন থাকত, চোখে জমে উঠত অসহায়তার জল।
কাসেম সরদার একসময় খেটে খাওয়া মানুষ ছিলেন। দিনমজুরির কাজ করতেন, কারও জমিতে ধান কাটতেন, কারও বাড়িতে মাটি কাটতেন। ঘরে পড়ে যাওয়ার পর থেকেই জীবনটা যেন একেবারে থমকে যায়। দু’টি ছেলে ছিল, সে নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বাবার খোঁজ নেওয়ার সময় বা ইচ্ছে—দুটোরই অভাব ছিল তার জীবনে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার শক্তি কমে আসে। একসময় পুরোপুরি কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তখন শুরু হয় অন্যের দয়ার ওপর বেঁচে থাকা। কখনো পাশের বাড়ি থেকে একবেলা ভাত, কখনো মসজিদের সামনে বসে দু’একজনের দেওয়া কিছু টাকা—এভাবেই চলছিল তার দিন।
গ্রামের অনেকেই জানত তার কষ্টের কথা, কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি সত্যিকারেরভাবে। হয়তো সবাই ভেবেছে, “কেউ না কেউ তো দেখবেই।” আর সেই “কেউ”টা কখনোই আসেনি।
একদিন ঈদের সকালে তাকে দেখেছিলাম ঈদের মাঠে। মানুষজন নামাজ শেষে কোলাকুলি করছে, নতুন কাপড়ের গন্ধে চারপাশ ভরে গেছে। আর এক কোণে বসে ছিলেন কাসেম সরদার—চুপচাপ। কাছে গিয়ে হাতে কিছু টাকা দিয়েছিলাম। তিনি মাথা নিচু করে বলেছিলেন, “আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুক মিয়াসাব। এই টাকায় দুইদিন ভালো খাইতে পারুম।”
সেদিন কে জানত, সেটাই হবে আমাদের শেষ দেখা!
এর কিছুদিন পরেই খবর এল—কাসেম সরদার আর নেই। কেউ ঠিক বলতে পারল না কবে মারা গেছেন। হয়তো একা ঘরে, নীরবে, কারও অজান্তেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছেন। তার মৃত্যুতেও কোনো হাহাকার ছিল না, কোনো ভিড় ছিল না—ছিল শুধু কিছু আনুষ্ঠানিকতা।
তাকে গ্রামের গোরস্থানে দাফন করা হলো। প্রথম দিকে তার ছেলেটা এসে কবরে বাঁশের খুঁটি পুঁতে দিয়েছিল, যেন চিহ্নটা বোঝা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই খুঁটিগুলো পচে গেল, পড়ে গেল, আর একসময় হারিয়েও গেল। এখন তার কবরটা অন্য কবরগুলোর সঙ্গে মিশে গেছে—চেনার উপায় নেই।
আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই গোরস্থানে। চোখের সামনে অসংখ্য সমতল মাটি, কিন্তু কোনটা যে কাসেম সরদারের—তা জানার কোনো উপায় নেই। মনে হয়, মানুষটা যেমন জীবনে হারিয়ে গিয়েছিলেন, মৃত্যুতেও তেমনি হারিয়ে গেলেন।
পাখিরা এখনও ডাকে। সকালে ‘বউকথা কও’, রাতে কুক চড়ুই—এই পাখিরাই এখন তার নিত্যসঙ্গী। মানুষ তাকে ভুলে গেছে, কিন্তু প্রকৃতি যেন ভুলেনি। বাতাসে, মাটিতে, পাখির ডাকে—কোথাও না কোথাও এখনও রয়ে গেছে তার অস্তিত্ব।
মাঝে মাঝে মনে হয়, কাসেম সরদার কি সত্যিই কিছু চাইতেন? না, খুব বেশি কিছু না—একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড, দু’বেলা পেট ভরে খাওয়ার নিশ্চয়তা, আর একটু সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ। এই সামান্য চাওয়াটুকুও আমরা দিতে পারিনি।
আজ এই গোরস্থানে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর একটা অপরাধবোধ কাজ করে। মনে হয়, আমি যদি আরেকটু চেষ্টা করতাম! যদি একটু জোর দিয়ে বলতাম! হয়তো তার জীবনের শেষটা একটু ভালো হতে পারত।
কিন্তু “যদি” শব্দটা বড় নিষ্ঠুর। এটা শুধু আফসোস বাড়ায়, বাস্তব বদলায় না।
কাসেম সরদারের গল্পটা আসলে শুধু একজন মানুষের গল্প নয়—এটা আমাদের সমাজের গল্প। যেখানে অসহায় মানুষগুলো নীরবে বেঁচে থাকে, নীরবে কষ্ট পায়, আর একদিন নীরবেই চলে যায়।
একদিন হয়তো এই গ্রামের নতুন প্রজন্ম জানবেই না—কাসেম সরদার নামে কেউ ছিল। তার নাম মুছে যাবে, তার স্মৃতি হারিয়ে যাবে, আর সে পরিণত হবে ধূলোমাখা ইতিহাসের এক অচেনা অংশে।
তবুও কোথাও না কোথাও, এই মাটির গভীরে, হয়তো এখনও তার একটা দীর্ঘশ্বাস রয়ে গেছে— একটা অপূর্ণ চাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
– লেখক: হারুন-অর-রশীদ, সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশের সময়: শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬ । ৮:৫১ এএম