ফরিদপুরের সালথা উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের কুমারকান্দা গ্রামের পান্নু ফকির ওরফে জামু ফকির হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। মামলার আসামিদের জামিন ও হুমকি-ধমকির অভিযোগের বিপরীতে বিবাদীপক্ষ ও স্থানীয়দের একাংশ দাবি করেছে, আদালতের মাধ্যমে আইনগত প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি ও হয়রানি করা হচ্ছে।
তাঁদের দাবি, আইনি নিয়মনীতি মেনেই আসামীরা আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন, অথচ এই মামলাকে পুঁজি করে এলাকায় চরম চাঁদাবাজি ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত জামু ফকির এলাকায় কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মীই ছিলেন না, বরং তাঁর বিরুদ্ধে সালথা থানাসহ বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। বিবাদীপক্ষের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁর শত্রু পক্ষ ছিল বহু বিস্তৃত। সে সবসময় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ অবলম্বন করে অপরাধের বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। সরকার পরিবর্তন হওয়ার সাথে সাথে সে-ও দল পরিবর্তন করতেন। তাইতো সরকারি দলের সুবিধা নিয়ে মানুষকে নির্যাতন, বাড়ি-ঘর-দোকানপাট ভাংচুর ও লুটপাট এবং হত্যার অভিযোগও ছিল জামুর বিরুদ্ধে।
জামিনে থাকা আসামীদের পরিবারের দাবি, জামিন আদালতের এখতিয়ার। শারীরিক অসুস্থতা ও আইনি শর্ত মেনেই আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয়েছে। এলাকায় জোরপূর্বক স্বাক্ষর বা হুমকির অভিযোগ সম্পূর্ণ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিবাদীপক্ষের বক্তব্য—”আমরা আইনি লড়াই লড়ছি। মানববন্ধনের নামে আদালত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে।”
যদুনন্দী ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য সিদ্দিক মাতুব্বর বলেন, জামুর আদি বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার ননখীর গ্রামে। তবে ১৯৬৫ সালে ফরিদপুরের সালথার কুমারকান্দা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন জামুর পরিবার। জামু এখানে আসার পর থেকে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সে ২০২১ সালের ৫ এপ্রিল রাতে সালথা উপজেলা কার্যালয় ও থানায় আগুন দেওয়ার আলোচিত সহিংসতার ঘটনার মামলার ৮২ নম্বর আসামি ছিলেন।
সিদ্দিক মাতুব্বর বলেন, আ.লীগের সময় জামুর বাড়ি অন্তত ৬ মাস নৌকা প্রতীক ঝুলিয়ে রাখা হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হঠাৎ করে সে বিএনপির সমার্থক হয়ে গিয়েছিল। অপরাধীরা বিভিন্ন দল পরিবর্তন করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যায়। জামুও এর ব্যতিক্রম ছিলোনা।
এলাকাবাসীর দাবি, জামু হত্যার পর কুমারকান্দা গ্রামের কারো বাড়ির ছাগল, গরু,আম, কাঠাল, ধান-পাট সহ কোনোকিছু নেওয়া কিংবা কাজে বাধা দেওয়ার বাকি রাখেনি জামুর পরিবার। মানুষকে মামলার ভয় দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন লাখ লাখ টাকা। তবে, এ ব্যাপারে থানায় একাধিক অভিযোগ দিলেও তার কোনো বিচার হয়নি। জামু হত্যা ও জামুর স্ত্রীর কোলের শিশুকে পুঁজি করে এখন নিরীহ মানুষকে ফাঁসানো হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ—জামু ফকিরের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী ও মামলার সাথে সংশ্লিষ্টরা সাধারণ মানুষকে আসামি করার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি করছে। টাকা না দিলে মামলার অজ্ঞাতনামা আসামিতে নাম জুড়ে দেওয়ার হুমকিতে দিশেহারা অনেক নির্দোষ গ্রামবাসী। মানববন্ধনের মাধ্যমে মূলত সেই চাঁদাবাজি ঢাকতে ও আইনি তদন্ত অন্যদিকে মোড় ঘুরাতে ‘সহানুভূতি কার্ড’ খেলা হচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নিহত জামু ফকিরের স্ত্রী রুপা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমার পাঁচ দিনের বাচ্চা রেখে যারা আমার স্বামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সালথা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) ইন্দ্রজিৎ রায় বলেন, ‘এ মামলায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং বাকিরা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছিল। ওই মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে আদালতে আরও ৯ জন জামিন চেয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ৭ জনকে জামিন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং দুইজনকে জামিন দিয়েছে আদালত। এছাড়া বাকি ৫ জন পুনরায় উচ্চ আদালত থেকে ৬ সপ্তাহের জামিন নিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, “অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ যাই থাক, পুলিশের তদন্ত নিরপেক্ষভাবেই চলছে। তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই চার্জশিট দাখিল করা হবে। বিজ্ঞ আদালতের আদেশ মেনেই জামিন প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়।”
ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা-সালথা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদ ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে বলেন, ‘মামলাটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। নিরীহ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হয় সেটাও দেখা হচ্ছে। জামু হত্যার সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করতে মাঠে তৎপর রয়েছে পুলিশ। কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবেনা।’
আপনার মতামত লিখুন
Array