খুঁজুন
বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ১২ চৈত্র, ১৪৩২

দৈনিক মাথাব্যথা: সাধারণ সমস্যা নাকি ব্রেন টিউমারের লক্ষণ?

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:১৪ এএম
দৈনিক মাথাব্যথা: সাধারণ সমস্যা নাকি ব্রেন টিউমারের লক্ষণ?

মাথাব্যথা খুবই সাধারণ একটি সমস্যা। কাজের চাপ, ঘুম কম হওয়া, মানসিক দুশ্চিন্তা, চোখের সমস্যা বা গ্যাস্ট্রিক—বিভিন্ন কারণেই মাথাব্যথা হতে পারে। তাই প্রতিদিন মাথাব্যথা মানেই গুরুতর কিছু, এমনটা নয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে মাথাব্যথা চলতে থাকলে বা ব্যথার ধরন অস্বাভাবিক হলে তা বড় কোনো রোগের লক্ষণও হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মস্তিষ্কে টিউমার থাকলেও মাথাব্যথা হতে পারে, যদিও সব মাথাব্যথা ব্রেন টিউমারের কারণে হয় না। এ বিষয়ে কী বলছে চিকিৎসাবিজ্ঞান, চলুন জেনে নেওয়া যাক।

মাথাব্যথা কি ব্রেন টিউমারের লক্ষণ?

আমেরিকান ব্রেন টিউমার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকা মাথাব্যথা মস্তিষ্কের টিউমারের একটি সাধারণ লক্ষণ হতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, বেশিভাগ মাথাব্যথার কারণই অন্য কিছু, যা সাধারণত গুরুতর নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, টিউমারের আকার, অবস্থান এবং মস্তিষ্কের কোন অংশে চাপ পড়ছে—এসবের ওপর নির্ভর করে লক্ষণ ভিন্ন হতে পারে। টিউমার বড় হয়ে মস্তিষ্কের স্নায়ুর ওপর চাপ সৃষ্টি করলে মাথাব্যথা শুরু হতে পারে।

ব্রেন টিউমারের মাথাব্যথা কেমন হতে পারে?

চিকিৎসকদের মতে, মস্তিষ্কের টিউমারের কারণে হওয়া মাথাব্যথা অনেক সময় মাইগ্রেন বা টেনশনের মাথাব্যথা থেকে আলাদা হয়ে থাকে।

কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো

১. এমন মাথাব্যথা, যা রাতে ঘুম ভেঙে দেয়

২. শরীরের অবস্থান পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যথার ধরন বদলে যায়

৩. সাধারণ ব্যথানাশক ওষুধে কাজ না করা

৪. কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরে স্থায়ী মাথাব্যথা

৫. ঘন ঘন মাথাব্যথা নিয়ে ঘুম থেকে ওঠা

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, সকালের মাথাব্যথার পেছনে স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো অন্য কারণও থাকতে পারে।

কখন ডাক্তারের কাছে যাওয়া জরুরি?

চিকিৎসকদের মতে, নতুন ধরনের বা অস্বাভাবিক মাথাব্যথা হলে সেটিকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। বিশেষ করে যদি ব্যথা ক্রমাগত বাড়তে থাকে এবং সাধারণ চিকিৎসায় কমে না, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত—

১. শরীরে আগে থেকেই ক্যান্সার ধরা পড়েছে এবং নতুন করে মাথাব্যথা শুরু হয়েছে

২. মাথাব্যথা ক্রমাগত বাড়ছে এবং দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত করছে

৩. মাথা ঘোরা বা ভারসাম্য হারানো

৪. মাথার পেছনে চাপ অনুভব হওয়া

৫. বমি বমি ভাব বা বমির সঙ্গে মাথাব্যথা

৬. খিঁচুনি হওয়া বা কথা বলতে অসুবিধা

৭. ঝাপসা বা দ্বিগুণ দেখা, এমনকি দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া

৮. ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন, অকারণে বিভ্রান্ত হওয়া বা মানসিকভাবে গুটিয়ে যাওয়া

৯. শরীরের একপাশ ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়া বা অনুভূতি কমে যাওয়া

সব মাথাব্যথাই কি ভয়ঙ্কর?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিভাগ মাথাব্যথা গুরুতর নয় এবং সাধারণ কারণেই হয়ে থাকে। তবে যে কোনো মাথাব্যথা যদি ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং সাধারণ ব্যবস্থায় কমে না, তাহলে তা পরীক্ষা করানো জরুরি। যদি মাথাব্যথার সঙ্গে অস্বাভাবিক উপসর্গ যোগ হয়, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

সূত্র : যশোদা হাসপাতাল

ফরিদপুরে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল কলেজছাত্রীর লাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ১০:১৪ এএম
ফরিদপুরে ঘরের ফ্যানের সঙ্গে ঝুলছিল কলেজছাত্রীর লাশ

ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুর এলাকায় তুলি রানী দাস (২১) নামে এক কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

বুধবার (২৫ মার্চ) দিবাগত রাত আনুমানিক ১০টা ১৫ মিনিটের দিকে একটি ভাড়া বাসা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

নিহত তুলি রানী দাস রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার লক্ষণদিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুজিত দাসের মেয়ে। তিনি ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। পড়াশোনার সুবিধার্থে তিনি শহরের পশ্চিম খাবাসপুর এলাকায় ইব্রাহিম হাসানের বাড়ির নিচতলার একটি কক্ষে ভাড়া থাকতেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার সময় তুলি তার নিজ কক্ষে একা ছিলেন। দীর্ঘ সময় দরজা বন্ধ দেখে সন্দেহ হলে পরিবারের সদস্যরা ডাকাডাকি শুরু করেন। পরে কোনো সাড়া না পেয়ে দরজা খুলে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা।

বিষয়টি দ্রুত পুলিশকে জানানো হলে কোতোয়ালি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আলমগীর হোসেন সঙ্গীয় ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।

ঘটনাস্থলে নিহতের মা, কাকী ও অন্যান্য স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তাৎক্ষণিকভাবে এ মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। পারিবারিক, ব্যক্তিগত বা মানসিক কোনো চাপ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। প্রাথমিকভাবে এটি আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তাও গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

ফরিদপুরে জ্বালানি সংকট: ১০০ টাকার পেট্রোলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে বাইকাররা

মানিক কুমার দাস, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ৯:০৫ এএম
ফরিদপুরে জ্বালানি সংকট: ১০০ টাকার পেট্রোলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে বাইকাররা

জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে পড়েছে ফরিদপুর। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। মাত্র ১০০ টাকার পেট্রোল সংগ্রহের জন্য তাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেলে শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে ফরিদপুর ফিলিং স্টেশন ও প্রগতি ফিলিং স্টেশনে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যায়। অনেকেই সকাল থেকে অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত জ্বালানি পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সীমিত সরবরাহের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমাণে—প্রতি মোটরসাইকেলে মাত্র ১০০ টাকার পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে। এতে করে স্বল্প পরিমাণ জ্বালানি নিতে গিয়েও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের।

ভুক্তভোগী হৃদয় মুন্সী নামের এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, “প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, তারপরও নিশ্চিত না পেট্রোল পাব কি না। ১০০ টাকার তেল দিয়ে তো দূরে যাওয়া সম্ভব না।”

করিম শেখ নামের আরেকজন চালক জানান, এই সংকটের কারণে তার দৈনন্দিন কর্মজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এদিকে, জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। অনেকেই জরুরি কাজে বের হতে পারছেন না, আবার যারা পেশাগতভাবে মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভরশীল—যেমন ডেলিভারি কর্মী বা রাইড-শেয়ার চালক—তারা পড়েছেন সবচেয়ে বড় বিপাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্ন, পরিবহন সমস্যা কিংবা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে জ্বালানি বিতরণে সীমাবদ্ধতা থাকলে এমন সংকট তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এর প্রভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

স্থানীয় মোটরসাইকেল চালকরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে—এমন আশাই করছেন ভুক্তভোগীরা।

‘একমুঠো জোনাকি নীরব বারান্দায়’

হারুন আনসারী রুদ্র
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০২৬, ৮:১৮ এএম
‘একমুঠো জোনাকি নীরব বারান্দায়’

আবরার রাহাদের জীবনের প্রতিটি সকাল শুরু হতো একটা চাপা হুং’কার দিয়ে। সেটা তাঁর নিজের ভেতরে নয়, তাঁর পত্রিকার হেডলাইনে। চল্লিশোর্ধ্ব এই জীবনে সে এখন আর সাধারণ কোন রিপোর্টার নয়; বরং সিস্টেমের কাঁ’টা, সমাজের র’ন্ধ্রে র’ন্ধ্রে ঢুকে পড়া অনৈ’তিক’তা, দু’র্নী’তি আর গড’ফা’দারদের প্রতি’পক্ষ সে।

তাঁর তী’ক্ষ্ণ লেখনী শহরের কর্তাবাবু থেকে বড় অফিসার আর প্রভাবশালী ঠিকাদারদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। ​প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও, গোপন ফিসফিসানি আর ঈ’র্ষা তাঁর পিছু ছাড়ে না। সাংবাদিকতার ভেতরের মহলও তাঁকে হিং’সা করে—কেউ কেউ তো সরাসরি শ’ত্রু।

​তবু রাহাদ থামেনা। থামতে পারেনা। তাঁর প্রেরণা আসে সেই ‘মানুষের জিম্মা’ থেকে, যাদের জন্য সে লড়ে যায়। ​তাঁর এই কণ্ট’কা’কীর্ণ পথ বড় পিচ্ছিল। মাঝে মাঝে যখন চারপাশের সব বন্ধুত্বের মুখোশ খসে পড়ে, তখন আরো শক্তি জুগিয়ে এগোতে থাকে।

মাঝেমধ্যে নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা লাগে। তখন তাঁর হৃদয় একটু উষ্ণতা খুঁজে ফিরে। যে অনুভব তাঁর এই পথ চলার সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নিমিষেই।

এজন্য মনের প্রশান্তি পেতে রাহাদ তাঁর স্রষ্টার দরবারে নিরবে সেজদায় লুটিয়ে পড়ে কখনো। গভীর আকুতি নিয়ে প্রার্থনা করে। সবকিছু তাঁর পালনকর্তার কাছে খুলে বলে নিজেকে হালকা করে নেয়। তা নাহলে হয়তো বইপত্রের মধ্যে নিবিষ্ট হয়ে মনোযোগ ঘোরানোর চেষ্টা করে।

​বর্তমানের এই ইন্টারনেট আর ফেসবুকের আমলে পেশাগত কারণেই তাঁকে ফেসবুকের দিকে নজর রাখতে হয়। আর সেখানেই, ফেসবুকে, একদিন তাঁর চোখ আটকে যায় একটি পোস্টে।
মনে হচ্ছিলো- ওই পোস্টের শব্দগুচ্ছের এমন ভারী আর মোলায়েম সৃজন যেনো তাঁরই জবাবের প্রতিধ্বনি ছিল। এমন কিছুই কি খুঁজছিলো সে মনে মনে।

​তাহমিনা জেরান তখন থেকেই তাঁর কাছে যেন নীরবতার আলপনা হয়ে গেছে। যার লেখার সীমা হিমালয়ের মতো উঁচু, কিন্তু সেখানে কি যেন এক নিচু, শান্ত এবং একাকী একটি অবমূর্তির ছায়া। ঠিক ঠাউরে উঠতে পারেনা তাঁকে।

​তাঁর মধ্যে স্থিতিশীলতা থাকলেও এক ধরনের অজানা শূন্যতা রয়েছে। প্রেম আর অপ্রাপ্তির মিশেলের এই বহিঃপ্রকাশ অবশ্য পাঠকের বেশ খ্যাতি পেয়েছে; কিন্তু কি যেন একটা অপূর্ণতা রয়েছে তাতে। তাহমিনা জেরানের এই দুর্বোধ্যতাই তাঁর কাছে ‘দোয়াপড়া দরজার’ মতো হয়ে উঠেছে।

​রাহাদ প্রথমদিনেই তাহমিনার লেখা পড়ে ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলো। শব্দের এমন গভীর আর গম্ভীর বুনন সচরাচর বন্ধুদের কারো মাঝে দেখেনি সে। তবে সংকোচ থেকে সেখানে কোনো মন্তব্য করতে পারেনি সেদিন। এরও পরে একদিন তাহমিনার লেখার নিচে মন্তব্যের ঘরে দু’লাইনের একটি অভিব্যক্তি লিখে দেওয়ার পর প্রথম সেই জড়তা কাটলো।

মনে হলো- এই প্রতুত্তরের অপেক্ষা ছিলো। তাহমিনা সেই মন্তব্য পড়ে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা হার্টের রিঅ্যাক্ট দিলো। সেই থেকে তাঁদের মধ্যে এক ধরনের অদেখা যোগাযোগ। রাহাদের বিপদসংকুল একঘেয়ে জীবনে এই প্রাপ্তিটুকু প্রশ্রয় পেয়ে ভাললাগার একটা নিরাপদ বারান্দা হয়ে উঠলো। যেখানে রয়েছে উপমা আর ইঙ্গিতের নীরব চালুনির বর্ণমালা।

​রাহাদ লিখলো: “যে আলোটুকু ছুঁতে বারণ, সেটুকু দেখাই জীবনের শেষ বিলাসিতা।”
​তাহমিনার জবাব এল: “আপনার কাব্য-কুসুমগুলো এমন এক দুর্লভ বাগানে ফোটে, যার চাবি আপনার কাছে থাকলেও দরজায় তালা দেওয়া।”

​রাহাদ বুঝলো, তাহমিনা তাঁর জীবনের এই ঝুঁ’কি ও একাকীত্বকে ইঙ্গিত করছে। ​সে জবাব দিলো: “আমি হলাম সেই পুরোনো সেতুর মতো, তাহমিনা, যার নীচে জলের ধারা বয়ে গেলেও উপরে শুধু দায়িত্বের ভার।”
​তাহমিনা জানতো, রাহাদের এই ভার আসলে তাঁর জীবনের আপসহীন ল’ড়াই। তাঁর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

একরাতে, রাহাদ তাঁর পত্রিকার অফিস থেকে বেরিয়ে বাসার পথে হাঁটছিলো। হাতে কেবলই ছাপা হওয়া একটি পত্রিকার কপি, হেঁটে যেতে পথে যখন বাসার কাছের মোড়টি ঘুরতে যাবে রাহাদ, একটি মোটরসাইকেলে চড়ে হেলমেট পরা দুই হা’ম’লাকারী আ’ক’স্মিক তাঁর কাছাকাছি চলে এলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর ঘাড়ের পেছনে স’জো’রে কিছু দিয়ে আ’ঘা’ত করলো। তী’ব্র য’ন্ত্র’ণায় রাহাদের পা টলে উঠলো। সাথে সাথেই আবার দ্বিতীয় আ’ঘা’তে কাবু করার চেষ্টা।

এমনিতেই সারাদিনের ক্লান্তিতে অবসন্ন শরীর। ভারসাম্য রাখতে না পেরে রাহাদ রাস্তার পাশে ড্রেনের উপর পড়ে গেল। এরপর ইচ্ছেমতো চললো বেধ’ড়ক মা’রপি’ট। তাঁর শরীর যেন নি’থ’র হয়ে এলো। আর তাকে এভাবে আ’ঘা’ত করার পর ওরা যেভাবে এসেছিলো, সেভাবেই মোটরসাইকেল চালিয়ে দ্রুতই আবার অন্ধকার পথে অদৃশ্য হয়ে গেলো।

আচমকা এমন আ’ক্র’মণের শিকার রাহাদ বেশ কিছুক্ষণ পড়ে থাকলো রাস্তায়। এর কিছুক্ষণ পর কোনোমতে একটু ধাতস্থ হলো সে। শরীরের শক্তি সঞ্চয় করে নিজেই নিজেকে টেনে তুললো। হাটতে হাটতে বাসার সামনে যেয়ে পকেট থেকে চাবি বের করে দরজা খুললো। তারপর এক গ্লাস পানি খেয়ে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।

শুয়ে পড়ার সময় ব্য’থা’য় কু’কড়ে উঠলো তাঁর শরীর। আ’ঘা’ত এতটাই তী’ব্র ছিল যে শ্বাস নিতেও তাঁর ক’ষ্ট হচ্ছিল। সে দ্রুত বন্ধু মানুকে ফোন করলো। বিপদের বন্ধু মানু এসে সব জেনে এই মুহুর্তে আগে তাঁকে সুস্থ হয়ে উঠার পরামর্শ দিলো। শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে কাপড় বদলাতে সাহায্য করলো তাঁকে। ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা খাবার গরম করে খাওয়ালো। ব্যথার জন্য একটি প্যা’রা’সিটা’মল ওষুধও খাইয়ে বিদায় জানিয়ে চলে গেলো।

এই মুহুর্তে আবার রাহাদ একা হয়ে গেছে। এতো রাতে আর কাউকে ফোন দিয়ে বির’ক্ত করতে ইচ্ছে হলোনা তাঁর। বিছানায় শুয়ে পড়লো কিন্তু শ্বাস নিতে ক’ষ্ট হচ্ছে তাঁর। শরীরে আ’ঘা’তের স্থান জুড়ে ব্যথা করছে। এই একাকী মুহূর্তে, সে যেন এক মমতার আশ্রয় খুঁজতে চাইলো। মোবাইল হাতে নিতেই মনে পড়লো তাহমিনার কথা।
জীবনের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তের স্বীকারোক্তিটুকু আপন মনেই বেরিয়ে এলো তাঁর আঙুলের টোকায়।

রাহাদ তাঁকে ম্যাসেজে লিখলো: “আমার পথে আজ র’ক্তে’র দাগ, তাহমিনা। আজ মনে হচ্ছে, এই যাত্রাপথে ফিরে আসার কোনো রাস্তা আর অবশিষ্ট রইলো না!”
তাহমিনা, গভীর রাতেও কি জেগে ছিলো? রাহাদ জানেনা। ম্যাসেজটি আরো অনেকক্ষণ পরে সিন হলো। রাহাদের জীবন যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা সে জানতো।

তাহমিনা কিছুটা শান্তভাবে আঙুল চালিয়ে লিখলো: “আপনার পথে অনেক আঘাত আসে, তা জানি। এই জীবন কি কখনও আপনাকে থামতে বলে না?” এটুকু কথাতেই সে শব্দের আড়ালে ঢেলে দিলো তাঁর গভীর ভালবাসা ও উদ্বেগ।

রাহাদ হাতের দুর্বল নখে অক্ষর টিপে লিখলো: “থামতে বললেও থামি না। কারণ, যে পথে সত্যের ইশারা আছে, সে পথে থামলেও পথ ফুরায় না। এই পথ তো আমি শুধু ‘মানুষের জিম্মায়’ পেয়েছি।”
সে আরও লিখলো: “আমি শুধু লিখে যাই। মনে হয়— এই ক’ঠিন যাত্রা শেষে কোথাও একটা নিরাপদ ‘বারান্দা’ আছে, যেখানে অপেক্ষমাণ কোন চোখ আমাকে দেখে, যা আমাকে শক্তি জোগায়।”

ম্যাসেজটি পড়ে তাহমিনার চোখ ভরে জল এলো।
সে রাহাদের জবাবে লিখলো: “এই পথে জানি আছে অনেক বাধা। কিন্তু আপনিও আ’পোষ করতে জানেন না। আপনাকে ল’ড়তেই হয় তাই। আমি আপনার বারান্দায় এক মুঠো জোনাকি রেখে গেলাম। কখনও পথ খুব অন্ধ’কার হলে, তা দিয়ে আলো খুঁজে নেবেন।”

রাহাদ তাকে যত্নের রিঅ্যাক্ট দিয়ে সেই বার্তার নীরবতা গ্রহণ করলো।
তাঁর মনে হলো— এই এক মুঠো জোনাকি যেনো একটি অপ্রকাশিত আশ্বাস। যা তাঁর শরীরের আ’ঘা’তের চেয়েও প্রবল হয়ে তাঁকে সাহস জোগায়।
আর তাহমিনা জানলো, রাহাদের এই নীরব বারান্দা হলো এক অব্যক্ত জগত, যা তাঁদের নিজ নিজ জীবনের ‘গোপন চুক্তির’ বাইরে এসে মুক্তভাবে বাঁচতে শেখায়।

[ডিসক্লেইমার: গল্পের এই চরিত্র ও তথ্যগুলো সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবতার সাথে এর কোন মিল নেই। যদি কারো চরিত্র বা ঘটনার সাথে কোনভাবে কোথাও সাদৃশ্য থাকে তবে সেটি হবে কাকতালীয়।]

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর