খুঁজুন
, ,

নগরকান্দায় সাংবাদিকের ওপর হামলা: পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রহস্য, ‘হামলা নাটক’ নিয়ে তোলপাড়

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর ও নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৯:০৬ অপরাহ্ণ
নগরকান্দায় সাংবাদিকের ওপর হামলা: পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রহস্য, ‘হামলা নাটক’ নিয়ে তোলপাড়

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় এক সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হামলার অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং ‘হামলা নাটক’ তৈরির অভিযোগে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললেও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।

ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরকান্দা বাজার এলাকায়। হামলার শিকার হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বাবু (৪৯) নিজেকে দৈনিক যুগান্তরের নগরকান্দা উপজেলা প্রতিনিধি দাবি করেছেন। অপরদিকে অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. লিয়াকত আলীর নাম। তবে ঘটনার পরপরই তিনি পাল্টা অভিযোগ এনে নিজেকেও হামলার শিকার দাবি করেছেন। এতে পুরো ঘটনাটি জটিল আকার ধারণ করেছে।

ঘটনাস্থলে কী ঘটেছিল:

মিজানুর রহমান বাবুর দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে তিনি নগরকান্দা বাজারে শাহিন মিয়ার চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় পূর্বের একটি বিরোধ ও ফেসবুকে লেখালেখির জের ধরে লিয়াকত আলী সেখানে এসে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি একটি কাঠের বাটাম দিয়ে মিজান বাবুর মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করেন।

আত্মরক্ষার জন্য হাত দিয়ে প্রতিহত করতে গেলে তার বাঁম হাতের বাহুতে গুরুতর আঘাত লাগে। এতে তিনি রক্তাক্ত জখম হন। এছাড়া ডান হাত ও পিঠেও আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় অভিযুক্ত লিয়াকত আলী উপস্থিত লোকজনকে হুমকি দেন—ঘটনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিলে তাকে প্রাণনাশ করা হবে।

পরে আহত অবস্থায় মিজান বাবুকে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানান এবং পরবর্তীতে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।

পাল্টা অভিযোগে ভিন্ন চিত্র:

ঘটনার কিছুক্ষণ পরই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে থানায় পাল্টা অভিযোগ দেন লিয়াকত আলী। তার অভিযোগে বলা হয়, একই সময় ও স্থানে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজান বাবু তাকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন।

তিনি দাবি করেন, মিজান বাবু তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোমরে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। এতে তার শরীরে রক্ত জমাটসহ জখম হয়। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় মিজান বাবু প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পরে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার আশায় অভিযোগ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

‘হামলা নাটক’ সাজানোর অভিযোগ:

তবে ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি। স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের একটি অংশ দাবি করেছেন, হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি ভিন্নখাতে নিতে পরিকল্পিতভাবে ‘হামলা নাটক’ সাজানো হয়েছে।

তাদের অভিযোগ, লিয়াকত আলী নিজের প্রভাব খাটিয়ে থানায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন এবং হাসপাতালে প্রভাব বিস্তার করে নিজের নামে একটি ‘ভুয়া মেডিকেল প্রেসক্রিপশন’ সংগ্রহ করেন, যাতে তাকে আহত দেখানো যায়। অথচ তার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখাতে পারেননি বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সাংবাদিক।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “ঘটনার সময় আমরা আশেপাশেই ছিলাম। মিজান বাবুই হামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু পরে ঘটনাটি ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।”

সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ:

এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা ও নগরকান্দা উপজেলার সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ করেন, লিয়াকত আলী ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি শফিকুল ইসলাম মন্টু প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত নন।

তবে শফিকুল ইসলাম মন্টু পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, আমি পেশাদার সাংবাদিকতা করি। কেউ আপনাদের আমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছে। এসব ভিত্তিহীন কথাবার্তা।

তাদের দাবি, তারা কৌশলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপেশে প্রচারণা চালিয়ে মূলধারার সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।

একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “এরা সুযোগসন্ধানী। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের পক্ষেই কাজ করেন। এখন আবার নিজেদের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।”

রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ:

স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন অভিযুক্তরা। সেই সময় তাদের সঙ্গে তোলা বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা নতুন করে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।

এখন তারা নিজেদের একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠ দাবি করছেন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মূলধারার সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তারা।

অভিযুক্তের বক্তব্য:

তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মো. লিয়াকত আলী। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি নিজেও একজন সাংবাদিক এবং একটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। নিয়মিত লেখালেখি করি।”

তিনি দাবি করেন, “মিজান বাবুই আমার ওপর হামলা করেছে। আমাকে হাতুড়ি দিয়ে মারধর করেছে। তাই আমি থানায় অভিযোগ করেছি এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি।”

তবে তার শরীরে আঘাতের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন দেখাতে পারেননি—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।

পুলিশের অবস্থান:

এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, উভয় পক্ষের কাছ থেকে দুটি পৃথক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, “ঘটনার সঠিক তথ্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালতে তদন্তের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

এব্যাপারে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা:

ঘটনাটি নিয়ে নগরকান্দা উপজেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একই ঘটনায় দুই বিপরীতধর্মী অভিযোগ এবং ‘নাটক সাজানোর’ অভিযোগে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে বিতর্কিত করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।

তদন্তে নজর সবার:

পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং ‘ভুয়া চিকিৎসা সনদ’ ইস্যু—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন একটি আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের মধ্যে এ ঘটনার প্রভাব বেশি পড়েছে।

এখন সবার দৃষ্টি পুলিশের তদন্তের দিকে। তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে—আসলেই কে হামলার শিকার, আর কে বা কারা ‘হামলা নাটক’ সাজানোর চেষ্টা করছে।

ফরিদপুরে অভাবনীয় পুনর্মিলন: ৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে শেকড়ে ফিরলেন পরী বেগম

নগরকান্দা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে অভাবনীয় পুনর্মিলন: ৫০ বছর পর পাকিস্তান থেকে শেকড়ে ফিরলেন পরী বেগম

মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যাওয়া পরী বেগম দীর্ঘ পাঁচ দশক পর পাকিস্তান থেকে নিজ জন্মভূমি ফরিদপুরের নগরকান্দায় ফিরেছেন। মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে সুদূর পাকিস্তানে পাড়ি জমানো এই নারী জীবনের দীর্ঘ ৫০ বছর পর ভাইদের বুকে ফিরে পেলেও ভাষা বদলে ফেলেছেন। মাতৃভাষা বাংলা ভুলে গিয়ে এখন তিনি সাবলীলভাবে কথা বলছেন উর্দুতে। তবুও এই ভাষা ও দূরত্বের ব্যবধান দুই ভাই-বোনের আত্মিক টানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।

​পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পরী বেগমের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। তার বাবার নাম মৃত মমিন মাতুব্বর। প্রায় ৫০ বছর আগে অতীতে শিশু বয়সে নিখোঁজ হওয়া পরী বেগম চক্রের খপ্পরে পড়ে প্রথমে ভারত এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানে পৌঁছান। সেখানে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একপর্যায়ে এক নিঃসন্তান দম্পতির আশ্রয়ে বড় হন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তানি এক নাগরিককে বিয়ে করেন। ওই সংসারে তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

​তবে প্রবাসের মাটিতে যুগের পর যুগ কেটে গেলেও জন্মভূমি কিংবা আপন মা-বাবা ও ভাইদের স্মৃতি একটুও মুছে যায়নি পরী বেগমের মন থেকে। পরিবারের সদস্যরাও তাকে ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের এক বিস্ময়কর চাকা ঘোরে পাকিস্তানে অধ্যয়নরত দুই বাংলাদেশি যুবকের সুবাদে।

​পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ওই দুই যুবকের সাথে পরিচয় হয় পরী বেগমের নাতির। দাদির মুখে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া শেকড়ের গল্প শুনে সেই যুবকরা উদ্যোগী হন। পরী বেগমের দেওয়া নগরকান্দার ঠিকানা এবং বাবা মমিন মাতুব্বর ও ভাইদের (নওশের আলী মাতুব্বর, সাইফুল মাতুব্বর ও সোলেমান মাতুব্বর) নাম সংগ্রহ করে তারা দেশে ফিরে খোঁজ শুরু করেন। অবশেষে তাদের মাধ্যমেই দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয় ভাই-বোনের।

​অবশেষে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে সম্প্রতি জন্মভূমিতে ফেরেন পরী বেগম। দীর্ঘ পাঁচ দশকের ব্যবধানে ভাই-বোনের চেহারা ও পরিবেশ বদলালেও ভালোবাসার কমতি হয়নি একটুও। ছোটবেলার সেই বোনকে এত বছর পর কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েন ভাইয়েরা।

​এদিকে পুনর্মিলনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী দিক হলো, দীর্ঘকাল পাকিস্তানে বসবাস করায় পরী বেগম এখন আর বাংলায় কথা বলতে পারেন না; তার দৈনন্দিন ভাষা এখন উর্দু। দেশে ফিরে গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালেও তিনি উর্দুতেই নিজের জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ভাইয়েরাও তার সব কথা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও চোখের ভাষা আর অনুভূতির মধ্য দিয়েই মনের ভাব বুঝে নিচ্ছেন।

​দীর্ঘ ৫০ বছর পর পরী বেগমের এই নাটকীয় ও আবেগঘন প্রত্যাবর্তনে নগরকান্দার পৈতৃক বাড়িতে বইছে আনন্দের বন্যা। আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন তাকে একনজর দেখতে। কেউ শুনছেন তার কষ্টের জীবনসংগ্রামের গল্প, আবার কেউ অবাক হচ্ছেন এত বছর পরও জন্মভূমির প্রতি অটুট ভালোবাসার কথা ভেবে। পরিবারে আনন্দের এই জোয়ার ধরে রাখতে মসজিদে বিশেষ দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়েছে।

​পরী বেগমের ভাই সাইফুল মাতুব্বর আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘পরী আপা আমাদের কাছে ফিরে আসায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। দীর্ঘ এই বিচ্ছেদ শেষে তাকে ফিরে পাবো, তা আমরা কল্পনাই করতে পারিনি।’

​মাত্র ১০ বছর বয়সে যে মেয়েটি নির্মমভাবে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অচেনা ভিনদেশে হারিয়ে গিয়েছিলেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের শেকড়ে তার এই ফিরে আসা কেবল একটি পরিবারের পুনর্মিলনই নয়, এটি মানুষের জন্মভূমির প্রতি অবিনশ্বর টান ও ভালোবাসার এক অনন্য উপাখ্যান।

 

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিচ্ছে ফরিদপুর জেলা পরিষদ

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৪৪ অপরাহ্ণ
জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিচ্ছে ফরিদপুর জেলা পরিষদ

ফরিদপুরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করেছে জেলা পরিষদ। সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যোগ করার এমন উদ্যোগ জেলা পর্যায়ে এটিই প্রথম।

​বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে জেলা পরিষদের প্রকৌশল শাখা ও সদর ভিআইপি ডাকবাংলোর ছাদে স্থাপিত মোট ৬০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এ সৌরবিদ্যুৎ প্লান্টের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম।

​জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকৌশল ভবনের ছাদে ৪০ কিলোওয়াট এবং ভিআইপি ডাকবাংলোর ছাদে ২০ কিলোওয়াট ক্ষমতার প্যানেল বসানো হয়েছে। এ সিস্টেম থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ‘নেট মিটারিং’ পদ্ধতির মাধ্যমে যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে।

​সৌরবিদ্যুৎ প্লান্টটি স্থাপনে সরকারের দেওয়া ২০ লাখ টাকার পাশাপাশি জেলা পরিষদ নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থায়ন করেছে। প্যানেল স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠান ‘মার্শ পাওয়ার টেকনোলজি লিমিটেড’-এর সঙ্গে আগামী ২০ বছরের জন্য মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি করা হয়েছে।

​উদ্বোধন উপলক্ষে জেলা পরিষদ এবং পশ্চিম অঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো)-১, ফরিদপুরের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

​অনুষ্ঠানে ফরিদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. আফজাল হোসেন খান পলাশ জানান, “দেশের ৬১টি জেলা পরিষদকে সোলার সিস্টেম স্থাপনে সরকার ২০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছিল। ফরিদপুর জেলা পরিষদ প্রথম নিজস্ব অর্থায়ন যুক্ত করে কাজ শেষ করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করল। আমাদের দৈনিক চাহিদা ৪০ কিলোওয়াট, বাকি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে চলে যাবে।”

​জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “বিশ্বব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে নিজস্ব প্রাকৃতিক উৎস ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এ উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও অনুকরণীয়।”

​উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বাকাহীদ হোসেন, ফরিদপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. ইলিয়াছুর রহমান, জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা সুলতানা, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম এবং ওজোপাডিকো-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রণব চন্দ্র দেবনাথ।

ফরিদপুরের নগরকান্দায় নেই কার্যকর পাঠাগার, আধুনিক গণগ্রন্থাগারের দাবি

এহসানুল হক মিয়া, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের নগরকান্দায় নেই কার্যকর পাঠাগার, আধুনিক গণগ্রন্থাগারের দাবি

ফরিদপুরের নগরকান্দায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জ্ঞানচর্চার সুযোগ বাড়াতে একটি আধুনিক সরকারি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিকরা। তাঁদের অভিযোগ, উপজেলায় একাধিক নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও পাঠ্যবইয়ের বাইরে মননশীল জ্ঞানচর্চার জন্য কার্যকর কোনো পাবলিক লাইব্রেরি নেই।

​স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার নগরকান্দায় ‘বঙ্গবন্ধু পাবলিক লাইব্রেরি’ নামে একটি গণগ্রন্থাগার উদ্বোধন করেন। তবে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি নিয়মিত পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাঠাগারটির নাম পরিবর্তন করে ‘জিয়া পাবলিক লাইব্রেরি’ রাখা হলেও এর সেবা ও কার্যক্রমে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি। পুরোনো ও পরিত্যক্ত একটি ভবনে এটি স্থাপন করায় সেখানে নিয়মিত পাঠ কার্যক্রমও গড়ে ওঠেনি।

​নগরকান্দা পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি (এম.এন. একাডেমি), সরকারি নগরকান্দা কলেজ, শহীদ আকরামুন্নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও দুটি কওমি মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও বইপ্রেমীদের প্রত্যাশা পূরণে এখন পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন গণগ্রন্থাগার নির্মাণের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

​স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন সচেতন নাগরিকদের মতে, তরুণদের মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি, অপসংস্কৃতি এবং মাদক থেকে দূরে রাখতে একটি আধুনিক পাঠাগার অত্যন্ত জরুরি। নতুন ভবনে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান, মুক্তিযুদ্ধ ও সাধারণ জ্ঞানের বই, চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির সামগ্রী, জাতীয়-স্থানীয় পত্রিকা ও শিশুদের উপযোগী বইয়ের ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান তাঁরা।

​নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ বলেন, “পড়াশোনা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের মেধার বিকাশ ঘটাতে প্রচুর বই পড়া দরকার, যা নগরকান্দায় নেই। তাই এখানে একটি আধুনিক গণগ্রন্থাগার স্থাপনের জোর দাবি জানাচ্ছি।”

​অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও লেখক মো. ইব্রাহিম খান বলেন, “অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নগরকান্দা উপজেলায় অদ্যাবধি কোনো কার্যকর গ্রন্থাগার গড়ে ওঠেনি। বর্তমান প্রজন্মকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে গণগ্রন্থাগার বিশেষ ভূমিকা রাখবে।”

​একই দাবি জানিয়ে নগরকান্দা সরকারি মহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ কে এম মুজাহিদুর রহমান বলেন, “শিক্ষার্থী ও যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহার কমাতে সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিবেশ ও পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা সময়ের দাবি।”

​এ বিষয়ে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন’-কে জানান, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির পুরোনো ভবনটি ভেঙে সেখানে একটি তিনতলা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ওই ভবনের একটি তলায় শিল্পকলা একাডেমি, একটিতে পাবলিক লাইব্রেরি এবং অন্যটিতে অফিসার্স ক্লাব স্থাপন করা হবে। তবে আপাতত পুরোনো লাইব্রেরিটি সংস্কার করে ব্যবহারের উপযোগী করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

​স্থানীয়দের প্রত্যাশা, কেবল নামসর্বস্ব কোনো পাঠাগার নয়, নগরকান্দায় দ্রুতই একটি কার্যকর ‘পাবলিক লাইব্রেরি’ গড়ে উঠবে—যেখানে প্রতিদিন বই হাতে নির্দ্বিধায় জ্ঞানচর্চা করতে পারবেন সব বয়সী পাঠক।