খুঁজুন
সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ২৪ ফাল্গুন, ১৪৩২

আওয়ামী লীগ কি নিষিদ্ধ হচ্ছে

ইলিয়াস সরকার, বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫, ১০:২৫ এএম
আওয়ামী লীগ কি নিষিদ্ধ হচ্ছে

 বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে সাড়ে ৮১ বছরের পুরোনো দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আন্দোলন দমনের নামে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও গণহত্যার অভিযোগ উঠেছে দলটির বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ১৪শ’র বেশি মানুষকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

ফলে দলটিকে নিষিদ্ধ করার দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে ভারতে অবস্থান করছেন। একইসঙ্গে গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে দলটির প্রথম সারির বেশিরভাগ নেতা দেশ-বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকে পালাতে না পেরে এরইমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী।

এ অবস্থায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীসহ বিভিন্ন মহল থেকে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে। তাদের অভিযোগ, গণহত্যার পর কোনো দলের রাজনীতি করার অধিকার থাকে না। বিশেষ করে সম্প্রতি ভারত থেকে অনলাইন মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে শেখ হাসিনার উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রচারের পর সে দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।

তবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো অফিসিয়ালি এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেনি। দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জনগণই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

এদিকে চিফ প্রসিকিউটর বলছেন, কোনো দল নিষিদ্ধ হবে কি না বা কোনো দলের বিচার হবে কি না সেটা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

অন্যদিকে আইনজীবীরা বলছেন, বিচার বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পাকিস্তান আমলে অধিকার আদায়ের সব আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও বিভিন্ন গণআন্দোলনে শামিল ছিলো দলটি। ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে দেন শেখ মুজিবুর রহমান। পরে জিয়াউর রহমানের আমলে আওয়ামী লীগ নতুন করে নিবন্ধন পায়।

চব্বিশের আন্দোলন ও শেখ হাসিনা সরকারের পতন
১৯৭৫ সালের পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফের শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতার মসনদে বসে আওয়ামী লীগ। কিন্তু পরবর্তী তিন নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম করে দলটির নেতৃত্বাধীন সরকার। ২০১৪ সালে বিনা ভোটে, ২০১৮ সালে রাতের ভোটে এবং ২০২৪ সালে বিরোধী জোট বিহীন নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু নির্বাচন নিয়েই নয়, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ধংস, ব্যাংক লুট, অর্থ পাচার, গুম, খুন, বৈষম্যসহ নানান অভিযোগ ওঠে দলটির বিরুদ্ধে।

এর মধ্যে কোটা নিয়ে একটি রায়কে কেন্দ্র গত বছরের মাঝামাঝিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে ওঠে। ওই আন্দোলনে গণহত্যা চালানোর দায় মাথায় নিয়ে ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। অধ্যাপক ড.মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ওই সরকারের অনুরোধে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে ঘটনার অনুসন্ধান করা হয়। সেই অনুসন্ধানে আন্দোলনে ছাত্র জনতার ওপর শেখ হাসিনা সরকারের নৃশংসতা উঠে আসে। তার আগে ২৩ অক্টোবর তাদের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। সন্ত্রাস বিরোধী আইন, ২০০৯ এর ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এর ক্ষমতাবলে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে গেজেট জারি করে। পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, আমলা, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য, সাবেক বিচারপতির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সে মামলাগুলো তদন্তাধীন রয়েছে।

এ অবস্থায় আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি তোলো।

বৈষম্যবিরোধীদের দাবি
সম্প্রতি আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজ ও ইউটিউবে ‘ছাত্রসমাজের উদ্দেশে’ সরাসরি বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। তার ওই বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বানে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি প্রায় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নিষিদ্ধে দাবি তোলা হয় আওয়ামী লীগকে । এ বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিনিয়ত পোস্ট করে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে ভাংচুরের পর গাজীপুরে হামলায় আহত কাশেমের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ লিখেছেন, ‘প্রতিবিপ্লবের প্রথম শহীদ আমার এই ভাই। ইন্টেরিম (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করো, করতে হবে’।

একইদিন আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে আরও দুইটি পোস্ট করেন তিনি। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে কফিন মিছিল করা হয়।

সর্বশেষ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এ শীর্ষ নেতা  এক  জরুরী পোস্টে ১৪০০জনকে হত্যা ও হাজার হাজার মানুষকে নির‌্যাতনের  অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি তোলেন।

এমন পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে স্পষ্ট কিছু বলেনি নির্বাচন কমিশন। তারা বিষয়টি সময়ের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন কি বলছে?
১৬ ফেব্রুয়ারি রোববার দুপুরে নির্বাচন ভবনে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে থাকতে পারবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। বলেন, ‘আমাদের এ বিষয়ে বলার সময় এখনো আসেনি। আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে। অপেক্ষা বলতে আরও সময় লাগবে। এ বিষয়ে আমরা এখনো কিছু বলতে চাচ্ছি না। সময়ই বলে দেবে, সময়ই আমাদের গাইড করবে। সময়ই বলবে, আমরা কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। ’

বিষয়টি নির্বাচন কমিশন সময়ের ওপর ছেড়ে দিলেও বিএনপি সিদ্ধান্তের ভার দিয়েছে জনগণের ওপর।

জনগণই সিদ্ধান্ত নিবে: মির্জা ফখরুল
১৩ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এটা তো আমরা পরিষ্কার করে বলেছি যে, জনগণ উইল ডিসাইড। আমরা পক্ষ-বিপক্ষ থাকা ইমমেটেরিয়াল… পিপলস উইল ডিসাইড। ‘

নিষিদ্ধের আগে বিশ্লেষণ করতে হবে: আইনজীবী
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, দল নিষিদ্ধে সরকারের একটা ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিলো। যেদিন নিষিদ্ধ ওদিন বলেছিলাম যে অভিযোগে নিষিদ্ধ করা যায় সেটা প্রমাণ করা খুব কঠিন। দল নিষিদ্ধ করতে হলে, রাষ্ট্র-সার্বভৌমত্ব বিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সেটা প্রমাণ করতে হবে। এটা জামাতে ইসলামীকে করলো। কিনতু করার কয়েকদিনের মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটে গেলো এবং সরকারের পতন হয়ে গেলো। এটা হলো একটা প্রেক্ষাপট।

‘এখন একটা আলোচনা হলো যারা অভ্যুথান করে ক্ষমতায় এসছে তাদের কিছু কিছু বলতে চাচ্ছেন এটা (আ’লীগ) নিষিদ্ধ করা হোক। তারা আর রাজনীতি করতে পারবে না। আমি মনে করি এগুলো পলিটিক্যাল বক্তব্য। সংবিধানে বলা আছে , রাজনীতি করা মৌলিক অধিকার। কোনো সিদ্ধান্ত মৌলিক অধিকার পরিপন্থি হওয়া যাবে না। সংবিধান হলো প্রধান আইন। সংবিধান পরিপন্থি কিছু করতে পারবেন না। নিষিদ্ধ করতে হলে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে। সেটির কতটুকু বাস্তবতা আছে তা বিশ্লেষণ করতে হবে। ’

অতীতের অভিজ্ঞতা নিয়ে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, পাকিস্তান আমলে দেখেছি দল করতে না পারলে তখন তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যায়। স্বাধীনতার পরে সর্বহারা পার্টি দেখেছি, নিষিদ্ধ ছিলো।

সব কিছু দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অপরাধ করবেন বিচার হবে। সেটা ব্যক্তি হতে পারে। নারী হতে পারে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী হতে পারে। তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু দল তো অন্য জিনিস।

রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ব্যাপার: চিফ প্রসিকিউটর
জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম রাজনৈতিক দল নিয়ে বলেন,  রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হবে কি হবে না  এটা রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। তবে দলগত ভাবে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সেই দল বা সংগঠনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেওয়ার সুযোগ আমাদের আইনে আছে। সে ক্ষেত্রে দলের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা বা অভিযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ আছে। সেটা ভবিষ্যতে করা হবে কিনা আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। তবে অভিযোগ তথ্য প্রমাণাদি বিদ্যমান আছে। প্রয়োজন হলে সে ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হতে পারে। বাট এটার পেছনে রাষ্ট্রের একটা সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে।

দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের এক ধরনের শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি: আসিফ মাহমুদ

মঙ্গলবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) ডিসি সম্মেলনের তৃতীয় দিনের অধিবেশন শেষে স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, সারা বিশ্বে ফ্যাসিস্টদের যে নজির, আওয়ামী লীগেরও তেমন হওয়া উচিত। আমরা ইউরোপের দেশগুলোকে গণতন্ত্রের মডেল হিসেবে ধরি। জার্মানি ও ইতালিতে ফ্যাসিস্টদের কী হয়েছিল, আমাদের সামনে সেই নজির রয়েছে।

তিনি বলেন, যেহেতু আন্তর্জাতিকভাবে এই গণহত্যা ডকুমেন্টেড হয়েছে, সেই জায়গা থেকে আমরা মনে করি, দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের এক ধরনের শাস্তি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কোন প্রক্রিয়ায় কী শাস্তি হতে পারে সে বিষয়েও সবার মতামত নেওয়া সরকার প্রয়োজন মনে করেন, আশা করি তারপর একটা সিদ্ধান্ত সরকার নিতে পারবে।

যে আইনে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ
সন্ত্রাস বিরোধী আইনের ১৮। (১) এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার, কোন ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যের সহিত জড়িত রহিয়াছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে।

(২) সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে কোন ব্যক্তি বা সত্তাকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে বা তফসিল হতে বাদ দিতে পারবে অথবা অন্য কোনভাবে তফসিল সংশোধন করতে পারিবে।

আওয়ামী লীগের জন্ম ও ইতিহাস
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর কেএম দাস লেন রোডের রোজ গার্ডেন প্যালেসে ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠিত হয়, যার সভাপতি ছিলেন টাঙ্গাইলের মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক। শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে রফিকুল হোসেনকে (খায়ের মিয়া) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

পরে ১৯৫৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দলের তৃতীয় সম্মেলনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়; নতুন নাম রাখা হয়: ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’।

তার আগে ১৯৫২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৬৬ সালে সভাপতি হন শেখ মুজিব। ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এ পদে ছিলেন তিনি। পরের বছর ১৫ আগস্ট এক সেনা অভ্যুত্থানে দুই কন্যা ছাড়া পরিবারের বাকি সদস্যদের সঙ্গে তিনি নিহত হন।

বিদেশে থাকা অবস্থায় ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয় শেখ হাসিনাকে। সেই থেকে তিনি একই পদে আছেন।

১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৯:৪৪ পিএম
১৫ বছর পর আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূরের বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দেওয়া বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এ বিষয়ে সোমবার (৯ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা-১ শাখা থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক উপকমিশনার (পশ্চিম) কোহিনূর মিয়ার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হবে। পাশাপাশি তিনি বিধি অনুযায়ী সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দুটি বিভাগীয় মামলা হয়েছিল। এ কারণে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তকরণের গুরুদণ্ডও দেওয়া হয়। পরে তিনি ফৌজদারী মামলা দুটির অভিযোগ থেকে আদালতের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণ হয়ে খালাস পান।

এছাড়া তার গুরুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন রাষ্ট্রপতি মঞ্জুর করায় আরোপিত চাকরি থেকে বরখাস্তের আদেশটি বাতিল করা হয়। তাই কোহিনূর মিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভাগীয় মামলায় ২০১১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করা হলো। একই সঙ্গে তার বরখাস্তকালকে চাকরিকাল হিসেবে গণ্য করা হলো এবং তিনি বিধি মোতাবেক সব ধরনের বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্য সুবিধা পাবেন। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে।

 

 

বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও লাবলু মিয়া, সালথা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৯ পিএম
বয়স ৮৭, তবু থামেননি—পুকুরপাড়ে বসেই চলছে অকিল শীলের সেলুন

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। নেই কোনো ঘর, নেই আধুনিক সেলুনের ঝাঁ চকচকে সাজসজ্জা। তবু এই পুকুরপাড়েই প্রতিদিনের মতো বসে মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। হাতে পুরোনো কাঁচি আর ক্ষুর—এই সামান্য সরঞ্জাম নিয়েই তিনি টানা ৬৬ বছর ধরে মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন।

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামেও এখন গড়ে উঠেছে অসংখ্য সেলুন। উন্নত চেয়ার, আয়না, বৈদ্যুতিক ট্রিমার আর সাজানো দোকান—সবই আছে সেখানে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারের এই পুকুরপাড়ে বসা বৃদ্ধ নাপিতের কাছে এখনও ভিড় করেন অনেকেই। কারণ তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু বছরের স্মৃতি, বিশ্বাস আর গ্রামীণ জীবনের এক সরল অধ্যায়।

শৈশবেই পেশায় যুক্ত:

অকিল শীলের বাড়ি পাশের নগরকান্দা উপজেলার সদর গ্রামের চৌমুখা এলাকায়। তাঁর পিতা হরিবদন শীল ছিলেন পেশায় নাপিত। ছোটবেলা থেকেই বাবার পাশে বসে তিনি এই কাজ শেখেন। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তাই কৈশোরেই জীবিকার তাগিদে পেশাটিকে বেছে নিতে হয় তাকে।

প্রথমদিকে বাবার সঙ্গে বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন তিনি। পরে ধীরে ধীরে নিজেই কাজ শুরু করেন। প্রায় ৬৬ বছর আগে মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে বসেই তিনি নিজের কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। সেই শুরু থেকে আজও একই জায়গায় বসেই কাজ করে যাচ্ছেন অকিল শীল।

হাটের দিনেই জমে ওঠে সেলুন:

মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। সাধারণত হাটের দিন সকাল থেকেই পুকুরপাড়ে চলে আসেন অকিল শীল। সঙ্গে থাকে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি, পুরোনো কাঁচি, ক্ষুর আর কয়েকটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেই শুরু হয় তাঁর দিনের কাজ। গ্রামের মানুষজন একে একে এসে বসেন তাঁর সামনে। কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, কেউ আবার সিরিয়াল ধরে বসে থাকেন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বয়সের ভারে শরীর কিছুটা নুয়ে পড়লেও কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহে কোনো ঘাটতি নেই। মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে কাঁচি চালিয়ে চুল কাটছেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্ষুর দিয়ে দাড়িও ছেঁটে দেন।

এই পুকুরপাড়ের ছোট্ট জায়গাটিই যেন তাঁর সেলুন, আবার কর্মজীবনের স্মৃতিবহ স্থান।

গ্রাহকদের কাছে প্রিয় ‘অকিল দা’:

স্থানীয় অনেকেই এখনও আধুনিক সেলুন ছেড়ে অকিল শীলের কাছেই চুল কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ তাঁদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই বৃদ্ধ নাপিতের সঙ্গে।

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, “আমি সেলুনে চুল কাটাই না। ছোটবেলা থেকে অকিল দার কাছেই চুল কাটাই। এখন বয়স হয়েছে, তবু তাঁর হাতের কাঁচির ওপর ভরসা আছে।”

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, “ওনার কাছে ধনী-গরিব সবাই চুল কাটান। কেউ তাকে অবহেলা করে না। বরং অনেকেই গল্প করতে করতে চুল কাটান। ওনার কাছে চুল কাটাতে অন্যরকম একটা আনন্দ আছে।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, অকিল শীল শুধু একজন নাপিত নন, তিনি যেন বাজারের একটি জীবন্ত ইতিহাস।

সামান্য আয়েই চলে সংসার:

অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি প্রতি জনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে তাঁর কাছে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক আসেন। সেই হিসেবে প্রতিদিন খুব বেশি আয় হয় না।

তবুও এই সামান্য আয়ের ওপরই ভর করে তিনি নিজের সংসার চালানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই এই কাজ করছি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কেটে সংসার চালিয়েছি। এখন অনেক সেলুন হয়েছে, তবুও পুরোনো গ্রাহকেরা আসে।”

বয়সের কারণে কাজ করা কঠিন হলেও তিনি এখনো থামতে চান না।

অকিল শীল বলেন, “বয়স তো অনেক হয়েছে। শরীরও আগের মতো শক্তি পায় না। কিন্তু কাজ না করলে মন ভালো লাগে না। তাই যতদিন পারি কাজ করেই যেতে চাই।”

পরিবারের কেউ নেননি পেশা:

অকিল শীলের পাঁচ ছেলে-মেয়ে রয়েছে। তবে তাঁদের কেউই বাবার পেশাকে অনুসরণ করেননি। সবাই ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যুক্ত হয়েছেন।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি কখনো জোর করিনি। তারা যার যার মতো কাজ করছে। আমি আমার কাজ নিয়েই খুশি।”

তবে তাঁর জীবনের এই দীর্ঘ কর্মযাত্রা এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।

গ্রামীণ ঐতিহ্যের এক প্রতীক:

স্থানীয়দের মতে, মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড় মানেই অকিল শীল। বহু বছর ধরে তিনি এই জায়গাটিকে নিজের কর্মস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

একসময় গ্রামে এভাবেই খোলা আকাশের নিচে বসে নাপিতেরা মানুষের চুল-দাড়ি কাটতেন। আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু মাঝারদিয়া বাজারে এখনও সেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রেখেছেন অকিল শীল।

স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা ছোটবেলা থেকেই দেখছি উনি এখানে বসে চুল কাটছেন। বাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, দোকানপাট বেড়েছে, কিন্তু উনার জায়গা বদলায়নি।”

কাঁচির টুংটাং শব্দে লেখা জীবনের গল্প:

পুকুরপাড়ে বসে কাঁচির টুংটাং শব্দ তুলতে তুলতে যেন নিজের জীবনের গল্পই লিখে চলেছেন অকিল শীল।

গ্রামীণ জীবনের সরলতা, পরিশ্রম আর আত্মমর্যাদার এক অনন্য উদাহরণ তিনি। বয়সের ভার, আধুনিকতার চাপ—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।

হাটের দিনগুলোতে এখনো মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায় সেই পরিচিত দৃশ্য—একটি ছোট পিঁড়ি, হাতে কাঁচি ও ক্ষুর, আর সামনে বসা গ্রাহক।

সময়ের স্রোতে অনেক কিছু বদলে গেলেও, অকিল শীল যেন এখনো ধরে রেখেছেন সেই পুরোনো দিনের গল্প। তাঁর কাঁচির টুংটাং শব্দেই যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে গ্রামীণ বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়।

ভাঙ্গায় হাইলাইট চক্ষু হাসপাতালের উদ্যোগে প্রশিক্ষণার্থীদের ইফতার ও দোয়া মাহফিল

সোহাগ মাতুব্বর, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬, ৬:২৫ পিএম
ভাঙ্গায় হাইলাইট চক্ষু হাসপাতালের উদ্যোগে প্রশিক্ষণার্থীদের ইফতার ও দোয়া মাহফিল

পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় হাইলাইট চক্ষু হাসপাতাল কেয়ারগিভিং সেন্টারের উদ্যোগে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ে ইফতার ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সোমবার (৯ মার্চ) সন্ধ্যায় ভাঙ্গা উপজেলার হাইলাইট চক্ষু হাসপাতাল কেয়ারগিভিং সেন্টারের মিলনায়তনে এ আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে হাসপাতালের চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, মানবসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। দক্ষ ও মানবিক মনোভাবসম্পন্ন সেবাকর্মী তৈরি করতে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চাও প্রয়োজন। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে ভবিষ্যতে মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার আহ্বান জানান।

ইফতার মাহফিলে হাইলাইট চক্ষু হাসপাতাল কেয়ারগিভিং সেন্টারের বিভিন্ন ট্রেডের প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অংশগ্রহণ করেন। ইফতারের আগে এক সংক্ষিপ্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে রমজানের তাৎপর্য, সংযম ও মানবিকতার শিক্ষা নিয়ে বক্তব্য রাখেন উপস্থিত অতিথিরা।

পরে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং হাসপাতালের সার্বিক উন্নতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। এ সময় বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের কল্যাণ এবং সকলের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী প্রশিক্ষণার্থীরা জানান, এ ধরনের আয়োজন তাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে। একই সঙ্গে রমজানের পবিত্রতা ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে নতুন করে অনুপ্রাণিত হতে সহায়তা করে।

সর্বশেষে উপস্থিত সবাই একসঙ্গে ইফতার গ্রহণ করেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভবিষ্যতেও প্রশিক্ষণার্থীদের অংশগ্রহণে এ ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন অব্যাহত থাকবে।