ফরিদপুরের আড়িয়াল খাঁ নদে যৌথবাহিনীর অভিযান, ৬ ড্রেজার জব্দ, আটক ৩
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফরিদপুর জেলার চারটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ২৮ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৯ জনই জামানত হারিয়েছেন। মোট প্রার্থীর প্রায় ৬৮ শতাংশ প্রয়োজনীয় ভোটের এক-অষ্টমাংশ অর্জন করতে না পারায় তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে চারটি আসনেই শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। রাতেই বেসরকারিভাবে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অংশগ্রহণ থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল কয়েকটি বড় দলের মধ্যে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৪৪(৩) ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী মোট প্রদত্ত বৈধ ভোটের ১২ দশমিক ৫ শতাংশের কম ভোট পেলে তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। এবারের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়-পরাজয়ের কারণে অধিকাংশ প্রার্থী এই শর্ত পূরণ করতে পারেননি।
🔹 ফরিদপুর-১ (মধুখালী-বোয়ালমারী ও আলফাডাঙ্গা):
এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৫,১০,৫৪০ জন। বৈধ ভোট পড়ে ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৯৮টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৯ হাজার ৮৭৫ ভোট।
এ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী মো. ইলিয়াস মোল্লা দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ১,৫৪,১৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ধানের শীষ প্রতীকে পান ১,২৬,৪৭৬ ভোট।
অন্য প্রার্থীদের মধ্যে—
মো. আবুল বাসার খান (স্বতন্ত্র) ফুটবল প্রতীকে ৩৪,৩৮৭ ভোট, মো. গোলাম কবীর মিয়া (স্বতন্ত্র) মোটরসাইকেল প্রতীকে ২,১৫৯ ভোট, মৃন্ময় কান্তি দাস (বিএমজেপি) রকেট প্রতীকে ৭৮৬ ভোট, সুলতান আহম্মেদ খান (জাতীয় পার্টি) লাঙ্গল প্রতীকে ৫০৬ ভোট, মো. হাসিবুর রহমান (স্বতন্ত্র) হরিণ প্রতীকে ৪৫৫ ভোট এবং শেখ আব্দুর রহমান জিকো (স্বতন্ত্র) উট প্রতীকে ৮৪ ভোট পান।
এখানে বিজয়ী ও রানারআপ ছাড়া বাকি ছয়জনই জামানত হারিয়েছেন।
🔹 ফরিদপুর-২ (নগরকান্দা ও সালথা):
এ আসনে মোট ভোটার ছিল ৩,৩২,০৪১ জন। বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ১৪ হাজার ৯১৬টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার ৮৬৫ ভোট।
এ আসনে বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম রিংকু ধানের শীষ প্রতীকে ১,২১,৬৯৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা মো. আকরাম আলী রিক্সা প্রতীকে পান ৮৯,৩০৫ ভোট।
অন্য প্রার্থীরা—
শাহ মো. জামাল উদ্দীন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা প্রতীকে ২,৩৬৮ ভোট,
ফারুক ফকির (গণঅধিকার পরিষদ) ট্রাক প্রতীকে ৬৭৫ ভোট, আকরামুজ্জামান (ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ) আপেল প্রতীকে ৬১৭ ভোট এবং মো. নাজমুল হাসান (বাংলাদেশ কংগ্রেস) ডাব প্রতীকে ২৫৭ ভোট পান।
এখানে বিজয়ী ও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া বাকি চারজন প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে।
🔹 ফরিদপুর-৩ (সদর উপজেলা):
এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৪,৩২,৬২১ জন। বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ৭৯ হাজার ১৪৩টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৪ হাজার ৮৯৩ ভোট।
এ আসনে বিএনপির চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ ধানের শীষ প্রতীকে ১,৪৮,৫৪৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. আবদুত তাওয়াব দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ১,২৪,১১৫ ভোট।
অন্যান্য প্রার্থীরা—
কে এম ছরোয়ার (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা প্রতীকে ৪,০২২ ভোট, মোরশেদুল ইসলাম আসিফ (স্বতন্ত্র) হরিণ প্রতীকে ১,২৫৩ ভোট, মো. রফিকুজ্জামান মিয়া (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি) কাস্তে প্রতীকে ৯৫৭ ভোট এবং
আরিফা আক্তার বেবী (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) তারা প্রতীকে ২৫১ ভোট পান।
এখানে বিজয়ী ও রানারআপ ছাড়া বাকি চারজন প্রার্থীর জামানত জব্দ হয়েছে।
🔹 ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর ও চরভদ্রাসন):
এই আসনে মোট ভোটার ছিল ৪,৯৬,৭০৬ জন। বৈধ ভোট পড়ে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৯৯২টি। জামানত রক্ষার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৪ হাজার ৩৭৪ ভোট।
এ আসনে বিএনপির মো. শহিদুল ইসলাম বাবুল ধানের শীষ প্রতীকে ১,২৭,৪৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মো. সরোয়ার হোসাইন দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পান ৭৫,৮০৫ ভোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী এ.এম. মুজাহিদ বেগ ফুটবল প্রতীকে পান ৫৬,১৬০ ভোট—এই তিনজন জামানত রক্ষা করেন।
অন্য প্রার্থীরা—
মো. ইসহাক চোকদার (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ) হাতপাখা প্রতীকে ১১,৪৯৮ ভোট, মুহাম্মদ মজিবুর হোসেইন (স্বতন্ত্র) ঘোড়া প্রতীকে ১,৭০৪ ভোট, মিজানুর রহমান (বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস) রিক্সা প্রতীকে ১,১১৮ ভোট,
আতাউর রহমান (বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি) কাস্তে প্রতীকে ৭১৪ ভোট এবং মুফতি রায়হান জামিল (জাতীয় পার্টি) লাঙ্গল প্রতীকে ৫৫০ ভোট পান।
এদের মধ্যে পাঁচজনের জামানত জব্দ হয়েছে।
সার্বিক চিত্র:
ফরিদপুরের চারটি আসনে মোট ভোটার ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৭১ হাজার ৯০৮ জন। নির্বাচনে অংশ নেন ২৮ জন প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপি তিনটি আসনে (ফরিদপুর-২, ৩ ও ৪) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি আসনে (ফরিদপুর-১) জয়লাভ করে।
ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলেও ফলাফলে বড় ব্যবধান লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ আসনেই ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে ব্যর্থ হন এবং তাদের বড় অংশ জামানত হারান।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, যারা নির্ধারিত ভোটের কম পেয়েছেন, তাদের জামানতের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হবে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় বাজারে চুরির ঘটনায় ক্ষতিপূরণ পরিশোধের চাপ ও অপমান সহ্য করতে না পেরে এক নৈশপ্রহরীর আত্মহত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহত ওয়াহিদুল ইসলাম (৩০) উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের মৃত নজরুল শেখের ছেলে। তিনি পাঁচ বছর বয়সী এক কন্যা এবং চার মাস বয়সী জমজ দুই পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় বড়দিয়া বাজারে একটি শালিশ বৈঠক চলাকালে তিনি বিষপান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিহতের স্ত্রী জোস্না বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে বড়দিয়া বাজারে নৈশপ্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। গত মঙ্গলবার ভোরে ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার পর থেকেই তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকেন। কিছু জানতে চাইলে উত্তেজিত হয়ে বলতেন, “মাথা ঠিক নাই, কথা বলিস না।” পরে জানান, বাজারে চুরি হয়েছে এবং এজন্য তাকে দায়ী করে ক্ষতিপূরণ দিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। এ নিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং প্রায়ই বলতেন, “এত টাকা কোথা থেকে দেবো, শরমের চেয়ে মরণ ভালো।”
জোস্না বেগম আরও জানান, নির্বাচনের পর শুক্রবার সন্ধ্যায় বাজারে একটি শালিশ বসে। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, ডিউটিতে থাকা পাহারাদারদের চুরি হওয়া মালামালের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। শালিশ চলাকালে ওয়াহিদুল কিছু সময়ের জন্য সরে গিয়ে ফিরে এসে তার তিন সন্তানের কথা উল্লেখ করে নিজের নির্দোষিতা দাবি করেন। এরপর হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে পড়লে উপস্থিত লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
বাজার কমিটির সভাপতি আবু মেম্বার জানান, এক দোকানদারের ঘরের পেছনের টিন কেটে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার মালামাল চুরি হয়। বিষয়টি জানার পর শালিশ ডাকা হয়। তিনি বলেন, “চোর ধরা না গেলে পাহারাদারদের দায়বদ্ধতা থাকে। তবে কাউকে অপমান করা হয়নি, সময় দেওয়া হয়েছিল।”
অন্যদিকে বাজারে টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা আজাদ মোল্যা বলেন, দুইজন পাহারাদার মাসে ২৪ হাজার টাকা বেতনে কাজ করতেন। চুরির ঘটনায় বাজারের পক্ষ থেকে তাদের কাছেই ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়। তিনি দাবি করেন, বৈঠকে চাপ সৃষ্টি করা হয়নি, তবে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
গট্টি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লাবলু জানান, তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। পাহারাদারকে জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় এলাকায় নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ উদঘাটন জরুরি।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান জানান, এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ভোট গ্রহণ শেষ হবার পরদিনই নির্বাচিত সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথ নেয়ার মাধ্যমে শুরু হবে নতুন সংসদের যাত্রা।
এরপরেই দায়িত্ব গ্রহণ করবে নতুন সরকার। কিন্তু কবে নির্বাচিতরা শপথ নেবেন তা এখনো পরিষ্কার নয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে আগামী মঙ্গলবার সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের শপথ নেয়ার কথা রয়েছে।
এই বিলম্বের কারণ হিসেবে সামনে আসছে আইনি বিভিন্ন জটিলতার বিষয়টি।
নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য সংবিধানে বেশ কিছু নিয়মের বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। রীতি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ পড়াবেন রাষ্ট্রপতি।
তবে বিভিন্ন আসনে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের শপথ পাঠের পর মন্ত্রিসভার শপথ হবে। কিন্তু সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিতদেরকে শপথ পাঠ করাবেন, তা পরিষ্কার নয়।
সংবিধানের বাইরে কোনো প্রক্রিয়ায় শপথ পাঠ বা সরকার গঠন হলে তা নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।
এ কারণেই আইনি জটিলতা এড়াতে গেজেট প্রকাশের তিনদিন পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে শপথ পাঠ করার কথা ভাবা হচ্ছে।
সেই হিসাবে আগামী ১৭ই ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিতদের শপথ পাঠ করাবেন সিইসি। আর সেদিন বিকালে নতুন সরকারের শপথ পাঠ করাবেন রাষ্ট্রপতি।
বিএনপির দুইজন শীর্ষ নেতা বিবিসি বাংলাকে এই আভাস দিয়েছেন।
এদিকে সরকার ও বিএনপির বিভিন্ন সূত্র থেকে ১৭ তারিখের কথা বলে হলেও, নির্বাচিত কয়েকজন সংসদ সদস্যরা জানিয়েছেন, রোববারের মধ্যে তাদের ঢাকায় থাকার জন্য দল থেকে বলা হয়েছে। নিজ এলাকা থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনাও দিয়েছেন তাদের কেউ কেউ।
খুলনা পাঁচ আসনের নির্বাচিত বিএনপির মোহাম্মদ আলি আসগার শনিবার ১১টা ৫১ মিনিটে তার ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, “আগামীকাল শপথ গ্রহণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় যেতে হচ্ছে”।
দুপুর দুইটার দিকে সাংবাদিকদের সাথে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “আগামী তিন দিন, সর্বোচ্চ চারদিনের মধ্যে শপথ হয়ে যাবে।
তবে আগামীকালও যদি শপথ হয়ে যায়, তাদের সেই প্রস্তুতি আছে বলেও জানান তিনি।
শপথ পাঠ নিয়ে আইনে কী আছে?
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর আসে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ পড়ানোর বিষয়টি। আর বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের এই শপথ পাঠ করান।
সংবিধানে বলা হয়েছে, গেজেট প্রকাশের পর স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার অথবা রাষ্ট্রপতির মনোনীত ব্যক্তি নির্বাচিতদের শপথ পাঠ করাবেন। তবে তারা শপথ পাঠ করাতে অসমর্থ হলে গেজেট প্রকাশের তিনদিন পরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পাঠ করাবেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় আছেন, সেটি পরিষ্কার নয়। ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে রয়েছেন।
এক্ষেত্রে দুটি বিকল্প আছে। একটি হলো রাষ্ট্রপতির মনোনীত প্রতিনিধিকে দিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানো অথবা গেজেট প্রকাশের তিন দিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে শপথ পাঠ।
এক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতি অবলম্বন করে শপথ নিলে ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে বিএনপি নেতাদের মধ্যে।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের দফা দুই অনুযায়ী, যেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি নিজে কর্তৃপক্ষ কেবল সেসব ক্ষেত্রেই তিনি প্রতিনিধি নিয়োগ করতে পারবেন।
কিন্তু সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ানোর কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতি না, বরং স্পিকার। আর স্পিকারের প্রতিনিধি হতে হলে তার স্বাক্ষর থাকা জরুরি। ফলে এই মুহূর্তে সেই সুযোগ না থাকায় উপায় আছে দুইটি।
একটিতো আগেই বলা হয়েছে, সংবিধানের ৭৪ ধারা অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দিতে পারেন এবং “সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য তাহা পালন করিবেন”।
অথবা কোনো কারণে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার না থাকলে তিন দিন পর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের শপথ পড়ানো, যা ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২(ক)-এ উল্লেখ আছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে পরবর্তী সময়ের জটিলতা বা বিতর্ক এড়ানোর জন্য দ্বিতীয়টিকেই ‘নিরাপদ’ মনে করছে নতুন সরকার গঠন করতে যাওয়া দল বিএনপি।
দলটির দুইজন শীর্ষ নেতা আভাস দিয়েছেন, ১৭ই ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের শপথ হতে পারে, সেদিন বিকালে হবে মন্ত্রিসভার শপথ।
তবে এখনো এ নিয়ে আইনি বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছেন দলটির নেতারা।
এর আগেই সরকারের তরফ থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে দেওয়া হবে।
জানা গেছে, রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে চায় সব পক্ষ।
অন্যদিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের শপথ পাঠ করানোর বিষয়ে কোনো আলোচনা চলছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মোঃ আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, শপথ পড়ানোর দায়িত্ব সরকারের।
নির্বাচন কমিশনের কাজ গেজেট প্রকাশ করা, তা তারা করে দিয়েছেন। ফলে আগামী তিন দিনের মধ্যে যদি সরকারের তরফ থেকে শপথ পড়ানো না হয়, সেক্ষেত্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার “এটা করতে পারে বা করবে আর কি”।
তবে সরকারের দিক থেকে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির প্রতিনিধি নিয়োগের বিষয়টিই বেশি সামনে এসছে।
গত বৃহস্পতিবার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছিলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার শপথ পড়ালে অপেক্ষা করতে হবে। “আমরা আসলে অপেক্ষা করতে চাই না, আমরা নির্বাচন হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব শপথ গ্রহণের ব্যবস্থা করতে চাই”।
অনেকটা একই দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আলী ইমাম মজুমদার।
তিনি জানান, শপথ পাঠের জন্য রাষ্ট্রপতি একজন প্রতিনিধি নিয়োগ করবেন বলে আলোচনা চলছে।
“আমি যতটুকু জানি সম্ভবত মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ হবে”, বলেন এই উপদেষ্টা।
তবে শনিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ জানিয়েছেন, ১৭ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে যেকোনো দিন নতুন সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সব প্রস্তুতি রাখছে।
শনিবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “আগামীকালও যদি শপথ হয়ে যায়, আমাদের প্রস্তুতি আছে।”
সচিব বলেন, নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানে কম-বেশি এক হাজার অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। শপথ অনুষ্ঠানের অন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সংসদ সদস্যদের শপথ কে পড়াবেন এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, সরকার থেকে কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হতে পারে, প্রধান বিচারপতি বা প্রধান নির্বাচন কমিশনারও শপথ পাঠ করাতে পারেন বলেও জানান তিনি।
সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাসহ মন্ত্রিপরিষদকে নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিই শপথ পড়াবেন, বলেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
সাংবিধানিক উপায়ে শপথ নেয়াকেই সবচেয়ে ভালো উপায় বলে মনে করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
তার মতে, সংবিধান অনুযায়ী আগের স্পিকারের ‘সম্মতি’কে গুরুত্ব সহকারে নেয়া প্রয়োজন।
আর তা করতে প্রয়োজনে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সাথে ফোনে না হলেও মেইলে যোগাযোগ করা যেতে পারে। কিংবা ডেপুটি স্পিকারকে প্যারোলে মুক্তি দিয়েও তা করা সম্ভব, কারণ আইন অনুযায়ী এই বিষয়ে কোনো বাধা নেই।
কিন্তু শুরু থেকেই এই সরকারের ‘এটিচিউট’ বা মনোভাব আলাদা ছিল আর তাদের মধ্যে ‘ইগো’ থাকার কারণে, সংবিধানের বাইরে তারা অনেক কিছু করেছে। সে কারণেই এসমস্ত জটিলতাগুলো হচ্ছে বলে মনে করেন মনজিল মোরসেদ। আবার সংবিধানের বাইরে গেলে ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অবশ্য মি. মোরসেদ বলছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছ থেকে শপথ নেয়া সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয় বিকল্প। সেক্ষেত্রে প্রথম বিষয়গুলো এড়িয়ে গেলে বিতর্ক থেকেই যাবে বলে মনে করেন তিনি।
যেভাবে হয় সরকার গঠন
প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠের মাধ্যমে সংসদ গঠিত হয়। সেই সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধানকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানান রাষ্ট্রপতি।
অতীতে সংসদ সদস্যদের শপথের দিন বিকালে অথবা পরদিন মন্ত্রিসভার শপথ হয়ে থাকে।
এবার রমজান এগিয়ে আসার কারণে ধারণা করা হচ্ছে, সকালে সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠের পর একইদিন বিকেলের দিকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যরা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নিতে পারেন।
বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২১২টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি ও তাদের নির্বাচনী মিত্ররা।
এর আগে বাংলাদেশে সবশেষ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল ২০০৮ সালে। সে সময় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার।
তবে ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তেসরা জানুয়ারি বিএনপি আমলের স্পিকার জমির উদ্দিন সরকারের কাছেই শপথ নেয় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা।
এর তিন দিন পর ছয়ই জানুয়ারি শপথ নেয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদর কাছে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের সদস্য।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারির নির্বাচনের পর ৮ই জানুয়ারি গেজেট প্রকাশ হয়। ১০ই জানুয়ারি স্পিকারের শপথ নেন সংসদ সদস্যরা আর ১১ই জানুয়ারি শপথ নেয় মন্ত্রিসভা।
এর আগে ২০০১ সালে পহেলা অক্টোবর নির্বাচন হলেও গেজেট হয়েছিল পাঁচই অক্টোবর।
তবে তিনদিন ধরে চলা সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রথমদিনে খালেদা জিয়াসহ চারদলীয় ঐক্যজোটের ১৯৭ জন নির্বাচিত তৎকালীন স্পিকার আবদুল হামিদের কাছে শপথ নিয়েছিলেন নয়ই অক্টোবর।
পরদিন ১০ই অক্টোবর রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে।
স্পিকার কীভাবে নির্বাচিত হবে?
সংবিধানের ৭৪(১) অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে সংসদ পরিচালনা করেন আগের সংসদের স্পিকার। “নতুন সংসদ নির্বাচনের পর প্রথম বৈঠকেই সংসদ সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে স্পিকার নির্বাচিত করেন”।
২০০১ সালের ২৮শে অক্টোবর যেমন আওয়ামী লীগের সরকারের সময়ের স্পিকার আবদুল হামিদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়ে নতুন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকারকে নির্বাচিত করা হয়।
এরপরে আবদুল হামিদ আধাঘণ্টার বিরতি দিয়ে বিদায় নিয়ে চলে যান। বিরতির পর নতুন স্পিকার দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
কিন্তু এবার কী করা হবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংবিধানের ৭৪ ধারার অনুযায়ী “সংসদের কোনো বৈঠকে স্পিকারের স্পিকারের অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকারও অনুপস্থিত থাকিলে সংসদের কার্যপ্রনালী বিধি অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য স্পিকারের দায়িত্ব পালন করিবেন।”
আবার একই ধারার ছয় অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্পিকার পদত্যাগ করলেও ‘ক্ষেত্রমত’ পরবর্তী কেউ সেই পদে নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত তিনিই “স্বীয় পদে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে”।
কিন্তু পাঁচ অগাস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের বেশিরভাগ সংসদ সদস্য পলাতক বা কারাগারে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের নেতাদের শপথ পাঠ করা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা রয়েছে।
ফলে কী প্রক্রিয়ায় নতুন স্পিকার নির্বাচিত হবেন এখনই সেটা পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। এ নিয়ে আইনি দিকগুলো খতিয়ে দেখছে সরকার ও বিএনপির আইনজীবীরা।
আইন বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সিইসি নির্বাচিতদের শপথ পাঠ করালে তাদের মধ্য থেকে কোনো একজন সংসদ সদস্য প্রাথমিকভাবে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর অধিবেশনে নতুন স্পিকার নির্বাচন করার পর তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
এছাড়া নিয়ম অনুযায়ী, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শপথ নেয়ার সাথে সাথে আগের সরকারের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের অবসান হয়ে যায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ক্ষেত্রেও এমন দেখা গিয়েছিল।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৮ ধারার চার অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে বা নিজ পদে বহাল না থাকলে মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করেছেন বলে গণ্য হবে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
আপনার মতামত লিখুন
Array