খুঁজুন
, ,

নগরকান্দায় সাংবাদিকের ওপর হামলা: পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রহস্য, ‘হামলা নাটক’ নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:০৬ অপরাহ্ণ
নগরকান্দায় সাংবাদিকের ওপর হামলা: পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রহস্য, ‘হামলা নাটক’ নিয়ে তোলপাড়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় এক সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হামলার অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং ‘হামলা নাটক’ তৈরির অভিযোগে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললেও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরকান্দা বাজার এলাকায়। হামলার শিকার হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বাবু (৪৯) নিজেকে দৈনিক যুগান্তরের নগরকান্দা উপজেলা প্রতিনিধি দাবি করেছেন। অপরদিকে অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. লিয়াকত আলীর নাম। তবে ঘটনার পরপরই তিনি পাল্টা অভিযোগ এনে নিজেকেও হামলার শিকার দাবি করেছেন। এতে পুরো ঘটনাটি জটিল আকার ধারণ করেছে।

ঘটনাস্থলে কী ঘটেছিল:

মিজানুর রহমান বাবুর দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে তিনি নগরকান্দা বাজারে শাহিন মিয়ার চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় পূর্বের একটি বিরোধ ও ফেসবুকে লেখালেখির জের ধরে লিয়াকত আলী সেখানে এসে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি একটি কাঠের বাটাম দিয়ে মিজান বাবুর মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করেন।

আত্মরক্ষার জন্য হাত দিয়ে প্রতিহত করতে গেলে তার বাঁম হাতের বাহুতে গুরুতর আঘাত লাগে। এতে তিনি রক্তাক্ত জখম হন। এছাড়া ডান হাত ও পিঠেও আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় অভিযুক্ত লিয়াকত আলী উপস্থিত লোকজনকে হুমকি দেন—ঘটনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিলে তাকে প্রাণনাশ করা হবে।

পরে আহত অবস্থায় মিজান বাবুকে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানান এবং পরবর্তীতে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

পাল্টা অভিযোগে ভিন্ন চিত্র:

ঘটনার কিছুক্ষণ পরই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে থানায় পাল্টা অভিযোগ দেন লিয়াকত আলী। তার অভিযোগে বলা হয়, একই সময় ও স্থানে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজান বাবু তাকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন।

তিনি দাবি করেন, মিজান বাবু তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোমরে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। এতে তার শরীরে রক্ত জমাটসহ জখম হয়। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় মিজান বাবু প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার আশায় অভিযোগ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

‘হামলা নাটক’ সাজানোর অভিযোগ:

তবে ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি। স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের একটি অংশ দাবি করেছেন, হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি ভিন্নখাতে নিতে পরিকল্পিতভাবে ‘হামলা নাটক’ সাজানো হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, লিয়াকত আলী নিজের প্রভাব খাটিয়ে থানায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন এবং হাসপাতালে প্রভাব বিস্তার করে নিজের নামে একটি ‘ভুয়া মেডিকেল প্রেসক্রিপশন’ সংগ্রহ করেন, যাতে তাকে আহত দেখানো যায়। অথচ তার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখাতে পারেননি বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সাংবাদিক।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “ঘটনার সময় আমরা আশেপাশেই ছিলাম। মিজান বাবুই হামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু পরে ঘটনাটি ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।”

সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ:

এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা ও নগরকান্দা উপজেলার সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ করেন, লিয়াকত আলী ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি শফিকুল ইসলাম মন্টু প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত নন।

তবে শফিকুল ইসলাম মন্টু পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আমি পেশাদার সাংবাদিকতা করি। কেউ আপনাদের আমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছে। এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

তাদের দাবি, তারা কৌশলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপেশে প্রচারণা চালিয়ে মূলধারার সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।

একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “এরা সুযোগসন্ধানী। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের পক্ষেই কাজ করেন। এখন আবার নিজেদের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।”

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ:

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন অভিযুক্তরা। সেই সময় তাদের সঙ্গে তোলা বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা নতুন করে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।

এখন তারা নিজেদের একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠ দাবি করছেন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মূলধারার সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তারা।

অভিযুক্তের বক্তব্য:

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মো. লিয়াকত আলী। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি নিজেও একজন সাংবাদিক এবং একটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। নিয়মিত লেখালেখি করি।”

তিনি দাবি করেন, “মিজান বাবুই আমার ওপর হামলা করেছে। আমাকে হাতুড়ি দিয়ে মারধর করেছে। তাই আমি থানায় অভিযোগ করেছি এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি।”

তবে তার শরীরে আঘাতের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন দেখাতে পারেননি—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

পুলিশের অবস্থান:

এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, উভয় পক্ষের কাছ থেকে দুটি পৃথক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, “ঘটনার সঠিক তথ্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালতে তদন্তের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এব্যাপারে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা:

ঘটনাটি নিয়ে নগরকান্দা উপজেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একই ঘটনায় দুই বিপরীতধর্মী অভিযোগ এবং ‘নাটক সাজানোর’ অভিযোগে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে বিতর্কিত করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।

তদন্তে নজর সবার:

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং ‘ভুয়া চিকিৎসা সনদ’ ইস্যু—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন একটি আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের মধ্যে এ ঘটনার প্রভাব বেশি পড়েছে।

এখন সবার দৃষ্টি পুলিশের তদন্তের দিকে। তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে—আসলেই কে হামলার শিকার, আর কে বা কারা ‘হামলা নাটক’ সাজানোর চেষ্টা করছে।

ফরিদপুরে ইজিবাইক চালককে হত্যা ও ছিনতাই: অজ্ঞানপার্টির ৩ সদস্য গ্রেফতার

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ইজিবাইক চালককে হত্যা ও ছিনতাই: অজ্ঞানপার্টির ৩ সদস্য গ্রেফতার

ফরিদপুরে চালককে চেতনানাশক প্রয়োগ করে হত্যা ও ইজিবাইক ছিনতাইয়ের ঘটনায় সংঘবদ্ধ পেশাদার অজ্ঞানপার্টির তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

​শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বেলা ১১টায় পিবিআই ফরিদপুর জেলা কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি নিশ্চিত করেন পুলিশ সুপার মো. রবিউল ইসলাম।

​গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত মুরাদ শেখ (২৪) ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মানিকদাহ ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের সিরাজ শেখের ছেলে। এছাড়া এই ঘটনায় আগেই গ্যারেজ মালিক কামাল ও ছিনতাই চক্রের সদস্য সুমন আহমেদকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

​সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই পুলিশ সুপার জানান, ২০২২ সালের ১৬ জুলাই রাত সাড় ৮টার দিকে শহরের গোয়ালচামট পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে পাঁচ সদস্যের সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারী চক্র ২০০ টাকা ভাড়ায় তালমা যাওয়ার কথা বলে একটি ইজিবাইক ভাড়া করে। পথিমধ্যে ফরিদপুর-বরিশাল মহাসড়কের বাখুন্ডা এলাকায় পৌঁছালে তারা রুমালে চেতনানাশক মাখিয়ে চালক বিশ্বনাথ সরকারের মুখে চেপে ধরে। এতে চালক জ্ঞান হারালে তাকে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে ইজিবাইকটি নিয়ে চম্পট দেয় চক্রটি।

​পরে স্থানীয়রা চালক বিশ্বনাথকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন সকালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে রবি কুমার সরকার বাদী হয়ে কোতয়ালী থানায় একটি হত্যা ও ছিনতাই মামলা দায়ের করেন।

​ঘটনার তিন মাস পর মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআই। তদন্তের একপর্যায়ে একটি গ্যারেজে থাকা ছিনতাই হওয়া ইজিবাইকের ‘হুট’-এর সুত্র ধরে দীর্ঘ অনুসন্ধান শুরু করে সংস্থাটি। ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে গত ১৪ অক্টোবর রাতে শহরের ফলপট্টি এলাকা থেকে মুরাদ শেখকে গ্রেফতার করা হয়।

​পরদিন আসামী মুরাদকে আদালতে পাঠালে সে চালককে হত্যা ও ইজিবাইক ছিনতাইয়ের দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

​ঘটনায় জড়িত বাকি আসামীদের গ্রেফতার করতে পিবিআইয়ের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার। সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় রাতের আঁধারে কৃষকের দুটি সেচযন্ত্র পুড়িয়ে দিলো দুর্বৃত্তরা

মো. ইকবাল হোসেন, আলফাডাঙ্গা:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৩ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় রাতের আঁধারে কৃষকের দুটি সেচযন্ত্র পুড়িয়ে দিলো দুর্বৃত্তরা

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় রাতের আঁধারে আরকান মোল্যা নামের এক কৃষকের দুটি সেচযন্ত্র পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রায় চার একর জমির ইরি ধান আবাদ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ওই কৃষক।

​বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দিবাগত রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের দরুনা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

​ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আরকান মোল্যা আলফাডাঙ্গা উপজেলার জাটিগ্রাম এলাকার সিরাজুল হক সুরাপ মোল্যার ছেলে। ঘটনাটি জানতে পেরে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকালে আলফাডাঙ্গা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি।

​লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দরুনা গ্রামের মাঠে দুটি সেচযন্ত্রের সাহায্যে প্রায় চার একর জমিতে ইরি ধানের চাষ করছিলেন কৃষক আরকান মোল্যা। একটি সেচযন্ত্র থেকে অন্যটির দূরত্ব প্রায় ৭০০ ফুট। প্রতিদিনের মতো শুক্রবার সকালে জমিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা তাঁর দুটি সেচযন্ত্রই পুড়িয়ে দিয়ে গেছে। এতে বর্তমান বাজারমূল্যে তাঁর প্রায় অর্ধ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

​ভুক্তভোগী কৃষক আরকান মোল্যা জানান, কর্মসংস্থান ব্যাংকের আলফাডাঙ্গা শাখা থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি এই ইরি ধানের আবাদ ও সেচযন্ত্র ক্রয় করেছিলেন। বর্তমানে ধানগাছের বয়স দুই মাস চলছে এবং আগামী এক মাসের মধ্যে শিষ বের হওয়ার কথা। এই মুহূর্তে সেচ কার্যক্রম বন্ধ থাকলে ধানখেত শুকিয়ে ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করা নিয়েও তিনি এখন গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

​এ বিষয়ে আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেল সরোয়ার জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ফরিদপুরে অভাবনীয় পুনর্মিলন: ৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে শেকড়ে ফিরলেন পরী বেগম

নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে অভাবনীয় পুনর্মিলন: ৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে শেকড়ে ফিরলেন পরী বেগম

মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া পরী বেগম দীর্ঘ পাঁচ দশক পর পাকিস্তান থেকে নিজ জন্মভূমি ফরিদপুরের নগরকান্দায় ফিরেছেন। মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে সুদূর পাকিস্তানে পাড়ি জমানো এই নারী জীবনের দীর্ঘ ৫০ বছর পর ভাইদের বুকে ফিরে পেলেও ভাষা বদলে ফেলেছেন। মাতৃভাষা বাংলা ভুলে গিয়ে এখন তিনি সাবলীলভাবে কথা বলছেন উর্দুতে। তবুও এই ভাষা ও দূরত্বের ব্যবধান দুই ভাই-বোনের আত্মিক টানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

​পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরী বেগমের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। তার বাবার নাম মৃত মমিন মাতুব্বর। প্রায় ৫০ বছর আগে অতীতে শিশু বয়সে নিখোঁজ হওয়া পরী বেগম চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রথমে ভারত এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একপর্যায়ে এক নিঃসন্তান দম্পতির আশ্রয়ে বড় হন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি এক নাগরিককে বিয়ে করেন। ওই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

​তবে প্রবাসের মাটিতে যুগের পর যুগ কেটে গেলেও জন্মভূমি কিংবা আপন মা-বাবা ও ভাইদের স্মৃতি একটুও মুছে যায়নি পরী বেগমের মন থেকে। পরিবারের সদস্যরাও তাকে ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের এক বিস্ময়কর চাকা ঘোরে পাকিস্তানে অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি যুবকের সুবাদে।

​পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ওই দুই যুবকের সাথে পরিচয় হয় পরী বেগমের নাতির। দাদির মুখে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের গল্প শুনে সেই যুবকরা উদ্যোগী হন। পরী বেগমের দেওয়া নগরকান্দার ঠিকানা এবং বাবা মমিন মাতুব্বর ও ভাইদের (নওশের আলী মাতুব্বর, সাইফুল মাতুব্বর ও সোলেমান মাতুব্বর) নাম সংগ্রহ করে তারা দেশে ফিরে খোঁজ শুরু করেন। অবশেষে তাদের মাধ্যমেই দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয় ভাই-বোনের।

​অবশেষে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে সম্প্রতি জন্মভূমিতে ফেরেন পরী বেগম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের ব্যবধানে ভাই-বোনের চেহারা ও পরিবেশ বদলালেও ভালোবাসার কমতি হয়নি একটুও। ছোটবেলার সেই বোনকে এত বছর পর কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন ভাইয়েরা।

​এদিকে পুনর্মিলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো, দীর্ঘকাল পাকিস্তানে বসবাস করায় পরী বেগম এখন আর বাংলায় কথা বলতে পারেন না; তার দৈনন্দিন ভাষা এখন উর্দু। দেশে ফিরে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালেও তিনি উর্দুতেই নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ভাইয়েরাও তার সব কথা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও চোখের ভাষা আর অনুভূতির মধ্য দিয়েই মনের ভাব বুঝে নিচ্ছেন।

​দীর্ঘ ৫০ বছর পর পরী বেগমের এই নাটকীয় ও আবেগঘন প্রত্যাবর্তনে নগরকান্দার পৈতৃক বাড়িতে বইছে আনন্দের বন্যা। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন তাকে একনজর দেখতে। কেউ শুনছেন তার কষ্টের জীবনসংগ্রামের গল্প, আবার কেউ অবাক হচ্ছেন এত বছর পরও জন্মভূমির প্রতি অটুট ভালোবাসার কথা ভেবে। পরিবারে আনন্দের এই জোয়ার ধরে রাখতে মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়েছে।

​পরী বেগমের ভাই সাইফুল মাতুব্বর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘পরী আপা আমাদের কাছে ফিরে আসায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। দীর্ঘ এই বিচ্ছেদ শেষে তাকে ফিরে পাবো, তা আমরা কল্পনাই করতে পারিনি।’

​মাত্র ১০ বছর বয়সে যে মেয়েটি নির্মমভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অচেনা ভিনদেশে হারিয়ে গিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের শেকড়ে তার এই ফিরে আসা কেবল একটি পরিবারের পুনর্মিলনই নয়, এটি মানুষের জন্মভূমির প্রতি অবিনশ্বর টান ও ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান।