খুঁজুন
, ,

দিল্লিতে মাহদী হাসানের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:৪৯ পূর্বাহ্ণ
দিল্লিতে মাহদী হাসানের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল?

বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জের নেতা মাহদী হাসানের সঙ্গে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ঠিক কী হয়েছিল, তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে গত কদিন ধরেই নানা আলোচনা চলেছে।

মি. হাসান বাংলাদেশে ফিরেছেন বুধবার বিকেলে।

মাহদী হাসান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক।

মাস খানেক আগে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওর কারণে তাকে নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, শায়েস্তাগঞ্জ থানায় বসে প্রকাশ্যেই মি. হাসান ওসি আবুল কালামকে হুমকি দিচ্ছেন এই বলে যে, তারা বানিয়াচং থানা পুড়িয়েছেন এবং এস আই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।

এই বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে গত জানুয়ারিতে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের প্রতিবাদে তার সমর্থকদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে তাকে মুক্তি দেওয়া হলে তা নিয়েও হয় সমালোচনা।

সম্প্রতি তিনি দিল্লিতে গিয়েছিলেন পর্তুগালের ভিসা নিতে। সেখানেই তাকে কেউ একজন চিনে ফেলে এবং একটা ভিডিও রেকর্ড করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। এরপরেই সক্রিয় হয়ে ওঠেন ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।

ওই কর্মকর্তারা মঙ্গলবার আর বুধবার তার ওপরে কীভাবে নজর রেখেছিলেন আর শেষমেষ তার সঙ্গে ঠিক কী কী করা হয়েছে, তা জানতে পেরেছে বিবিসি বাংলা।

এমন দুজন ব্যক্তির সঙ্গে বিবিসি বাংলা পৃথকভাবে কথা বলেছে, যারা গোটা ঘটনাক্রম সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল।

অবশ্য তাদের নাম উল্লেখ করা হবে না, এই শর্তেই বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন।

তারা দুজনেই বলেছেন যে, মাহদী হাসানকে শারীরিকভাবে নিগ্রহ করা হয়নি কোথাও। তবে এটা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, “ভারত-বিরোধী কথা বলে এবং বাংলাদেশের এক হিন্দু পুলিশ কর্মকর্তাকে মেরে ফেলার প্রকাশ্য দাবি করে – এমন কোনো ব্যক্তিকে ভারতে অবস্থান করতে দেওয়া হবে না। তাকে এটাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, নিজের দেশেই ফিরে যাওয়া ছাড়া তার অন্য কোনো উপায় নেই”।

ওই দুইজনের দেওয়া তথ্যের ওপরে ভিত্তি করেই এই প্রতিবেদন।

কনট প্লেস, মঙ্গলবার বেলা ১১টা

দিল্লির প্রাণকেন্দ্র কনট প্লেসে একটি বেসরকারি সংস্থার দফতরে মঙ্গলবার সকালে প্রথম দেখা যায় মাহদী হাসানকে। তার পাশে এক নারীও বসেছিলেন। ওই বেসরকারি সংস্থাটি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের হয়ে ভিসার আবেদন প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে।

জানা গেছে যে মি. হাসান এবং তার পাশে বসা নারী পর্তুগালের ভিসার জন্য আবেদন করতে গিয়েছিলেন।

পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের নাগরিকদের দিল্লিতে আসতে হয়, সে জন্য ভারতীয় ভিসা লাগে। জানা গেছে যে, বাংলাদেশের ভারতীয় দূতাবাস মাহদী হাসানকে ভিসা দিয়েছিল।

মি. হাসান এবং তার সঙ্গে আসা এক নারী নিউ দিল্লি রেল স্টেশনের কাছাকাছি পাহাড়গঞ্জ এলাকার একটি হোটেলে ওঠেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।

কনট প্লেসের ওই ভিসা কেন্দ্রে অপেক্ষা করার সময়ে কেউ তার ভিডিও রেকর্ড করে নেয়। সেই ব্যক্তি যে কে, সেটা কেউ জানাতে চাননি। তবে তিনি যে মি. হাসানকে চিনতে পেরেছিলেন, এটা নিশ্চিত।

ভিডিও রেকর্ডকারী ব্যক্তিও সেখানে ভিসা নিতেই গিয়েছিলেন।

তবে সেই ব্যক্তি পর্তুগালের জন্য নয়, অন্য কোনো দেশের ভিসা পাওয়ার আবেদন জানাতে গিয়েছিলেন বলে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে।

“মঙ্গলবার সকাল ১১টা নাগাদ মাহদী হাসানকে চিহ্নিত করা যায়। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যে খবর পেয়ে যাই। সেই সময়েই পর পর তার কাছে ভারতীয় আর বাংলাদেশের নানা নম্বর থেকে ফোন আসতে শুরু করে। সেই সব ফোন কারা করছিল, সেটা বলব না, কিন্তু তখনই মাহদী হাসান আন্দাজ করে যে কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে”।

“একটা নতুন দেশে এসে, যেখানে তাকে কেউ চেনে না – তার কাছে হঠাৎ করে কেন এত অজানা নম্বর থেকে ফোন আসবে! এটা তাকে চিন্তায় ফেলে দেয়। অন্যদিকে কর্মকর্তারা তার ওপরে নজর রাখা শুরু করেন,” বিবিসি বাংলাকে জানাচ্ছিলেন পুরো ঘটনাক্রম সম্বন্ধে জানেন, এমন একটি সূত্র।

অন্য সূত্রটি বলছে যে ওই ভিসা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে তিনি প্রথমে পুরোনো দিল্লির জামা মসজিদ এলাকায় গিয়েছিলেন।

“বেলা দুটো থেকে আড়াইটের মধ্যে তার (মাহদী) কাছে বাংলাদেশ থেকে কেউ জানায় যে সে চিহ্নিত হয়ে গেছে। তখন সে নিশ্চিত হয় যে অজানা নম্বরগুলো থেকে কারা, কেন ফোন করছিল। এরপরেই সে দিল্লিতে কয়েকটি জায়গায় গিয়েছিল আশ্রয়ের সন্ধানে। কেউই তাকে থাকতে দিতে রাজি হয়নি,” বলছিলেন একটি সূত্র।

‘দিল্লি ছাড়তে হবে’

বিবিসি বাংলা যে দুজনের সঙ্গে কথা বলেছে, তাদের একজন জানিয়েছেন, মি. হাসান দিল্লি থেকেই ভিসা নিয়ে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার সঙ্গে যে নারী ছিলেন, তিনি মি. হাসানেরই এক আত্মীয়া।

ওই সূত্রটিই বলেছে যে, পরবর্তী সময়ে খরচের জন্য ক্রিপ্টো-কারেন্সি নিয়ে ভারতে এসেছিলেন মাহদী হাসান এবং তার পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় ৪০ লক্ষেরও বেশি।

তবে অন্য সূত্রটি “এটা আমার এখতিয়ারে পড়ে না” বলে অর্থের পরিমাণ সম্বন্ধে কিছু জানাতে পারেননি। তিনি এটাও নিশ্চিত করতে পারেননি যে মি. হাসান দিল্লি থেকেই লিসবনে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন কি না।

তবে মি. হাসানকে কেউ পরামর্শ দেন যে তিনি যেন পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে সরে যান এবং বিমানবন্দরের কাছাকাছি কোনো হোটেলে ওঠেন।

পাহাড়গঞ্জের হোটেল থেকে কাউকে দিয়ে তিনি নিজের ব্যাগ-সুটকেস আনিয়ে বিমানবন্দরের কাছাকাছি একটি হোটেলে ওঠেন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।

দিল্লি-ঢাকা ইন্ডিগোর বিমানের টিকিট তাকে পৌঁছিয়ে দেওয়া হয় রাতেই।

‘ভিসা বাতিল’

একদিকে মাহদী হাসানের ওপরে নজর রাখা যেমন চলছিল, অন্যদিকে ভারতীয় কর্মকর্তারা খোঁজ করছিলেন যে “ভারতবিরোধী কথা বলা কোনো ব্যক্তিকে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস ভিসা কী করে দিল”- সেই প্রশ্নের উত্তর।

একটি সূত্র বলছে, “সে সম্ভবত বাংলাদেশে কোনো এজেন্টকে দিয়ে ভারতের ভিসা জোগাড় করেছিল। আর তার বিরুদ্ধে ভারতে তো কোনো মামলা নেই। সে পর্তুগালের ভিসা নেওয়ার জন্য ভারতে আসতে চেয়েছিল। তাই কীভাবে তার ভিসার আবেদন বাতিল করা যেত?”

অন্য সূত্রটি জানাচ্ছে, “যেভাবেই ভিসা জোগাড় করে থাক সে, তার ভিসা রাতেই বাতিল করানো হয়েছে। সেই খবর অবশ্য সে আগে জানতে পারেনি”।

দুটি সূত্রই বলছে যে মাহদী হাসান এটা মঙ্গলবার সন্ধ্যার মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলেন যে তার পক্ষে আর এক দিনও ভারতে থাকা সম্ভব না। এমনকি পর্তুগালের ভিসার জন্য তাকে কনট প্লেসের ওই বেসরকারি সংস্থা দফতরে বুধবার সকালে দ্বিতীয়বার যেতে বলা হলেও সেখানে যে তিনি যেতে পারবেন না, এটা বুঝে গিয়েছিলেন।

“বিমানবন্দরের কাছের ওই হোটেলে সকালের জলখাবার খেয়ে ৮টা ১০ মিনিটে সে রওনা দেয়, আর ৮টা ৫০ মিনিট নাগাদ সিকিউরিটি চেক করতে এগোয়,” বিবিসিকে জানিয়েছে দুটি সূত্রই।

তারা দুজনে জানাচ্ছেন যে, ইন্ডিগোর ১২টা ৪০ মিনিটের ফ্লাইটের টিকিট ছিল তার কাছে। এটা দিল্লি বিমানবন্দরে একটি সেলফি ভিডিও করার সময়ে নিজেও জানিয়েছিলেন তিনি। ওই ভিডিওটি তিনি সামাজিক মাধ্যমে আপলোডও করেছেন। সেখান তিনি হয়রানির শিকার হওয়ার অভিযোগও করেছেন।

একটি সূত্র বলছে, মাহদী “বিমান সংস্থার চেক ইন কাউন্টারে গিয়ে তিনি নিজের বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করে সিকিউরিটি চেকের জন্য এগোন”।

“নিরাপত্তা চেকিংয়ের জন্য তিনি নিজের লাগেজ স্ক্যানারের কনভেয়র বেল্টে দেন। লাগেজ এগিয়ে যায়, তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সময়েই এক ভারতীয় কর্মকর্তা তাকে একটু সরে আসতে বলেন,” বিবিসিকে জানিয়েছে একটি সূত্র।

জেরা শুরু

নিরাপত্তা চেকিংয়ের লাইন থেকে তাকে সরিয়ে এনে শুরু হয় জেরা।

“বিভিন্ন এজেন্সির কর্মকর্তারা তাকে জেরা করেন, খুব শান্তভাবে, কোনো শারীরিক নিগ্রহ ছাড়াই,” বলছে দুটি সূত্রই।

তাদের একজন বলছেন, যে মি. হাসান যদি কোনো অপরাধ করে থাকেন, সেটা তো বাংলাদেশের বিষয়, ভারত কেন সেখানে মাথা ঘামাবে।

তবে একটি সূত্র বলছে, “আমাদের তিনটে পয়েন্ট ছিল। প্রথমত সে ভারতকে অপমান করেছে, কটূ কথা বলেছে। দ্বিতীয়ত সে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে বলে প্রকাশ্যে দাবি করেছে, তাই সে একজন সন্দেহভাজন ক্রিমিনাল। তৃতীয় পয়েন্টটাই সবথেকে গুরুত্ব পেয়েছে আমাদের কাছে, সে একজন হিন্দু অফিসারকে মেরেছে বলে দাবি করেছে। এত কিছুর পরেও সে দিল্লিতে আসবে আর এখান থেকে অন্য কোনো দেশে চলে যাবে, আর আমরা চুপ করে বসে থাকব?”

প্রায় আধঘণ্টা তাকে জেরা করা হয় দিল্লির বিমানবন্দরেই। দুটি সূত্রই জানাচ্ছে, তাকে কোনোরকম শারীরিক নিগ্রহ করা হয়নি।

বাংলাদেশে ফিরে কী বললেন মাহদী হাসান?

দিল্লি থেকে বুধবার বিকেলে ইন্ডিগোর বিমানে বাংলাদেশে ফিরেছেন মাহদী হাসান। বিমানবন্দরেই কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ঘিরে ধরে জানতে চান যে দিল্লিতে তার সঙ্গে ঠিক কী হয়েছিল।

গোড়ায় তিনি সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন না। অপেক্ষমান গাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতেই তিনি বলেন, “বলব আমরা, জানাবো, জানাবো”।

এরপরে তিনি বলেন, “আমাকে এসএডি লিডার, বৈষম্যবিরোধী নেতা বলে আটক করা হয়েছিল। তারপর হচ্ছে আমাকে প্রচন্ড হ্যারাস করা হয়েছে। আমি ফুল লাইফ রিস্কে ছিলাম”।

“এটা আমি বলে না, যে কোনো অন্য একটা দেশের নাগরিককে যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা, সেটা দেয় নাই। সো এইটা আমরা ডিটেইলসে জানাবো পরে,” সংবাদ মাধ্যমকে জানান তিনি।

একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনার ওয়ালেটে নাকি ক্রিপ্টো কারেন্সি পাওয়া গিয়েছিল, সেই বিষয়টা যদি ক্লিয়ার করেন”।

জবাবে তিনি বলেন যে ওগুলো ‘গুজব’।

বাংলাদেশে ফেরার পরেও বিমানবন্দরেও এক দফা জেরার মুখে পড়তে হয়, সেটাও জানান মি. হাসান।

“আমাকে আটকানো হয়েছিল, জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বাংলাদেশেও। পরবর্তীকালে আমাকে ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হয়,” মন্তব্য মাহদী হাসানের।

ভারতের যে দুটি সূত্র থেকে মাহদী হাসানকে ঘিরে দিল্লির ঘটনাবলী সম্পর্কে বিবিসি বাংলা জানতে পারে, সেই ব্যাপারে তার বক্তব্য জানতে দুদিন ধরে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি আমরা।

কিন্তু কোনোভাবেই তার সঙ্গে ফোনে কথা বলা যায়নি।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

লিবিয়ায় কারাগারে ফরিদপুরের ২৪ তরুণ, ৩ বছর ধরে নিখোঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৮ অপরাহ্ণ
লিবিয়ায় কারাগারে ফরিদপুরের ২৪ তরুণ, ৩ বছর ধরে নিখোঁজ

জীবিকার তাগিদে ভালো চাকরির আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারী উপজেলার ২৪ জন তরুণ। কিন্তু ২০২৩ সালে লিবিয়ায় যাওয়ার পর থেকে দীর্ঘ তিন বছর ধরে তারা নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, মানবপাচারকারী দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা বর্তমানে লিবিয়ার বিভিন্ন কারাগারে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এখন সন্তানদের জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় স্বজনরা।

​ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দালাল পারভেজ মোল্লা বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওই ২৪ তরুণকে লিবিয়ায় পাঠান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের সঙ্গে তাদের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন সালথা উপজেলার রিয়াজ মোল্লা, তুহিন সরদার, ফিরোজ মোল্লা, তানভীর মোল্লা, সালমান মোল্লা, মাঝারদিয়া ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামের মো. হাচিবুল হাচান এবং ভাওয়াল ইউনিয়নের বারখাদিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামসহ ২৪ জন।

​সন্তানের জন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাচিবুলের মা বলেন, “তিন বছর ধরে আমার ছেলের কোনো খবর নেই। প্রতিদিন অপেক্ষা করি, হয়তো একবার ফোন দেবে। সরকারের কাছে হাতজোড় করে আকুতি জানাচ্ছি, আমার সন্তানকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে দিন।”

​নিখোঁজ রবিউল ইসলামের বাবা নান্নু খান আক্ষেপ করে বলেন, “জমি বিক্রি ও ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। আজ আমার টাকা-পয়সাও শেষ, ছেলেরও কোনো খোঁজ নেই। আমরা শুধু আমাদের সন্তানকে ফেরত চাই।”

​নিখোঁজদের ফেরাতে ‘পাচারের শিকার মানব উদ্ধার ও শিশু সুরক্ষা সংস্থা’র চেয়ারম্যান সৈয়দ খায়রুল আলম জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “২৪টি পরিবার আজ পুরোপুরি নিঃস্ব ও অসহায়। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দ্রুত তাদের পরিচয় যাচাই করে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।”

​নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আবেদন পাওয়ার পর তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।

​ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, মানবপাচারকারী দালাল চক্রের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।

​এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত দালাল পারভেজ মোল্লার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তার বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুরে নেশাগ্রস্ত জামাইয়ের কাছ থেকে মেয়েকে ছাড়িয়ে দুধে গোসল করলেন মা, ভিডিও ভাইরাল

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪৬ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে নেশাগ্রস্ত জামাইয়ের কাছ থেকে মেয়েকে ছাড়িয়ে দুধে গোসল করলেন মা, ভিডিও ভাইরাল

ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে নেশাগ্রস্ত জামাইয়ের নির্যাতন থেকে মেয়েকে মুক্ত করে দুধ দিয়ে গোসল করেছেন এক মা। মানত বা ওয়াদা রক্ষায় প্রকাশ্যে স্থানীয় একটি বাজারে ৫ কেজি দুধ দিয়ে গোসল করার এই খবর ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

​শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়নের বড় বাইখীর গ্রামের চৌরাস্তা বাজারে এ ঘটনা ঘটে।

​ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪ বছর আগে উপজেলার বড় বাইখীর গ্রামের বৃদ্ধ মহাশিন মোল্লার (৭৪) মেয়ে মনিরা খাতুনের (৩০) সঙ্গে একই এলাকার সুমন শেখের (৩২) বিয়ে হয়। মনিরা খাতুনের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁর স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে প্রতিদিন তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি সংসারের ইতি টানতে বাধ্য হন। সম্প্রতি কাজী অফিসে গিয়ে কাবিন রেজিস্ট্রি বাতিলের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় সুমনের সঙ্গে মনিরার বিচ্ছেদ ঘটে।

​মেয়ের মা জুলেখা বেগম (৪৬) জানান, জামাইয়ের ক্রমাগত অত্যাচারে তাঁর মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মেয়েকে এই নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে পারলে তিনি দুধ দিয়ে গোসল করবেন বলে ওয়াদা বা মানত করেছিলেন। সেই ওয়াদা রক্ষা করতেই শুক্রবার সকালে বাইখীর চৌরাস্তা বাজারে ৫ কেজি দুধ দিয়ে গোসল করেন তিনি।

​তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুমন শেখ। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত নির্যাতন ও নেশা করার অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

ফরিদপুর শহরে বেদেপল্লীর নারীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, অতিষ্ঠ পথচারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৪৩ অপরাহ্ণ
ফরিদপুর শহরে বেদেপল্লীর নারীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি, অতিষ্ঠ পথচারীরা

ফরিদপুর শহরের ব্যস্ততম সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে পথচারীদের ঘিরে ধরে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বেদেপল্লীর একদল নারীর বিরুদ্ধে। শহরের আলিপুর মোড়, ১১ তলা ভবন এলাকা, জনতা ব্যাংক মোড় ও চকবাজারসহ ব্যস্ত পয়েন্টগুলোতে দিনের পর দিন এমন ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।

​ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় কাজে শহরে আসা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করেই মূলত চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো পথচারী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ঘিরে ধরে পথ আটকে দেওয়া হয়, এমনকি টানাহেঁচড়া করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে সেখান থেকে রক্ষা পান।

​সদর উপজেলার গ্রাম থেকে কাজে আসা ফাহিম শেখ বলেন, “শহরে ঢোকার পরই কয়েকজন নারী আমাকে ঘিরে ধরে টাকা দাবি করে। না দিলে ছাড়ছিল না। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি, এখন বাড়ি ফেরার ভাড়া নিয়ে চিন্তায় পড়েছি।” একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মমিন খারহাটের রুস্তম ব্যাপারী ও স্থানীয় বাসিন্দা রাহুল শেখ। রাহুল শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেহেতু তারা নারী, প্রকাশ্যে এসব টানাহেঁচড়া করলে পুরুষের জন্য তা অত্যন্ত বিব্রতকর। বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে পার পেতে হয়।”

​অভিযোগ রয়েছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সামনেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে। এ বিষয়ে আলিপুর এলাকার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা (টিএসআই) শেখ তুহিন বলেন, “আমাদের সামনেই সাধারণ মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে টাকা আদায় করা হয়। আমি নিজে কয়েকবার নিষেধ করেছি, কিন্তু নিষেধ করলে তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। যে কারণে অনেক সময় আর কিছু বলা যায় না।”

​তবে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন অভিযুক্ত বেদেপল্লীর নারীরা। মুন্সিবাজার এলাকার বেদেপল্লীর এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়। আমাদের অন্য কোনো কাজের সুযোগ নেই। প্রশাসন যদি পুনর্বাসন বা বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করে, তবে আমরা রাস্তায় এসে টাকা চাওয়া বন্ধ করে দেব।”

​ঘটনাটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া জানান, মুন্সিবাজারের বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের সরকারি কোনো সহায়তার আওতায় আনা যায় কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।

​অন্যদিকে, ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বিষয়টি এখন পর্যন্ত তার জানা ছিল না। তবে টহল টিমকে নির্দেশনা দেওয়া হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

​স্থানীয়দের দাবি, বেদে সম্প্রদায়ের জীবিকার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। একই সাথে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পথচলা নির্বিঘ্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।