খুঁজুন
মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২৭ মাঘ, ১৪৩২

ছোট ছেলের বিয়ের খবর জানালেন আসিফ

বিনোদন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:৩৫ এএম
ছোট ছেলের বিয়ের খবর জানালেন আসিফ
তিন বছর আগে বড় ছেলে শাফকাত আসিফ রণর বিয়ে দিয়েছেন বাংলা গানের যুবরাজ আসিফ আকবর। এবার তার ছোট ছেলেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন। সামাজিকমাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছেন আসিফ নিজেই। মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) ফেসবুকে একটি ছবি শেয়ার করেন তিনি।

যেখানে ছেলে ও পুত্রবধূর সঙ্গে আসিফ এবং তার স্ত্রী বেগম সালমা আসিফকে দেখা গেছে।এর ক্যাপশনে আসিফ জানিয়েছেন, তার ছোট ছেলে শাফায়াত আসিফ রুদ্র বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আসিফ আকবরের পুত্রবধূর নাম লামিয়া তানজিম শ্রেয়সী। তার বাবার নাম বাদল শাহরিয়ার।

রুদ্র ও শ্রেয়সী নতুন জীবনে পা রেখেছেন জানিয়ে নবদম্পতির দাম্পত্য জীবন সুখী ও সুন্দর হোক-এমন কামনা করেছেন আসিফ। একই সঙ্গে ছেলে ও বৌমার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন এই গায়ক।

আসিফের বড় ছেলে শাফকাত আসিফ রণ বর্তমানে কানাডার টরন্টোতে একটি ব্যাংকে সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে কাজ করছেন। ছুটি না পাওয়ায় তিনি বিয়েতে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

পাশাপাশি বড় বৌমা ইসমাত শেহরীন ঈশিতার পরীক্ষার কারণে তিনিও টরন্টোতেই ছিলেন। তাদের অনুপস্থিতি খুব মিস করছেন বলেও অনুভূতি প্রকাশ করেন আসিফ।সবশেষে সবার উদ্দেশে ভালোবাসা জানিয়ে আসিফ আকবর লেখেন, সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন, সুন্দর থাকুন। ভালোবাসা অবিরাম।

আসিফ আকবরের এই স্ট্যাটাসে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দনে ভাসছেন রুদ্র-শ্রেয়সী দম্পতি।

অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াল, নাকি আরও চাপে পড়ল দেশ?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:১৯ এএম
অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াল, নাকি আরও চাপে পড়ল দেশ?

জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, বাংলাদেশের অর্থনীতি তখন ‘নাজুক’ অবস্থায় ছিল বলে আলোচনা হচ্ছিলো। ফলে এই সরকারের শেষ সময়ে এসে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, গত দেড় বছরে সেই অবস্থা কতটা পাল্টাতে সক্ষম হলো তারা।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের লাগামহীন দাম, ডলার সংকট, বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ, পাচারের অর্থ ফেরত আনাসহ নানামুখী চ্যালেঞ্জ ছিল।

“শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটনার পর অর্থনীতির যে দুর্দশা দেখা গিয়েছিল, সেটা সামাল দেওয়াটাই তখন বড় চ্যালেঞ্জের ব্যাপার ছিল। সেটা তারা পেরেছেন, যার ফলে অর্থনীতি পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তবে ভেঙে না পড়লেও এই সময়ে অর্থনীতিতে খুব একটা গতিও সঞ্চার হয়নি বলে মনে করেন অনেকে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি, আবার দেশের দারিদ্র্যের হারও বেড়েছে।

“সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়নের ফলে একদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদের কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা গেছে। যার ফলে অর্থনীতিতে গতি না ফেরায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার একেবারে তলানিতে এসে ঠেকেছে,” বলছিলেন অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির।

“বাংলাদেশের মতো একটি দেশ, যারা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাত্রা করেছে, সেখানে এত নিম্ন অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়,” বলেন মি. কবির।

তবে এর মধ্যেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতে সরকার নানান সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে বলে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

“সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার করে বিনিয়োগনির্ভর উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে এই সরকার নিয়ে যেতে পারেননি, এটা সত্য। কিন্তু ব্যাংকিংসহ বিভিন্নখাতে তারা ভালো কিছু সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছেন, যার সুফল আগামীতে অর্থনীতি পাবে,” বলছিলেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

মূল্যস্ফীতি

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে বাড়তে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছিল।

অধ্যাপক ইউনূসের সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের আনার জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে, নতুন করে টাকা না ছাপানো এবং ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে সাত শতাংশ।

সরকারের নানান প্রচেষ্টায় গত দেড় বছরে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেও এসেছে। গত ডিসেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি আট দশমিক ৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)।

“মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১২ থেকে কমে সাড়ে আটে নেমে এসেছে ঠিক, কিন্তু সেটা এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়ে গেছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজের (বিস) গবেষণা পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবিরও মনে করেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এই সরকার খুব একটা সাফল্য দেখাতে পারেনি।

“অল্প সময়ের জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করে খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতি সামাল দেওয়ার নজির বহু দেশে রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে এই সরকার লম্বা সময় ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেও মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছে,” বলেন মি. কবির।

দ্রব্যমূল্য

ক্ষমতায় আসার পর যে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে অন্তর্বর্তী সরকারকে পড়তে হয়েছে, সেগুলোর মধ্য একটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।

শেখ হাসিনার সরকারের সময় মূল্যস্ফীতি সাড়ে ১১ শতাংশের ওপর ওঠায় সেটার প্রভাব পড়েছিল দ্রব্যমূল্যের ওপর। বাজার সিন্ডিকেট ও মূল্যস্ফীতির প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিয়েছিল।

জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল, বাজারে পণ্যের দাম কমবে।

“কিন্তু মূল্যস্ফীতির হার এখনো বেশি। তাছাড়া আগের সরকারের মতো এই সরকারও বাজারে চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেটের কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আলু, পেঁয়াজ, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে,” বলছিলেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তিন বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। ২০২৫ সালে গড় মূল্যস্ফীতি হয়েছে সাত দশমিক ৭৭ শতাংশ।

দারিদ্র্যের হার

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ১৮ দশমিক সাত শতাংশ ছিল, সেটি এখন বেড়ে ২১ শতাংশের ওপর চলে গেছে।

আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) বলছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে এখন ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গিয়ে দারিদ্র্যের হার বেড়ে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

“এটা চিন্তার বিষয়, কারণ এর আগে দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য হ্রাসের দিকে যাচ্ছিলাম,” বলেন অর্থনীতিবিদ মি. কবির।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ ছিল ২০২১ সালের অগাস্টে, ৪৮ বিলিয়ন ডলার।

কোভিড মহামারি পরবর্তী সময়ে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলে রিজার্ভ কমতে শুরু করে। সেই সঙ্গে নানান উপায়ে অর্থ পাচারকেও বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ হ্রাসের কারণ বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

২০২৪ সালের পাঁচই অগাস্ট গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের যখন পতন ঘটে, তখন দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।

গত দেড় বছরে সেটি আবার ধাপে ধাপে বেড়ে এখন ৩২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে সম্প্রতি জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

“বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ক্ষেত্রে এই সরকার স্থিতিশীলতা আনতে সক্ষম হয়েছে। দেশে এখন প্রায় সাড়ে ছয় মাসের আমদানির সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে সববচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। গত দেড় বছরে ধারাবাহিকভাবে দেশে রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়তে দেখা গেছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বেড়েছে।

“এক্ষেত্রে সরকারের সফলতা এখানেই যে, তারা ব্যাংকখাতের ওপর মানুষের আস্থা ফেরাতে উদ্যোগ নিয়েছেন। মানুষের আস্থা ফিরতে শুরু করায় বৈধ চ্যানেলে প্রবাসীদের টাকা পাঠানোর হার বৃদ্ধি পেয়েছে,” বলেন অধ্যাপক রহমান।

ব্যাংকখাতের অস্থিরতা

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকখাত ব্যাপক লুটপাটের শিকার হয়ে নাজুক হয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তারল্য সংকটে অনেক ব্যাংক গ্রাহকের টাকা পর্যন্ত দিতে পারছিল না।

এমন পরিস্থিতর মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে ব্যাংকখাতে বেশকিছু সংস্কার উদ্যোগ নেয় অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।

লুটপাটের অভিযোগ ছিল যেসব ব্যাংকে, সেগুলোর পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

সেইসঙ্গে, দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এর বাইরে, আইনসহ নানান সংস্কার ও পরিবর্তনের উদ্যোগের ফলে গত দেড় বছরে ব্যাংকখাত কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

“অর্থনৈতিক সংস্কারে সরকার যত উদ্যোগ নিয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ব্যাংকখাতে সবচেয়ে বেশি উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে,” বলছিলেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

তবে এই সময়ে খেলাপি ঋণ রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সাল নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, যা দেশটির মোট ঋণের ৩৩ শতাংশরও বেশি।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেওয়া এই বিপুল পরিমাণ ঋণ কীভাবে আদায় হবে, সেটা এখন একটা বড় প্রশ্ন।

কারণ আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীদের যারা ঋণ নিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তাদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় করা যাচ্ছে না।

নানান চেষ্টা চালিয়েও খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকার সফলতা পায়নি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

সামগ্রিকভাবে এটা অর্থনীতিতে একটা ক্ষতিকর ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করেছে। ব্যাংকগুলো এখন বেরসরকারি খাতে ঋণ দিতে পারছে না। ফলে নতুন উদ্যোক্তা বা ব্যবসা সৃষ্টি কমে গেছে। কর্মসংস্থান কমে গিয়ে এর প্রভাব জনজীবনেও পড়ছে।

“এখানে একটা দুষ্টচক্র সৃষ্টি হয়েছে। বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মানুষের জীবনমান সবখানেই এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে,” বলেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।

বিনিয়োগ ও রফতানি

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করেছে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার। ব্যাংক ঋণকে নিরুৎসাহিত করতে বাড়ানো হয় সুদের হার।

“আর যখন ব্যাংক ঋণের সুদহার উচ্চ রাখা হয়, সেটার অর্থ দাঁড়ায় সরকারের নীতিনির্ধারকরা বিনিয়োগ চাচ্ছেন না,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন অর্থনীতিবিদ মাহফুজ কবির।

সরকারের এমন নীতির কারণে গত দেড় বছরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি।

“বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই সরকার সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এক্ষেত্রে তারা খুব একটা চাঞ্চল্য আনতে পারেননি, বরং স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে,” বলেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগও আসেনি।

“এমনকি, বিনিয়োগ সম্মেলন করেও সরকার দেশি-বিদেশি বিনিয়াগকারীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি, যার ফলে অর্থনীতিতে গতি আসেনি। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ব্যাংক ঋণে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতিই এর জন্য বড় অংশে দায়ী। সরকার দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি,” বলেন অর্থনীতিবিদ মি. কবির।

আর দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বেসরকারিখাতে সেভাবে নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়নি।

“২০২৪ সালের যে শ্রমশক্তি জরিপ, সেখানে বেকারত্বের পরিমাণ কমে আসতে দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় ২০২৫ সালে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে বেকারত্ব বেড়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অর্থনীতিতে,” অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির।

পাচারের অর্থ ফেরত কতদূর?

ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের সময় অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিদেশে কত টাকা পাচার করা হয়েছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে ২০২৪ সালের ২৮শে অগাস্ট একটি শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার।

তিন মাসের মাথায় ওই কমিটি যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, সেখানে বলা হয়েছে আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনামলে ২৮ উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

বিদেশ থেকে পাচারকৃত অর্থ উদ্ধার করে দেশে ফেরাতে ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকোভারি’ নামে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে অধ্যাপক ইউনূসের সরকার।

“টাস্কফোর্সটি ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। যেসব দেশে অর্থগুলো পাচার করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, সেসব দেশে আমরা যাচ্ছি এবং প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছি,” বিবিসি বাংলাকে বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান।

গত দেড় বছরে দেশে ৫৫ হাজার ৬৩৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি সংযুক্ত ও অবরুদ্ধ করেছে সরকার।

এছাড়া বিদেশে ১০ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তিসহ মোট ৬৬ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

“আমরা তো দেখেছি কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে সাবেক একজন মন্ত্রীর স্থাবর সম্পত্তি সেদেশের সরকার ক্রোক করেছে। স্থাবর সম্পত্তি হয়তো ফেরানো যাবে না কিন্তু সেটা যদি টাকায় কনভার্ট করে আমরা ফেরত আনতে পারি, তাহলে অবশ্যই এটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে,” বলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মি. খান।

পাচারের অর্থ ফেরাতে সরকার নানান উদ্যোগের কথা জানালেও সেগুলো যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

“পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছে, কিন্তু সেখানে আমার মনে হয় আরও উদ্যোগ-উদ্যমের সুযোগ ছিল। একমাত্র ব্রিটেনে পাচার হওয়া সম্পদ ছাড়া অন্য দেশগুলোতে তো ফ্রিজও করা সম্ভব হয় নাই,” বলছিলেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তবে অর্থনীতিবিদরা এটাও স্বীকার করছেন যে, পাচারের অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়াটা বেশ সময়সাপেক্ষ।

“এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ফলে এত অল্প সময়ের মধ্যে সাফল্য পাওয়া সম্ভব না। তবে এই সরকার প্রক্রিয়াটা শুরু করে দিয়ে গেছেন, যা আগামীর সরকারকে কিছুটা হলেও হেল্প করবে,” বলেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ

শেখ হাসিনা সরকারের সময় বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেটি এসে পড়ে অধ্যাপক ইউনূসের সরকারের ঘাড়ে।

২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশে মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১৩ দশমিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তখন তলানিতে। ডলার সংকটের মধ্যে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাটা নতুন সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

“রেমিট্যান্সের সুবাদে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদেশি ঋণের চাপ এই সরকার আপাতত সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে,” বলছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

তবে আপাতত চাপ সামাল দেওয়া সম্ভভ হলেও পরবর্তী সরকারের জন্য ঋণ পরিশোধ চ্যালেঞ্জিং হবে বলে মনে করছেন এই অর্থনীতিবিদ।

“বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বিদেশি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধে ছাড়ের সময়) শেষ হয়ে আসার কারণেই সামনে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। যদিও এই সরকার নতুন করে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ সংযতই ছিল, কিন্তু আগের সরকারের নেওয়া ঋণ পরিশোধে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে,” বলেন অধ্যাপক রহমান।

তবে ডলারের রিজার্ভ যেভাবে বাড়ছে, সেটি অব্যাহত রাখা সম্ভব হলে পরবর্তী সরকারের জন্যও ঋণের চাপ সামাল দেওয়া “কিছুটা হলেও সহজ হবে” বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এই সম্মাননীয় ফেলো।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

আমলাতন্ত্র কি বিফলতার ঢাল, না-কি রাষ্ট্রের অপরিহার্য রক্ষাকবচ?

শামীম আল মামুন
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:৩৩ এএম
আমলাতন্ত্র কি বিফলতার ঢাল, না-কি রাষ্ট্রের অপরিহার্য রক্ষাকবচ?

বাংলাদেশে পণ্ডিতের অভাব নেই। তবে সংখ‍্যার দিক দিয়ে সব চেয়ে বেশি বিশেষজ্ঞ পণ্ডিত দেখা যায় প্রশাসন বিষয়ে। শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনীতিক থেকে শুরু করে ফুটপাথে বসে অলস আড্ডা দেয়া অক্ষম ব্যক্তিটিও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সমালোচনা করে, নিদেন পক্ষে তাঁর অক্ষমতার জন্য প্রশাসনকে দায়ী করেন।

আমি কোনো পণ্ডিত নই বা কখনো তা হবার চেষ্টাও করিনি। নিজের অজ্ঞতা নিয়ে আমি সবসময় সংকুচিত থাকি। তথাপি আমার শিক্ষকগণ, দেশী-বিদেশী বন্ধুবান্ধব, সহকর্মীদের এক বিরাট অংশ মনে করেন আমি জনপ্রশাসন বিষয়টা খুব ভালো বুঝি। জনপ্রশাসন বুঝার জন‍্য লোকপ্রশাসন পাঠই যথেষ্ট নয়। প্রশাসন বুঝার জন্য দেশীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব, লোকাচার, সামাজিক মনোবিজ্ঞান, সমাজের ক্ষমতা-কাঠামো সমন্ধে স্বচ্ছ জ্ঞান থাকার সাথে সাথে গভীর অন্তর্দৃষ্টি থাকা প্রয়োজন।

স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, আমি বাংলাদেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বুঝি। দায়িত্ব নিয়েই বলছি যে, এর উত্থান-পতনের উপলক্ষ‍্য এবং উপাদান ব‍্যাখ‍্যা করতে পারি। বন্ধুমহলের আড্ডায় অনেকবার প্রশাসন ও রাজনীতি নিয়ে যা বলেছি তা পরবর্তীতে সত্য হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

পৃথিবীর সকল দেশেই আমলারা কখনো রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের কোনো কথার প্রতিবাদ করে না বা করতে পারে না। তারা হলো ফুটবলের মত। ২২ জন খেলোয়াড় একটি সীমাবদ্ধ মাঠে লাথি দিতে থাকে এবং বল বিনা প্রতিবাদে সেই লাথি সহ্য করে। বলের মত আমলাদেরও সকল দোষ অপবাদ মাথায় নিয়ে নীরবে কাজ বা অকাজ করে যেতে হয়।

গত কয়েক দিন যাবৎ সরকারের উপদেষ্টাগণ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা, পরিযায়ী পণ্ডিতগণসহ অনেকেই সকল ব‍্যর্থতার দায় আমলাদের ঘাড়ে চাপিয়ে নিজেদের ব্যর্থতার দায়ভার থেকে মুক্তির চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন হতো না, যদি না কিছুদিন আগে একজন উপদেষ্টা মাইলস্টোন স্কুলের পরিবর্তে সচিবালয়ে মধ্যে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার বাসনা প্রকাশ না করতেন। তাঁর হতাশা এবং আমলাতন্ত্রের প্রতি শত্রুভাবাপণ‍্যতা কত প্রবল তা পত্রিকায় প্রকাশিত বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়। তাঁর ব‍্যক্তিগত অনুভূতি গণমাধ্যমে প্রকাশ করে তিনি আমলাতন্ত্রকে জনগণের শত্রু হিসাবে উপস্থাপনের প্রয়াস নিয়েছেন – যা মেনে নিতে না পেরে আমি এই লেখা লিখছি।

আমলাতন্ত্রের সমালোচনা নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে একে ধ্বংস করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়, তখন বুঝতে হবে আমরা গভীর সংকটে আছি।

আসলে আমলাতন্ত্র কী এবং কেন এটি এমন—তা বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি।

১. ম্যাক্স ওয়েবার এবং যৌক্তিক কাঠামো:

আমলাতন্ত্রের জনক বলা হয় ম্যাক্স ওয়েবারকে (Max Weber)। তিনি বলেছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র হলো ‘সবচেয়ে যৌক্তিক এবং কার্যকর উপায়’। তার মতে, আমলারা আবেগ বা রাজনৈতিক হুজুগে নয়, বরং নির্দিষ্ট নিয়মের (Rule of Law) অধীনে কাজ করে। এই যে আমরা ‘ধীরগতি’র কথা বলি, ওয়েবারের দৃষ্টিতে এটি আসলে একটি ‘নিরপেক্ষ ও ত্রুটিমুক্ত’ পদ্ধতি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া।

২. কার্ল মার্ক্স ও আমলাতন্ত্রের দ্বান্দ্বিক অবস্থান:

কার্ল মার্ক্স (Karl Marx) আমলাতন্ত্রকে শাসক শ্রেণির হাতিয়ার হিসেবে দেখলেও তিনি একে রাষ্ট্রের একটি ‘অপরিহার্য অঙ্গ’ হিসেবে স্বীকার করেছেন। মার্ক্সীয় বিশ্লেষণে আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্রের সংহতি রক্ষার একটি মাধ্যম। যখন কোনো সংকট তৈরি হয়, তখন রাজনীতিবিদরা দায় এড়াতে আমলাতন্ত্রকে ‘বলির পাঁঠা’ বানান, যা বর্তমানে আমরা বাংলাদেশেও দেখতে পাচ্ছি। অথচ এই কাঠামোটিই রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।

৩. ঐতিহাসিক সত্য: কেন আমলাতন্ত্র ধীর?

পৃথিবীর কোনো সফল রাষ্ট্রই হুটহাট সিদ্ধান্তে চলেনি। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে আধুনিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত সর্বত্র আমলাতন্ত্র একটি ‘ফিল্টার’ হিসেবে কাজ করে। উড্রো উইলসন (Woodrow Wilson) তার ‘The Study of Administration’-এ স্পষ্ট করেছেন যে, রাজনীতি এবং প্রশাসন দুটি ভিন্ন মেরু। রাজনীতি স্বপ্ন দেখায়, আর প্রশাসন সেই স্বপ্নকে বাস্তবতার কঠিন আইন ও বাজেটের নিক্তিতে বিচার করে। এই বিচার করতে গিয়ে যে সময় ব্যয় হয়, তাকে ‘অদক্ষতা’ বলা ভুল।

যারা খোঁজ খবর রাখেন তাঁরা জানেন পৃথিবীর সকল দেশের আমলাতন্ত্রই ধীরগতিতে চলে। যে রাষ্ট্র যত উন্নত সে রাষ্ট্রের আমলাতন্ত্র তত শক্তিশালী। আমাদের ধারণাগত সীমাবদ্ধতা এবং তথ‍্যের অপ্রতুলতার কারণে সফল রাষ্ট্রগুলোর আমলাতন্ত্র সম্পর্কে না জেনে আমরা অনেক মন্তব্য এবং আমাদের আমলাতন্ত্র তুলনা করে থাকি। উন্নত রাষ্ট্রসমূহের সেবাখাত বেসরকারি ব‍্যবস্থাপনায় ছেড়ে দিয়ে তারা প্রতিযোগিতামূলক অবকাঠামো তৈরি করে দেয়াতে ঐসব দেশে সেবা প্রদানের মান ও দক্ষতা বাণিজ‍্যিক কারণে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশের সেবাখাত পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় এখানে অদক্ষতা ও দুর্নীতি বেশী এবং সেবার মান হতাশাজনক। সেবাখাতের প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরির সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ – আমলাতন্ত্র নয়। আমেরিকা, ইউকে, ফ্রান্স, জার্মানি, কানাডা, জাপান, রাশিয়া সিংগাপুর, ইন্ডিয়াসহ পৃথিবীর যে কোনো স্থিতিশীল দেশের আমলাতন্ত্র আমাদের দেশের আমলাতন্ত্রের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতাধর এবং মজবুত। পিরামিড থেকে তাজমহল পৃথিবীর সকল অত‍্যাশ্চর্য স্থাপনা নির্মাণের পিছনে আছে সুসংগঠিত এবং সুদক্ষ এক আমলাতন্ত্র।

আমরা অনেকেই আইনের শাসন (rule of law) নিয়ে কথা বলি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক তা আমরা চাই। কিন্তু আমরা একবারও ভাবি না যে আইনের শাসন মানেই দল নিরপেক্ষ এক আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেখানে আইনের চোখে সবাই সমান। আমলাগণ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সকলকে এক দৃষ্টিতে দেখবেন। তখন আমলাগণ এখনকার চেয়ে শক্তিশালী হবেন।

এবার অন্য প্রসঙ্গে কথা বলি। আমলাদের যতটা ক্ষমতাবান হিসেবে বিবেচনা করা হয় আসলে তাঁরা তা নন। গত তিন দশক যাবৎ মন্ত্রণালয় বা বিভাগের নির্বাহী প্রধান হচ্ছেন মন্ত্রী/উপদেষ্টা। তাই সকল মন্ত্রণালয়ের ভালো মন্দ যাই হোক না কেন তাতে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী/উপদেষ্টার বিশাল ভূমিকা বা দায় আছে।

বাংলাদেশের বর্তমান আমলাতন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল এবং disoriented। জনগণের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে এটাকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের স্বার্থে ধীরে ধীরে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে আইনের শাসন থেকে দেশ যোজন যোজন মাইল দূরে ছিটকে পড়েছে। গত ১৭/১৮ ধরে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ সততা ও দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে দেশের আমলাতন্ত্রই প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছে। আর দূর্বল আমলাতন্ত্রের কারণে দেশে এমন কোনো অপরাধ নেই যা ঘটেনি। লক্ষকোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। বৈদেশিক ঋণ সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করেছে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হচ্ছে অদক্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র যার প্রধান পৃষ্ঠপোষক হচ্ছে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ এরকম একটি দুর্বল ভঙ্গুর আমলাতন্ত্রকে যদি পরিচালনা করতে না পারে তাহলে জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত‍্যাশা পূরণ করবে কিভাবে!

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর আকাঙ্ক্ষা এই জনপদের দীর্ঘ দিনের। এমন কোনো পরীক্ষা নেই যা এদেশের মানুষ দেয়নি। সাধারণ মানুষের ত‍্যাগ বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে অনেক বেশি। অন‍্যান‍্য প্রতিষ্ঠান সচল করার সাথে সাথে একটি শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ছাড়া সুদৃঢ় গণতান্ত্রিক কাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব নয়। আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুফল পেতে সৎ-দক্ষ-দলনিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই।

বাংলাদেশে ক্ষমতাসীনদের সাধারণ প্রবণতা হলো তাৎক্ষণিক পরিবর্তন ঘটানো। কিন্তু এটা সবসময় ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনা। অনেক সময় আমলাগণ সেটা ধরিয়ে দিতে গেলেই রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ তা পছন্দ করেন না। বাস্তবে আমলাগণ ad hoc wisdom এর ভিত্তিতে চলতে পারেন না – তাকে আইন কানুন বিধিবিধান অনুসরণ করে যৌক্তিক পদক্ষেপ বা সিদ্ধান্ত নিতে হয়। একটা দেশও কখোনো ad hoc wisdom দ্বারা চলতে পারে না – চলা উচিত না।

শেষাংশ:

যারা আমলাতন্ত্রের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন, তারা আসলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনই বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। একজন প্রাক্তন আমলা যখন সচিবালয়ে বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার প্রত্যাশা করেন, তখন বুঝতে হবে তিনি নিজের পেশাগত অতীত এবং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর প্রতি অশ্রদ্ধাশীল। আমলাতন্ত্র কোনো ত্রুটিমুক্ত ব্যবস্থা নয়, তবে এটি পরিবর্তনের পথ ‘ধ্বংস’ নয়, বরং ‘সংস্কার’। আমলাতন্ত্রকে তার কাজের জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি। যে কোনো বিচ‍্যুতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকার হওয়া উচিৎ। মাথা ব্যাথার চিকিৎসা দরকার তবে তা মাথা কেটে নয়।

জনপ্রিয়তা পাওয়ার সস্তা আশায় রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে জনশত্রু হিসেবে দাঁড় করানোর এই অপচেষ্টা দেশের স্বার্থে সকল পক্ষ থেকে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।

লেখক : প্রশাসনের অবসরপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা

রোজায় বমি: শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজা ভাঙে নাকি থাকে?

ইসলাম ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৯ এএম
রোজায় বমি: শরিয়তের দৃষ্টিতে রোজা ভাঙে নাকি থাকে?

রমজান মাস এলেই রোজা সংক্রান্ত নানা মাসআলা ও প্রশ্ন সামনে আসে। দৈনন্দিন জীবনে হঠাৎ অসুস্থতা, বমি, মাথা ঘোরা কিংবা শারীরিক দুর্বলতার মতো বিষয়গুলো অনেক সময় রোজাদারকে দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয় যে, রোজা ভেঙে গেল কি না, কাজা করতে হবে কি না—এসব নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা ভুল ধারণাও প্রচলিত রয়েছে। বিশেষ করে রোজা অবস্থায় মুখ ভরে বমি হলে রোজা থাকে নাকি ভেঙে যায়—এ প্রশ্নটি প্রায়ই শোনা যায়।

ইসলামি শরিয়তে রোজা ভঙ্গ হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে, আর সবকিছুই যে রোজা ভেঙে দেয়, তা নয়। অনেক ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃতভাবে কোনো কিছু ঘটলে শরিয়ত তা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেছে এবং রোজা সহিহ থাকার বিধান দিয়েছে। এ বিষয়ে হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা থেকে উলামায়ে কেরাম বিস্তারিত মাসআলা বর্ণনা করেছেন।

তাই রোজার বিধান সঠিকভাবে জানতে হলে কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিষয়গুলো বোঝা জরুরি। রোজা অবস্থায় বমি হলে কখন রোজা ভাঙবে আর কখন ভাঙবে না—এ বিষয়ে হাদিসের আলোকে সঠিক বিধান ফরিদপুর প্রতিদিনের পাঠকদের জন্য নিচে তুলে ধরা হলো।

ইসলামিক স্কলাররা বলছেন, ‘রোজা অবস্থায় মুখ ভরে বমি হলে রোজা ভেঙে যাবে এবং তার কাজা করতে হবে’—এ ধারণা ঠিক নয়। বরং অনিচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি হলেও রোজা ভাঙবে না, কাজাও আদায় করতে হবে না। হ্যাঁ, কেউ যদি রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি করে, তবে তার রোজা ভেঙে যাবে এবং কাজা আদায় করতে হবে।

হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যার অনিচ্ছাকৃত বমি হয়ে যায় তাকে কাজা আদায় করতে হবে না (অর্থাৎ তার রোজা ভাঙবে না)। আর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত বমি করে সে যেন কাজা আদায় করে (অর্থাৎ তার রোজা ভেঙে যাবে)। (তিরমিজি : ৭২০, সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৬৭৬, মুসতাদরাকে হাকেম : ১৫৫৭)