ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার ব্রাহ্মণকান্দা আব্দুল শরীফ একাডেমির প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার মাত্র তিন দিন আগে বহিরাগতসহ অযোগ্য ২১ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় ভাঙ্গা উপজেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ইতোমধ্যে এক অভিভাবক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, বিদ্যালয়টির নিয়মিত এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল ৩৯ জন। পরে বিশেষ তদবিরের মাধ্যমে দুই থেকে চার বিষয়ে অকৃতকার্য আরও ২৮ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়। এর পর পরীক্ষার মাত্র তিন দিন আগে আরও ২১ জন অযোগ্য ও বহিরাগত শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করে তাদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। এভাবে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলেও এর একটি অংশ মাত্র বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হয়েছে।
এ অনিয়মের কারণে পরীক্ষার শুরু থেকেই প্রতিদিন ২১টি করে প্রশ্নপত্র কম পড়ে যায়। এতে পরীক্ষাকেন্দ্র ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরে বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে জানানো হলে তিনি অনলাইনে যাচাই করে প্রশ্নপত্র সংকটের সত্যতা পান। এরপর ট্রেজারির মাধ্যমে অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র পুলিশ পাহারায় ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গায় পাঠানো হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ভাঙ্গা গার্লস স্কুলের হল সুপার অরুণ দত্ত বলেন,
“প্রশ্নপত্র কম পড়ার বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রককে জানানো হলে তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নেন। পরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অতিরিক্ত প্রশ্নপত্র এনে পরীক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা হয়।”
এ ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির, সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির, কয়েকজন সহকারী শিক্ষক, কম্পিউটার শিক্ষক মো. শাহআলম এবং অভিভাবক সদস্য সাজিব তালুকদার সজল।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক এনামুল কবির বলেন, “দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় আমি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারিনি। আমি ৬৭ জন পরীক্ষার্থীর ফরম পূরণ করেছি। বাকি ২১ জনের ফরম কীভাবে পূরণ হয়েছে, তা আমি জানি না। আমার পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে কয়েকজন শিক্ষক এসব কাজ করেছেন। এ নিয়ে আমি বাধাও দিয়েছি। এমনকি আমাকে হাত-পা ভেঙে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছে।”
অন্যদিকে সহকারী প্রধান শিক্ষক গোলাম কবির বলেন, “প্রধান শিক্ষকের অনুমতি নিয়েই ২১ শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করা হয়েছে। ফরম পূরণের কিছু টাকা বিদ্যালয়ের ফান্ডে জমা হয়েছে। কোচিং ফি বাবদ চার হাজার টাকা করে নেওয়া হয়েছে, যা কয়েকজন শিক্ষক ভাগ করে নিয়েছেন।”
বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য সাজিব তালুকদার সজল জানান, “অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের জন্য অনুরোধ করেছিলেন। এলাকার পরিবেশ শান্ত রাখার স্বার্থে কয়েকজন শিক্ষার্থীর বিষয়ে সুপারিশ করেছি। এক নেতার সুপারিশে একজন বহিরাগত পরীক্ষার্থীও নেওয়া হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কে কত টাকা নিয়েছে, তা আমি নিশ্চিত নই।”
এদিকে কয়েকজন অভিভাবক অভিযোগ করেন, ফরম পূরণের নামে প্রায় ৮ লাখ টাকার বেশি আদায় করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা হলেও বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তাদের দাবি।
তাদের অভিযোগ, অযোগ্য শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ায় বিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। পাশাপাশি লেখাপড়ার মান ও পাসের হারও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের সভাপতি ও নবাগত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “আমি বিষয়টি এখনই বিস্তারিত জানলাম। যদি কেউ অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, তাহলে তদন্ত সাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
আপনার মতামত লিখুন
Array