খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ও বেশি ভোট পড়েছে যে নির্বাচনগুলোতে?

মরিয়ম সুলতানা
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৬, ৮:০৫ পূর্বাহ্ণ
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ও বেশি ভোট পড়েছে যে নির্বাচনগুলোতে?

নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিকে শুধু সংখ্যার একটি হিসাব নয়, বরং দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা, তাদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন বলেও মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১২টি সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে কখনো দেখা গেছে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার উপস্থিতি, আবার কখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কম।

এসব নির্বাচনের কোনোটিকে তুলনামূলকভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন বলা হয়। আবার ইতিহাসে কোনো কোনোটিকে চিহ্নিত করা হয় একতরফা ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতি বেশিরভাগ সময়ই অস্থিতিশীল থাকলেও এই সময়ে মোট পাঁচটি নির্বাচন হয়। এর মাঝে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে তকমা পেয়েছে কেবল একটি।

এরপরে ১৯৯৬ থেকে ২০২৪ সালের মাঝে বাংলাদেশে আরও সাতটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেগুলোর মাঝে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে গণ্য করা হয় তিনটিকে।

এদিকে, চলতি বছরের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ত্রয়োদশ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

এই প্রতিবেদনে ১৯৭৩ থেকে সর্বশেষ ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন চিত্র এবং তার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলেন, শুধু ভোটার সংখ্যা দিয়ে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারিত হয় না।

আওয়ামী লীগ আমলের বিতর্কিত তিন নির্বাচন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৪)

বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচন ছিল ২০২৪ সালের সাতই জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘স্বল্প ভোটের নির্বাচন’ খ্যাত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

অনিয়মের অভিযোগে তখন নয়টি আসনের ২১ কেন্দ্রের ভোট স্থগিত করা হয়েছিলো। আর, আওয়ামী লীগের একজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছিলো নির্বাচন কমিশন।

অবশিষ্ট ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২৩টি আসন পেয়ে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয় পায়।

দ্বাদশ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১১ কোটি ৯৫ লাখ এক হাজার ৫৮৫ জন। তাদের মধ্যে চার কোটি ৯৯ লাখ ৫৫ হাজার ৪৪৫ জন ভোট দিয়েছেন বলে জানিয়েছিলো নির্বাচন কমিশন।

তবে এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে।

কারণ, নির্বাচনের দিন বেলা ৩টা পর্যন্ত সারা দেশে ২৭ দশমিক ১৫ শতাংশ ভোট পড়ার তথ্য দিয়েছিলো নির্বাচন কমিশন। পরে বিকাল ৫টায় তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, ৪১ দশমিক আট শতাংশ ভোট পড়েছে।

পরিসংখ্যান নিয়ে যাদের সন্দেহ আছে, তাদের উদ্দেশ্যে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল তখন বলেছিলেন, “যদি মনে করেন এটাকে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, তাহলে সেটাকে চ্যালেঞ্জ করে…আমাদের অসততা – যদি মনে করেন – সেটা পরীক্ষা করে… দেখতে পারেন”।

ওই নির্বাচনে ৪৪টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে অংশ নিয়েছিলো আওয়ামী লীগসহ ২৮টি রাজনৈতিক দল। বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত দল এই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিলো।

বিএনপি তখন ওই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ বলে দাবি করেছিলো। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মঈন খান বলেছিলেন, “সরকার ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।”

সেবার বড় সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে না আসায় দুঃখ বা হতাশা প্রকাশ করে নির্বাচনে হওয়া অনিয়মগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছিলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন

উল্লেখ্য, এই নির্বাচনকে ‘ডামি’ প্রার্থীর নির্বাচন হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়। বলা হয়ে থাকে, এই নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখানোর জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই প্রার্থী হন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৮)

২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বিএনপিসহ মোট ৩৯টি দল অংশ নিলেও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে এই নির্বাচন তখন বিতর্কিত হয়ে পড়ে।

‘রাতের ভোট’ আখ্যা পাওয়া সেই সংসদ নির্বাচনে ভোটের আগের রাতেই অর্থাৎ, ২৯শে ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকেই খবর আসতে থাকে, সারাদেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখলে নিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। ভোটের দিন ৩০শে ডিসেম্বর সকালে অনেক স্থানে গিয়ে এসব অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছিলেন বিবিসি বাংলার সংবাদদাতারা।

ওই নির্বাচনের খবর প্রচারে আগে থেকেই দেশের গণমাধ্যমগুলোকে নানা বিধিনিষেধ দেওয়া হয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। যে কারণে নানা অনিয়ম, কারচুপি বা জালিয়াতির খবর পেয়েও তা প্রচার করতে পারেনি বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো।

অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন বলা হলেও এর ফলাফল ছিল একতরফা। নির্বাচনে ২৯৯ আসনের মাঝে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছিলো ২৮৮টি আসন। অপরদিকে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট পায় মাত্র সাতটি। বাকি তিনটি আসন পায় অন্যান্যরা।

বাংলাদেশের একটি এনজিও সুশাসনের জন্য নাগরিক – সুজনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচন শুধু অংশগ্রহণমূলকই ছিল না, বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রার্থীও ছিল এই নির্বাচনে। এছাড়া, ভোট পড়ার হার বিবেচনায়ও এই নির্বাচন রেকর্ড গড়েছিলো।

সুজনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ১০ কোটি ৪১ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৯ জন। ভোট দিয়েছেন আট কোটি ৩৫ লাখ ৩২ হাজার ৯১১ জন। শতকরা হারে যা ৮০ দশমিক ২০ শতাংশ।

নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ছিল মোট ৪০ হাজার ১৫৫টি। এর মাঝে ১০৩টি সংসদীয় আসনের ২১৩টি কেন্দ্রে ভোট পড়ার হার ছিল শতভাগ।

পরিসংখ্যান বলছে, ভোট পড়ার দিক থেকে ১৯৯১ সালের পর অনুষ্ঠিত ছয়টি (১৯৯৬ সালের নির্বাচন বাদে) নির্বাচনের মাঝে এটিতেই সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোট পড়েছিলো।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪)

এটি ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে হওয়া প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

সে সময় নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ছিল ৪০টি। এর মধ্যে মাত্র ১২টি দল ভোটে পাঁচই জানুয়ারির সেই ‘একতরফা’ নির্বাচনে অংশ নেয়।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে আওয়ামী লীগ। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে।

নির্বাচন বয়কটের প্রেক্ষাপটে অর্ধেকের বেশি আসনে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি।

বিরোধী দলবিহীন ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৫৪ জন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিল। নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৪৭টি আসনে এবং নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, তাতে ভোট পড়েছিলো এক কোটি ৭১ লাখ ২৯ হাজার।

ওই নির্বাচনে ভোটার ছিল নয় কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৬৭ জন। আর ১৪৭টি নির্বাচনি এলাকায় ভোট পড়ার হার ছিল ৪০ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।

এদিকে, সুজনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্স বা ফেমা এবং হিউম্যান রাইটস কমিশনের মতে ওই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ১০ শতাংশের মতো। যদিও নির্বাচন কমিশন এই দাবি নাকচ করেছিলো।

১৯৯১ থেকে ২০০৮, ‘গ্রহণযোগ্য’ চার নির্বাচন

বলা হয়ে থাকে, এ যাবৎকালে বাংলাদেশে যতগুলো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, তার মাঝে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য ছিল ১৯৯১, ১৯৯৬ (দ্বিতীয়), ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন।

তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলী মনে করেন, ‘গ্রহণযোগ্য’ কথাটি আপেক্ষিক।

“কারণ ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সবাই ভালো নির্বাচন বললেও বিএনপি বলে যে এখানে কারচুপি হয়েছে। আবার ২০০১ এর নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রশ্ন আছে।”

২০০৮: ‘সুষ্ঠু’ নির্বাচন ও আ’লীগের ফিরে আসা

২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। এতে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ নিবন্ধিত ৩৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়।

কিন্তু ভোটে আওয়ামী লীগ এককভাবে জয় লাভ করে ২৩০টি আসনে। জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য জোট শরিকসহ তাদের সর্বমোট আসন দাঁড়ায় ২৬২টি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হওয়া ২০০৮ সালের নির্বাচনটি ছিল সর্বশেষ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

সেবার ভোটার ছিল আট কোটি ৮৭ হাজার তিন জন। ভোট পড়ে ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

২০০১: বিএনপি’র সর্বশেষ জয়

২০০১ সালের পহেলা অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবার ৫৪টি দলের অংশগ্রহণে দেশজুড়ে ৩০০ আসনে ভোটগ্রহণ হয়।

সেই নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল সাত কোটি ৪৯ লাখ ৪৬ হাজার ৩৬৪ জন। দেশের ২৯ হাজার ৯৭৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছিলো। দলটি ২০০৬ সালের ২৭শে অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল।

এরপর সংঘাতময় এক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। দেশে জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় সেনাসমর্থিত একটি নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার।

এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৯৬: একই বছরে দুই নির্বাচন

ওই বছর দুইবার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সপ্তম সংসদ নির্বাচন বেশিরভাগ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য বলেই বিবেচিত।

তবে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় অধিকাংশ বিরোধী দল সেটি বয়কট করে। কারণ তারা নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চাইছিলো।

কিন্তু সেই দাবি উপেক্ষা করে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হয় এবং ২৭৮টি আসনে জিতে সরকার গঠন করে বিএনপি। যদিও সেই সংসদ মাত্র ১২দিন স্থায়ী ছিল।

সেবার মোট ভোটার ছিল পাঁচ কোটি ৬১ লাখ ৪৯ হাজার ১৮২ জন। দেশজুড়ে থাকা ২১ হাজার ১০৬টি ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়ে ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

পরে আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাশ করে। সেই সরকারের প্রধান দায়িত্ব ছিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা।

পরে মাত্র চার মাসের কম সময়ের মধ্যে ওই বছরের ১২ই জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে সর্বমোট ৮১টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছিলো।

বলা হয়, আসন সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে জোরালো লড়াই হয়েছিলো ওই নির্বাচনে। নির্বাচনে অন্তত ৮২টি দলের ৫৮৬ জন ও স্বতন্ত্র ২৮৪ জন প্রার্থীসহ ৮৭০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ১৪৬টি আসন এবং বিএনপি ১১৬টি আসন। জাতীয় পার্টি সেবার ৩২টি আসনে জয় লাভ করেছিলো।

সরকার গঠন করার জন্য কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়ে ২১ বছর পরে ক্ষমতার মঞ্চে ফিরে আসে আওয়ামী লীগ।

ওই নির্বাচনে পাঁচ কোটি ৬৭ লাখ ১৬ হাজার ৯৩৫ জন ভোটার। সারাদেশে কেন্দ্র ছিল ২৫ হাজার ৯৫২টি। ভোট পড়ার হার ছিল ৭৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

১৯৯১: বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন ছিল সেটি। যদিও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন সংবিধানের অংশ ছিল না, কিন্তু সবগুলো রাজনৈতিক দলের সম্মতির ভিত্তিতে সেটি করা হয়েছিল।

১৯৯১ সালে নির্বাচনের আগে প্রচারের সময় দুই প্রধান রাজনৈতিক দল পরস্পরের প্রতি খুব বেশি আক্রমণাত্মক ছিল না। তৎকালীন সংবাদপত্র পর্যালোচনা করে এ ধারণা পাওয়া যায়।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দলীয় জোট এবং বামপন্থি পাঁচ দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ নেয়। তারা এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয় ছিল।

১৯৯১ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঠিক হয়।

নির্বাচনের আগের দিন রেডিও-টিভিতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবউদ্দিন আহমদ বলেন, এবারের নির্বাচন নিরপেক্ষ হতে বাধ্য।

নির্বাচনের দিন বিপুল সংখ্যক মানুষ ভোটকেন্দ্রে হাজির হন। প্রায় সাড়ে ছয় কোটি ভোটারের মধ্যে ৫৫ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়ে। নির্বাচনে কোথাও কোনো ধরনের সহিংসতা দেখা যায়নি।

সেই নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসনে জিতে জামায়াতে ইসলামী’র সাথে জোট বেঁধে সরকার গঠন করে। তখন আওয়ামী লীগ পেয়েছিলো ৮৮টি আসন, জাতীয় পার্টি ৩৫টি।

আর এই জয়ের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

ফিরে দেখা প্রথম চার নির্বাচন

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন: এরশাদের পতন

বাংলাদেশের চতুর্থ সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তেসরা মার্চ ১৯৮৮ সালে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে বিএনপি, অধিকাংশ বড় দলই ওই নির্বাচন বর্জন করেছিলো। মাত্র ৯টি দল এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলো।

নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর ভোটার ছিল প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি সংখ্যক।

সেই নির্বাচনে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি জয় লাভ করে। কিন্তু মাত্র দুই বছর সাত মাসের মাথায় চতুর্থ সংসদ ভেঙে পড়ে।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বামপন্থি দলগুলোর, অর্থাৎ জোটের গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ছয়ই ডিসেম্বর ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

সেজন্যই ওই দিনটিকে আওয়ামী লীগ ‘গণতন্ত্র মুক্তি দিবস’, বিএনপি ‘গণতন্ত্র দিবস’ এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি ‘সংবিধান সংরক্ষণ দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে ‘স্বৈরাচার পতন দিবস’ হিসেবেও পালন করে থাকে।

তৃতীয় সংসদ নির্বাচন: এরশাদ শাসনামলের শুরু

১৯৮৬ সালের ১০ই জুলাই বাংলাদেশের তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই নির্বাচনের পেছনে লম্বা ইতিহাস আছে। ১৯৮১ সালের ৩০শে মে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হন।

এই ঘটনার এক বছরেরও কম সময়ের মাথায়, ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার।

আব্দুস সাত্তারকে পদত্যাগে বাধ্য করে এরশাদ নিজেই ১৯৮৩ সালে রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন।

এরপর ১৯৮৬ সালের পহেলা জানুয়ারি তিনি ‘জাতীয় পার্টি’ নামে দল প্রতিষ্ঠা করেন এবং ছয় মাসের মাথায় তিনি নির্বাচনের আয়োজন করেন, যাতে জাতীয় পার্টি জয়লাভ করে।

ওই সময় মোট ভোটার ছিল প্রায় চার লাখ ৮০ হাজার এবং ভোট পড়ে ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ। নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলো ২৮টি দল। কিন্তু এই তৃতীয় সংসদ টিকে থাকে মাত্র ১৭ মাস।

দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন: বিএনপি’র জন্ম

১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়েই সংসদীয় রাজনীতিতে একটি নতুন দলের শক্ত অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।

ওই বছরের সাতই নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান হন ও ১৯৭৬ সালের ২৯শে নভেম্বর বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন।

পরে ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরে দাঁড়ালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এরপর ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’ নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা করেন।

এই সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করে এবং ২০৭টি আসনে জয়লাভ করে। তখন বাংলাদেশের মোট ভোটার ছিল তিন কোটি ৮৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬৬৪ জন। আর ভোট পড়েছিলো ৪৯ দশমিক ৬৭ শতাংশ। নির্বাচনে ২৯টি দল অংশ নিয়েছিলো তখন।

প্রথম সংসদ নির্বাচন: শেখ মুজিবকে হত্যা

১৯৭৩ সালের সাতই মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে সাংবিধানিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এই নির্বাচনটি ছিল একটি বড় পদক্ষেপ। ৩০০টি সংসদীয় আসনের জন্য অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে ১৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয় এবং আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

তখন দেশে ভোটার ছিল সাড়ে তিন কোটিরও বেশি এবং তাদের ৫৫ শতাংশ ভোট দিয়েছিলো।

ওই নির্বাচনে কারচুপি ও ব্যালট ছিনতাইয়ের বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও ওই নির্বাচনটির সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।

তবে প্রথম জাতীয় সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র দুই বছর ছয় মাস। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

এর ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ছয়ই নভেম্বর সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়, যার মাধ্যমে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে এক দীর্ঘ বিরতি শুরু হয়।

এখানে উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ পরিচালিত হয়েছিলো অস্থায়ী সরকার দিয়ে এবং নির্বাচনের আগে পর্যন্ত দেশে তখন অস্থায়ী সংসদ ছিল।

১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর শেখ মুজিবুর রহমান পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার গঠন করেন।

ভোটার উপস্থিতিই কি নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বানায়?

নির্বাচন কমিশন ১২টি নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির যে হিসাব প্রকাশ করেছে সে অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেই সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে বলে দেখা যায়।

সেবার পাঁচ কোটি ৬১ লাখের বেশি ভোটারের মধ্যে ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ ভোট পড়ে।

আর সবচেয়ে বেশি, ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। যদিও বাংলাদেশের ইতিহাসের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর মাঝে অন্যতম হলো ওই নির্বাচন।

“তাই, ভোটার উপস্থিতি বেশি হওয়া মানেই এটা না যে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য। আমাদের দেখতে হবে যে উপস্থিতি স্বতঃস্ফূর্ত কি না। যেমন, ২০১৮ সালে ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক। কিন্তু সেই নির্বাচন নিয়ে তো অনেক প্রশ্ন আছে,” বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল আলীম।

তার মতে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও বড় একটা বিষয়।

“আমরা যদি আগে থেকেই জানি যে কে জয়ী হতে যাচ্ছে, তাহলে তো হলো না। আমরা সেই নির্বাচনকে বলি মিনিংলেস (অর্থহীন) নির্বাচন। যেমন, ২০১৪ সালে আমরা জানতাম যে কে জিততে যাচ্ছে। আর, নির্বাচন মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর। সুতরাং, নির্বাচনে দলগুলোর সমান অংশগ্রহণও এখানে জরুরি। অর্থাৎ, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

এসময় তিনি ২০২৪ সালের নির্বাচনকে “বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “ওই নির্বাচনে ডামি প্রার্থী ছিল অনেক। মানে, একই দলের একাধিক প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছিলো। এটা অন্য নির্বাচনের চেয়ে আলাদা। এসব কারণেই ভোটার উপস্থিতি কম ছিল।”

আব্দুল আলীম বলছিলেন, নির্বাচন যখন অংশগ্রহণমূলক হয় না, তখন ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হয় না। পাশাপাশি, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর ভোটারদের আস্থা থাকাও এখানে জরুরি।

এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিনগুলোতে নির্বাচনের মাঠকে শতভাগ সমতল রাখা উচিত। আর কোনো অভিযোগ উঠলে সেটিকে উড়িয়ে না দিয়ে নির্বাচন কমিশনের উচিত সেটিকে যাচাই করে দেখা।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা