ফরিদপুরে সাংবাদিক পরিচয়ে অপপ্রচার, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়ারেন্টের কপি ও বিভিন্ন তথ্য ছড়িয়ে একজন ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ এবং মানসিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে ফরিদপুরের নগরকান্দার কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কোতোয়ালী থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন ফরিদপুর পৌরসভার রঘুনন্দনপুর এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ নাজমুল আলম পারভেজ (৪৫)।
নাজমুল আলম পারভেজ ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক এবং কনজুমার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ফরিদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বলে জানা যায়।
অভিযোগে তিনি দাবি করেছেন, ২০২৪ সালের একটি মামলার ওয়ারেন্টের কপি ব্যবহার করে স্বার্থান্বেষী একটি চক্র বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে। এতে তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় অভিযোগপত্রে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—নগরকান্দার পাঁচ কাইচাইল গ্রামের মো. গোলাম মোস্তফা (৪৬), মো. রাজু আহম্মেদ (৩৫) ও মো. মিজানুর রহমান (৫০)। এছাড়া ‘বাংলা টেলিগ্রাম’সহ কয়েকটি অজ্ঞাত ফেসবুক আইডি পরিচালনাকারীদের বিরুদ্ধেও তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) কোতোয়ালী থানায় লিখিত অভিযোগটি দাখিল করা হয়। অভিযোগের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন পোস্টের স্ক্রিনশটের প্রিন্ট কপিও সংযুক্ত করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১১ আগস্ট থেকে কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে সৈয়দ নাজমুল আলম পারভেজের নাম ও ওয়ারেন্টের কপির ছবি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের পোস্ট ও প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অভিযোগকারীর নজরে আসা আইডিগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘Golam Mostofa’, ‘Mizanur Rahman’, ‘Excellent Boy Razu’ এবং ‘বাংলা টেলিগ্রাম’সহ অন্যান্য অজ্ঞাত আইডি।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব পোস্টের মাধ্যমে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয়টিও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হচ্ছে। তিনি এসব আইডির প্রকৃত ব্যবহারকারী ও পোস্টদাতাদের শনাক্ত করে তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পরস্পরের যোগসাজশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়ে আসছেন।
এদিকে থানায় করা অভিযোগে নাম আসা মো. গোলাম মোস্তফাকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার, রাজনৈতিক পরিচয় দেখিয়ে প্রভাব বিস্তার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, ব্ল্যাকমেইল ও অর্থ দাবির মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত গোলাম মোস্তফার অতীত ইতিহাস বেশ বিতর্কিত। তিনি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক দপ্তর সম্পাদক ছিলেন (যে কমিটি সম্প্রতি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে)। একসময় নগরকান্দা বাজারে তার একটি বইয়ের লাইব্রেরি ছিল। কিন্তু ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ায় এবং দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর তিনি নিজের পথ পরিবর্তন করেন। রাতারাতি বনে যান ‘সাংবাদিক’।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ব্যবসায় দেউলিয়া হওয়ার পর গোলাম মোস্তফা সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক পরিচয়কে অর্থ উপার্জনের প্রধান হাতিয়ার বানায়। নগরকান্দা বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মোস্তফা দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। সামান্য কোনো বিষয় হলেই বিএনপি এবং সাংবাদিক পরিচয়ের দাপট দেখায়। সাইবার বুলিং ও রাজনৈতিক হয়রানির ভয়ে এতদিন কেউ মুখ খুলতে সাহস পায়নি।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে সে নিজের খোলস পুরোপুরি পাল্টে ফেলে। রাতারাতি নিজেকে একজন ‘প্রভাবশালী সাংবাদিক’ হিসেবে জাহির করে নগরকান্দায় একটি ভুঁইফোড় সাংবাদিক সংগঠন গড়ে তোলে। এই ভুয়া সংগঠনের আড়ালে তার অপকর্মের পরিধি আরও বিস্তার লাভ করে।
অভিযোগ রয়েছে, গোলাম মোস্তফা অত্যন্ত সুকৌশলে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সদ্য যোগ দেওয়া বা দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসক (ডিসির), পুলিশ সুপার (এসপি), জেলা পরিষদের প্রশাসকসহ প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সেসময় চতুরতার সাথে তোলা ছবিগুলো পরবর্তীতে নিজের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে পোস্ট করেন এবং কর্মকর্তাদের সাথে তার ‘গভীর সুসম্পর্ক’ রয়েছে বলে সাধারণ মানুষকে দেখান।
এই ছবিগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সে সাধারণ মানুষ, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হুমকি-ধামকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কথা না শুনলে বা দাবি করা টাকা না দিলে ওইসব প্রশাসনিক পাওয়ার দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করেন। এছাড়া, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যাকে-তাকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ আখ্যা দিয়ে হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নগরকান্দা উপজেলার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গোলাম মোস্তফা বিভিন্ন সময় সরকারি দপ্তরে এসে অযাচিতভাবে নিউজ করার হুমকি দেয়, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে এবং মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। আমরা তার এই অনৈতিক দাবি মানতে অস্বীকার করলে সে ফেসবুকে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পোস্ট করে চরিত্রহননের চেষ্টা চালায়। এছাড়া নগরকান্দা থানা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে দালালি ও তদবির বাণিজ্যের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।”
গোলাম মোস্তফার মতো ভুঁইফোড় সাংবাদিকদের কারণে চরম বিপাকে ও বিড়ম্বনায় পড়েছেন ফরিদপুরের মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরিদপুরের এক প্রবীণ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, “আমরা যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বা সরকারি প্রোগ্রামে সংবাদ কভার করতে যাই, তখন দেখতে পাই গোলাম মোস্তফার মতো কিছু লোক হাতে একটা মোবাইল নিয়ে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে ঢুকে পড়ে এবং নিজেকে বড় সাংবাদিক দাবি করে। কিন্তু তাদের কোনো সংবাদ মূলধারার সংবাদপত্র, টিভি বা স্বীকৃত অনলাইন পোর্টালে কখনো দেখা যায় না। আজকাল একটা মোবাইল আর একটা ফেসবুক পেজ থাকলেই অনেকে নিউজের নাম দিয়ে সাংবাদিক সেজে বসে। এরা আসলে সাংবাদিকতার ‘স’-ও জানে না। এদের কারণে আমরা পেশাদার সাংবাদিকরা মাঠে কাজ করতে গিয়ে চরম বিড়ম্বনা ও প্রশ্নের মুখে পড়ছি। এদের প্রতিরোধ করা দরকার।”
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুব হোসেন পিয়াল এ বিষয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “বর্তমানে একটি মারাত্মক প্রবণতা তৈরি হয়েছে—যে কেউ একটি ফেসবুক আইডি বা পেজ খুলেই নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে ঘোষণা দিচ্ছে। মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে এদের কোনো সম্পর্ক নেই। এরা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে ভুঁইফোড় কিছু সংগঠন খুলে দল ভারী করছে। এদের কারণে সচেতন সমাজ ও ফরিদপুর প্রেসক্লাব চরমভাবে বিব্রত। আমরা প্রশাসনকে বলবো—সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কেউ কোনো অপরাধ বা ব্ল্যাকমেইল করলে তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
একই বিষয়ে নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত আলী শরীফ স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “গোলাম মোস্তফা নগরকান্দা প্রেসক্লাবের সদস্য নয়। তার কোনো ব্যক্তিগত অপকর্ম বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ভার নগরকান্দা প্রেসক্লাব বহন করবে না। সে যদি অপরাধ করে থাকে, তবে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।”
দলীয় নাম বিক্রি করে অপকর্মের অভিযোগের ব্যাপারে নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদার বলেন, “আমাদের নেতা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশ—অপরাধী যে দলেরই হোক, তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। নৈতিকতা বিবর্জিত কোনো কাজে কেউ লিপ্ত হলে এবং দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।”
ফরিদপুর জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল জানান, “গোলাম মোস্তফার বিষয়টি আমরা আপনাদের মাধ্যমে জানলাম। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবো। অতঃপর এই বিষয় নিয়ে ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করবো। কারণ, কারো কোনো ব্যক্তিগত অপরাধ দল বহন করবে না।”
এ ব্যাপারে ফরিদপুর সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সদস্য ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হাসানউজ্জামান বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এখন একশ্রেণীর স্বার্থান্বেষী মহল ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানো ও ব্ল্যাকমেইলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। কারো ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ডিজিটাল হামলা চালানো বা অপপ্রচার চালানো একটি মারাত্মক অপরাধ। এটি সমাজের সুস্থ পরিবেশ ও স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি। পুলিশ প্রশাসনের উচিত এই ঘটনায় কোনো ধরনের শিথিলতা না দেখিয়ে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।”
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগের ব্যাপারে গোলাম মোস্তফা তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন,”সম্প্রতি কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নগরকান্দা উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়। সেখানে সৈয়দ নাজমুল আলম পারভেজের সঙ্গে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। ওই ভুল বোঝাবুঝির জেরে তার ছবি দিয়ে আমি একটি ফেসবুক পোস্ট করেছিলাম। তবে পরবর্তীতে জানতে পারি যে তিনি একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। বিষয়টি বুঝতে পেরে আমি নিজে থেকেই পোস্টটি ডিলিট করে দিয়েছি। এছাড়া আমার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি বা ব্লাকমেইলিংয়ের যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”
অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে ফরিদপুরের কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, “সৈয়দ নাজমুল আলম পারভেজ নামে এক ব্যক্তি সাইবার অপপ্রচার ও সম্মানহানির বিষয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। আমরা লিখিত অভিযোগটি গ্রহণ করেছি।”
ওসি মাহমুদুল হাসান আরও জানান, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও সাইবার অপরাধের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে যদি অভিযুক্ত ব্যক্তিবর্গ ও ফেসবুক আইডিগুলোর বিরুদ্ধে সাইবার অপরাধ, চরিত্রহনন কিংবা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সত্যতা পাওয়া যায়, তবে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।”
স্থানীয় ভুক্তভোগীদের দাবি, দ্রুত এই সাইবার অপরাধীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হোক, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাংবাদিকতা বা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সম্মানহানি ও চাঁদাবাজি করার দুঃসাহস না পায়।

আপনার মতামত লিখুন
Array