খুঁজুন
বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ২৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসা স্থগিত: কোন কোন সংকটে পড়তে পারেন বাংলাদেশিরা

মরিয়ম সুলতানা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসা স্থগিত: কোন কোন সংকটে পড়তে পারেন বাংলাদেশিরা

তিন বছর, কেউ কেউ তারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় ছিলেন – কবে পরিবারের সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকা যাবে। কিন্তু বাংলাদেশিদের জন্য আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ভিসা কার্যক্রম স্থগিত থাকায় সেই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে থাকা অনেক বাংলাদেশি বলছেন, তাদের নানা পরিকল্পনা আপাতত থমকে গেছে। কবে নাগাদ ভিসা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট সময়সীমা না থাকায় তাদের চাপ ও উৎকণ্ঠা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

তেমনই একজন হলেন বাকের মজুমদার (আমরা তার নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রতিবেদনে ছদ্মনাম ব্যবহার করছি) যিনি তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন।

তিনি জানিয়েছেন, ১৯৯৩ সালে তিনি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।

তার ভাষ্যমতে, শুরুতে তিনি পেশাগত কাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরের বছরই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম, তথা রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এটি পেতে তার আরও বছরখানেক লেগে যায়। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার অনুমতি পেয়ে যান।

এরপর কেটে যায় আরও এক দশক। ২০০৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট কার্ড বা ‘গ্রিন কার্ড’ পান এবং দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাবার অসুস্থতার কারণে বাংলাদেশে আসেন।

পরবর্তীতে তিনি নাগরিকত্বের জন্যও আবেদন করেন এবং ২০১২ সালে সেটি পেয়েও যান।

বর্তমানে তিনি স্ত্রী-সন্তানসহ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং সেখানে কাজ করছেন।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ‘গ্রিন কার্ড ও সিটিজেনশিপ পুনর্মূল্যায়ন’ করার অবস্থান থেকে শুরু করে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের সিদ্ধান্তে অন্য অনেক প্রবাসীর মতো তিনি নিজেও কিছুটা চিন্তিত। কারণ এই তালিকায় বাংলাদেশের নামও রয়েছে।

‘নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা পায় না’

মি. মজুমদার জানান, বাংলাদেশ থেকে অনেকেই অবৈধ পন্থায় মার্কিন আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। মূলত, তাদের কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন-পুরাতন সবার গ্রিন কার্ড ও সিটিজেনশিপ রিভিউ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

“তাই, কনসার্নটা এখানেই যে আমি যতই বৈধ হই, এর একটা সাইকোলজিক্যাল ইম্প্যাক্ট আছে। কারণ নগর পুড়লে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। আগুনের তাপটা তো আমাদেরও লাগে। সেজন্যই, আমার মতো যারা শুরুতে অ্যাসাইলাম সিক করেছেন, এই ঘটনায় তারাও এখন কনসার্ন,” বলেন তিনি।

উল্লেখ্য, গত বছরের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে দুইজন ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে গুলি করার ঘটনার পর ট্রাম্প প্রশাসন সব ধরনের আশ্রয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত স্থগিত করে।

ওই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরেই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে “তৃতীয় বিশ্বের দেশ” থেকে অভিবাসন “স্থায়ীভাবে স্থগিত” করবেন।

ট্রাম্পের সেই ঘোষণার দেড় মাস পেরোতেই গতকাল ট্রাম্প প্রশাসন আগামী ২১শে জানুয়ারি থেকে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের ঘোষণা দেয় এবং কবে নাগাদ এসব দেশের মানুষ মার্কিন অভিবাসন ভিসা পাবে, সেটাও জানানো হয়নি।

মার্কিন প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের ফলে গ্রিনকার্ডধারী থেকে শুরু করে সিটিজেনশিপ প্রাপ্ত, এমনকি ঘুরতে বা ভিসার মেয়াদ বাড়াতে যারা বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন, তারাও অনেকেই এখন দ্বিধা-উৎকণ্ঠার মাঝে রয়েছেন।

তেমনই একজন হলেন, রেহনুমা রহমান; তার ক্ষেত্রেও আমরা ছদ্মনাম ব্যবহার করছি।

তিনি কয়েক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং পড়াশোনা চলা অবস্থায়ই সহপাঠী, যিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক, তাকে বিয়ে করেন।

মিজ রহমান আশা করছিলেন, এ বছরের শেষ নাগাদ তার গ্রিন কার্ড হয়ে যাবে এবং এরপর তারা সবাই বাংলাদেশে ফিরবেন ও এখানে বিয়ের পরের অনুষ্ঠান করবেন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ভিসা স্থগিতের এই ঘোষণায় তিনিও কিছুটা মুষড়ে পড়েছেন।

গ্রিন কার্ডধারীদের সম্পর্কে মি. মজুমদারও বলছিলেন, “ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিতের এই ঘোষণার ফলে গ্রিন কার্ডধারীরাও এখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশে যেতে পারবেন না”।

যে কারণে এই সিদ্ধান্ত ও প্রবাসীদের শঙ্কা

বাংলাদেশসহ যে ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসন ভিসা স্থগিত করছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, তার পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, অভিবাসন আইনের ‘পাবলিক চার্জ’ নীতির আওতায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে যাদের যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের অভিবাসন ঠেকানোর উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রধান উপ-মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, “স্টেট ডিপার্টমেন্ট তার দীর্ঘদিনের ক্ষমতা ব্যবহার করে এমন সম্ভাব্য অভিবাসীদের অযোগ্য ঘোষণা করবে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরকারি সহায়তার বোঝা হয়ে দাঁড়াবে এবং মার্কিন জনগণের উদারতার অপব্যবহার করবে”।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর নেতৃত্বাধীন বিভাগটি তাদের প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের সময় ভিসা প্রক্রিয়াকরণ স্থগিত রাখবে, যাতে “এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ রোধ করা যায়, যারা কল্যাণভাতা ও সরকারি সুবিধা গ্রহণ করবে,” যোগ করেন পিগট।

মার্কিন সরকারের এই সিদ্ধান্তের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অবৈধ পথগুলোর পাশাপাশি বৈধ পথগুলো আরও বেশি সীমিত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন এই সিদ্ধান্তে সবারই ‘ফ্যামিলি প্রায়োরিটিজ’ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

“গ্রিন কার্ড হোক বা সিটিজেনশিপ হোক, সবার ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য। ধরা যাক, কারও বাবা-মা, ভাই-বোন অসুস্থ থাকলেও তাদের এখন ভিসা দেবে না। কারণ স্পন্সরশিপে এসে বেশিরভাগ মানুষই সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে,” বিবিসিকে বলছিলেন মি. মজুমদার।

তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্ধৃত করে বলেন, বাংলাদেশের ৫৪ শতাংশ লোকই এই সুবিধা নেয়।

অর্থাৎ, তারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর জনকল্যাণমূলক সহায়তা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

“আয় কম থাকলে তারা একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পাবলিক সুবিধা পায়। কিছু নিয়ম মানলে বয়স্করাও এই সুবিধা নিতে পারে। কিন্তু অনেকে অপ্রয়োজনেও বা তথ্য লুকিয়ে এই সুবিধা নিচ্ছে এবং একইসাথে বাংলাদেশেও টাকা পাঠাচ্ছে। তখন প্রশ্ন উঠবে যে আপনি পর্যাপ্ত আয় করেন না, পাবলিক বেনিফিটস নিচ্ছেন, আবার টাকাও পাঠাচ্ছেন, কীভাবে?” যোগ করেন তিনি।

তার মতে, এখন এই ধরনের হিসাবনিকাশ করা শুরু করবে মার্কিন প্রশাসন এবং এতে করে যারা এতদিন স্পন্সরশিপ দেখিয়ে পরিবার-পরিজনকে যুক্তরাষ্ট্রে এনেছে, তারাও বিপদে পড়বে।

“যারা সাপোর্ট দিয়েছে এর আগে, তারা এখন ধরে পড়বে যে তুমি বলেছিলে যে তার ভরনপোষণ তুমি করবে, কিন্তু সে তো সরকারি সুবিধা নিচ্ছে। অর্থাৎ, এখন তোমাকে সমস্ত ডিউ পে করতে হবে। ধরুন, আমি আমার আত্মীয়কে এনেছি। তারা পাবলিক সুবিধা নিচ্ছে। এই বারডেন আসবে আমার ওপর। সুতরাং, এখন নতুন যারাই আসবে, আপনার যদি যথেষ্ট সামর্থ্য না থাকে, তাহলে আপনাকে ভিসা দেবে না। আর সরকারি সুবিধা দিলেও তাতে এমন কিছু শর্ত দেবে, এমন এত বছরের জন্য বা সারাজীবনের জন্য অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেওয়া যাবে না।”

বছরের পর বছর ধরে অবৈধভাবে সুবিধা গ্রহণকারীদের জন্য “যারা সুবিধা ডিজার্ভ করে, তারাও চিন্তিত হয়ে পড়ছে। কারণ উনাদের কারণে তাদেরটাও রিভিউ করা হচ্ছে,” যোগ করেন তিনি।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করতে যাওয়া অনেকে বলছেন, পড়াশোনা শেষ করার পর মার্কিন প্রশাসন তাদেরকে যে এক থেকে তিন বছরের জন্য চাকরি খোঁজার জন্য সময় দেয়, এটিও এখন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা যখন স্ট্যাটাস পরিবর্তন করতে যাবেন, তখন তারা সমস্যার মাঝে পড়বেন।

এছাড়া, শিক্ষার্থীদের স্পন্সরশিপে কড়াকড়ি আরোপ হলেও ভিসা জটিলতা বাড়বে।

যেসব ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম

মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে, যেসব দেশের নাম তালিকায় আছে সেগুলোর নাগরিকরা অভিবাসী ভিসার আবেদন জমা দিতে এবং সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আবেদনকারীদের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য সময়সূচিও নির্ধারণ করবে।

তবে এই বিরতির সময়কালে এই নাগরিকদের কোনো অভিবাসী ভিসা জারি করা হবে না।

তালিকাভুক্ত নয় এমন কোনো দেশের বৈধ পাসপোর্টসহ আবেদনকারী দ্বৈত নাগরিকরা এই বিরতির আওতা থেকে মুক্ত থাকবেন।

এই নির্দেশনার অংশ হিসাবে কোনো অভিবাসী ভিসা বাতিল করা হয়নি বলেও জানায় স্টেট ডিপার্টমেন্ট।

এছাড়া, পর্যটন, ব্যবসায়িক ভ্রমণ ও শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া ‘অ-অভিবাসী’ (নন-ইমিগ্রেন্ট) ভিসাগুলো এই স্থগিতাদেশের বাইরে থাকবে।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত দেশটিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সমস্যা নেই। কিন্তু কেউ যদি পড়াশুনা করতে গিয়ে তা ছেড়ে ভুল তথ্য দিয়ে চাকরি করে বা আর্থিক অনিয়ম করে, তখন তারাও জটিলতায় পড়বে বলে জানিয়েছে অভিবাসী বাঙালি এবং শিক্ষার্থীরা।

উল্লেখ্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর থেকে অবৈধ অভিবাসনের পাশাপাশি বৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্র এক লাখের বেশি ভিসা বাতিল করেছে। পাশাপাশি, গত সেপ্টেম্বরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দক্ষ বিদেশি কর্মী হিসেবে বা এইচ-ওয়ানবি ভিসা প্রোগ্রামে যুক্তরাষ্ট্র যেতে আবেদনকারীদের বাড়তি এক লাখ ডলার গুণতে হচ্ছে।

এমনকি, গত জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই অবৈধভাবে বসবাস করা পিতামাতার সন্তানদের জন্য জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সুবিধা বন্ধ করে আদেশ জারি করেছিলেন তিনি।

যেসব দেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা

যে ৭৫টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ ছাড়াও পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল ও ভুটানও রয়েছে।

আরো রয়েছে – আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামা, বার্বাডোস, বেলারুশ, বেলিজ, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, ব্রাজিল, বার্মা, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, আইভরি কোস্ট, কিউবা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিকা, মিশর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রেনাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজ প্রজাতন্ত্র, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, মরক্কো, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, উত্তর ম্যাসেডোনিয়া।

কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

সালথায় রক্তপাতের পথ ছেড়ে শান্তির পথে, অস্ত্র জমাদানকারীদের ফুল দিল প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও সালথা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৯:১৩ অপরাহ্ণ
সালথায় রক্তপাতের পথ ছেড়ে শান্তির পথে, অস্ত্র জমাদানকারীদের ফুল দিল প্রশাসন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নে শান্তি, সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও সহিংসতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের প্রত্যয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় তাদের কাছে থাকা দেশীয় অস্ত্র প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছেন।

বুধবার (১০ জুন) বিকেলে মাঝারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দেশীয় অস্ত্র জমা দেন। পরে অস্ত্র হস্তান্তরকারীদের ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনা জানিয়ে মানবিক ও ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে প্রশাসন।

অনুষ্ঠানে অস্ত্র জমাদানকারীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাদের ইতিবাচক ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানানো হয়। উপস্থিত বক্তারা বলেন, ভয়ভীতি বা শাস্তির পরিবর্তে সম্মান ও সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মানুষকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল করে তোলা সম্ভব। এই উদ্যোগ সেই বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রতিফলন।

সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) ফাতেমা ইসলাম।

বিশেষ অতিথি ছিলেন সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন, সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহম্মদ আল ফাহাদ, পুলিশ পরিদর্শক ইন্দ্রজিৎ মল্লিক এবং সালথা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম।

এছাড়া মাঝারদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আফসার মাতুব্বর, সাবেক চেয়ারম্যান শাহিদুজ্জামান শাহিদ, সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি আ. রাজ্জাক মোল্লা, মাঝারদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবি, সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম মাতুব্বর, যুবদল নেতা ইমরান হোসেন, সজিব মাতুব্বরসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফাতেমা ইসলাম বলেন, “শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনে জনগণের অংশগ্রহণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যারা স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন, তারা সমাজের জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।”

বক্তারা আরও বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার সমাজে সহিংসতা, অপরাধ ও অস্থিরতা বাড়ায়। তাই অস্ত্রমুক্ত ও নিরাপদ সমাজ গঠনে প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। স্বেচ্ছায় অস্ত্র জমা দেওয়ার এই উদ্যোগ অন্যদের জন্যও অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে থাকবে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক স্বীকৃতি মানুষের আচরণ পরিবর্তনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অস্ত্র জমাদানকারীদের সম্মান জানানোর মাধ্যমে প্রশাসন একটি ইতিবাচক, মানবিক ও দূরদর্শী বার্তা দিয়েছে, যা এলাকায় শান্তির পরিবেশ আরও সুদৃঢ় করবে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও অপরাধমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করে উপস্থিত সবাই ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনসম্পৃক্ত ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। মাঝারদিয়া ইউনিয়নের এই ব্যতিক্রমী আয়োজন ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আলফাডাঙ্গায় টিটা বাঁওড়ে ৬৮০ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত, বাড়বে দেশীয় মাছের উৎপাদন

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৭:৪০ অপরাহ্ণ
আলফাডাঙ্গায় টিটা বাঁওড়ে ৬৮০ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত, বাড়বে দেশীয় মাছের উৎপাদন

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলার টিটা বাঁওড়ে দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্যে ৬৮০ কেজি মাছের পোনা অবমুক্ত করা হয়েছে।

বুধবার (১০ জুন) সকাল ১১টার দিকে উপজেলা মৎস্য দপ্তরের আয়োজনে এবং ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর অর্থায়নে পাবদা, গুলশা, টেংরা ও শিং জাতের মাছের পোনা টিটা বাঁওড়ে অবমুক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আলফাডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত নূর মৌসুমি। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রকল্পের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ফারুক ময়েদুজ্জামান।

এসময় বক্তারা বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছ বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নানা কারণে এসব মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরকার বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিয়েছে। টিটা বাঁওড়ে মাছের পোনা অবমুক্তকরণের ফলে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় জেলেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ বসু, টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মিয়া আসাদুজ্জামান, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান আব্বাস, জামায়াতে ইসলামী আলফাডাঙ্গা উপজেলা শাখার সেক্রেটারি এস. এম. হাফিজুর রহমান, উপজেলা চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাওলানা এস. এম. রিদওয়ানুন্নবী, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম দাউদ, উপজেলা মৎস্য অফিসের সহকারী রিফাত মিয়াসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তরুণ বসু জানান, দেশীয় মাছের প্রজাতি রক্ষা ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিয়মিতভাবে এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জলাশয়ের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

ফরিদপুরে পদ্মায় স্পিডবোট থামিয়ে দুঃসাহসিক ডাকাতি, যাত্রীকে কুপিয়ে ইঞ্জিন লুট

মো. মোস্তাফিজুর রহমান শিমুল, চরভদ্রাসন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৭:২১ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে পদ্মায় স্পিডবোট থামিয়ে দুঃসাহসিক ডাকাতি, যাত্রীকে কুপিয়ে ইঞ্জিন লুট

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার পদ্মা নদীতে যাত্রীবাহী একটি স্পিডবোটে দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ডাকাতরা এক যাত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে তার কাছে থাকা নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন এবং স্পিডবোটের ইঞ্জিন লুট করে নিয়ে যায়। নদীপথে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে এ ঘটনা।

মঙ্গলবার (৯ জুন) সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার চর ঝাউকান্দা ইউনিয়নের পদ্মা নদীর বালুরটেক এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

ঘটনার পর খবর পেয়ে চরভদ্রাসন থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে নদীর মাঝের একটি চরসংলগ্ন এলাকা থেকে ইঞ্জিনবিহীন স্পিডবোট ও এর চালককে উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া চালক সঞ্জিব (২২) সদর ইউনিয়নের খালাশিডাঙ্গী গ্রামের অভিমান্যুর ছেলে।

স্পিডবোট চালক সঞ্জিব জানান, সন্ধ্যার আগে তিনি গোপালপুর ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে দোহার উপজেলার মৈনট ঘাটে যান। পরে একজন যাত্রী নিয়ে ফের গোপালপুর ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর পদ্মার বালুরটেক এলাকায় মাওয়ার দিক থেকে আসা ১০ থেকে ১৫ জন লোক বহনকারী একটি বড় স্পিডবোট তাদের ধাওয়া করে।

পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে তিনি দ্রুত একটি চরে স্পিডবোট ভিড়িয়ে যাত্রীকে রেখে নিজের প্রাণ রক্ষার্থে চরের ভেতরে আশ্রয় নেন। পরে ডাকাতরা স্পিডবোটটি দখলে নিয়ে যাত্রীর ওপর হামলা চালায়।

আহত যাত্রী মো. লিটন (৩৫) জানান, বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ঢাকায় প্রয়োজনীয় কাজ শেষে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় গোপালপুর ঘাট থেকে একটি ফিরতি স্পিডবোটে ওঠেন। কিছুদূর যাওয়ার পর একটি স্পিডবোট তাদের ধাওয়া করে। চালক নেমে যাওয়ার পর ডাকাতরা তাকে ঘিরে ফেলে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে।

তিনি আরও জানান, ডাকাতরা তার কাছে থাকা নগদ ১২ হাজার টাকা, একটি মোবাইল ফোন এবং স্পিডবোটের প্রায় ৪ লাখ টাকা মূল্যের ইঞ্জিন খুলে নিয়ে যায়। হামলায় তার বাম হাতের কনুইয়ের ওপর গুরুতর জখম হয়। পরে ডাকাতদের অনুরোধ করলে তারা তাকে একটি জেলে নৌকায় তুলে দেয়। সেখান থেকে তিনি মৈনট ঘাটে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন এবং দোহার নৌ পুলিশ ফাঁড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

তবে এ ঘটনায় তিনি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানান।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, “সন্ধ্যার পর পদ্মা নদীতে ডাকাতির খবর পেয়ে দ্রুত পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পরে নদীর মাঝের একটি চরসংলগ্ন এলাকা থেকে ইঞ্জিনবিহীন স্পিডবোট ও চালককে উদ্ধার করা হয়েছে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নৌ পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।”

ফরিদপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক নাসিম আহাম্মেদ জানান, খবর পেয়ে রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।