খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

পরপর দুই বছর কেন বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ করলো অন্তর্বর্তী সরকার?

জান্নাতুল তানভী
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৬:৪৮ পূর্বাহ্ণ
পরপর দুই বছর কেন বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ করলো অন্তর্বর্তী সরকার?

ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই বাংলাদেশে শুরু হয়ে যায় বিজয় উদযাপন প্রস্তুতি। প্রায় প্রতিবছরই ১৬ই ডিসেম্বর দেশটির বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে সেই উদযাপনেরই একটি অংশ হিসেবে থাকে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান।

গত বছর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পাঁচই অগাস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আটই অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকার বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান স্থগিত ঘোষণা করে।

তবে এক বছর পর এ বছরও এই অন্তর্বর্তী সরকার বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান স্থগিত করেছে।

গত ১৯ শে নভেম্বর দেশটির স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, “বিজয় দিবসে অস্থিরতার আশঙ্কা নেই। আগে যেমন ছিল এবারও কর্মসূচি থাকবে। বরং আগের চেয়ে কর্মসূচি বেশি হবে। তবে এবারও প্যারেড কর্মসূচি হবে না।”

কেবল রাজধানী নয়, জেলা-উপজেলা পর্যায়েও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান হচ্ছে না বলে জানানো হয়।

তবে বিজয় দিবসে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক শক্তির প্রদর্শন করে এবং এটি ঐতিহাসিক রেওয়াজ বলে উল্লেখ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এদিকে, কুচকাওয়াজ হলে রেওয়াজ অনুযায়ী সামরিক বাহিনীগুলোকে বাংলাদেশের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সালাম দিতে হবে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য ‘বিব্রতকর’, এটিকে কুচকাওয়াজ না হওয়ার পেছনে একটি কারণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

এ বিষয়ে কথা বলতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

বিজয় দিবসে সরকারের উদ্যোগ কী?

এ বছরও কুচকাওয়াজ হবে না- নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এই তথ্য জানানোর পর গত পাঁচই ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, কুচকাওয়াজ বন্ধ করার কোনো কারণ নেই। প্রস্তুতির সময় না পাওয়ায় কুচকাওয়াজ হচ্ছে না বলে জানান তিনি।

মি. আলম সাংবাদিকদের বলেন, গত বছর অগাস্টের পাঁচ তারিখের পর থেকে বাংলাদেশের মিলিটারি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় পুরো বাংলাদেশে নিয়োজিত আছে।

“৬০-৭০ হাজার আর্মি ট্রুপস তারা ডিউটি করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীদেরকে সাহায্য করার জন্য। সেজন্য একটা কুচকাওয়াজ করার জন্য যে প্রস্তুতি থাকে সেটা তো অনেক ক্ষেত্রেই এই সময়ে আমরা পাচ্ছি না সেজন্য ” বলেন মি. আলম।

তিনি মন্তব্য করেন, কুচকাওয়াজ নিয়ে যারা পরিস্থিতি ঘোলা করতে চাচ্ছেন, তারা সেনাবাহিনী ১৬ মাস বাইরে ডিউটি করছেন এমন বিষয় আমলে নিচ্ছেন না।

তাদের ক্যান্টনমেন্টে থাকার কথা ছিল, কিন্তু তারা টহল দিচ্ছেন দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, বলেন তিনি।

এদিকে, ১০ই ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মহান বিজয় দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি নিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঢাকায় ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা।

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন বলেও জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ এবার সর্বাধিক পতাকা উড়িয়ে প্যারাসুটিং করে বিশ্বরেকর্ড গড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।

তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর যৌথ উদ্যোগে স্বাধীনতার ৫৪ বছর উদ্‌যাপনে ৫৪ জন প্যারাট্রুপার পতাকা হাতে স্কাই ডাইভিং করবেন। এটিই হবে বিশ্বের বুকে সর্বাধিক পতাকা হাতে প্যারাস্যুটিং, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ড গড়বে।

একইসাথে বিজয় দিবসের দিন সকাল এগারটা থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পৃথকভাবে ফ্লাই পাস্ট মহড়া পরিচালনা করবে।

এছাড়া দেশের অন্যান্য শহরেও তিন বাহিনী ফ্লাই-পাস্ট মহড়া পরিচালনা করবে।

সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ বাহিনী, বিজিবি, আনসার বাহিনী ও বিএনসিসি’র বাদক দল বাদ্য পরিবেশন করবে।

এছাড়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিজয় মেলার পাশাপাশি শিশুদের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনা, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়।

এছাড়া বিনা টিকেটে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, জাদুঘর উন্মুক্ত রাখাসহ নানা আয়োজন করবে অন্তর্বর্তী সরকার। কনসার্ট, জাতীয় পতাকা উত্তোলনসহ নানা অনুষ্ঠানও আয়োজন করার কথা বলা হয়েছে।

একইসাথে প্রতিবছরের মতো এবারেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ অনুষ্ঠান, জেলা ও উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হবে।

চব্বিশে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ কুচকাওয়াজ বাতিল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে।

“এটা আসলে একটি প্রতীকী আত্মসমর্পণ। পাকিস্তান যে দেশটিকে ১৯৭১ সালে হারিয়েছিল, সেই পাকিস্তানের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা শক্তি এখন বাংলাদেশে ক্ষমতায়। তারা কীভাবে সেই পরাজয়ের দিনটি উদযাপন করবে?” ফেসবুক পোস্টে বলেছে আওয়ামী লীগ।

কুচকাওয়াজে কী থাকে?

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগের বিজয় দিবসগুলোতে দেখা গেছে, শহীদদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতারাসহ সাধারণ মানুষের ঢল নামতো সাভারে স্মৃতিসৌধে।

এছাড়া রাজধানীর তেজগাঁওয়ের পুরোনো বিমানবন্দর যেটি জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড, সেখানে সেনা, নৌ ও বিমান এই তিন বাহিনীর এই কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হতো। এতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা উপস্থিত থাকতেন। তিন বাহিনীর প্রধানও সেখানে উপস্থিত থাকতেন।

২০২৩ সালের বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, আনসারসহ বিভিন্ন বাহিনীর সালাম গ্রহণ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ।

এছাড়া বিমান বাহিনী ফ্লাই পাস্ট এবং অ্যারোবেটিক ডিসপ্লে করে। আকাশ থেকে নেমে আসেন প্যারা ট্রুপাররা।

বাংলাদেশের সামরিক সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে সাঁজোয়া যানগুলো এই কুচকাওয়াজে প্রদর্শন করা হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবায়দা নাসরীন মনে করেন, বিজয় দিবসে কুচকাওয়াজ অর্থ হলো একটা রণকৌশল, শৃঙ্খলা এবং এমন একটা উদ্যমের জায়গা যা বহুবছর ধরে এটি বিজয় এবং স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

“সরকারকে খোলাসা করতে হবে কেন কুচকাওয়াজ বন্ধ হলো। গতবছর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়েছে, এবার কোনো কারণই দেখায়নি। কিন্তু কুচকাওয়াজ আর অন্যান্য অনুষ্ঠান কোনোভাবেই রিপ্লেসের জায়গা না,” বলেন মিজ নাসরীন।

 

কেন কুচকাওয়াজ হয়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা জানান, প্রজাতন্ত্র দিবস বা একটি দেশের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কুচকাওয়াজ বা প্যারেড অনুষ্ঠানের রেওয়াজ রয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে লেখেন মহিউদ্দিন আহমদ।

তিনি জানান, ভারত, পাকিস্তান, চীন, উত্তর কোরিয়াসহ এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই সামরিক সক্ষমতার প্রকাশে এই ধরনের কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠিত হয়।

মি. আহমদ বলেন, “যেসব দেশে কুচকাওয়াজ হয়, প্রায় প্রতিটি দেশই তাদের সামরিক সক্ষমতার নিদর্শন ডিসপ্লে করে। যেমন- ভারত তাদের মিসাইল ডিসপ্লে করে।”

“আমাদের এখানে রাষ্ট্রবাদের প্রকাশটা দেখি মিলিটারি বাহিনীর কুচকাওয়াজের মাধ্যমে। রাষ্ট্রবাদীরা মনে করে সামরিক সরঞ্জাম, মারণাস্ত্র, অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ এটা দিয়েই বুঝি স্বাধীনতা রক্ষা করা যায়,” বলেন মি. আহমদ।

মি. আহমদ মনে করছেন, এ বছর কুচকাওয়াজ না হওয়ার দুটি কারণ থাকতে পারে। একটি আর্থিক এবং অপরটি রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদান।

রেওয়াজ অনুযায়ী, বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজে তিন বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদান করে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে বিব্রত বোধ করে বলে মনে করেন মি. আহমদ।

“কুচকাওয়াজে সালাম নেন রাষ্ট্রপতি। এখন তো সমস্যা হয়ে গেলো যে, এই রাষ্ট্রপতিকে তো অফিসিয়ালি ডিসপ্লে করা যাচ্ছে না। কেননা এটা বিব্রতকর এই সরকারের জন্য এবং অন্য আরো অনেকের জন্য,” বলেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

কেন বিব্রতকর এমন প্রশ্নে মি. আহমদ বলেন, “কারণ তিনি আমাদের পতিত ফ্যাসিস্ট শাসকদের অবশেষে হিসেবে থেকে গেছেন এই রাষ্ট্রপতি। কুচকাওয়াজের সাথে সাথে তো তাকেও ডিসপ্লে করতে হয় যেহেতু তিনি সালাম নেন। তো সেটা খুব বিব্রতকর।”

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্য দেশটি প্রস্তুত- এমন বিষয়ও বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজের প্রতীকী রূপ।

মিজ নাসরীন অবশ্য মনে করেন, এ বছর বিজয় দিবসের কুচকাওয়াজ বন্ধ রাখার পেছনে সরকারের অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

“কোনো কারণ প্রদর্শন না করে কুচকাওয়াজ বন্ধ হওয়া ইঙ্গিত করে যে অনেক কিছুই বন্ধ হবে। মেলা বা অন্যান্য কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কোনোভাবেই কুচকাওয়াজের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিকভাবে চর্চিত বিষয়কে খারিজ বা প্রতিস্থাপন করে না,” বলেন মিজ নাসরীন।

কুচকাওয়াজ বন্ধের পেছনে অন্তর্বর্তী সরকারের “বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে” বলেও উল্লেখ করেন মিজ নাসরীন।

তিনি বলেন, “কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর চাপ থাকতে পারে সরকারের ওপরে, কিংবা সরকার কোনো না কোনো গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য এটা করতে পারে তারা।”

কুচকাওয়াজ হচ্ছে এমন একটি প্রতীকী শক্তি যেটার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের আবেগ, গৌরব, দেশপ্রেমকে আবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় বলেও তিনি মনে করেন। “মুক্তিযুদ্ধকে মানুষ যাতে পুনরায় স্মরণ করতে না পারে সেজন্য বাধা দেওয়া, হুমকি তৈরি করাও” উদ্দেশ্য হতে পারে বলে মনে করেন অধ্যাপক মিজ নাসরীন।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

সালথায় যে কারণে থামছে না সংঘর্ষ? —কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ণ
সালথায় যে কারণে থামছে না সংঘর্ষ? —কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

ফরিদপুরের সালথা উপজেলা মারামারি ও সংঘর্ষ প্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানকার স্থানীয় অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মোড়ল কিংবা মাতুব্বররা এখানে লিড দিয়ে থাকেন। তারা তাদের দলে লোকজন ভিড়িয়ে আধিপত্য বিস্তার আর ক্ষমতার বলয় বৃদ্ধি করে থাকেন।

এরপর চলে এলাকায় আধিপত্য, দরবার-সালিশ, মামলা-হামলাসহ নানা কাহিনী। এভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে এ উপজেলার কাইজা, সংঘর্ষ আর বাড়ি-ঘর ভাংচুরের ঘটনা। এভাবেই কারো যাচ্ছে প্রাণ, কেউ হচ্ছেন বাড়ি হারা, কেউবা বরণ করছেন পঙ্গুত্ব।

যাহোক, এবার আসি কেন সালথা উপজেলায় মারামারি ও সংঘর্ষ বন্ধ হয় না—

এই উপজেলার মানুষ ধর্মপরায়ণ। তাইতো মাদ্রাসার সংখ্যাও বেশি, যেমন— বাহিরদিয়া মাদ্রাসা, পুরুরা মাদ্রাসা উল্লেখযোগ্য। মসজিদের সংখ্যাও অসংখ্য।

তবুও কেন থামছে না সংঘর্ষ—

‌> আধিপত্য বিস্তারের লড়াই:

মাতুব্বর তার আধিপত্য বিস্তার করতে এবং একক বলয় তৈরি করতে তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে সংঘর্ষ করে থাকেন। এরপর ঢাল, সরকি, রামদা, লাঠিসোঁটা আর ইটপাটকেল দিয়ে চলে সংঘর্ষ। এই সংঘর্ষে যদি নিজের পক্ষের কোনো লোকজন না যায় তবে তাকে হুমকি-ধমকি দিয়ে থাকেন মাতুব্বর ও তার অনুসারীরা। এরপরও কাইজা বা সংঘর্ষে না গেলে যিনি কাইজায় না যান তার বাড়িতে হামলা-ভাংচুর করা, এছাড়া তাদের মারধর করা হয়। এ কারণে একজন নিরীহ মানুষ কাইজা বা সংঘর্ষে না যেতে চাইলেও বাধ্য করা হয়।

> জোর করে দলভুক্ত করা:

বিপীরত বা বিরোধী পক্ষের মাতুব্বরের লোকজনকে মারধর ও বাড়ি-ঘর ভাংচুর ও হুমকি-ধমকি দিয়ে নিজের পক্ষে নিয়ে নেন অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাসীন মাতুব্বর কিংবা মোড়লরা। অতঃপর দলে ভিড়িয়ে তাদের দিয়েও কাইজা করান। না করলে হুমকি-ধামকি আর ভাংচুর চালায় তাদের বাড়িঘরেও।

> প্রতিবাদের পথ বন্ধ:

কেউ যদি মাতুব্বরের অপকর্ম নিয়ে কথা বলে কিংবা প্রতিবাদ করে তবে তাকে মারধর সহ মিথ্যা মামলায় জড়ান ওই মাতুব্বর ও তার অনুসারীরা। তাই ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করেনা।

> একপাক্ষিক সালিশ ব্যবস্থা:

এলাকায় কোনো ঘটনা ঘটলেই এই অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত মোড়ল সালিশ ডেকে যে রায় দেন সেটাই মানতে হয়! ভয়ে কেউ সঠিক কথা বলতে পারেন না।

> সালিশকে আয়ের উৎস বানানো:

এরপর এই মোড়ল বা মাতুব্বররা এলাকায় যে কোনো ঘটনা মিমাংসার নামে সালিশ বসিয়ে উভয় পক্ষের কাছে থেকে বা যে কোনো এক পক্ষের কাছে থেকে টাকা বা জরিমানা আদায় করেন। অতঃপর সেখানে ভাগ বসানোর অভিযোগ রয়েছে অহঃরহ। কেউ প্রতিবাদ করলে হয়রানির শিকার হন সে ব্যক্তি।

> অসৎ যোগসাজশের অভিযোগ:

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুষ্টিমেয় কিছু অসৎ কর্মকর্তার সঙ্গে এই মাতুব্বররা যোগসাজশ করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে বিধায় অনেক নিরীহ মানুষ থানা কিংবা প্রশাসনে অভিযোগ করলে উল্টো নিজেই অপরাধী ও মামলা হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাইতো, ভয়ে কেউ কথা বলতে চায় না।

> শিক্ষিত সমাজের নীরবতা:

এ উপজেলার উচ্চ শিক্ষিত ও ভালো চাকরিজীবী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শিল্পপতি আর ব্যবসায়ীরা এলাকায় থাকেন না। হয়রানি ও সম্মানহানির ভয়ে এ এলাকার মোড়ল কিংবা মাতুব্বরের বিরুদ্ধে কিছু বলেন না। সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে দেখা যায় না। তারা মনে করেন মাতুব্বরদের কিছু বললে উল্টো তারা নাজেহাল হবেন, পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় থাকবে। তাই অযথা ঝামেলায় জড়াতে চায় না।

এ উপজেলায় সংঘর্ষ ও মারামারি এড়াতে বা প্রতিরোধের উপায়-

> . ‘গ্রাম্য শান্তি কমিটি’ গঠন:

এ উপজেলায় মোড়ল কিংবা মাতুব্বর প্রথা বিলুপ্তি করে এলাকার সুশীল সমাজের লোক— যেমন নিরপেক্ষ স্কুল-কলেজের শিক্ষক, ব্যবসায়ী, মসজিদের ইমাম, চাকরিজীবী ও উচ্চ শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে কিংবা নিরপেক্ষ একজন মানুষকে প্রধান করে নিরপেক্ষভাবে গ্রামের যেকোনো বিরোধ কিংবা সমস্যা সমাধান কিংবা পরিচালনা করার জন্য ‘গ্রাম্য শান্তি কমিটি’ নামক একটি কমিটি করে দেওয়া যেতে পারে। তারা গ্রামের যেকোনো বিরোধ মিমাংসা করবেন। না পারলে আইনগত সহায়তা নিবেন বা সুপারিশ করবেন।

> মাদকবিরোধী কমিটি:

প্রতিটি এলাকার গ্রামে গ্রামে মাদক নির্মূল ও প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যারা এলাকার মাদক নির্মূল বা বন্ধে প্রশাসনের সহায়তা নিয়ে কাজ করবে।

> সংঘর্ষ প্রতিরোধ টিম:

এ ছাড়া প্রতিটি গ্রামে সুশীল সমাজের লোকজন দিয়ে কাইজ্যা কিংবা সংঘর্ষ প্রতিরোধ কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যারা সংঘর্ষ বন্ধে ভূমিকা পালন করবেন।

> নিরপেক্ষ আইন প্রয়োগ:

স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থেকে স্থানীয় মোড়ল কিংবা মাতুব্বর অথবা যারা মারামারিতে উস্কানি দেয় তাকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পক্ষপাতিত্ব করা যাবেনা।

> প্রশাসন ও জনগণের সমন্বয়:

থানা পুলিশ ও প্রশাসন স্থানীয় প্রতিটি গ্রামে গঠন করা শান্তি কমিটির কিংবা সুশীল সমাজের সঙ্গে সমন্বয় করে আইনশৃঙ্খলা ভালো রাখতে কাজ করতে পারেন।

> জরুরি হেল্পলাইন চালু:

সংঘর্ষ ও কাইজা বন্ধে দ্রুত রেসপন্স করার জন্য থানা কিংবা উপজেলা প্রশাসনে হেল্পলাইন নম্বর চালু করা যেতে পারে। যাতে যেকোনো সহিংসতা বন্ধে দ্রুত রেসপন্স করতে পারে প্রশাসন।

> দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার অভিযান:

প্রশাসনের দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার নিয়মিত অভিযান পরিচালনা অব্যাহত রাখা। যাতে নতুন দেশীয় অস্ত্র তৈরি করতে না পারা ও মানুষের ভয় এবং আতঙ্ক তৈরি হয় কাইজের বিরুদ্ধে।

> সচেতনতামূলক কার্যক্রম:

প্রশাসনের সহযোগিতায় একটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট এমপি, ইউএনও কিংবা ওসিকে প্রধান করে সুশীল সমাজ, চাকরিজীবী, শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে, সম্মানি ব্যক্তির দ্বারা কয়েকটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যে কমিটির কাজ হবে একেকদিন এক একটি স্কুল-কলেজে গিয়ে এভাবে প্রতিটি স্কুল-কলেজে পৌঁছে কাইজা বা সংঘর্ষের কুফল ও খারাপ দিকগুলো বিস্তর আলোচনা করতে পারে শিক্ষার্থীদের মাঝে। যাতে নতুন প্রজন্ম এই কাইজা করতে নিরুৎসাহিত হয়।

> নিয়মিত গণসভার আয়োজন:

থানার ওসি ও ইউনওর অন্তত মাসে এলাকার লোকজন নিয়ে এক একটি ইউনিয়নে গিয়ে কাইজা বন্ধে সভা-সমাবেশ করতে পারেন।

এইভাবেই সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সালথা উপজেলায় সংঘর্ষ ও সহিংসতা কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক:

হারুন-অর-রশীদ, বিবিএ (অনার্স), এমবিএ (ব্যবস্থাপনা)।

– ফরিদপুর প্রতিনিধি: বাংলানিউজ২৪ ও দৈনিক আজকালের খবর।

– সিনিয়র সহ-সভাপতি : সালথা প্রেসক্লাব

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।