খুঁজুন
, ,

ভাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, বিশ্ববিদ্যালয় ও ৬ লেন সড়কের জোরালো দাবি

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ১১:০২ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা, বিশ্ববিদ্যালয় ও ৬ লেন সড়কের জোরালো দাবি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বরিশাল সফরকে কেন্দ্র করে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে ঢাকা-ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়কের ভাঙ্গা গোলচত্বর ও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো মানুষ জড়ো হন।

সকাল ৬টা থেকেই ভাঙ্গা গোলচত্বর থেকে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থান নেন নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। প্রধানমন্ত্রীকে এক নজর দেখতে এবং শুভেচ্ছা জানাতে তাদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা।

সকাল আনুমানিক ৭টা ৫০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর ভাঙ্গা গোলচত্বরে পৌঁছালে রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষ হাত নেড়ে তাকে স্বাগত জানান। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও গাড়ি থেকে হাত নেড়ে উপস্থিত জনতার শুভেচ্ছার জবাব দেন। পুরো এলাকায় ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। সফরকে ঘিরে সকাল থেকেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাগত জানাতে আসা ভাঙ্গা ও সদরপুরের নেতাকর্মীদের মধ্যে আইয়ুব মোল্লা, স্বরন, এম এম সিদ্দিক মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন, একরামুল, মিলন, ফজলে সুবাহান শামিম, তুরান রহমানসহ জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ভাঙ্গার উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরেন। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে—ভাঙ্গায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার ভাঙ্গা ইন্টারচেঞ্জ এলাকায় ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনা রোধে মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করা এবং দুর্ঘটনায় আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক ট্রমা সেন্টার স্থাপন।

ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেন সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রথম ভাঙ্গা হয়ে বরিশাল সফরে গেছেন। তার সফর সফল করতে ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুলের নেতৃত্বে ভাঙ্গার হাজারো নেতাকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হয়েছেন।”

তারা আরও বলেন, “ভাঙ্গাসহ দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে শহিদুল ইসলাম বাবুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবেন। তাই আমরা তাকে মন্ত্রিসভায় দেখতে চাই। পাশাপাশি ভাঙ্গার সার্বিক উন্নয়নে আমাদের উত্থাপিত দাবিগুলো বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”

প্রধানমন্ত্রীর এ সফরকে ঘিরে ভাঙ্গাজুড়ে সকাল থেকে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এ সফরের মাধ্যমে ভাঙ্গা ও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

ফরিদপুরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৩:১৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পাঁচ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ

কঠিন বিষয় সমূহের ফলাফলে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনার দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে  ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।

প্রশ্নপত্রের কঠিনতা কমানো, মানবিকভাবে খাতা মূল্যায়ন, কঠিন বিষয়ে ফলাফলে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বন্যা পরিস্থিতি বিবেচনায় এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে তারা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিও উত্থাপন করেন।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, তাদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। তারা দাবি করেন, বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছে না। এছাড়া চলমান বন্যা পরিস্থিতিতে পরীক্ষা আয়োজন বাস্তবসম্মত নয় বলেও তারা মন্তব্য করেন।

কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন শর্মিষ্ঠা কর্মকার, তাজুল ইসলাম তুহিন, জুনায়েদ আহমেদ, মোহাম্মদ রকিব, সাইমা আক্তার, মেধা আক্তার প্রমুখ।

পরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগান দেন। এতে কিছু সময়ের জন্য প্রেসক্লাবসংলগ্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। কর্মসূচি থেকে বুধবার দুপুর ১টায় একই স্থানে আবারও বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ঘোষণা দেওয়া হয়।

বন্যার পানিতে যে ১০ ভুল কখনো করবেন না?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ
বন্যার পানিতে যে ১০ ভুল কখনো করবেন না?

টানা বর্ষণ, উজানের ঢল কিংবা আকস্মিক বন্যা যেকোনো সময় স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। অনেক সময় বন্যার চেয়ে মানুষের অসতর্কতাই বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, পানিবাহিত রোগ, সাপের কামড় কিংবা দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বহু মানুষ প্রাণ হারান বা আহত হন। তাই বন্যার সময় কিছু ভুল এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি।

বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী, বন্যার পানিতে নিচের ১০টি ভুল কখনোই করা উচিত নয়।

১. অপ্রয়োজনে বন্যার পানিতে নামবেন না

বন্যার পানি দেখতে শান্ত মনে হলেও এর নিচে থাকতে পারে খোলা ম্যানহোল, গর্ত, ভাঙা রাস্তা, ধারালো বস্তু কিংবা বৈদ্যুতিক তার। তাই প্রয়োজন ছাড়া পানিতে নামা ঝুঁকিপূর্ণ। যদি নামতেই হয়, তাহলে লাঠি দিয়ে সামনে পরীক্ষা করে ধীরে ধীরে এগোন এবং সম্ভব হলে শক্ত জুতা বা বুট ব্যবহার করুন।

২. পানিতে দাঁড়িয়ে বৈদ্যুতিক সুইচ বা যন্ত্র স্পর্শ করবেন না

বন্যার সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। পানিতে দাঁড়িয়ে কখনো সুইচ অন বা অফ করবেন না। ভেজা হাতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রও ধরবেন না। সন্দেহ হলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত ঘরে প্রবেশ থেকে বিরত থাকুন।

৩. বন্যার পানি পান বা রান্নায় ব্যবহার করবেন না

বন্যার পানিতে নর্দমার বর্জ্য, ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, রাসায়নিক পদার্থ ও বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবাণু মিশে থাকতে পারে। শুধু ফুটানো, বিশুদ্ধ বা বোতলজাত পানি পান করুন। প্রয়োজনে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট ব্যবহার করুন।

৪. খালি পায়ে পানিতে হাঁটবেন না

অনেকেই খালি পায়ে পানি মাড়িয়ে চলাফেরা করেন। এতে পায়ে কাটা, সংক্রমণ, এমনকি সাপ বা বিষাক্ত প্রাণীর আক্রমণের ঝুঁকি থাকে। রাবারের বুট বা শক্ত স্যান্ডেল ব্যবহার করাই নিরাপদ।

৫. বন্যার পানির সংস্পর্শে আসা খাবার খাবেন না

পানিতে ভিজে যাওয়া বা দূষিত খাবার খেলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ফ্রিজের নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকা খাবারও খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।

৬. শিশুদের একা পানির কাছে যেতে দেবেন না

বন্যার সময় শিশুরা পানিতে খেলতে আগ্রহী হয়। কিন্তু অল্প গভীর পানিতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। শিশুদের সবসময় বড়দের নজরদারিতে রাখুন এবং তাদের বন্যার পানিতে খেলতে নিরুৎসাহিত করুন।

৭. সাপ বা অচেনা প্রাণী দেখলে ধরার চেষ্টা করবেন না

বন্যার সময় সাপ, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণী আশ্রয়ের খোঁজে মানুষের বসতবাড়িতে চলে আসে। সাপ দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন। নিজে ধরতে না গিয়ে স্থানীয় উদ্ধারকর্মী বা বন বিভাগের সহায়তা নিন।

৮. বন্যার পানিতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানোর ঝুঁকি নেবেন না

অনেক সময় পানির গভীরতা বোঝা যায় না। এতে গাড়ি আটকে যেতে পারে বা স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, রাস্তার অবস্থা নিশ্চিত না হলে পানির মধ্যে দিয়ে যানবাহন চালানো উচিত নয়।

৯. প্রশাসনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করবেন না

অনেকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাড়ি ছাড়তে চান না। এতে বিপদের মাত্রা বেড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন, আবহাওয়া অধিদপ্তর বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

১০. পানি নেমে গেলেই ঘরে ঢুকে পড়বেন না

বন্যার পানি সরে গেলেও ঝুঁকি শেষ হয় না। ভেজা বৈদ্যুতিক সংযোগ, দুর্বল দেয়াল, গ্যাস লিক বা বিষাক্ত প্রাণীর উপস্থিতি থাকতে পারে। তাই ঘরে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ পরীক্ষা করিয়ে নিন।

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

বন্যা পুরোপুরি ঠেকানো না গেলেও এর ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একটু সতর্কতা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চললে নিজের পাশাপাশি পরিবারকেও নিরাপদ রাখা যায়।

মনে রাখবেন, বন্যার সময় সাহস দেখানোর চেয়ে সচেতন থাকা বেশি জরুরি। কারণ একটি ছোট ভুলও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।

তথ্যসূত্র: সিডিসি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

ফরিদপুরে নিজস্ব তিনতলা বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শেষ বিদায়ে এলেন না কোনো স্বজন

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৮ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে নিজস্ব তিনতলা বাড়িতে নিঃসঙ্গ মৃত্যু, শেষ বিদায়ে এলেন না কোনো স্বজন

তিনতলা নিজের বাড়ি। নিচতলায় ভাড়াটিয়া, ওপরে একটি ফ্ল্যাটে একা থাকতেন তিনি। একসময় যে ঘরে বাবা-মায়ের স্নেহ, ভাই-বোনের হাসি আর সংসারের কোলাহল ছিল, সেই ঘরই ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল নিঃসঙ্গতার ঠিকানায়। শেষ পর্যন্ত সেই ঘর থেকেই অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলো কোয়েল চৌধুরীকে (৫৪)। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক জানালেন, তিনি আর নেই।

আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, মৃত্যুর খবর বিদেশে থাকা একমাত্র বোন ও আত্মীয়স্বজনকে জানানো হলেও কেউ শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে আসেননি। শেষ বিদায়ের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন প্রতিবেশী আর স্থানীয় মানুষজন। তাঁদের উদ্যোগেই বাবা-মায়ের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন কোয়েল চৌধুরী।

রোববার (১২ জুলাই) সকালে ফরিদপুর শহরের পূর্ব খাবাসপুর এলাকার ‘চৌধুরী ভিলা’য় প্রতিদিনের মতো একজন ভাড়াটিয়া তাঁর জন্য খাবার নিয়ে যান। অনেকক্ষণ ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের খবর দেওয়া হয়। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে।

পুলিশ দরজা ভেঙে কোয়েল চৌধুরীকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে। প্রথমে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতাল, পরে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০০০ সালের দিকে সরকারি চাকরিজীবী দম্পতি হাশমত আলী চৌধুরী ও আছিয়া খানম এই বাড়িটি কিনে বসবাস শুরু করেন। তাঁদের তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র মেয়ে পরবর্তীতে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে—বাবু চৌধুরী ও কোয়েল চৌধুরী—দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।

তবে তাঁদের নিয়ে মানুষের স্মৃতিতে ভয় বা বিরক্তি নয়, বরং রয়েছে মমতার গল্প।

শহরের অনেকেই এখনও মনে করতে পারেন, দুই ভাইকে প্রায় সব সময় একসঙ্গেই দেখা যেত। কখনো পাশাপাশি হাঁটছেন, কখনো একজন আরেকজনের হাত ধরে ধীর পায়ে শহরের রাস্তা পেরিয়ে যাচ্ছেন। যেন বাইরের পৃথিবীতে তাঁদের আর কেউ নেই—দুজনই ছিলেন একে অপরের সবচেয়ে কাছের মানুষ।

প্রায় দেড় বছর আগে বড় ভাই বাবু চৌধুরীর মৃত্যু হলে কোয়েল চৌধুরীর জীবন আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। বিশাল বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে একাই কাটত তাঁর দিন-রাত। নিজের দেখাশোনার মতো ঘনিষ্ঠ কেউ ছিলেন না। ভবনের ভাড়াটিয়ারাই নিয়মিত খাবার দিতেন, প্রতিবেশীরা খোঁজ নিতেন, প্রয়োজন হলে পাশে দাঁড়াতেন।

প্রতিবেশী আশিকুর রহমান খান বলেন, “সকালে ভাড়াটিয়া খাবার দিতে গিয়ে কোনো সাড়া না পেয়ে আমাদের খবর দেয়। আমরা ৯৯৯-এ ফোন করি। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে তাঁকে উদ্ধার করে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।”

তিনি জানান, “কানাডায় থাকা তাঁর একমাত্র বোনকে মৃত্যুর খবর দেওয়া হলে তিনি দাফন করে দিতে বলেন। অন্য আত্মীয়দেরও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কেউ আসেননি। পরে এলাকার মানুষ মিলে আলীপুর কবরস্থানে তাঁর বাবা-মায়ের কবরের পাশেই দাফনের ব্যবস্থা করেন। দাফনের পর দূরসম্পর্কের কয়েকজন আত্মীয় এসেছিলেন।”

এলাকায় একটি প্রচলিত কথা রয়েছে, ছোটবেলায় বাবা-মা কর্মস্থলে যাওয়ার আগে দুই সন্তানকে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতেন, যা তাঁদের মানসিক অবস্থার অবনতির কারণ হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো সরকারি বা চিকিৎসাগত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহামুদুল হাসান বলেন, “৯৯৯-এ ফোন পেয়ে পুলিশ গিয়ে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়।”

কোয়েল চৌধুরীর জীবনের শেষ অধ্যায় যেন নীরবে একটি প্রশ্ন রেখে গেল—রক্তের সম্পর্ক সবসময় কি সবচেয়ে কাছের সম্পর্ক? নাকি মানুষের সবচেয়ে কঠিন সময়ে প্রতিবেশী, ভাড়াটিয়া আর আশপাশের মানুষই হয়ে ওঠেন প্রকৃত আপনজন?

একটি তিনতলা বাড়ি ছিল তাঁর। ছিল স্মৃতিভরা একটি পরিবার। কিন্তু জীবনের শেষ সময়ে ছিল শুধু নিঃসঙ্গতা। আর শেষ বিদায়ে, স্বজনের বদলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলেন প্রতিবেশীরাই।