খুঁজুন
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯ মাঘ, ১৪৩২

জলে ভাসা নীলডুমুরের ফুল

সেলিনা শিউলী
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৬ জুন, ২০২৫, ১২:৩১ পিএম
জলে ভাসা নীলডুমুরের ফুল

পিল পিল করে পায়ে হেঁটে মাটির কাঁচা রাস্তা ধরে ধূলি উড়িয়ে যাচ্ছে নানা বয়সী কিছু মানুষ। পথে পথে বাড়তে থাকে ঘরফিরতি উৎসুক মানুষের দল। এ-যাত্রায় মুখে আনন্দের বিন্দুমাত্র নেই, আছে বাতাসে ভর দেওয়া কানে-মুখে ফিসফিসানি। ছোটরা মুখ উঁচু করে কান খাড়া করে পাশের মানুষটা কী বলছে গোপনে তা জানার জন্য। হাঁটার পথে আছে উহ্-আহ্ শব্দ। কেউ কেউ কোনো কথা বলছে না, চেহারায় ভয় ও আতঙ্ক নিয়ে চলছে। কেউ ছুটছে ঊর্ধ্বশ্বাসে, কারো বা দৃষ্টিতে শূন্যতা। বাঁ পায়ে বাঘের কামড়ে মাংস তুলে নেওয়া ক্ষত নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে দিগি¦দিকশূন্য হয়ে ছুটছে। আলিমের ছেলেবেলার বন্ধু করিমের হাতের লালরঙা গামছায় বাঁধা আলিমের কল্লাটা। আলিম কাঠ কাটতে গিয়ে বাঘের নিশানায় পড়ে যায়। তাকে টেনে বনের গভীরে নিয়ে যায় বাঘ। আলিম কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ। সঙ্গীরা লাঠিসোটা নিয়ে খুঁজতে গিয়ে দেখে ওর ছেঁড়া শার্ট, প্যান্ট এদিক-সেদিক আর কিছু হাড়গোড় পড়ে আছে, অদূরে পড়ে আছে মাথাটা। এরপর গন্তব্য তাদের হাওলাদার বাড়ি।

পালের গোদা গ্রামের জসিম মাতবর। তিনি হাত-কাটা নাসিমুদ্দিন, ল্যাংড়া কাদেরসহ তিনজনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলেছেন। নাসিমুদ্দিন বলে, কপাল আমাগো ভালো, এদিক আইছিলেন বইল্যা পাইলাম আপনেরে।

মাতবর বলে, হুম। কলিমরে চিনতাম আমি, এমন কইরা চইল্যা যাইবো তা ভাবি নাই। আল্লাহর হুকুম ছাড়া কিছুই হয় না রে।

তিনি নিজের মতোই বলতে থাকেন, শোনো মানুষ যেমন বাঘরে ভয় পায়, তেমনি বাঘ কিন্তু মানুষরে ভয় পায়। গুলপট্টি মারতেছি না, এ হইল সুন্দরবনের বাঘ। জিম করবেটসহ বিখ্যাত সব শিকারির কাছে শুনছি – সব জায়গাতেই মানুষখেকো বাঘ আছে, কম আর বেশি। কিন্তু সুন্দরবনের বাঘ কিন্তু মানুষের মতোই সেয়ানা আর চালাক। ছোটবেলা থেকে শুইনা আসতেছি, বাঘ নাকি ভরা পেটে থাকলে শিকারের পিছে ছোটে না; কিন্তু কখনো কখনো এই বনের বাঘ দুঃসময়ের জন্য শিকার করে সেই খাবার জমায়া রাখে। ওই শালা সেয়ানা, তক্কেতক্কে থাকে, যেই না একবার কাউরি একলা পালো, অমনি মনে কর তাকে শিকার করি ফালালো। আমি একবার এক লেখায় পড়ছিলাম সুন্দরবনের বাঘ নিয়া। সেখানে লেখছে, সুন্দরবনের লবণাক্ত পানি বাঘের যকৃৎ আর কিডনিকে আক্রান্ত করে, সেই কারণে বাঘের ভিতর অস্বস্তি তৈরি হয়। যে কারণে এখানকার বাঘ ভিতরে ভিতরে হিংস্র হইয়া যায়। বুঝলি কি হয়? বন বিভাগ তো কয়েছে রেজিস্টার্ড যারা তারা বনে যাতি পারবি না, কিন্তু মানা করলি তো আর প্যাট বাঁচবি না। প্যাটের খাওন চাই। বুঝলি, খাওন। ওসব আইনকানুন দিয়া কি আর প্যাট বাঁচে। এই প্যাটের জন্যি সব, এই প্যাটটা না থাকলি পরে ওসব নিয়মকানুন মানলিও চলে। এই যে আলিমডা মরল, সরকারি কিছু পাইব না। এই কারণে মনডা খারাপ হয়ি যায়।

নাসিমুদ্দিন বিস্ময় প্রকাশ করে বলে, কন কী? কি ভয়ংকর! শুধু নোনা পানির লাইগ্যা?

মুখে বললেও তার মনের ভেতর কিন্তু নানা কথা চলে, হাঁটে আর মাথা চুলকায়, সাহস পায় না, মাতবরকে কীভাবে বলে কথাটা। বলে, আলিম ভালা মানুষ আছিল। তয় হুজুর যাই কন, আলিমের বউডা ভাতারখাকি, অপয়া আর কুলটা। নাইলে এমুন হয়! দেখছেন এই বাপের জনমে মাথাডা ধড়ের লগেও নাই? বছর ঘুরতে না ঘুরতেই এক মাসের ছাওয়াল নিয়া বিধবা হয়? শঙ্খিনী জাতের মাইয়া এইডা। এই জাতের মাইয়া বিয়া করলি সাক্ষাৎ মৃত্যু – বলে বিজ্ঞের মতো ঘাড় নাড়ে নাসিমুদ্দিন।

শোরগোল শোনা যায়। উৎসুক বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় জটলা পাকানো মানুষের দল। আলিমের হাওলাদার বাড়িব দরজায় সমবেত হয় উৎসুক জনতা। এ-বাড়ির সামনে বহু মানুষের ভিড় আজ। উঠানে জায়গা হয় না, এত মানুষ। ফাল্গুন মাসের শেষ দিন, চারদিকে ঝকঝকা রোদ। বাতাসের তোড়ে আলগা ধুলোর ঝাপটা সবার চোখমুখ ছুঁয়ে যায়।

ঘরের পেছন দিকটায় গরু-ছাগলের বিচরণ বন্ধ করতে কাউফলা গাছের ডাল কলাগাছের ফেতনা দিয়ে বেঁধে, পুরনো মাছ ধরার জাল আর তালগাছের একটা ডাল কেটে করাত বানিয়ে গোবরজল, ধানের কুড়া আর আঠালো মাটি গুলে ঘরের পিড়া লেপতে ব্যস্ত তখন জমিরন বেওয়া।

বাড়ির বউ আছিয়া বেগম গত সপ্তাহে উঠান নিকিয়েছে। সে-উঠানে হোগলা পাটি বিছিয়ে শীতে নামানো লেপ-কাঁথা আর বালিশ শুকাতে দিয়ে, গাছ থেকে পড়া শুকনো পাতা ঝাড়ু দিয়ে একটি হাজিতে রাখছিল আছিয়া। দুই শরিকের ঘর, এক বাড়ি। পুরুষ বলতে কেউ নেই। আছিয়ার শ্বশুর মরেছেন বছর আটেক আগে। সুন্দরবনে জোংরা শামুক সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি বাঘের পেটে যান। সে বার দল থেক দূরে গিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন নবীন হাওলাদার। হঠাৎ বাঘের আক্রমণে তার আর্তচিৎকারে উপস্থিত সবাই ভয়ে যে যেদিকে পেরেছে দৌড়ে পালিয়েছে। কিছুক্ষণ পর সবাই লাঠিসোটা নিয়ে এক জায়গায় জড়ো হয় বটে, ততক্ষণে সময় গড়িয়েছে অনেকটা। বনের ভেতরে কে আগে যাবে – এ জাতীয় দেনদরবার করতে করতে সবাই একসঙ্গে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তারা নবীন হাওলাদারকে ডেকে ডেকে সামনে এগোতে থাকে। বনজীবী যারা তারা অকুতোভয় হলেও তাদের বুকের ভেতরে ঢিপ ঢিপ শব্দ বাড়ে। দলটি আর খোঁজ পায়নি তার। জীবনের মায়ায় তারা গভীর জঙ্গলে না গিয়ে ফিরে এসেছিল। নবীনের বাড়িতে এসে খবরটা দিয়ে দায়মুক্ত হয় সকলে।

উঠানের সামনের ঘরে থাকে আছিয়ার চাচা শ্বশুর খালেক ও আছিয়ার দেওর হালিম হাওলাদার। তারা সাতদিন আগে বনে গেছে কাঠ কাটতে। এ-বাড়িতে মানুষ বলতে চাচি শাশুড়িসহ তারা মোট তিনজন নারী ও এক শিশু। বাড়িময় ছোটাছুটি করে পাশের বাড়ির ছেলেমেয়েরা খেলছে আর বারকয়েক উঠে পড়ছে সদ্য নিকানো পিঁড়ায়। অমনি গালাগাল দিয়ে সবার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে শিশুদের শাপশাপান্ত করে জমিরন। এরপরও শিশুরা তাদের কানামাছি খেলা শেষ করে না। পরে ধমক খেয়ে পুরনো শাড়ি থেকে ছিঁড়ে ত্যানা বানিয়ে খড়ের ছোট্ট পুঁটলিতে শোয়া আছিয়ার ছেলেকে নিয়ে খেলতে বসে শিশুরা – শিশুটি তখন ও চোখ পিটপিট করে।

একসময় মানুষের জটলা এসে থামে মান্দার গাছ আর হোগলা পাতা দিয়ে ঘেরা দরজার সামনে।

ও কলিমের মা, কলিমের মা আছো বাড়িত?

এলাকার মাতবরের হাঁকে হাঁটুর কাপড় ঠিক করে ব্লাউজবিহীন ঝুলে পড়া স্তন সামলে মাথায় আঁচল টানে আধময়লা পুরনো শাড়িতে জমিরন।

বুকে ঢাক্ গুড়্ গুড়্ শুরু হয়নি তখন। কী কারণে ডাকছে তা দেখার জন্য এগোতে যাবে দরজায় ঠিক তখনই বাড়িতে ঢোকে দঙ্গলটি। গরিবের ঘরে হাতির পারা নয়, অশনিসংকেতের মতো ধেয়ে আসে পেছনে পেছনে মানুষগুলো। ঝাঁটা হাতে থমকে দাঁড়ায় আছিয়া। তার বুক হাঁপরের মতো ওঠে আর নামে। ভিড়ের মধ্যে কেউ একজন বলে ওঠে, মামা আইজ অসদয় হইছে, বনবিবির কথাও শোনে নাই। তোমার ছাওয়ালরে খাইয়া ফেলাইছে, নৌকার অন্য মাঝিরা অনেক দূর গিয়া হের পর কলিমের মাথাডা পাইছে।

মাতবর গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন, আমরা তোমারে একটা খারাপ খবর দিতে আইছি। চোখ তার কথা বলতে বলতে ঘুরে আসে উঠানে দাঁড়িয়ে থাকা সবার দিকে। তারপর বলতে থাকেন ঘটনা। এমন ঘটনা এর আগে শোনেনি পাঁচ গাঁওয়ের  মানুষ। তার কথা শেষ হতে না হতেই মাথাটা কেমন জানি করে ওঠে আছিয়ার। সে নিকানো উঠানে লুটিয়ে পড়ে। ‘আল্লাহ গো মা গো’ বলে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে ওঠে জমিরন বেওয়া। জোটভাঙা নারীর কয়েকজন এগিয়ে আসে। কেউ ছোটে পুকুরের দিকে। বদনায় পানি নিয়ে বউ আর শাশুড়ির মাথায় ঢালে।

জসিম মাতবর গলায় জমাটবদ্ধ কাশি সরাতে গলা খাকারি দেন, আশেপাশে তাকিয়ে বলেন – সবই ওপরওয়ালার ইচ্ছা, তোমার পোলা-ভাগ্য এমনই – কী করবা কও। হুনলাম বিয়ানবেলা আলিম গেছিল মাছ ধরতে, নৌকায় আর কেউ আছিল না। মামা ওরে একলা পাইয়া টাইন্যা নিয়া গেছে। আশেপাশের দুই-একজন মাঝিমাল্লা দেখলে পরে ডাকাডাকি কইরা লাঠিবৈঠা লইয়া ছুইটা গেছে। ওর মাথাডা বাঁচাইতে পারছে। বাকি সব হের প্যাডে। মানুষের হাতে সবসময় কিছু থাহে না, বান্দার হিসাব ওপরওয়ালাই ভালো জানেন। কথাগুলো বলে তাকান জমিরন বেওয়ার মুখের দিকে, ততক্ষণে মূর্ছা যাওয়া বউটা বসে থাকে এক হাত ঘোমটা দিয়ে। তাকে ঘিরে থাকা কয়েকজন প্রতিবেশী আড়েঠাড়ে আছিয়াকে বোঝাতে চায়, দোষটা যেন তারই। এখানে এসব জায়গায় স্বামী বাঘের খোরাক হলে বা কোনো বিপদ হলে দোষ এসে পড়ে বাড়ির বউয়ের ওপর। ধারণা করা হয়, বউয়ের চলন দোষে এমনটা ঘটেছে।

জরিমন বেওয়া জানে না সে কী করবে। বিলাপ করতে করতে মাতবরকে উদ্দেশ করে বলে, আমনেরা যা ভালো মনে হরেন, মোর কপাল পুড়ছে। ছোড পোলাডায় বাড়িত নাই, মোর কোন পাপে মোর পোলাডা গেলে?

মাতবর পকেট থেকে হাজার দুয়েক টাকা বের করে দেয় চাপা মুনসীকে – দাফন-কাফনের কাজ করার জন্য। মাতবরের খাস লোক এই মুনসী।

জমিরন বিলাপ থামিয়ে তাকায় টাকার দিকে। বলে, মোরা দুইজন মাতারি আর কি বুঝি? আমনেরা বুঝব্যবস্থা করেন। ওর বাপের মাতার লগে রাইখ্যা দিয়েন ওরে আপনেরা।

মাতবর শহরে যাওয়ার তোড়জোড় করে।

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার শেষ গ্রাম নীলডুমুর। সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী রেঞ্জে গ্রামটির অবস্থান। এ-গ্রামের মানুষের জীবন জলের মতো স্বচ্ছ-সরল। নীলডুমুরের চারপাশে জলের নহর যেন। বুড়িগোয়ালিনী থেকে এ-গ্রামে যাতায়াত করা বেশ কষ্টকর – পাড়ি দিতে হয় ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ। ইঞ্জিনের নৌকা বা স্পিডবোট যাতায়াতের উপায়। প্রতিটি ঘর লাগোয়া চিকন চিকন সড়ক সাবধানে পার হতে হয়। সে-পথেই তাদের নিত্যচলাচল। মাতবর ফিরে যেতে উদ্যত হন।

জানাজা পড়াতে আসা মসজিদের ইমাম বলেন, মোর জীবনে কহনও এমুন দাফনকাজ আর হয় নাই। মউত যে কার কেমনে হয় তা একমাত্র মাবুদই জানেন।

বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে কাকের শরীরের মতো। কমতে থাকে উৎসাহীদের উৎসাহ। দু-একজন প্রতিবেশী এসে দুজনকে সান্ত্বনা দিয়ে যার যার ঘরে ফিরে গেছে। পুরনো একটা কাপড় বিছিয়ে সেই থেকে নামাজ পড়ে আর কেঁদেই চলেছে জমিরন। মাঝে মাঝে বিলাপের সুরে বলতে থাকে – তার নসিব হলো না স্বামী আর ছেলের মরা মুখ শেষবারের মতো দেখার। ছেলের শরীরটা গেছে বাঘের পেটে, দেখার জন্য আছে শুধু ক্ষতবিক্ষত মুখ। তাও দুই চোখের কোনায় গভীর ক্ষত। এদিকে আছিয়া স্বামীর মুখটা দেখতে চাইলেও তাকে ওই বীভৎস চেহারা দেখাতে চায়নি উপস্থিত জনতা। তারা বলছিল, দোয়া করো, হের যে মউত হইছে, তার য্যান সব পাপ মাফ হয়।

এ গ্রামের সবাই দরিদ্র, বলতে গেছে হতদরিদ্র। খেটে খাওয়া মানুষ। নিজেদের দু-মুঠো খাবার জোগাড়েই সবার হিমশিম অবস্থা – অন্যকে সাহায্য করবে কীভাবে। এই রেওয়াজ এ-গ্রামে দেখাও যায় না। সবারই সবকিছু বাড়ন্ত।

আজ বাড়িতে চুলা জ্বালানো হয়নি সারাদিন। পেটের তাড়নায় চুলায় চাল আর আলু সেদ্ধ দেয় আছিয়া। জলডোবা ফোলা দুই চোখে অশ্রু। ভাবে – অমন সুন্দর শরীরডা, নাদুসনুদুস, কেমনে খায় বাঘে – তার বুদ্ধিতে কুলায় না। তার স্বামী যে নেই সেটাও যেন ঠিকমতো বুঝে উঠতে পারে না আছিয়া। শুধু স্বামীর মাথাটার কথা মনে হতেই শিউরে ওঠে।

সহসা শাড়ির আঁচল সরিয়ে ব্লাউজের ফাঁকে একটু থুতু দেয় আছিয়া। ভাবে, যে-মানুষটা বছরের তিন মাস একসঙ্গে থাকল, তারে ভালো করে চেনা হয়নি, শরমের ভেদভাও বোঝা হয়নি, চোখ তুলে ভালো করে তাকানোও হয়নি, শুধু বিয়ের দিনক্ষণ হিসাবমতে ছেলেসন্তানের জন্ম দিয়েছে সে। সেই মানুষটা চলে গেল তার অভিমান নিয়ে, না পাওয়ার বেদনা নিয়ে, স্বপ্ন পূরণের কথা না বলে। মরে যাওয়ার আগে বাঘে যখন টেনে নিয়ে গেল তখন সে মাছ ধরায় ব্যস্ত ছিল ছোট ডিঙি নৌকাটায়। ক্ষুধার্ত বাঘটা যখন তাকে খেল, তখন কি দুর্বল শরীরে কোনো শক্তি ছিল না নিজেকে রক্ষা করার? এসব ভাবতে ভাবতে আছিয়ার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না বাতাসে মিলায়।

সারাদিন শুধু তার ছেলেটা কেঁদেছে। সন্ধ্যায় কোলের ছেলে বুকের দুধ পায়নি বলে আছিয়া রান্না করতে বসে। জমিরন শুয়ে আছে ছেঁড়া কাঁথাটা মুড়ি দিয়ে। সে ভাবে, এ-বাড়িতে তার ভাত উঠে যাবে। তার কান্নার দিন শুরু হলো। সে-কান্না দিনে গুমরে গুমরে নিশুতি রাতে হাহাকার মেশানো আর্তনাদে রূপ নেবে। আছিয়ার পরিবারেও বাঘে-খাওয়া মানুষ আছে।

স্বামী হারানোর পর থেকে আছিয়ার জীবন চলে ধুঁকে ধুঁকে। ঘরে চাল নেই। বাইরে গিয়ে কাজ করবে – সেটা চায় না জমিরন। তার মনে হয়, আছিয়া ঘরের বের হলে ঘরে আর ফিরবে না। তার বাপের বাড়ি থেকেও মেয়েকে নিতে এসেছিল। আছিয়ার শাশুড়ি নানা আচার আর নিয়মের বালাই দিয়ে বলেছিল – বছর পার না কইরা স্বামীর বাড়ির বাইর হওন যায় না …।

বাঘের নাম এ-অঞ্চলের মানুষের মুখে শোনা যায় না। সমীহ করে তাকে বলা হয় ‘মামা’। এখানকার মানুষ বুঝে নেয় তা। কেউ বাঘের নাম মুখে আনলেই ভয় পায়, যেন বাঘ খপ্ করে খেয়ে নেবে। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করা মানুষগুলো বাঘের হাত থেকে বাঁচতে কত কিছুর আশ্রয় নেয়। বনে যাওয়ায় সময় দোয়াদরুদ পড়ে, সুস্থভাবে ঘরে ফিরে আসার জন্য মা ও ঘরের বউ সিন্নি আর বনমোরগ মানত করে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নারীরা দেবদেবীর নামে জপ-তপ করে। তবে এখানকার সব ধর্মের মানুষই মনে করে, সুন্দরবনের রক্ষক বনবিবি। নারীরা তাদের স্বামীর সুস্থতা কামনায় যুগ যুগ ধরে বনবিবিকে সন্তুষ্ট রাখতে গান গায় –

রাতদুপুরে ঘরের চালে পেঁচায় দেলে ডাক

বেন বেলা কেন মাথার পরে কা কা করে কাক।

শোনো বলি মা বনবিবি

বলি গো তোমারে,

শোনো তুমি মা বনবিবি,

অভাগিনী শরণ নেলে

তোমারই চরণে ॥

ওমা তোমারই চরণে।

সুন্দরবনের চারপাশে গড়ে ওঠা গ্রামগুলোর মানুষ বনে যাওয়ার সময় নানা নিয়ম ও কৌশল মেনে চলে। তারা মনে করে, তাদের জীবন কঠিন নিয়মে বাঁধা। তাই তারা দিনক্ষণ দেখে বনবাদাড়ে যায়।

কলিমের দাফনের পরপরই বদলে যেতে থাকে আছিয়ার জীবন। জমিরন বেওয়ার পুরনো একটা সাদা থান এনে তাকে পরিয়ে দেয় প্রতিবেশী কয়েকজন নারী। তার তেল-না-দেওয়া উসকোখুসকো চুল ঢেকে দেওয়া হয় লম্বা ঘোমটা টেনে। ফ্যাকাসে সাদা শাড়ি পরা আছিয়ার মাথায় ঘোমটা আরো লম্বা হয়। খোয়া যাওয়ার ভয়ে নাকের একরত্তি ওজনের সোনার নাকফুলটা খুলে তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। এখন তেকে খোলা চুলে আর কারো সামনে যেতে পারবে না সে। হাতের ক’গাছা কাচের চুড়িও ভেঙে ফেলা হয়। পায়ের স্যান্ডেল নেই, খালি পায়ে হাঁটাচলা। তার স্বামী যখন বনে যায় তখনো এমনই চালচলন ছিল তার। শুধু শাড়িটা ছিল বাংলা ছাপার। স্বামীর মঙ্গল কামনায় ও তার ফিরে আসার অপেক্ষায় এখানকার নারীরা এমনসব নিয়ম মেনে চলে। যতটা না নিজের ইচ্ছায় তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি সমাজের চাপে তারা এসব মেনে চলে। এ সময় কোনো পুরুষের মুখ ও ছায়াও তারা মাড়ায় না। আছিয়া নতুন নামে সমাজের কাছে পরিচিত হয়। সমাজ তার নাম দেয় ‘বাঘবিধবা’। বাঘের খাবার হওয়া স্বামীকে এসব নারী রক্ষা করতে না পারায় তারা বিশেষিত হয় অপয়া, কুলটা, ভাতারখাকি, রাক্ষুসী নামে।

চুলায় পাটকাঠি ঠেসে দিয়ে থুঁতনি হাঁটুতে রেখে চোখের জলের বাঁধ যেন মিশে যায়। গতকাল চালের ছাতু লবণ আর ঝোলা গুড় মিশিয়ে খেয়েছে দুপুরবেলা। রাতভর কিছুই খায়নি পানি ছাড়া। তাতেই জমিরন শুকরান গুজার করেছে। সপ্তাহ হলো আছিয়া স্বামীকে হারিয়েছে। ঠিকমতো খাওয়া নেই। বুকের দুধ অপুষ্ট ছেলেটা পায় না ঠিকমতো। সারাদিন ট্যাঁ ট্যাঁ করে কাঁদে। দেওরের খোঁজ নেই। লোকমুখ জেনেছে গহিন বনে থাকায় কিছুদিন দেরি হবে। তার মনে পড়ে, যাওয়ার দিন স্বামীর কাছে আবদার করেছিল এক ছটাক গরুর মাংস আনার জন্য, ফেরার পথে। রাতে নিজেদের একান্ত সময় কেটেছিল। আহ্লাদী হয়ে স্বামীকে বলেছিল সে-কথা। আলিম বলছিল ঠাট্টা করে, আমার ফুলবানুর লাইগ্যাই যামু বনে। আছিয়া আলিমের বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে লাজুক হাসি হেসেছিল চোখ বন্ধ করে। নিজেকে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মনে হয়েছিল তার।

সুন্দরবনের আশপাশের এলাকায় নোনাজলের কারণে খাওয়ার পানি জোগাড়ে যেতে হয় অনেকটা পথ। চিংড়ির ঘের পার হয়ে সামনে এগোতেই পথে দেখা হয় হরতন বিবির সঙ্গে। এই এলাকায় তিনি নানা কারণে নিন্দিত। নানা কথা চালু আছে তাকে নিয়ে। আছিয়া ভয় পায়। এড়িয়ে যেতে চায়। কিন্তু হরতন বলে, সেমাই যাও কেনে, মুই অপয়া নই। তুমিই কও, স্বামীরে মামা নিয়া গেল। আল্লাই কপালে রাখছিল। মোর ক্যান দোষে? মোর জীবনডা ফাঁসি দিছে সকলে। মোর কহন দিন গেইছে কহন রাইত তা ঠাহর করতি পারিনি। খালি যহন সলক হয়, তহন চায়ি দেখতাম রাইত পরিষ্কার হয়ি গেছে। অন্য কামকাজ করতি পারলে লাবলুর বাপ বনে যাতো না।

লবণ-পানির চিংড়ি ঘের না হলি মুইও বিধবা হতাম না।

হরতন কাঁদতে কাঁদতে জানায়, রাত দিন জাল টানা, জাল ধরা, তিনডা ছাওয়াল-পাওয়াল লয়া পার করতিছি দিন-রাইত। বেবাক সমান লাগে। পরের বাড়িত চায়াচিন্তে খাই। কেউ দিছে ফেন, চাউলের খুদকুড়া, চাউলে বা খুদে বেশি পানি দিয়া ভাতের মাড় দিয়া, নুন দিয়া খাওন নাগে। শাশুড়ি বলে, ওলো ভাতারখাকি, শঙ্খিনী, তোর সোয়ামিরে খাইছিস, মোগোও খাবি। যার সোয়ামি যায়, হে কতি পারে কী যায়, মোর চোখের পানি ছাড়া গতি নাই। মোক শিকল পরায়ে রাখে, সলক হওনের আগে খুলি দেয়। কয় – মোর পাপে ছাওয়াল হারায়ছে।

আছিয়া এক অদ্ভুত নির্জীবতা-নির্লিপ্ততা নিয়ে কলসি কাঁখে হরতনের কথা শোনে।

পানি নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আছিয়া ভাবে, তার জীবনে এখনো এমন কিছু ঘটেনি। দেওরের ঘরে ফেরার অপেক্ষা করে তার শাশুড়ি। তখন জানা যাবে সংসারের মতিগতি। সদ্যবিধবা আছিয়াও জানে, স্বামী বাউরে গেলে এসব নারী চুল আঁচড়াতে পারে না, চুলে তেলও মাখতে পারে না। তাদের খোলা চুলে চলাফেরা করা বারণ। এ-সময় তারা সাবানও ব্যবহার করতে পারে না। পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে না। এ-গ্রামের অলিখিত নিয়ম এটাই।

এতকিছু স্ত্রীদের মেনে চলার পরও যখন কারো স্বামী বাঘের আক্রমণে মারা যায়, তখন সব দোষ গিয়ে পড়ে স্ত্রীর ওপর। সমাজ ধরে নেয়, স্ত্রীর ব্রত পালনে কোথাও হয়তো গাফিলতি হয়েছে। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর সমস্ত দায় তাকে বহন করতে হয়।

জমিরন বেওয়া আছিয়াকে ডেকে হাত ধরে বলে, এই গেরাম এমন আছিল না, মোরা ভালোই আছিলাম। ১৯৯০ সালের পর থেকে এসব অঞ্চলের চাষের জমিতে লবণ পানি তুইলে অনেক মানুষ চিংড়ি চাষ শুরু করে, আর মোগো কপালও পোড়ে। মোগের স্বামীরা কৃষিকাজ পায় না। মজুরির কাজও পায় না। মোগো কপাল পোড়ে। মোগো ব্যাডারা জাল দিয়া মাছ ধরতো, মধু আইন্যা বাজারে বেচতো, কাঠ কাটতি যাইতো বনে। সবকিছু এই পোড়া প্যাটের লাইগ্যা।

সে আছিয়াকে কাতর কণ্ঠে বলে, বউরে তুই মোরে ফালাইয়া যাইস না, তুই চইল্যা গেলে মাগো মোরে কে রাইন্ধা খাওয়াইবে। মুই না খাইয়া মইরা যাইমুগা। মোরে ছাইড়্যা যাইস না। হারপাই যেন মোর প্যাটে জম্মের খিদা।

ভাঙ্গায় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, মালিকসহ সবাই পলাতক

ফরিদপুর ও ভাঙ্গা প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৫:৩৫ পিএম
ভাঙ্গায় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পিটুনিতে যুবকের মৃত্যু, মালিকসহ সবাই পলাতক

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় একটি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে পিটুনিতে রাজ্জাক মাতুব্বর (৪০) নামে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর কেন্দ্রটির মালিক মিজানুর রহমানসহ সেখানে কর্মরত সবাই পালিয়ে গেছে। এ ঘটনার জেরে নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি থাকা রোগীরা ক্ষোভে ফেটে পড়ে ভাঙচুর চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকাল ১০টার দিকে ভাঙ্গা পৌরসভার নওপাড়া গ্রামের ‘আলোর দিশা’ নামের ওই মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ঘটনাটি ঘটে। নিহত রাজ্জাক মাতুব্বর ভাঙ্গা পৌরসভার পূর্ব হাসামদিয়া গ্রামের মৃত ছামাদ মাতুব্বরের ছেলে।

স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজ্জাক দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন। পরিবারের সিদ্ধান্তে গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাতে তাকে ওই নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার সকাল ৯টার দিকে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে রাজ্জাকের স্বজনদের ফোন করে জানানো হয়, তিনি গুরুতর অসুস্থ। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। পরে স্বজনরা ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে রাজ্জাকের মরদেহ দেখতে পান।

খবর ছড়িয়ে পড়লে নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি থাকা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তারা কেন্দ্রের ভেতরে জানালা, দরজা ও আসবাবপত্র ভাঙচুর করে এবং চিৎকার–চেঁচামেচি শুরু করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে ভাঙ্গা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করে। পরে ফায়ার সার্ভিস, রোগীদের স্বজন এবং সেনাবাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, নিরাময় কেন্দ্রের কর্মীরা রাজ্জাককে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। তারা দাবি করেন, রাজ্জাক সুস্থই ছিলেন, কিন্তু শারীরিক নির্যাতনের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। ঘটনার পর কেন্দ্রের মালিক ও কর্মীরা পালিয়ে যাওয়ায় সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে বলে তারা মনে করেন।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রাথমিকভাবে নিহতের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। তার নাক ও কান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যাবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। এ ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

নির্বাচনের মাঠে জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোট: প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কে?

তাফসীর বাবু
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ৩:২১ পিএম
নির্বাচনের মাঠে জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোট: প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী কে?

বাংলাদেশে বরাবরই কোনো একজন শীর্ষ নেতাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দল বা জোটকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা গেলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১০ দলীয় জোটে এবার সেভাবে কাউকে সামনে রাখা হয়নি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা ২২শে ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবং দলগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে।

এই নির্বাচনে প্রার্থী প্রায় দুই হাজার। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুটি বড় রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে। একদিকে আছে বিএনপি এবং দলটি যাদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে তারা। অন্যদিকে জামায়াত ও ও তার সঙ্গে সমঝোতায় আসা দলগুলো।

বিএনপি, গণতন্ত্রমঞ্চ, গণঅধিকার পরিষদসহ যে জোট হয়েছে, সেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে বিএনপি এবং এই জোটের নেতৃত্বেও আছেন তারেক রহমান।

বিপরীতে জামায়াতসহ ১০ দলের যে জোট হয়েছে, সেখানে একক কোনো নেতৃত্ব নেই। বরং জোটটি চলছে যৌথ নেতৃত্বে।

এই জোটে ১০ দলের মধ্যে জামায়াত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন––এই পাঁচটি দল ইসলামপন্থি।

বাকি পাঁচটি দল হলো–– জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এলডিপি, আমার বাংলাদেশ বা এবি পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি বা জাগপা এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।

বিভিন্ন ধরনের ১০টি দল একসঙ্গে এলেও কীসের ভিত্তিতে ঐক্য হলো সেটা স্পষ্ট নয়। এই ঐক্যের উদ্দেশ্য কী, আদর্শিক ভিত্তি কী সেটা নিয়েও কোনো রূপরেখা নেই, বক্তব্য নেই।

এছাড়া এই জোট নির্বাচনে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন কিংবা নির্বাচনে বিরোধী দলে বসলে বিরোধী দলীয় নেতা কে হবেন, সেটাও নির্ধারিত হয়নি। ফলে অস্পষ্ট নেতৃত্ব এবং দলীয় রূপরেখা নিয়ে এই জোট নির্বাচনের মাঠে বিএনপির কতটা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে, তা নিয়ে সংশয় আছে অনেকের মধ্যে।

নেতা সামনে রেখে প্রচারণার রীতি

বাংলাদেশের রাজনীতির দল বা জোটগুলো অনেকটা ঐতিহ্যগতভাবেই একজন শীর্ষ নেতাকে সামনে রেখেই ভোটের যুদ্ধে মাঠে নামে।

একসময় আওয়ামী লীগ সামনে রেখেছে শেখ মুজিবুর রহমানকে। পরে যখন শেখ হাসিনা দলের হাল ধরেন, তখন তার নেতৃত্বেই দল এগিয়েছে। জোট হলে সেই জোটের নেতৃত্বে থেকেছেন শেখ হাসিনা।

পরবর্তীকালে বিএনপির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান থেকে খালেদা জিয়া পর্যন্ত একই চিত্র দেখা গেছে।

এমনকি জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রেও দলটি নির্বাচনের সময় সামনে রেখেছিলো হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদকে।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সামনে রেখেছে তারেক রহমানকে। কিন্তু ১০ দলীয় ঐক্যে এভাবে একক কোনো নেতৃত্ব সামনে রাখা হচ্ছে না।

এতে করে যে প্রশ্ন উঠছে–– এই জোট যদি নির্বাচনে জয়ী হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন?

দশ দলের নির্বাচনী ঐক্য গঠনের আগেই অবশ্য এই প্রশ্ন উঠেছিলো। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে জোট গঠনের আগেই এর সুরাহা করার কথা তোলা হয়। যদিও সেটা নিয়ে পরে আর আলোচনা এগোয়নি।

পরবর্তীকালে ইসলামী আন্দোলন অবশ্য আদর্শিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ঐক্যপ্রক্রিয়া থেকেও বেরিয়ে যায়

তবে ইসলামী আন্দোলন বেরিয়ে যাওয়ার পর জোটে জামায়াতের গুরুত্ব এবং প্রভাব আরো বেড়েছে। দলটি এককভাবে ২১৫টি আসন নেওয়ার পর এটা স্পষ্ট হয়েছে যে জোটের মূল শক্তি জামায়াত।

ফলে, ঘোষণা না হলেও এই জোটে জামায়াতই এখন অঘোষিত নেতৃত্বে, যেটা দলগুলোর বক্তব্যেও পরিষ্কার হয়।

তাহলে কি জামায়াতের শীর্ষ নেতাই প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী–– এমন প্রশ্নে জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বিবিসি বাংলাকে বলেন, শীর্ষ নেতা, প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলীয় নেতা -এসব নিয়ে দলগুলার মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।

“এখানে এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা স্পিকার বা এ ধরনের পদ পেলে সেখানে কে বসবেন তা নিয়ে আলোচনা হয়নি। সাধারণত, ধরে নেওয়া হয় যে দলের বেশি সংসদ সদস্য জয়ী হোন, তারাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পান,” তিনি বলেন।

এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে জামায়াত একাই লড়ছে ২১৫টি আসনে। এরপরেই আছে এনসিপি, দলটির প্রার্থী মাত্র ৩০টি আসনে।

১০ দলীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় শেষ সময়ে যুক্ত হয়েছে এনসিপি। নিজ আগ্রহে জোটে যুক্ত হওয়ার পর দলটি নেতৃত্ব কিংবা নির্বাচনে জিতলে কে কোন পদে বসবে, সেসব নিয়ে দরকষাকষির সুযোগ পায়নি। আবার এসব ইস্যুতে নিজেদের চাহিদা জানানোর মতো অবস্থাতেও নেই দলটি।

অন্য দলগুলোও বাস্তবতা দেখে জামায়াতের নেতৃত্বের কথাই বলছে।

“জামায়াত দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে নির্বাচন করছে। কাজেই এখানে প্রধান্য বা মুখ্য ভূমিকা তাদেরই। যদি আপনি বিএনপি জোটে বড় দল হিসেবে বিএনপির শীর্ষ নেতাকে ধরেন, তাহলে আমাদের জোটেও বড় দল আছে। সেই দলের নেতাও তো একজনই আছে,” বলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।

কিন্তু জামায়াত এক্ষেত্রে কী বলছে?

দলটি অবশ্য নেতৃত্বের বিষয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না। বিশেষ করে জামায়াতের একক নেতৃত্ব বা প্রাধান্য নিয়ে এর আগে ইসলামী আন্দোলনের আপত্তির নজির থাকায় জামায়াত চায় নির্বাচনের পরই এর সুরাহা হবে।

“নির্বাচন হয়ে গেলে পরে যাদের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে, তারা কে কতটি আসন পেয়েছে সেটা দেখা যাবে। তখন সেটার ভিত্তিতেই শীর্ষ নেতারা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে দলের পক্ষ থেকে আমরা তো আমাদের শীর্ষ নেতাকেই সামনে রাখবো,” বলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

১০ দলের আদর্শিক ভিত্তি কী?

বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দলগুলোর নির্বাচনী জোটের প্রক্রিয়া শুরু হয় বছরখানেক আগে, মূলত এই দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার কথা বলে।

শুরুতে ইসলামপন্থি পাঁচটি দল জোটের প্রক্রিয়া শুরু করলেও পরে সেখানে ধর্মভিত্তিক নয়, এমন দলগুলোও যুক্ত হয়।

শেষপর্যন্ত গত সপ্তাহে জানানো হয় ১০ দলের এই নির্বাচনী ঐক্যের কথা যেখানে ইসলামী আন্দোলন যোগ দেয়নি।

তবে নির্বাচনী ঐক্য হওয়ার পর গত একসপ্তাহে দলগুলো ব্যস্ত থেকেছে মূলত আসন ভাগাভাগি নিয়ে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামপন্থি এবং ইসলামপন্থি নয় এরকম বিভিন্ন দল নিয়ে এই যে জোট গঠিত হলো, তার আদর্শিক ভিত্তি আসলে কী?

এক্ষেত্রে দলগুলো জুলাই স্পিরিটের কথা বলছে।

“আমাদের ঐক্যের সূচনাটা হয় মূলত ঐকমত্য কমিশন থেকে। সেই সময় এই দলগুলোর বক্তব্য ছিল অনেকটা একই রকম। আমরা সবাই সংস্কার চেয়েছি, বিচার চেয়েছি, আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান নিয়েছি। এই বিষয়গুলোতেই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় থাকা সব দল একমত। কোনো ভেদাভেদ নেই,” বলেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হকও বলেন, এই জোটের ঐক্যে সূত্র হচ্ছে “জুলাই স্পিরিট ধারণ, ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রগঠন এবং আধিপত্যবাদবিরোধী অবস্থান”।

শরিয়া আইন নিয়ে অবস্থান কী?

ইসলামপন্থি দলগুলোর ভোট এক বাক্সে আনার কথা যখন উঠেছিল, তখন সেই দলগুলোর কোনো কোনো নেতা ইসলানি বা শরিয়া আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রগঠনের কথাও বলেছেন।

কিন্তু পরবর্তীকালে এই জোটে এনসিপি, এবি পার্টির মতো ধর্মভিত্তিক নয়, এমন দলগুলোও যুক্ত হয়। ফলে জুলাই সনদে একমত থাকলেও এই জোট শরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে, নাকি প্রচলিত রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই গ্রহণ করবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব অবশ্য দাবি করেন, শরিয়া রাষ্ট্র গঠন করা হবে এমন কথা জামায়াত বা অন্য দলগুলো বলছে না।

তিনি বলেন, “ক্ষমতায় গেলে জামায়াত যে ইসলামি রাষ্ট্র করবে এমনটা তারা কিন্তু বলেনি। কারণ তারা সেই জায়গা থেকে বের হয়ে সবগুলো দল মিলে কিন্তু গণতান্ত্রিক জায়গায় এসেছে, জোট করেছে”।

কিন্তু তাহলে ধর্মভিত্তিক দলগুলো কি শরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আদর্শ থেকে বের হয়ে এসেছে?

এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ গত সপ্তাহে ঐক্য প্রক্রিয়া থেকে সরে যাওয়ার আগে এই কারণটিকেই সামনে এনেছিলো ইসলামী আন্দোলন।

যদিও জামায়াতসহ ইসলামী দলগুলো অবশ্য সেটা নাকচ করছে।

“যার যার আদর্শ, যার যার রাষ্ট্রকল্প, যার যার রাজনৈতিক দর্শন, তার তার কাছে অটুট আছে, অক্ষুণ্ন আছে। আমরা এই মুহূর্তে বাংলাদেশটাকে সবার আগে ইনসাফের বাংলাদেশ হিসেবে গড়তে চাই,” বলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।

ইসলামপন্থি দলগুলো বলছে, তাদের শরিয়া বা ইসলামি আইনভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা আছে। কিন্তু বাস্তবায়ন তারা হঠাৎ করে করতে চান না। “জনগণকে প্রস্তুত করে ধাপে ধাপে এটা হবে” বলেন মামুনুল হক।

একই রকম কথা বলছে জামায়াতও। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “এখন তো দেশে বিদ্যমান একটা আইন আছে। যে দলই জিতুক, কালকে গিয়েই তো সে সব আইন বদলাতে পারবে না। তার জন্য একটা প্রসিডিউর (প্রক্রিয়া) এর মধ্য দিয়ে যেতে হবে। সংসদ লাগবে।

“যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে তাদের মধ্যে একটা মিউচুয়াল আন্ডারস্টান্ডিং দরকার হবে। মানুষের জন্য কল্যাণকর, মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় -এমন সকল বিধান আমরা অ্যালাউ করবো। তো এটাতো ইসলামও অ্যালাউ করে” বলেন মি. পরওয়ার।

তথ্য সূত্র : বিবিসি বাংলা

ফরিদপুরে সেনাবাহিনীর পরিচয়ে চাঁদাবাজি: ভুয়া সাংবাদিক গ্রেপ্তার

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
ফরিদপুরে সেনাবাহিনীর পরিচয়ে চাঁদাবাজি: ভুয়া সাংবাদিক গ্রেপ্তার

ফরিদপুর শহরের গোয়ালচামট এলাকার কিষাণহাটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজির সময় মো. আরিফ শেখ (৩৯) নামে এক ভুয়া সাংবাদিককে হাতেনাতে আটক করেছে সেনাবাহিনী। পরে তাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হলে বিশেষ আইনে প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে এক প্রেসবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ফরিদপুর সেনা ক্যাম্প।

সেনা ক্যাম্প সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ফরিদপুর আর্মি ক্যাম্পের নেতৃত্বে ১৫ রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়ন এবং স্থানীয় পুলিশের একটি যৌথ দল কিষাণহাট এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানের সময় সেনাবাহিনীর পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে মো. আরিফ শেখকে আটক করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক ব্যক্তি নিজেকে ‘দৈনিক ঘোষণা’ পত্রিকার প্রতিনিধি দাবি করেন। তবে পরবর্তীতে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হেনস্তা ও চাঁদাবাজির বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। আটক আরিফ শেখ গোয়ালচামট এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
পরে তাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) আজমীর হোসেন জানান, সেনাবাহিনীর ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিশেষ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগেও গত বুধবার (২১ জানুয়ারি) ভোররাতে সেনাবাহিনীর অভিযানে মো. জহির মোল্যা (৪১) নামে আরেক ভুয়া সাংবাদিককে আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।

সেনা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আটক জহির মোল্যা ও আরিফ শেখ ফরিদপুরের একটি ভূঁইফোড় সাংবাদিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত।