আলফাডাঙ্গায় সিগারেটের বাকি টাকা চাওয়ায় দোকান ভাঙচুর-গুলির হুমকি
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার ছিঁড়ে পড়ে মিলন মাতুব্বর (২৭) নামে এক যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরও তিনজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হয়ে আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুর ২টার দিকে উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের পূর্ব শৌলডুবী গ্রামে এ দুর্ঘটনাটি ঘটে।
নিহত মিলন মাতুব্বর ওই গ্রামের আব্দুর রব মাতুব্বরের ছেলে। আহতরা হলেন মিলনের ভাই মিঠু মাতুব্বর (৩০), মিঠুর স্ত্রী হেনা বেগম (২৪) এবং প্রতিবেশী ওবায়দুর শেখ (৩০)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গ্রামের প্রধান বিদ্যুত লাইনের একটি তার ছিঁড়ে পাশের একটি গোয়ালঘরের ওপর পড়ে। এতে গোয়ালঘর থেকে কাপড় শুকানো জন্য ব্যবহার করা জিই তারের (ধাতব তার) মাধ্যমে তিনটি বসতঘরসহ তিনটি ঘরে বিদ্যুত ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় গোসল শেষে ভেজা কাপড় শুকাতে বাড়ির উঠানে টানানো জিআই তারে কাপড় মেলতে গেলে মিলন মাতুব্বর বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হন।
তার চিৎকার শুনে তার ভাই মিঠু মাতুব্বর উদ্ধার করতে এগিয়ে এলে একে একে হেনা বেগম ও ওবায়দুর শেখও বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠ হয়ে আহত হন। পরে স্থানীয়রা সদরপুর পল্লী বিদ্যুৎ অফিসে খবর দিলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। এরপর চারজনকে উদ্ধার করে সদরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মিলন মাতুব্বরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত তিনজনের অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়ার পাশাপাশি ক্ষোভেরও সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোন ঝড় বৃষ্টি ছাড়াই একা একা কিভাবে বিদ্যুতের তার ছিড়ে পরে?, ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনার কারণেই এ প্রণহানির ঘটনা ঘটেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, একজনের মৃত্যু ও তিনজন আহত হওয়ার দায় কি পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ নেবে?
এলাকাবাসী ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং আহতদের চিকিৎসার দায়িত্ব গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সদরপুর পল্লী বিদ্যুত সমিতির সহকারী জেনারেল ম্যানেজার মো. শহিদুল ইসলামের সাথে কথা বলতে তার অফিসে গেলে অফিস বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে একাধিক বার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি কল রিসিভি করেননি।
সদরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল আল মামুন শাহ্ জানান, ঘটনাস্থলে আমাদের ফোর্স পৌঁছে মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন এবং লাশ পুলিশ হেফাজতে নেন। তিনি জানায়, ঘটনাটি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে।
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ বাজার এলাকায় সরকারি খালের ওপর দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে উপজেলা প্রশাসন। প্রায় ৪০ বছর ধরে দখলে থাকা খালটি উদ্ধার হওয়ায় এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে মধুখালী পৌরসভার পেঁয়াজ বাজার এলাকায় ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক থেকে চন্দনা নদী পর্যন্ত সরকারি খালের ওপর নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
অভিযান পরিচালনা করেন মধুখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রতীক দত্ত। এ সময় পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন মধুখালী বাজার বণিক সমিতির সভাপতি আবুল বাশার বাদশা, সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মিন্টু, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ মিয়া, স্থানীয় সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্ত বলেন, “প্রায় ৪০ বছর ধরে পেঁয়াজ বাজার এলাকার সরকারি খালের ওপর অবৈধভাবে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের নিচে থাকা কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এতে বৃষ্টির সময় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়ে মহাসড়কের দক্ষিণ পাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্ষা মৌসুমে সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং হাটের দিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।”
তিনি আরও বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নির্দেশনায় সরকারি খাল উদ্ধার এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জনস্বার্থে এ ধরনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।”
মধুখালী বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মিন্টু বলেন, “সরকারি খালের ওপর অবৈধ স্থাপনা থাকায় দীর্ঘদিন ধরে বাজার এলাকায় জলাবদ্ধতা ও চলাচলে ভোগান্তি ছিল। প্রশাসনের এই উদ্যোগের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার সমাধানের পথ তৈরি হলো।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরাও প্রশাসনের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, খালটি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত রেখে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা কমবে এবং বাজার ও আশপাশের এলাকার পরিবেশও উন্নত হবে।
আয় একই থাকলেও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে চরম বিপাকে পড়েছেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার সাধারণ মানুষ। কয়েক মাস আগেও যে বাজার ৫০০ টাকায় মোটামুটি হয়ে যেত, এখন সেই টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় সবজি, মাছ ও মসলার অল্প কিছু জিনিস কিনতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ক্রেতাদের। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা।
গত শুক্রবার সরকারি ছুটির সুযোগে আলফাডাঙ্গা সদর বাজারে বাজার করতে আসেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহ-ব্যবস্থাপক বেলাল হোসেন। সঙ্গে ছিল মাত্র ৫০০ টাকা। তিনি দুই কেজি আলু, বেগুন, কচুর মুখি, ধুন্দুল, পটল ও একটি লাউ কিনতেই প্রায় পুরো টাকা শেষ হয়ে যায়। এরপর মাছের বাজারে গিয়ে ৫০০ গ্রাম চাষের মাছ কিনে দেখেন বিল ৫০০ টাকারও বেশি হয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে এক কেজি আলু ফেরত দিয়ে মাছের দাম পরিশোধ করেন। বাড়ি ফিরে বুঝতে পারেন, স্ত্রী কাঁচামরিচ কিনতে বললেও টাকার অভাবে সেটি কেনা হয়নি।
ক্ষোভ প্রকাশ করে বেলাল বলেন, “আয় তো বাড়েনি, কিন্তু খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগে ৫০০ টাকায় এক সপ্তাহের প্রয়োজনীয় বাজারের অনেকটাই হয়ে যেত, এখন একদিনের বাজার করতেও টাকা কম পড়ে যাচ্ছে।”
একই ধরনের সংকটের কথা জানান আলফাডাঙ্গা পৌরসভার বাকাইল গ্রামের ভাঙারি ব্যবসায়ী আক্কাস বিশ্বাস। তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো কাগজ, কার্টন, লোহা ও প্লাস্টিক সংগ্রহ করেন। আগে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় হলেও এখন সেই আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। কারণ হিসেবে তিনি জানান, ভাঙারি পণ্যের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যে কার্টনের কেজি ১৬ থেকে ১৮ টাকায় বিক্রি হতো, এখন সেটি মাত্র ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আয় কমে গেলেও সংসারের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
আলফাডাঙ্গা সদর বাজার, গোপালপুর, জাটিগ্রাম ও হেলেঞ্চা হাট ঘুরে দেখা যায়, গত ছয় মাসের তুলনায় অধিকাংশ শাকসবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাজারে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি কম থাকায় অন্য জেলা থেকে আসা পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমানে বাজারে বিক্রি হওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ সবজি বাইরের জেলা থেকে আসে। পরিবহন ব্যয়, বৃষ্টির কারণে সরবরাহ সংকট এবং মৌসুমি প্রভাবের কারণে দাম বেড়েছে।
বর্তমানে আলফাডাঙ্গা বাজারে আলু ৩০ টাকা, কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা, পেঁয়াজ ৩০ টাকা, আদা ২৪০ থেকে ২৮০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা, পটল ৭০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, কচুর মুখি ৭০ টাকা এবং ঢ্যাঁড়স ৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাউ ও চালকুমড়া আকারভেদে ৬০ থেকে ৮০ টাকা এবং স্থানীয় পুঁইশাক, কলমিশাক ও লালশাক ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সবজি বিক্রেতা ফারুক হোসেন মিয়া বলেন, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। তাই কম দামে বিক্রির সুযোগ নেই। শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শুধু সবজি নয়, মাছের বাজারেও বেড়েছে দাম। মাছ ব্যবসায়ী গোপাল চন্দ্র জানান, বর্ষা মৌসুম হলেও নদীতে মাছ কম ধরা পড়ছে। দেশীয় মাছের দাম এখন ৮০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত। চাষের রুই, কাতলা, সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্পের মতো মাছও এখন ৩০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না।
আরেক মাছ ব্যবসায়ী পবন দাশ বলেন, স্থানীয়ভাবে মাছের উৎপাদন কম হওয়ায় খুলনা, বাগেরহাট ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ আনতে হয়। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি বাজারে পড়ছে।
আলফাডাঙ্গা সদর বাজার সবজি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি জুদ্দু মিয়া বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে সবজির দাম কিছুটা বাড়ে। তবে এবার সরবরাহ কম থাকায় দাম আরও বেশি। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাজারে স্বস্তি ফিরতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বাজার তদারকি জোরদার এবং সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না হলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজার করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। বর্তমানে সংসারের বাজেট সামলাতে অনেক পরিবারকেই প্রয়োজনীয় পণ্য কম কিনে কিংবা তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন
Array