ফরিদপুরের শ্রেষ্ঠ এসআই প্রশান্ত কুমার মন্ডল
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় এগারো দলীয় জোট সমর্থিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত প্রার্থী আল্লামা শাহ্ আকরাম আলীর নির্বাচনী এজেন্ট মাওলানা আমীর হোসেনের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি কর্মীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে উপজেলার জয়বাংলা মোড় থেকে লেগুনাযোগে ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে রওনা দেন আমীর হোসেন। পথিমধ্যে ঝাটুরদিয়া এলাকায় পৌঁছালে কয়েকজন দুর্বৃত্ত গাড়ি থামিয়ে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নামিয়ে হাতুড়ি, ইট-পাথর ও রডসহ দেশীয় অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারালে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
পরিবারের দাবি, নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল এলাকায় ‘রিকশা’ প্রতীকের এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি চক্র বিএনপির পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করলে আমীর হোসেন বাধা দেন। এর জেরে পূর্বপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে মধ্য কাইচাইল এলাকার কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—এখলাস মাতুব্বর (৩২), শাহরিয়ার মাতুব্বর (৩৫), কাওসার মাতুব্বর (৩৩), বাবু মাতুব্বর (৩৪), আবু তাহের (৩৬) ও খালিদ মাতুব্বর (৩১) প্রমুখ।
এ বিষয়ে আল্লামা আকরাম আলীর মুখপাত্র মুফতি মুস্তাফিজুর রহমান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “কাইচাইল ইউনিয়নে রিকশা প্রতীকের এজেন্ট হিসেবে কাজ করার ‘অপরাধে’ মাওলানা আমীর হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি জানাই।”
অন্যদিকে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ বলেন, “দলীয় নির্দেশনা হচ্ছে—কোনো ধরনের সহিংসতায় জড়ানো যাবে না। কেউ ব্যক্তিগতভাবে জড়ালে তার দায় দল নেবে না। কে কাকে ভোট দিয়েছে, সেটি মুখ্য নয়। আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই।”
এদিকে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী জানান, এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় ‘রিকশা’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপির এক এজেন্টকে মারধর, কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও মিথ্যা প্রচারের অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগীরা।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১২টায় উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা যুব জমিয়তে ওলামা ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মুফতি এনায়েত তালুকদার অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা ও জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার ভাতিজা এসকেন তালুকদারকে কেন্দ্রের এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ভোটগ্রহণ চলাকালে তিনি লক্ষ্য করেন, উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তি ‘রিকশা’ প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন। বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানালে নির্বাচন শেষে ক্ষুব্ধ হয়ে এসকেন তালুকদারকে ধাওয়া করে মারধর করা হয়। প্রাণভয়ে তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, এ সময় ইশারত মোল্লার ছেলে মোস্তাকিনসহ কয়েকজনকে মারধর করে একটি দোকানের ভেতরে আটকে রাখা হয়। এতে তারা আহত হন। বর্তমানে এসকেন তালুকদার অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসাধীন বলে জানান তিনি।
মুফতি এনায়েত তালুকদার বলেন, জুমার নামাজের পর হাফিজুর মৃধার ছেলে সিয়াম মসজিদ থেকে বের হলে কয়েকজন তাকে মারধর করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয় এবং পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। তার অভিযোগ, প্রথমে প্রতিপক্ষ মৃধা বাড়িতে হামলা চালায়। পরে ধানের শীষের সমর্থক রবিউল মৃধার বাড়িসহ শহিদ ও রিপন তালুকদারের বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়। বাধা দিতে গেলে তাদের ওপরও হামলা হয়।
তিনি অভিযোগ করেন, আসন্ন চেয়ারম্যান নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি পক্ষ বাহিরদিয়া গ্রামের সঙ্গে সমঝোতা করে ‘রিকশা’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার চেষ্টা করছিল। বিষয়টি প্রকাশ পেয়ে গেলে উল্টো তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালানো হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সহ-দপ্তর সম্পাদক তালুকদার আমান হুসাইন বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিজয় মিছিল না করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং কেন্দ্রীয় নেতা শামা ওবায়েদও সংঘাতে না জড়াতে পরামর্শ দেন। তারা সেই নির্দেশনা মেনে পরিস্থিতি শান্ত রাখার চেষ্টা করলেও নির্বাচনের দিন ও পরবর্তী সময়ে হুমকি, মারধর ও ভাঙচুরের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
অভিযোগের বিষয়ে সালথা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান তালুকদার বলেন, সংবাদ সম্মেলনে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তার দাবি, যারা অভিযোগ তুলেছেন তারা আ.লীগের কর্মী এবং ‘রিকশা’ প্রতীকের পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি আরও বলেন, গলায় ধানের শীষ ঝুলিয়ে রিকশায় ভোট দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে এবং এদের আশ্রয় দিয়েছেন বিএনপি নেতা আছাদ মাতুব্বর।
তবে আছাদ মাতুব্বর এসব অভিযোগ নাকচ করে বলেন, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সবাই বিএনপির কর্মী এবং তারা ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। সিদ্দিকুর রহমান তালুকদারের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, একই গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেই এ বিরোধের সৃষ্টি।
এদিকে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই স্থানীয় নেতৃত্বের কোন্দল প্রকাশ্যে আসায় সালথার রাজনীতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ফরিদপুর-২ আসনের সালথা ও নগরকান্দা উপজেলায় নির্বাচন-পরবর্তী উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ, বাড়িঘর ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে সহিংসতা পরিহার করে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মাওলানা শাহ মো. আকরাম আলী (ধলা হুজুর)।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় তিনি নগরকান্দা-সালথাবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “আপনাদের ভালোবাসা, স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ও আস্থা আমাকে অভিভূত করেছে। আপনারা আমাকে এবং আমার সংগঠন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-কে ‘রিকশা’ প্রতীকে যে সমর্থন দিয়েছেন, তা আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
তিনি উল্লেখ করেন, বিপুল ভোট প্রাপ্তি প্রমাণ করে মানুষ পরিবর্তন চায় এবং নীতি-আদর্শভিত্তিক ইনসাফের রাজনীতি প্রত্যাশা করে। “এই জাগরণই আমাদের শক্তি ও আশা,” বলেন তিনি। একইসঙ্গে ত্যাগী নেতা-কর্মী, সমর্থক, প্রবাসী ভোটার, পরিবার-পরিজন, মা-বোন এবং বিশেষ করে ছাত্র ও যুব সমাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। তাদের উদ্দেশে দোয়া কামনা করে বলেন, “মুমিনের জীবনে হতাশা নেই। মহান আল্লাহ পরিশ্রম ও সৎ নিয়তকে বিফল করেন না।”
বর্তমান সহিংস পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ধলা হুজুর সকলকে কাইজা-দাঙ্গা, প্রতিহিংসা ও মারামারি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমরা একই এলাকার মানুষ। নির্বাচন তো আজ আছে, কাল থাকবে না। কিন্তু আমাদের সহাবস্থান ও সম্প্রীতি চিরস্থায়ী। আসুন, সবাই মিলেমিশে নগরকান্দা-সালথায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করি এবং মানবতার কল্যাণে কাজ করি।”
এদিকে সাম্প্রতিক কয়েকদিন ধরে সালথা ও নগরকান্দার বিভিন্ন গ্রামে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী টহল জোরদার করেছে।
বার্তায় ধলা হুজুর ধানের শীষের বিজয়ী প্রার্থী শামা ওবায়েদ ইসলাম-কে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নবনির্বাচিত এই জনপ্রতিনিধি দল-মত নির্বিশেষে নগরকান্দা-সালথার জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা ও এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবেন।
উল্লেখ্য, শামা ওবায়েদ ইসলাম হলেন মরহুম কে. এম. ওবায়দুর রহমান-এর কন্যা, যিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও জনপ্রিয়তা এই আসনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।
সবশেষে ধলা হুজুর মহান আল্লাহর সহায়তা কামনা করে বলেন, মানুষের আস্থা অর্জনের যে যাত্রা শুরু হয়েছে তা থামবে না। “আজ ফলাফল যাই হোক, মানুষের ভালোবাসাই আমাদের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় পুঁজি। আমরা আরও সংগঠিত হব, আরও দক্ষ হব এবং মানুষের পাশে দাঁড়াব—ইনশাআল্লাহ।”
এলাকাবাসী এখন আশা করছেন, সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও সংযমের মাধ্যমে দ্রুত সহিংসতা বন্ধ হয়ে নগরকান্দা-সালথায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরে আসবে।
আপনার মতামত লিখুন
Array