খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে নারিকেল চারা বিতরণ

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫, ২:৪২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে বিনামূল্যে কৃষকদের মাঝে নারিকেল চারা বিতরণ

কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় নারিকেলের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ফরিদপুরে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খরিপ-২ মৌসুমে কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে নারিকেল চারা বিতরণ করা হয়েছে।

ফরিদপুর সদর উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে সোমবার (২৩ জুন) সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে ৩০০ জন কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে উন্নত জাতের ১৫০০টি নারিকেলের চারা বিতরণ করা হয়।

ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে বিতরণ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করেন ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসরাত জাহান।

বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানা, সদর উপজেলা সহকারী কৃষি কর্মকর্তা শেখ আমিনুল ইসলাম, উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আব্দুর রব, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলামসহ উপকারভোগীরা।

ফরিদপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আনোয়ার হোসেন তিনি তার স্বাগত বক্তব্যে বলেন, কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খরিপ-২ মৌসুমে নারিকেলের আবাদ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে সদর উপজেলার ৩০০ জন কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে ৫ টি করে উন্নত জাতের নারিকেলের চারা বিতরণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগের ফলে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি নারিকেল উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।

ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
ডিম ছাড়ার মৌসুমেও সালথায় চায়না দুয়ারির দাপট, হুমকিতে দেশীয় মাছের বংশবিস্তার

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি (চায়না জাল) দিয়ে অবাধে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। আষাঢ় মাসজুড়ে যখন দেশীয় প্রজাতির অধিকাংশ মাছ ডিম ছাড়ে ও বংশবিস্তার করে, ঠিক সেই সময় নির্বিচারে মাছ ধরায় জলজ জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় মাছের উৎপাদন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।

শুক্রবার (৩ জুলাই) উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় খাল, বিল, নালা ও নদীর বিভিন্ন স্থানে চায়না দুয়ারি বসিয়ে দিন-রাত মাছ ধরা হচ্ছে। এসব ফাঁদে শুধু বড় মাছই নয়, রেণু, পোনা এবং ডিমওয়ালা মাছও আটকা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে এভাবে নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার হলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর অভিযান না থাকায় অসাধু জেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে একদিকে যেমন দেশীয় মাছের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে ভবিষ্যতে মৎস্যসম্পদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বাসিন্দা মজিবুর মাতুব্বর বলেন, “আগে বর্ষাকালে খাল-বিলে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে ছোট-বড় সব মাছ ধরা পড়ে যাচ্ছে। মাছ ডিম দেওয়ার আগেই ধরে ফেলায় আগের মতো মাছ আর পাওয়া যায় না। প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান চালানো প্রয়োজন।”

একই উপজেলার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, “চায়না দুয়ারি একবার বসালে পানির ভেতরের প্রায় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ে। এতে ছোট মাছও রক্ষা পায় না। কয়েকজনের লাভের জন্য পুরো এলাকার মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। বিষয়টি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি বা সূক্ষ্ম ফাঁসের অবৈধ জাল ব্যবহারের ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব জাল ব্যবহার দেশীয় প্রজাতির মাছের জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়। এ কারণে সরকার বিভিন্ন সময় এ ধরনের অবৈধ উপকরণ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

এ বিষয়ে সালথা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তরুণ বসু ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, “চায়না দুয়ারি ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যেখানে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। অবৈধভাবে মাছ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকার বদ্ধপরিকর। নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি দিয়ে মাছ শিকারের অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে স্থানীয়দেরও সচেতন হয়ে প্রশাসনকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানাই।”

২০২৬-২৭ সালের বাজেট কতটা জনমুখী, কতটা অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত?

রেহেনা ফেরদৌসী
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
২০২৬-২৭ সালের বাজেট কতটা জনমুখী, কতটা অর্থনৈতিকভাবে বাস্তবসম্মত?

জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়নের রূপরেখা এবং নাগরিকের প্রতি সরকারের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। ২০২৬- ২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে এনেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তব অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে ব্যবধান কতটা কমাতে পারবে এই বাজেট?

প্রতিটি জাতীয় বাজেট একটি দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। এটি শুধু সরকারের ব্যয় পরিকল্পনা নয়; বরং রাষ্ট্র কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেবে, কীভাবে রাজস্ব সংগ্রহ করবে, মূল্যস্ফীতি মোকাবিলা করবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশ গড়ে তুলবে তারই একটি সামগ্রিক নীতিপত্র।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট এমন এক সময়ে কার্যকর হলো, যখন বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতিকে চাপের মধ্যে রেখেছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ তুলনামূলক সহজ; সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন, দক্ষ প্রশাসন এবং নীতির ধারাবাহিকতা।

জনপ্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা:

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা খুব জটিল নয়। তারা চায়-

* নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমুক

* কর্মসংস্থান বাড়ুক

* চিকিৎসা ও শিক্ষা আরও সহজলভ্য হোক

* করের বোঝা যেন অসহনীয় না হয়

* এবং ব্যবসা-বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত হোক

অন্যদিকে সরকারের সামনে বাস্তবতা ভিন্ন। একদিকে রাজস্ব বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা, অবকাঠামো, ঋণের সুদ এবং সরকারি পরিচালন ব্যয়, সবকিছুই অর্থের দাবি রাখে। ফলে সরকারকে একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ এবং আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও সেই দ্বৈত বাস্তবতা স্পষ্ট।

বাজেটের আকার বাড়ানো হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও উন্নয়ন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণেও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে মূল প্রশ্নটি অন্যত্র।
রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা যদি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে উন্নয়ন পরিকল্পনার বড় অংশই কাগজে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।

বাংলাদেশে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রায়ই পূরণ হয় না। ফলে বছরের মাঝামাঝি উন্নয়ন ব্যয় কমাতে হয় অথবা ঋণ নির্ভরতা বাড়াতে হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

অর্থনীতির ভাষায়, একটি বাজেটের সফলতা তার আকারে নয়; বরং বাস্তবায়নের দক্ষতায়। কেননা জনগণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের ভাষণ মনে রাখে না, তারা মনে রাখে বাজারের চাল-ডাল, চিকিৎসার খরচ, সন্তানের চাকরি এবং নিজের ক্রয়ক্ষমতার বাস্তব অভিজ্ঞতা।

বাজেটের সামগ্রিক মূল্যায়ন : লক্ষ্য যত বড়, বাস্তবায়ন তত বড় চ্যালেঞ্জ

একটি বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বরং তার বাস্তবায়নে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উচ্চাভিলাষী। প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা এতে লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য কেবল অর্থ বরাদ্দ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দক্ষ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, স্বচ্ছতা এবং নীতির ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। বাংলাদেশের বাজেট প্রণয়নের একটি দীর্ঘদিনের দুর্বলতা হলো বরাদ্দ ও বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যবধান। উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্প অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্ব, এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশিত সুফল সময়মতো জনগণের কাছে পৌঁছায় না। ফলে বড় বাজেট সবসময় বড় ফলাফল নিশ্চিত করে না।

রাজস্ব ও করনীতি : শুধু কর বাড়ানো নয়, করের ভিত্তি বাড়ানো জরুরি। রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান শক্তি রাজস্ব। কিন্তু বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় কম। প্রতি বছর উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে করব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত তিনটি-

প্রথমত, করের আওতা বাড়ানো।

দ্বিতীয়ত, কর আদায়ে স্বচ্ছতা ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা।

তৃতীয়ত, সৎ করদাতাকে উৎসাহিত করা এবং কর ফাঁকি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করলে ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। তাই করনীতি এমন হওয়া উচিত, যা একদিকে সরকারের রাজস্ব বাড়াবে, অন্যদিকে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পরিবেশও বজায় রাখবে।

মূল্যস্ফীতি : জনগণের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটি-বাজারে কি স্বস্তি ফিরবে? গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয়কে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষয় করেছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কেবল আর্থিক নীতির বিষয় নয়, এটি সরবরাহব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি এবং মুদ্রানীতির সমন্বিত ফল। তাই শুধু বাজেটে লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না; সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে।

কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ : একটি অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার তরুণ জনগোষ্ঠী উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সীমিত হয়ে পড়বে। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটে বেসরকারি বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতি আরও কার্যকর প্রণোদনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত। তাই বিনিয়োগবান্ধব নীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও রপ্তানি: টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। শিল্প ও সেবাখাতের প্রসার সত্ত্বেও কৃষি এখনও খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই বাজেটে কৃষিকে শুধু ভর্তুকি নির্ভর খাত হিসেবে নয়, একটি প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী অর্থনৈতিক খাত হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের আম, কাঁঠাল, সবজি, আলু, চিংড়ি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। কিন্তু আন্তর্জাতিকমান, কোল্ডচেইন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্যাকেজিং ও লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতা আমাদের সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে দিচ্ছে না। বাজেটে এসব অবকাঠামো উন্নয়নে ধারাবাহিক বিনিয়োগ হলে কৃষি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরও শক্তিশালী খাতে পরিণত হতে পারে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য : ব্যয় নয়, বিনিয়োগ

যে রাষ্ট্র শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে ব্যয় হিসেবে দেখে, সে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের গতি হারায়। দক্ষ মানবসম্পদই একটি দেশের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সম্পদ। বাজেটে শিক্ষা খাতে শুধু অবকাঠামো নয়, গবেষণা, কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা এবং শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি। একইভাবে স্বাস্থ্য খাতে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা, জেলা পর্যায়ে বিশেষায়িত সেবা, ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য।

সামাজিক নিরাপত্তা : সহায়তা থেকে সক্ষমতায়

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুধু আর্থিক সহায়তা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে দীর্ঘমেয়াদে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং আত্মনির্ভরশীলতা গড়ে তোলা। বিশেষ করে প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তা কর্মসূচির পাশাপাশি দক্ষতা উন্নয়ন ও আয়বর্ধক উদ্যোগ যুক্ত করা হলে রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যয় আরও কার্যকর হবে। বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কূটনীতি বাংলাদেশ ধীরে ধীরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে। এর ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা কমে আসতে পারে। তাই এখন থেকেই রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং অর্থনৈতিক কূটনীতিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একটি আধুনিক অর্থনীতি শুধু উৎপাদন দিয়ে নয়; আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা দিয়েও মূল্যায়িত হয়।

অর্থনীতির দৃষ্টিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সতর্ক আশাবাদের বাজেট বলা যেতে পারে। এতে উচ্চাকাক্সক্ষা রয়েছে, উন্নয়নের রূপরেখা রয়েছে, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবায়নের সক্ষমতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা। যদি রাজস্ব আহরণ প্রত্যাশামতো না বাড়ে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা নিশ্চিত না হয়, তবে এই বাজেটের অনেক ইতিবাচক লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত-

> করের আওতা সম্প্রসারণ ও ডিজিটাল করব্যবস্থা জোরদার করা।

> মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার তদারকি ও সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা।

>  ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও খেলাপি ঋণ কমাতে কার্যকর সংস্কার।

> ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা।

> কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।

> শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা উন্নয়নে বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার।

> স্বাস্থ্যসেবায় গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি।

> উন্নয়ন প্রকল্পে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কঠোর জবাবদিহি।

> বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ।

> তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং স্বাধীন মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রসার।

জাতীয় বাজেট কোনো জাদুকাঠি নয়;  এটি সম্ভাবনার একটি নকশা। সেই নকশা বাস্তবে রূপ দেয় মানুষের পরিশ্রম, সুশাসন, দক্ষ প্রশাসন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে, যদি ঘোষণাগুলো বাস্তবায়নের দৃঢ়তা থাকে, যদি ব্যয়ের প্রতিটি টাকার জবাবদিহি নিশ্চিত হয় এবং যদি নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। জনগণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের ভাষণ মনে রাখে না; তারা মনে রাখে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম, সন্তানের কর্মসংস্থান, কৃষকের ন্যায্য মূল্য, উদ্যোক্তার বিনিয়োগের পরিবেশ এবং চিকিৎসার নিশ্চয়তা।

তাই একটি সফল বাজেটের প্রকৃত পরিচয় কাগজে নয়, মানুষের জীবনে। প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান যত কমবে, ততই শক্তিশালী হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ততই অর্থবহ হয়ে উঠবে জাতীয় বাজেট। সবশেষে বলা যায়, এই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষণার ওপর নয়; বরং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। জনগণ বাজেটের আকার নয়, তার বাস্তব প্রভাব অনুভব করতে চায়।

লেখক: সহ-সম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, কেন্দ্রীয় পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি (পুনাক)।

ফরিদপুরে ইতালি প্রবাসীর বাড়িতে তালা, বৃদ্ধ মাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ

নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬, ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে ইতালি প্রবাসীর বাড়িতে তালা, বৃদ্ধ মাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় ইতালি প্রবাসী এক ব্যক্তির বসতবাড়িতে জোরপূর্বক প্রবেশ, ভাঙচুর, বাড়ি দখল করে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং তার বৃদ্ধ মাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনাটি শুক্রবার (৩ জুলাই) উপজেলার চরযশোরদি ইউনিয়নে পৌলানপুটি গ্রামে ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালা খুলে বাড়িটি পরিবারের জিম্মায় বুঝিয়ে দেয়।

অভিযোগে জানা যায়, ইতালি প্রবাসী জাহিদ শেখের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার কাসালিয়া গ্রামের শাহিদুল মল্লিকের ছেলে নাসিম মল্লিকের বিদেশে পাঠানোকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেন হয়। নাসিম মল্লিকের দাবি, ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে জাহিদ শেখ চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা নেন। পরে বিদেশে পাঠাতে ব্যর্থ হলেও দীর্ঘদিন টাকা ফেরত দেননি। এ নিয়ে একাধিকবার সালিশ বৈঠক হলেও কোনো সমাধান হয়নি বলে দাবি তার।

এদিকে জাহিদ শেখের পরিবারের অভিযোগ, ওই বিরোধের জেরে শুক্রবার নাসিম মল্লিক দলবল নিয়ে তাদের বাড়িতে এসে সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেন। এরপর জাহিদের মা দুলু বেগমকে জোরপূর্বক ঘর থেকে বের করে দিয়ে বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে একাধিক তালা ঝুলিয়ে দেন। এ সময় তাকে মারধর, গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

দুলু বেগম বলেন, “ওরা দলবল নিয়ে এসে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেয়। আমাকে মারধর ও হত্যার হুমকি দেয়। এরপর আমার ঘরে তালা ঝুলিয়ে দেয়। বিষয়টি আমি আমার ছেলেকে জানাই। পরে সে পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে তালা খুলে দেয়।”

ইতালি থেকে মুঠোফোনে জাহিদ শেখ বলেন, “নাসিমের কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য টাকা নিয়েছিলাম। তাকে পাঠাতে না পারায় টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ না দিয়ে তারা আমার বসতবাড়ি দখলের চেষ্টা করেছে, সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করেছে এবং আমার মায়ের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। আমি এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

অভিযুক্ত নাসিম মল্লিক বসতবাড়ি দখলের অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, “বিদেশে পাঠানোর জন্য টাকা দিয়েছিলাম। কথা ছিল বিদেশে পাঠাতে না পারলে বাড়ি আমাকে দিয়ে দেবে। সেই কারণে আমি বাড়িতে গিয়ে তালা ঝুলিয়েছি।” তবে আদালতের আদেশ বা আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়া এভাবে বাড়ি দখল করা বৈধ কি না, এ প্রশ্নের সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।

ঘটনার খবর পেয়ে নগরকান্দা থানার এসআই আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে তালা খুলে বাড়িটি পরিবারের জিম্মায় হস্তান্তর করা হয়।

নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ বলেন, “খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”