দুই কিডনি অকেজো, থেমে যাচ্ছে ৩৩ বছর বয়সী সুমনের জীবনের গল্প!
একসময় ছিলেন সংবাদকর্মী। মানুষের সুখ-দুঃখ, অন্যায়ের প্রতিবাদ আর এলাকার নানা ঘটনার খবর পৌঁছে দিতেন সবার কাছে। পরে জীবনের স্বপ্ন বদলে যায়। ইউটিউবকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলেন নতুন এক পথচলা। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে নিজের জগতে ডুবে থাকতেন। ধীরে ধীরে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। অনেকেই ভাবতেন, হয়তো কাজের ব্যস্ততায় সময় পান না। কেউ কেউ বলতেন, ইউটিউব থেকেই মাসে লাখ টাকা আয় করেন, তাই আর আগের মতো মেলামেশা হয় না।
কিন্তু কেউ জানতেন না, সেই নীরবতার আড়ালে একদিন এমন ভয়ংকর বাস্তবতা অপেক্ষা করছে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলা সদরের বাসিন্দা মো. সুমন। বয়স মাত্র ৩৩ বছর। বাবা মো. শাহজাহান ফকির, যিনি একসময় সালথা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য ছিলেন। বাবার পথ ধরেই সুমনও সাংবাদিকতায় যুক্ত হন। ঢাকা থেকে ডিগ্রি শেষ করে এলাকায় ফিরে দৈনিক সকালের সময় পত্রিকার সালথা উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করেন। পাশাপাশি ইউটিউব কনটেন্ট তৈরিতে নিজেকে ব্যস্ত করে তোলেন। ২০২০ সালে সালথা প্রেসক্লাবের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক কিছু নিয়মের কারণে বাবা-ছেলে দু’জনেরই সদস্যপদ আর থাকেনি। তবুও সাংবাদিকতার প্রতি ভালোবাসা কখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
যারা সুমনকে কাছ থেকে চিনতেন, তারা বলেন—তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী একজন মানুষ। কারও সঙ্গে বিরোধ নয়, সবার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। হাসিমুখে কথা বলা, মানুষের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো—এসবই ছিল তার স্বভাব।
এরপর হঠাৎ করেই তিনি যেন হারিয়ে গেলেন সবার চোখের আড়ালে। দুই-তিন বছর ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেই, বন্ধুদের সঙ্গে নেই, সহকর্মীদের সঙ্গেও নেই। সবাই ভেবেছিল, হয়তো নতুন স্বপ্ন নিয়ে ব্যস্ত আছেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল আরও নির্মম।
শনিবার (১১ জুলাই) সুমনের বাবা শাহজাহান ফকির যখন কাঁপা কণ্ঠে বললেন, “আমার ছেলেটা ভালো নেই”, তখন যেন বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।
জানা গেল, প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে চিকিৎসকদের পরীক্ষায় ধরা পড়ে—সুমনের দুটি কিডনিই প্রায় সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। সেই থেকে শুরু হয় জীবন বাঁচানোর লড়াই। নিয়মিত চিকিৎসা, দামি ওষুধ, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম—সব মিলিয়ে প্রতি মাসেই প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় এক লাখ টাকা। ইতোমধ্যে চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় আট লাখ টাকা। কিন্তু সেই লড়াই এখন থমকে দাঁড়িয়েছে অর্থের অভাবে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, সুমনকে বাঁচাতে হলে দ্রুত কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। আর এই চিকিৎসায় প্রয়োজন প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা—যা একটি মধ্যবিত্ত তো দূরের কথা, অনেক সচ্ছল পরিবারের পক্ষেও জোগাড় করা কঠিন।
একজন অসহায় বাবা যখন নিজের সন্তানের দিকে তাকিয়ে কিছুই করতে পারেন না, তখন সেই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
শাহজাহান ফকির কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। বিক্রি করার মতো তেমন কোনো সম্পত্তিও নেই। চিকিৎসা চালাতে চালাতে যা ছিল, তাও শেষ হয়ে গেছে। টাকার অভাবে এখন চিকিৎসাও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। আমার ছেলেটা ছটফট করে। ওর দিকে তাকালে বুকটা ভেঙে যায়। কিন্তু আমি একজন বাবা হয়েও কিছু করতে পারছি না। মাঝেমধ্যে নিজেকেই খুব অসহায় মনে হয়। আহারে জীবন!”
সুমনের ব্যক্তিগত জীবনও ছোট্ট অথচ স্বপ্নে ভরা। তার আয়ান নামে ছয় বছরের একটি ছেলে রয়েছে। বাবার অসুস্থতা হয়তো সে পুরোপুরি বোঝে না, কিন্তু প্রতিদিন বাবাকে কষ্ট পেতে দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে শেখছে—জীবন কত কঠিন হতে পারে। একজন শিশুর সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা তার বাবা। সেই বাবাকেই যদি মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হয়, তবে সেই পরিবারের যন্ত্রণা কল্পনাও করা কঠিন।
একসময় যিনি মানুষের খবর তুলে ধরতেন, আজ তিনিই মানুষের সহানুভূতি আর ভালোবাসার অপেক্ষায়। যে মানুষটি নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে ব্যস্ত ছিলেন, আজ তার একমাত্র স্বপ্ন—আরও কিছুদিন বেঁচে থাকা, নিজের সন্তানকে বড় হতে দেখা, পরিবারের পাশে ফিরে দাঁড়ানো।
সমাজে অনেক হৃদয়বান মানুষ আছেন, অনেক প্রতিষ্ঠান আছেন, যারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। সবার সামান্য সহযোগিতাও কখনো কখনো একটি জীবন বাঁচিয়ে দিতে পারে। হয়তো কারও এক দিনের ব্যয়, কারও একটি ছোট অনুদান, কারও একটি মানবিক সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে নতুন করে বেঁচে থাকার সুযোগ এনে দিতে পারে সুমনের জন্য।
জীবন বড় অদ্ভুত। আজ যে মানুষটি অন্যের গল্প লিখতেন, আজ তার নিজের জীবনই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক গল্প। এই গল্পের শেষটা যেন মৃত্যু দিয়ে না হয়—এই প্রত্যাশাই সবার।
যদি কোনো হৃদয়বান ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন বা দানশীল প্রতিষ্ঠান সুমনের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে চান, তাহলে যোগাযোগ করতে পারেন তার বাবা মো. শাহজাহান ফকিরের সঙ্গে।
যোগাযোগ: ০১৭১৩-৫১৭৪৪৮ (বাবা)
অথবা প্রতিবেদক: ০১৭৪৪৪৮৫৩০০
হয়তো আপনার একটি সহযোগিতাই ফিরিয়ে দিতে পারে একটি ছয় বছরের শিশুর বাবাকে, একজন অসহায় মায়ের সন্তানকে এবং একজন ভেঙে পড়া বাবার মুখের হারিয়ে যাওয়া হাসিটুকু।
লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

আপনার মতামত লিখুন
Array