খুঁজুন
বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

ইফতারের পর ক্লান্তি কেন? সহজ উপায়ে মিলবে সমাধান

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৭:০৭ পূর্বাহ্ণ
ইফতারের পর ক্লান্তি কেন? সহজ উপায়ে মিলবে সমাধান

সারাদিন রোজার রাখার পর মাগরিবের আজান শুনে ইফতার করা হয়। টেবিলে সাজানো নানা পদের খাবার দেখে খাওয়ার আগ্রহ থাকে অনেক বেশি, কারণ আপনি সারাদিনের ক্ষুধার্ত।

পেটপুরে মজার সব খাবার তো খেয়ে নিলেন, এরপর ভাবছেন মুহূর্তেই শক্তিশালী হয়ে যাবেন? আপনার প্রত্যাশা এমনটা থাকলেও আসলে তা হয় না। কারণ ইফতার খাওয়ার পরপরই আপনার ক্লান্ত লাগতে শুরু করে।

কেন ইফতারের পর ক্লান্তি আসে?

১. একসঙ্গে বেশি খাবার খাওয়া

সারাদিন না খেয়ে থাকার পর হঠাৎ করে বেশি খাবার খেলে হজমপ্রক্রিয়া দ্রুত সক্রিয় হয়ে যায়। তখন শরীরের রক্তপ্রবাহের বড় অংশ অন্ত্রের দিকে চলে যায়, যাতে খাবার দ্রুত হজম হয়। ফলে মস্তিষ্কে সাময়িকভাবে রক্তপ্রবাহ কমে গিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্নতা ও ক্লান্তি অনুভূত হয়।

২. পানিশূন্যতা

সারাদিন পানি না খাওয়ার কারণে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হয়। ইফতারে যদি পর্যাপ্ত পানি বা তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ না করা হয়, তাহলে ক্লান্তি আরও বাড়ে।

৩. অতিরিক্ত ভাজাপোড়া ও ভারী খাবার

ডুবো তেলে ভাজা খাবার, মসলাদার পদ ও অতিরিক্ত মিষ্টি শরীরের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। এসব খাবার হজমে বেশি সময় নেয় এবং শরীরকে অবসন্ন করে তোলে।

ইফতারের পর ক্লান্তি দূর করার উপায়

ধীরে ও পরিমিতভাবে খান- ইফতার শুরু করুন একটি খেজুর ও একগ্লাস পানি দিয়ে। এরপর কিছুক্ষণ বিরতি দিন। একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে খান। এতে হজম সহজ হবে এবং শরীর ভারী লাগবে না।

পানিশূন্যতা দূর করুন- ইফতারের পর পর্যাপ্ত পানি পান করুন। সঙ্গে রাখতে পারেন— ফল, ফলের রস, শরবত, ডাবের পানি। এগুলো শরীরের পানিশূন্যতা দূর করে সতেজতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

হালকা খাবার বেছে নিন- ভাজাপোড়া কমিয়ে ছোলা, ফল, সালাদ, স্যুপ বা হালকা প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এতে শক্তি মিলবে, কিন্তু অতিরিক্ত ভারী লাগবে না।

এককাপ চা কিংবা কফি- ইফতারের কিছু সময় পর এক কাপ হালকা চা বা কফি পান করতে পারেন। এতে থাকা ক্যাফেইন সাময়িকভাবে ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত বা খুব কড়া কফি এড়িয়ে চলাই ভালো।

কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করুন- ইফতারের পরপরই শুয়ে পড়বেন না। ১০–১৫ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করলে হজম ভালো হয় এবং শরীর চাঙ্গা থাকে।

নামাজ আদায় করুন- ইফতারের শুরুতে হালকা কিছু খেয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করতে পারেন। এতে খাবার হজমের জন্য শরীর সময় পায়। নামাজ শেষে ধীরে ধীরে বাকি খাবার গ্রহণ করলে ক্লান্তি কম হয়।

ইফতারের পর ক্লান্তি অনুভব করা স্বাভাবিক। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পানি পান এবং হালকা শারীরিক নড়াচড়া এই সমস্যাকে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। রমজানে সুস্থ থাকতে চাই সচেতনতা ও পরিমিত খাবার গ্রহণ।

সূত্র : দৈনিক ইত্তেফাক

সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকতে চান? জেনে নিন রাতে ঠিক কতক্ষণ ঘুম জরুরি

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৬:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সুস্থ ও রোগমুক্ত থাকতে চান? জেনে নিন রাতে ঠিক কতক্ষণ ঘুম জরুরি

আমরা কত বছর বেঁচে আছি তা আমাদের ক্যালেন্ডারের বয়স বা ক্রোনোলজিক্যাল বয়স দিয়ে মাপা হয়। কিন্তু আমাদের শরীরের কোষ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো আসলে কত দ্রুত বুড়িয়ে যাচ্ছে, তা নির্ধারণ করে ‘জৈবিক বয়স’। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে এই জৈবিক বয়স বাড়ার গতি কম বা বেশি হতে পারে।

গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য

‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রাতে ৬.৪ থেকে ৭.৮ ঘণ্টা ঘুমান, তাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো অন্যদের তুলনায় ধীরগতিতে বুড়িয়ে যায়। অন্যদিকে, খুব কম (৬ ঘণ্টার কম) বা খুব বেশি (৮ ঘণ্টার বেশি) ঘুম মস্তিষ্কসহ শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের বার্ধক্য ত্বরান্বিত করতে পারে।

কম ঘুমের বিপদ

গবেষকদের মতে, অপর্যাপ্ত ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং প্রদাহ (inflammation) বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে টিস্যু মেরামত এবং বিপাকীয় ভারসাম্য ব্যাহত হয়। এছাড়া কম ঘুম সরাসরি নিচের সমস্যাগুলোর সাথে যুক্ত:

উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ: পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবে রক্তচাপ ও কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়।

ডায়াবেটিস ও স্থূলতা: এটি গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ এবং শক্তির ভারসাম্যে বিঘ্ন ঘটায়।

মানসিক স্বাস্থ্য: কম ঘুম বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বেশি ঘুম কি ভালো?

অনেকে মনে করেন বেশি ঘুমানো স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, কিন্তু গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা [৯]। অতিরিক্ত ঘুম অনেক সময় শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কোনো রোগের লক্ষণ হতে পারে। যারা ৮ ঘণ্টার বেশি ঘুমান, তাদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতা এবং দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার ঝুঁকি বেশি থাকে।

বয়সভিত্তিক ঘুমের চাহিদা

যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি (CDC)-এর তথ্যমতে, সুস্থ থাকার জন্য ঘুমের প্রয়োজন বয়স ভেদে ভিন্ন হয়:

১৮ থেকে ৬০ বছর: অন্তত ৭ ঘণ্টা।

৬১ থেকে ৬৪ বছর: ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা।

৬৫ বছরের বেশি: ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা।

ভালো ঘুমের কিছু সহজ উপায়

বিশেষজ্ঞরা তারুণ্য ও সুস্থতা ধরে রাখতে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন:

লক্ষ্য স্থির করুন: রাতে অন্তত ৮ ঘণ্টা বিছানায় থাকার পরিকল্পনা করুন, যাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত হয়।

রুটিন মেনে চলুন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস করুন।

ডিজিটাল ডিটক্স: ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে সব ধরনের স্ক্রিন (মোবাইল, ল্যাপটপ) বন্ধ করে দিন।

খাবার দাবার: রাতের খাবার দ্রুত সেরে ফেলুন, যা শরীরকে শান্ত হতে সাহায্য করবে।

পর্যাপ্ত এবং সঠিক সময়ের ঘুম কেবল আপনাকে সতেজই রাখে না, বরং আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়িকে সচল রেখে বার্ধক্যকে দূরে সরিয়ে দেয়। তাই আজ রাত থেকেই আপনার ঘুমের অভ্যাসে পরিবর্তন আনুন।

তথ্যসূত্র: হেলথ লাইন

গরুর মাংস কার জন্য কতটুকু খাওয়া নিরাপদ?

স্বাস্থ্য ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৬:৪৪ পূর্বাহ্ণ
গরুর মাংস কার জন্য কতটুকু খাওয়া নিরাপদ?

অনেকেরই ধারণা গরুর মাংস মানেই স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। প্রচুর কোলেস্টেরল থাকায় অনেকেই এটি এড়িয়ে চলেন। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, গরুর মাংসের যেমন কিছু ক্ষতিকর দিক আছে, তেমনি এতে এমন কিছু পুষ্টিগুণ রয়েছে যা অন্য অনেক খাবার থেকে পাওয়া কঠিন। তাই এই মাংস আপনার জন্য আশীর্বাদ হবে না কি ভয়ের কারণ, তা নির্ভর করবে আপনি কতটা নিয়ম মেনে এবং কী পরিমাণে খাচ্ছেন তার ওপর।

পুষ্টিগুণে অনন্য গরুর মাংস আমাদের শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬, বি১২ এবং জিংক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস ও আয়রনের মতো খনিজের বড় উৎস হলো গরুর মাংস।

এই উপাদানগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, পেশি, দাঁত ও হাড়ের গঠনে ভূমিকা রাখে, ত্বক, চুল ও নখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, রক্তস্বল্পতা ও ডায়রিয়া প্রতিরোধ করে এবং ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। পাশাপাশি মানসিক অবসাদ ও ক্লান্তি দূর করে শরীরে কর্মোদ্যম বজায় রাখে।

কার জন্য কতটা প্রোটিন?

একজনের প্রতিদিন কতটা প্রোটিন প্রয়োজন তা নির্ভর করে তার ওজনের ওপর। সাধারণত সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ওজনের জন্য ১ গ্রাম প্রোটিন দরকার। যেমন: কারো ওজন ৫০ কেজি হলে তিনি দৈনিক ৫০ গ্রাম প্রোটিন খেতে পারেন।

বিশেষ ক্ষেত্রে: গর্ভবতী বা মাসিক চলাকালীন নারীদের জন্য এই চাহিদা দ্বিগুণ হতে পারে।

সতর্কতা: তবে যাদের কিডনিতে সমস্যা আছে, তাদের প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ হতে হবে স্বাভাবিকের অর্ধেক (প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.৫ গ্রাম)। ব্রিটেনের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্যমতে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রেও দিনে ৭০ গ্রামের বেশি এবং সপ্তাহে ৫০০ গ্রামের বেশি প্রোটিন খাওয়া উচিত নয়।

কতটুকু খাওয়া নিরাপদ?

পুষ্টিবিদ তাসনিম হাসিনের মতে, সপ্তাহে দুই দিন এবং সর্বোচ্চ তিন থেকে পাঁচ বেলা গরুর মাংস খাওয়া নিরাপদ। এই দুই দিনে মোট ১৫৪ গ্রাম মাংস খাওয়া যেতে পারে। সহজ হিসেবে, প্রতি বেলায় ঘরে রান্না করা মাঝারি আকারের ২ থেকে ৩ টুকরার (১৬-২৬ গ্রাম) বেশি মাংস খাওয়া উচিত নয়।

অসুস্থ রোগীদের জন্য পরামর্শ

ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া জরুরি। সাধারণত তারা সপ্তাহে এক-দুই বেলা চর্বি ছাড়া মাংস খেলে বড় ঝুঁকি থাকে না, তবে চিকিৎসক সম্পূর্ণ নিষেধ করলে তা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়।

রান্নায় সতর্কতা

ঝুঁকি কমানোর উপায় রান্নার কৌশলের ওপর মাংসের গুণাগুণ ও নিরাপত্তা অনেকটা নির্ভর করে:

চর্বি ছেঁটে ফেলা: রান্নার আগে মাংসের গায়ে লেগে থাকা দৃশ্যমান চর্বি কেটে বাদ দিলে কোলেস্টেরল অনেক কমে যায়।

ছোট টুকরো: মাংস যত ছোট টুকরো করে কাটা হবে, চর্বির পরিমাণ তত কমবে। কিমা বা বাটা মাংসে চর্বি সবচেয়ে কম থাকে।

সেদ্ধ করে পানি ফেলা: মাংস কিছুক্ষণ ফুটিয়ে উপরের তেলের স্তরসহ পানি ফেলে দিলে চর্বি অনেকাংশেই দূর হয়।

তেল ও মসলা নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত তেল-মসলায় কষিয়ে ভুনা না করে ঝোল রান্না করা ভালো এবং খাওয়ার সময় ঝোল এড়িয়ে চলা উচিত। ভিনেগার, লেবুর রস বা টক দই দিলেও চর্বি কমে।

সবজি মেশানো: মাংসের পরিমাণ কমাতে এর সাথে পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ বা ফুলকপি মিশিয়ে রান্না করা একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস।

ঝলসানো মাংস: শিক কাবাব বা গ্রিল করে খেলে মাংসের অধিকাংশ চর্বি পুড়ে যায়, যা স্বাস্থ্যের জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ।

অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ঝুঁকি অতিরিক্ত গরুর মাংস রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি জটিলতার ঝুঁকি তৈরি করে। এর কোলেস্টেরল ধমনীতে রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাকের কারণ হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত রেড মিট খেলে ক্যানসার, টাইপ-টু ডায়াবেটিস এবং আরথ্রাইটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

পরিশেষে, গরুর মাংস মানেই উচ্চ ক্যালোরি বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নয়। সঠিক পদ্ধতিতে রান্না এবং পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে এটি আপনার সুস্বাস্থ্যের সহায়ক হতে পারে। তাই মাংস খাওয়ার আগে নিজের শারীরিক অবস্থা বুঝে পরিমাণ নির্ধারণ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

তথ্যসূত্র: বিবিসি

ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

মফিজ ইমাম মিলন
প্রকাশিত: বুধবার, ২৭ মে, ২০২৬, ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
ভাইরাল লাইলি খালার আমলনামা, যে গল্প সবার অজানা?

বাংলা ভাষায় ‘আমলা’ শব্দের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের প্রেক্ষিত ভিন্নতর। আরবিতে ‘আমল’ শব্দের অর্থ কাজ। সে নিরিখে যে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমল বা কাজ করে, তারাই আমলা। উৎপত্তি আর বুৎপত্তি—যে অর্থেই ব্যবহার করি না কেন, আমলাতন্ত্রের শানে নুযুল কিন্তু আমাদের সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা হাজির করে। শিল্পী লাইলির আমলনামা কিন্তু সম্পূর্ণ উল্টোটা।

লাইলি বেগম কবে, কার কাছে থেকে ‘খালা’ উপাধি পেয়েছেন, তা নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। তবে ষাটোর্ধ্ব এই নারীর ক্ষেত্রে বয়সটাই হয়তো বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ফরিদপুরের ছয় দশকের ধুলো, বালি, ময়লা আর অমলিন সময় লাইলির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে রয়েছে। তাঁকে নিয়ে মানুষের কৌতূহলও কম নয়। কারণ তিনি আজন্ম ভবঘুরে।

কোনো পাসপোর্ট তিনি বানাননি, কিন্তু দিল্লির আজমির শরীফ যেন তাঁর হাতের মুঠোয়। বাড়ি থেকে না বলে-কয়ে অজানার পথে রওনা দিতে তাঁর যতটুকু সময় লাগে, ততটুকুই। অক্ষরজ্ঞানহীন এই মানুষটির সবচেয়ে বড় সখ—‘মানুষ দেখা’। তিনি প্রায়ই প্রশ্ন করেন, “আল্লার দুনিয়ায় কত পদের মানুষ, কিন্তু কারো সঙ্গে কারো মিল নাই কেন?” এর সদুত্তর কোনোদিনই তাঁকে দিতে পারিনি। তবে মানুষ দেখতে যাওয়ার সফরসঙ্গী হয়েছি কয়েকবার। হাটে, নৌকাঘাটে, রেলস্টেশনে—যেখানে মানুষের ভিড়, লাইলি সেখানেই।

২০০০ সাল থেকে প্রায় সাত বছর আমি ফরিদপুর শিল্পকলা একাডেমির সেক্রেটারি ছিলাম। প্রথম দিকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে লাইলি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। মাঝেমধ্যে বায়না ধরতেন—
“স্যার, একটা গান শোনাই?”

বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুঁচকাতাম। একদিন জোর করেই আমাকে মেহেদী হাসানের একটি গজল শোনালেন। বাহবা দিতেই গেয়ে উঠলেন রুনা লায়লার ১৪ বছর বয়সে গাওয়া পাকিস্তানি ছবি আঞ্জুমান-এর সেই বিখ্যাত উর্দু গান— “আপ কি দিল মে আনজুমান মে, হুসনে বান কার আগায়া…”

পারিবারিকভাবে আমরা সবাই মেহেদী হাসান আর নূরজাহানের ভক্ত। কিন্তু সেদিন বুঝতে পারিনি—আমি রুনা লায়লার ভক্ত হলাম, নাকি লাইলির।

পিয়নরা ভীষণ বিরক্ত হতো তাঁকে নিয়ে। ওয়ান টাইম কাপ ছাড়া চা দিত না। তাও কখনো ফুরিয়ে যেত। লাইলি সব বুঝতেন। তরমুজের বিচির মতো পান খাওয়া দাঁত বের করে হেসে বলতেন— “স্যার, কত খাওয়া যাবি চা?”

একদিন আবদার করে বললেন—“স্যার, আমারে হারমোনিয়াম শিখাইবেন না?”

স্থানীয় শিক্ষকদের অনুরোধ করলাম, তাঁকে একটু গানবাজনা শেখানোর জন্য। একসময় তিনি নিজেই সুর তুলতে শিখে গেলেন। এরপর ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের প্রায় সব অনুষ্ঠানে লাইলি অপরিহার্য হয়ে ওঠেন।

২০০৩ সালে কবি জসীমউদ্দীনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জসীম পল্লী মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। পল্লীকবির সৃষ্ট নায়ক-নায়িকাদের যেন বাস্তবে হাজির করা হয়েছিল সেই মেলায়। কবিতার আসমানী, লোকগানের কিংবদন্তি হাজেরা বিবি, তাম্বুলখানা থেকে আদর্শ কৃষক গণি মিয়া, আর ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে আনা হয়েছিল লাঠিয়াল রুপাইকে।

তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন তরুণ কর্মকর্তা জালাল আহমেদ। তিনি সবার জন্য ভালো উপহারের ব্যবস্থা করতে বললেন। গায়িকা লাইলির কথা বলতেই তাঁর জন্য শাড়ি-কাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসক গান শুনে তাঁকে কাপড় উপহার দিয়েছেন—এ কথা লাইলি নিজেই মাইকের মতো প্রচার করতে লাগলেন।

শহরের সবাই লাইলিকে চেনেন—তা নয়। তবে শিল্প-সংস্কৃতির মানুষদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয়। তাঁর ঠিকানা অবশ্য কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। একসময় পৌর বিসর্জনঘাটের কাছে থাকতেন। স্বামী মারা গেছেন প্রায় দশ বছর আগে। দুই ছেলে, দুই মেয়ে—সবাই বিবাহিত। স্থায়ী ঠিকানা বলতে কিছু নেই। কখনো শহরতলির হারুকান্দীতে ছেলের বাসায়, কখনো ঝিলটুলীর মালেক মীর বাড়িতে রাত কাটান। শুধু ওয়াজ মাহফিল নয়—যেখানে রামকীর্তন, যেখানে তিন রথের মেলা, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি।

যোগাযোগের সুবিধার্থে কয়েক বছর আগে তাঁকে অল্প দামের একটি বাটন ফোন কিনে দিয়েছিলাম। ফোন হাতে নিয়েই প্রশ্ন করলেন— “এইটার সঙ্গে কি কানেকশন পাওয়া যাবে?”

কার সঙ্গে—জিজ্ঞেস করতেই ফোনটা আমার হাত থেকে নিয়ে দূরে পানিতে ছুড়ে ফেললেন। তারপর বললেন—“এই জ্ঞান নিয়ে আবার গানবাজনা করেন আপনারা!”

লাইলির সেই মারফতি কথার অর্থ আজও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

২০২৫ সালের ৬ জানুয়ারি ফরিদপুর হেরিটেজ প্রথম অনুষ্ঠান করেছিল লাইলিকে প্রধান অতিথি করে। সেটি ছিল তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন। অধ্যাপক আলতাফ হোসেন, ফারাহ দিবা আহমেদ, শামীম আরা বেগম, মৃধা রেজাউল, অধ্যাপক হিমু, শরীফসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। ভিন্ন মাত্রার এক আয়োজন ছিল সেদিন।

প্রায় ১৫ বছর আগে আমরা একবার ‘পাগল সম্মেলন’ করেছিলাম। মূল চরিত্র ছিলেন প্রফেসর আলতাফ হোসেন। সেই অনুষ্ঠানেও লাইলি গান গেয়েছিলেন। তবে সেখানে গোলমাল বেঁধেছিল গান নিয়ে। কেউ চায় না লাইলি একা গান গাইুক—সব ‘পাগল’ একসঙ্গে গাইবে! অথচ লাইলি সুর, তাল, লয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন। কিন্তু পাগলরা কি আর গ্রামার মানে?

গত ২ এপ্রিল ২০২৬, ফরিদপুর হেরিটেজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইসমাইল জবিউল্লাহ। তাঁর সঙ্গে কথা ছিল—ফরিদপুরে এলে তাঁকে লাইলির গান শোনাব। শুনিয়েছিলামও। দুই সংসদ সদস্য—চৌধুরী নায়াব ইউসুফ ও শহীদুল ইসলাম বাবুল—দুজনেই বললেন, “আমরা বক্তব্য রাখব না, লাইলির গান শুনব।”

ইসমাইল জবিউল্লাহ সাহেব ডিসি থাকাকালীন সময় থেকেই লাইলিকে চিনতেন। তখন জেলা প্রশাসক ছিলেন মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা। অসাধারণ বিনয়ী ও চৌকস প্রশাসক। তিনি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলেন— “এমন কিছু করবেন না, যাতে জবিউল্লাহ সাহেব অসন্তুষ্ট হন।”

কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২৪ মে, উপমহাদেশের রাজনৈতিক সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত এবং নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ফরিদপুরের ময়েজ মঞ্জিলে নজরুল জন্মোৎসবের আয়োজন করা হয়। যথারীতি সাহিত্য পরিষদের একনিষ্ঠ সদস্য শরীফ খান দায়িত্ব নেন লাইলিকে অনুষ্ঠানে আনার। যথাসময়ে লাইলি উপস্থিত হন। আমি মঞ্চের চেয়ার ছেড়ে দিয়ে দর্শক সারিতে তাঁর পাশে গিয়ে বসি।

সকলের অনুরোধে লাইলি দুটি গান গাইলেন। মুহূর্তেই শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গেল। কিন্তু মাগরিবের আজান হয়ে যাওয়ায় অনুষ্ঠান শেষ করতে হয়। “ওয়ান মোর, ওয়ান মোর”—শব্দগুলো বাতাসে ভাসতে থাকে।

রিকশাভাড়া বাবদ তাঁকে তিনশ টাকা দিলে তিনি একশ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেন— “অত লাগবে না। যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।”

এর মধ্যেই টেলিভিশনের এক এ-গ্রেডের ধোপদুরস্ত শিল্পী এক এমপির কাছে নালিশ করেন—“রাস্তার শিল্পীরা গান গায়, আর আমি এ-গ্রেডের শিল্পী হয়েও সুযোগ পাই না!”

‘রাস্তার শিল্পী’ বলতে তিনি লাইলিকেই বুঝিয়েছিলেন।

শিল্পী লাইলিকে নিয়ে পোস্ট দিতে কাউকে কেউ উদ্বুদ্ধ করেনি। তিনি ভাইরাল হয়েছেন নিজের গুণে। তাঁর গাওয়া “নয়ন ভরা জল গো তোমার” গানটি শুনলেই বোঝা যায়।

তবে নজরুল জন্মোৎসব এখানেই শেষ হয়নি।

রাত ১০টার দিকে ফরিদপুর জেলা বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক ফোন করে জানতে চান—নজরুল জন্মোৎসব ময়েজ মঞ্জিলে কেন? আমি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করি—১৯৩৯ সালে ময়েজ মঞ্জিলের মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী এবং কোমরপুরের হুমায়ুন কবির মিলে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ গঠন করেছিলেন। নজরুলের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই জায়গাটির সঙ্গে।

ওপাশ থেকে উত্তর আসে—“কবে কে কী কইরা থুইয়া গেছে, তার জন্য এখন ময়েজ মঞ্জিলে অনুষ্ঠান মানা যাবে না!”

আমি বলি—“অশিক্ষিত লোকের মতো কথা বলো না।”

তিনি আরও রেগে গিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় বলতে থাকেন—ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ ভেঙে-চুরে গুঁড়িয়ে দেবেন।

আমি যদি তাঁর অতীত না জানতাম, তাঁর জাতগোষ্ঠী না চিনতাম, তাহলে হয়তো চুপ থাকতাম। আমার মাতুলকুলের চার পুরুষ এই শহরের মানুষ। আমরা কি মুর্শিদাবাদ থেকে এসেছি? আমাকে কিছু বলতে হলে বাখুন্ডা পার হয়ে, জোয়ারের মোড় ছাড়িয়ে, মহিলা রোড ডিঙিয়ে তালমার মোড়ে গিয়ে বলতে হবে।

এই শহরে চাঁদাবাজ, ধান্ধাবাজ আমি নই। আশির দশক থেকে ফরিদপুরের যত সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার প্রতিটির শুরুতে আমি জড়িত ছিলাম। কোনো সংগঠন থেকে ১০ টাকারও কোনো ভাউচার দেখাতে পারলে আর সমাজসেবা করব না।

আমি যেহেতু রাজনীতি করি না, কোনো দলের সদস্য নই—তাই সবার কাছেই যাই। প্রতিষ্ঠানের জন্য যাই, ব্যক্তিস্বার্থে নয়। হ্যাঁ, এ কে আজাদের কাছেও গেছি, ভবিষ্যতেও যাব—প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে। তিনি শিশু চিকিৎসাকেন্দ্র ও মুসলিম মিশনে যে পরিমাণ অর্থ দিয়েছেন, শহীদুল হাসান সাহেব ছাড়া আর কে দিয়েছেন?

যাই হোক, কথা অন্যদিকে চলে গেল। আসলে মফস্বল শহরে সাহিত্যচর্চা আর সমাজসেবার কাজ করতে কত ব্যথা আর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তা আমাদের হাসিমুখ দেখে বোঝা যায় না।

সেদিন ময়েজ মঞ্জিলে লাইলি খালা গান গেয়েছিলেন। সেই লাইলি খালা—যাকে আমি শিল্পকলার সেক্রেটারি থাকাকালে হারমোনিয়ামের সামনে বসিয়েছিলাম। যে আমার কাছে আসত জোর করে দুটি গান শোনানোর জন্য।

সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও, বিশেষ করে লাইলি খালার গান, ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর শত শত ফোন পেয়েছি। ফেসবুক সয়লাব হয়ে গেছে। তাই মনে হলো, লাইলি খালা সম্পর্কে কিছু লিখে রাখা দরকার।

দরদি এই শিল্পী নিজের কথা ভদ্রলোকদের কাছে গুছিয়ে বলতে পারেন না। মানুষ দেখতে ছুটে বেড়ানো এই আজন্ম ভবঘুরে নারী ভদ্রসমাজের সঙ্গেও খুব একটা মিশতে চান না। ভিউ-বাণিজ্য তাঁকে বিরক্ত করে। তিনি অন্য সবার মতো নন। তিনি সত্যিকারের ভবঘুরে। মানুষ দেখা পাগল।

লাইলি খালা বলেন—“এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের কোনো মিল নাই। এক জীবনে কি মানুষ দেখা ফুরায়, স্যার?”

এই হলো, আপাতত বর্তমানে ভাইরাল শিল্পী লাইলি খালার বৃত্তান্ত।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, ফরিদপুর।