আধুনিকতার স্রোতে হারানো ঐতিহ্যের প্রত্যাবর্তন: চরভদ্রাসনে পালকিতে চড়ে নবদম্পতির বিয়ে
ফরিদপুরের হারিয়ে যেতে বসা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে নতুন করে জীবন্ত করে তুলেছে এক ব্যতিক্রমধর্মী বিয়ের আয়োজন। আধুনিক গাড়িবহর নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী পালকিতে চড়ে নববধূকে ঘরে তুলেছেন প্রবাসী বর মনির হোসেন।
বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বিকেলে জেলার চরভদ্রাসনের জনপথ যেন ফিরে যায় বহু বছর আগের গ্রামবাংলায়। জারি-সারি গান আর ঢাকের তালে তালে পালকির বহর যখন এগিয়ে চলে, তখন রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমায় উৎসুক জনতা। পালকির ভেতরে বিয়ের সাজে সজ্জিত বর-কনেকে এক নজর দেখতে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ ছুটে আসেন।
পালকির সামনে-পেছনে সারিবদ্ধভাবে চলতে থাকা বহনকারী দল, বরযাত্রীদের নাচনভঙ্গি ও সম্মিলিত গান পুরো গ্রামকে রূপ দেয় আনন্দ-উৎসবে। দীর্ঘ ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পালকির বহর কয়েক দফা যাত্রাবিরতি দেয়, আর প্রতিটি বিরতিতেই সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ থেকেই বর মনির হোসেন মাদারীপুর জেলা থেকে ২৪ হাজার টাকায় একটি ঐতিহ্যবাহী পালকির বহর ও ডাক দল ভাড়া করেন। চরভদ্রাসন উপজেলার সদর ইউনিয়নের এমপি ডাঙ্গী গ্রামের শেখ ইউনুছের ছেলে মনির হোসেন প্রবাস থেকে দেশে ফিরে পাশের সদরপুর উপজেলার মনিকোঠা গ্রামে বিয়ে করেন। বর-কনের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ৯ কিলোমিটার হলেও আধুনিক যানবাহন পরিহার করে ঐতিহ্যকেই বেছে নেন তিনি।
বরযাত্রী নাসির শেখ জানান, বরের বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছাতেই জারি-সারি গান ও ঢাকের তালে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। আমন্ত্রিত নারী অতিথিরা ধান, দুবলা ও সাজানো কুলা হাতে নিয়ে রাস্তায় নেমে নববধূকে বরণ করে নেন। প্রায় ১৫ মিনিট ধরে বরণ পর্ব শেষে নববধূকে শূন্যে তুলে বাসর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়।
বর মনির হোসেন বলেন, “আমি বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি ভালোবাসি। পালকি আজ গ্রামবাংলা থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। আমাদের আদি ঐতিহ্যকে ধরে রাখতেই পালকিতে চড়ে নববধূকে বাড়িতে এনেছি।”
চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ খান বলেন, “গ্রামবাংলার ঐতিহ্য রক্ষায় এমন আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়। আধুনিকতার ভিড়েও যে আমাদের সংস্কৃতি এখনো মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে আছে, এই বিয়ে তারই প্রমাণ।”
পালকিতে চড়ে এই ব্যতিক্রমী বিয়ে শুধু দুটি পরিবারের মিলনই নয়, বরং গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে নতুন করে তুলে ধরার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল চরভদ্রাসনের মানুষের কাছে।

আপনার মতামত লিখুন
Array