খুঁজুন
, ,

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কার্যালয়ে আ.লীগ নেতাকর্মীদের ঢোকার চেষ্টা, নেপথ্যে কী পরিকল্পনা?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৬:২১ পূর্বাহ্ণ
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কার্যালয়ে আ.লীগ নেতাকর্মীদের ঢোকার চেষ্টা, নেপথ্যে কী পরিকল্পনা?

নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে প্রবেশের চেষ্টা করছেন বা তালা খুলে ভেতরে প্রবেশও করেছেন– এরকম খবর উঠে আসছে সংবাদ মাধ্যমে।

দলের নির্দেশে, নাকি ব্যক্তিগত উদ্যোগে তারা এ ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছেন, নাকি এর পেছনে বিএনপি বা জামায়াত বা অন্য কারো সঙ্গে কোনো সমঝোতা আছে– এসব প্রশ্নও সামনে আসছে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের অগাস্টে ক্ষমতাচ্যুত দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং সে কারণে তারা এই নির্বাচনেও অংশ নিতে পারেনি।

তবে নির্বাচনের পরপরই নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ বেশ কিছু জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলে প্রবেশ করেছে বা প্রবেশের চেষ্টা করেছে। আবার কিছু জায়গায় কার্যালয় খোলার পরপর পাল্টা দখল ও হামলারও ঘটনা ঘটেছে।

এ ধরনের তৎপরতার পেছনে কারণ কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে অনেকের মধ্যে।

আত্মগোপনে থাকা দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলছেন, দলের কার্যালয় নিষিদ্ধ বা বাজেয়াপ্ত করা হয়নি বলে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সেখানে যেতে বাধা নেই বলেই মনে করেন তারা।

“এখানে নির্দেশনা বা সমঝোতার কিছু নেই। কর্মী-সমর্থকরা দলীয় কার্যালয়ে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ইউনূসের অবৈধ সরকারের বিদায়ের পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে এবং স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সবার জন্য উন্মুক্ত হবে এটা আশা করে তৃণমূলের কর্মী- সমর্থকরা দলীয় কার্যালয়ে যাচ্ছে বা যেতে চাইছে,” বলছিলেন তিনি।

প্রসঙ্গত, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সব সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল।

এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরেই ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করেছিলো সরকার।

দলীয় নির্দেশনা, নাকি কর্মীদের নিজেদের উদ্যোগ?

আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার প্রজ্ঞাপনের শেষ দিকে উল্লেখ করা হয়েছিল, “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সকল অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন কর্তৃক যে কোনো ধরনের প্রকাশনা, গণমাধ্যম, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে কোনো ধরনের প্রচারণা, মিছিল, সভা-সমাবেশ, সম্মেলন আয়োজনসহ যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো”।

তবে ইউনূস সরকারের সময়েও দলটির নেতাকর্মীরা ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে ‘ঝটিকা মিছিল’ বের করেছেন।

এছাড়া দলটির অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দলের পক্ষে ও সরকারের বিপক্ষে মতামত বা প্রচারণা চালিয়ে আসছে।

নির্বাচন কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর সামাজিক মাধ্যমে তাদের ‘নো বোট, নো ভোট’ প্রচারণাও অনেকের চোখে পড়েছে।

২০২৪ সালের অগাস্টের পর নিজ জেলায় অবস্থান করতে পারেননি রিহান সরদার নামে ছাত্রলীগের একজন কর্মী।

এরপর ঢাকায় অবস্থান নিয়ে ঝটিকা মিছিলসহ নিজেদের উদ্যোগেই নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আসছেন বলে জানান তিনি।

বিবিসি বাংলাকে রিহান সরদার জানান, তারা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনারই একটি বার্তা পেয়েছেন, যেখানে তিনি সারাদেশে যার যেখানে সম্ভব দলীয় কার্যালয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন।

“মূলত এরপর থেকেই সব জায়গায় এ চেষ্টা করা হচ্ছে। ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক, যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই যাচ্ছে,” বলছিলেন মি. সরদার।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, শেখ হাসিনা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে নিয়মিত তৃণমূল নেতাদের সাথে যেসব আলোচনা করেন সেখানেই তিনি কার্যালয়ে যাওয়ার বিষয়ে এ পরামর্শ দিয়েছেন।

ঢাকা বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে যাওয়ার কর্মসূচি দিয়ে সেখানে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন। কিন্তু এটি কর্মীদের কিছুটা সাহস যুগিয়েছে বলে মনে করেন রিহান সরদার।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাহাউদ্দিন নাছিম বলেছেন, তারা কর্মীদের দলীয়ভাবে উৎসাহিত করছেন, কারণ দলীয় কার্যালয়ে যেতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।

“আওয়ামী লীগ দেশের বড় রাজনৈতিক দল, দলটির কর্মীরা কার্যালয়ে যাবে এটা তাদের রাজনৈতিক অধিকার,” বলছিলেন তিনি।

এছাড়াও দলটির কয়েকটি জেলার নেতাকর্মীদের সাথে আলাপ করে যে ধারণা পাওয়া গেছে তা হলো- নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিএনপি বা জামায়াতের প্রভাবশালী নেতারা নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ভোটের সমর্থনের আশায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় জনপ্রিয় নেতাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন।

সে সময়ই অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের ওই নেতারা নির্বাচনের পর তাদের কার্যালয় খুলতে দেওয়া হবে কিংবা বাধা দেওয়া হবে না- এমন আশ্বাস পেয়েছেন।

তবে কোনো কোনো জায়গায় আশ্বাস দেওয়া বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের নিজ দলীয় প্রতিপক্ষ গ্রুপ এখন আবার তাতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলেও জানা যাচ্ছে। ফলে কার্যালয় খোলার পরেও কয়েকটি জায়গায় আবার হামলা বা ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

বাহাউদ্দিন নাছিম বলছেন, তারা আশা করছেন এসব বিপত্তি কেটে যাবে এবং সরকার শিগগিরই আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে।

পঞ্চগড় থেকে শুরু

নির্বাচনের পর দিনই আলোচনায় আসে পঞ্চগড়ের আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ের তালা খোলার ভিডিও। বিশেষ করে বিএনপির স্থানীয় একজন নেতার উপস্থিতিতে তালা খোলার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় তোলে।

ভিডিওতে দেখা যায়, পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, এই কার্যালয়টি যে আওয়ামী লীগের তা তিনি জানতেন না।

এরপর গত এক সপ্তাহে চাঁদপুর, ঠাকুরগাঁও, সাতক্ষীরা, বরগুনার বেতাগী ও পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা কার্যালয় এবং খুলনায় কার্যালয় খুলে অবস্থান করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্লোগান দেন বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ, শরীয়তপুর, নোয়াখালী, জামালপুর রাজবাড়ীসহ আরও কয়েকটি এলাকায় জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বন্ধ থাকা কিছু কার্যালয় খোলার পর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে দলীয় বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছেন নেতা-কর্মীরা- এমন খবরও এসেছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে।

আবার কোনো কোনো জায়গায় কার্যালয় খোলার পর প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এসে পাল্টা হামলা করেছে বা কার্যালয় বন্ধ করে দিয়েছে- এমন ঘটনাও ঘটেছে।

স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহের তারাকান্দায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খোলার পর সেখানে গিয়ে বিক্ষোভ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) স্থানীয় একদল নেতাকর্মী। এ সময় কার্যালয়ের ভেতরে গাড়ির টায়ারে আগুন জ্বালানো হয়।

কেন্দ্রীয় ও সভানেত্রীর কার্যালয়

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরই ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর হয়। অনেক জায়গায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।

ধানমন্ডিতে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের ‘ধানমন্ডি ৩২’ হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠা বাসভবনও ভাঙা হয়েছে এ সময়ের মধ্যে।

বাহাউদ্দিন নাছিমের মতে, সারাদেশেই তাদের দলীয় কার্যালয়গুলোতে হামলার পর দখল করা হয়েছিল এবং তিনি মনে করেন যারা দখল করেছিল, অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর তারাও সরে যাওয়ায় এখন কার্যালয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দশ তলা ভবনটিতে ব্যাপক হামলার পর আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর। এরপর একদল ব্যক্তি ‘আন্তর্জাতিক ফ্যাসিজম ও গণহত্যা গবেষণা ইন্সটিটিউট’ লেখা একটি ব্যানার সেই ভবনে ঝুলিয়ে দিয়েছিল।

এছাড়া তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় ও ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়েও ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের পর থেকে এই তিন ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় আছে।

এবার নির্বাচনের একদিন পর ১৪ই ফেব্রুয়ারি দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে কিছুক্ষণ অবস্থান করে কয়েকজন নেতাকর্মী।

এরপর ২০শে ফেব্রুয়ারি সংবাদ মাধ্যমে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে দলটির কয়েকজন নারী কর্মী ধানমন্ডিতে দলটির সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো যে ভবনটি, তার সামনে গিয়ে জাতীয় পতাকা টানিয়ে স্লোগান দিচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা যা বলছেন

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, নির্বাচনের পর যেসব জায়গায় আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার তথ্য এসেছে সেখানে অনেক জায়গাতেই স্থানীয় বিএনপি নেতাদের সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।

“আমার মনে হয় নির্বাচিত সরকার এসেছে এবং এখন তাদের কাছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা গুরুত্ব পাবে। আওয়ামী লীগকে ছাড়া বিগত সরকার নির্বাচন করে গেছে। দলটির কর্মী-সমর্থকরা দেশে আছে এবং অনেকে কারাগারে।

সব মিলিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে দলটির কার্যালয় খোলা বা স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পেলে তা ইতিবাচকই হবে,” বলছিলেন তিনি।

আরেকজন বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলছেন, নির্বাচিত সরকার আসার পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম আবার শুরুর একটি প্রক্রিয়ার হয়তো সূচনা হয়েছে কার্যালয় খোলার তৎপরতার মাধ্যমে।

“গত সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি। কিন্তু তার মানে এই না যে দলটি সবসময় নিষিদ্ধ থাকবে।

আবার আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তী সরকারকে গ্রহণ করেনি, কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে তারা প্রত্যাখ্যানও করেনি। তাছাড়া বিভিন্ন দলকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়ার উদাহরণ বিএনপির আগেও আছে,” বলেছেন তিনি।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নতুন ভবনের করিডোরে প্রতিদিনের মতোই ধীর পায়ে হাঁটেন মো. জাকির হোসেন। কারও হাতে এক কাপ চা তুলে দেন, কারও জন্য দরজা খুলে দেন, আবার কখনো কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেন, চা খাওয়ান। সংবাদ শিরোনামে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির নাম খুব কম মানুষই জানেন। অথচ এই প্রেসক্লাবের প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি কক্ষ যেন তার জীবনেরই অংশ।

মো. জাকির হোসেনের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৯ মে, ফরিদপুর শহরের মধ্য আলীপুর মহল্লায়। বাবা শেখ আব্দুর রহমান ছিলেন একজন নাইটগার্ড। অল্প আয়ের সেই চাকরিতে সংসার চলত কষ্টে। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেই বড় হয়েছেন জাকির। ফরিদপুরের বাখুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার বই-খাতা কেড়ে নেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে জীবিকার পথে নামতে বাধ্য করে।

মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৯৮৯ সালে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তমিজউদ্দীন তাজের হাত ধরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেই যে শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, প্রেসক্লাবের ভবন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি জাকিরের দায়িত্ববোধ।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য সাংবাদিকের উত্থান-পতন দেখেছেন। অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব নিতে দেখেছেন, আবার তাদের চিরবিদায়ও প্রত্যক্ষ করেছেন। সভাপতি সৈয়দ ইমামুল আজম আব্দুর রব, শেখ মো. দেলোয়ার হোসেন, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, আব্দুল আলী শিকদার—আজ তারা আর নেই। সাধারণ সম্পাদক মন্টু দাস গোপী, ইউসুফ রেজা মন্টু, আ.জ.ম. আমীর আলী, আলী আশরাফ মো. শোয়াইব ও আরিফ ইসলামও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আরও কত সদস্য, কত পরিচিত মুখ—এক এক করে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।

এসব কথা বলতে বলতে জাকিরের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। তিনি বলেন, “এই প্রেসক্লাবটাই আমার জীবন। এখানে আমার যৌবন কেটেছে, হাসি-কান্না কেটেছে। প্রতিটি দেয়ালে আমার স্মৃতি লেগে আছে।”

জাকিরের ব্যক্তিগত জীবনও সংগ্রামের গল্পে ভরা। স্ত্রী লিপি বেগম একজন গৃহিণী। অল্প আয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। ছেলে আজিম হোসেন ২০২৪ সালে ফরিদপুরের সরকারি ইয়াছিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে জীবিকার তাগিদে হামিম গ্রুপের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছেন। মেয়ে মোসা. হাফছার বিয়ে হয়েছে কাপড় তৈরির মেশিনচালক আরিফের সঙ্গে। নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন জাকির।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের হাড় ক্ষয়ের মতো জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। প্রতিদিন ওষুধ কিনতেই খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এই সামান্য টাকাও অনেক সময় জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার আশায় মানুষের সহায়তায় ছয়-সাতবার ভারতে গিয়েছেন। কিছুদিন সুস্থ থাকলেও আবার ফিরে এসেছে অসুস্থতা। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, কিন্তু অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা এখন অধরাই রয়ে গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কখনো কারও দরজায় গিয়ে হাত পাতেননি। নিজের অভাবকে হাসিমুখে আড়াল করে প্রতিদিন যথাসময়ে কর্মস্থলে হাজির হন। যারা তাকে চেনেন, তারা জানেন—জাকিরের মুখে অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি শোনা যায়।

২০২৬ সালের মে মাসে মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরও একা হয়ে গেছেন তিনি। সংসারের দায়িত্ব, ওষুধের খরচ, পুরোনো দেনা—সব মিলিয়ে জীবন যেন আরও ভারী হয়েছে। তবুও দায়িত্ব পালনে তার কোনো ক্লান্তি নেই। কেউ প্রেসক্লাবে এলে এখনও আগের মতোই আন্তরিক হাসিতে অভ্যর্থনা জানান তিনি।

জাকির হোসেন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। তিনি সংবাদপত্রের প্রথম পাতার মানুষও নন। কিন্তু সংবাদ তৈরির পেছনে যারা নিরলস শ্রম দিয়ে যান, তাদের একজন তিনি। সাংবাদিকদের ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো অনেকেই তাকে খেয়াল করেন না, কিন্তু প্রেসক্লাবের প্রতিটি দিন, প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি ব্যস্ত মুহূর্তে তার নীরব উপস্থিতি অপরিহার্য।

একটি প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় ৩৭ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা শুধু চাকরি নয়, এটি এক ধরনের ভালোবাসা, এক ধরনের আত্মনিবেদন। সেই ভালোবাসার মূল্য কি শুধু একটি সামান্য বেতন? একজন মানুষ, যিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসর্গ করেছেন, অসুস্থতার সময়ে কি তার পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব নয়?

আজও জাকির হোসেনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন খুব সাধারণ—আরও একবার ভালো চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে বাঁচতে চান। তিনি বিলাসী জীবন চান না, বড় কোনো বাড়ি বা গাড়িও চান না। শুধু চান একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ, যাতে প্রতিদিনের ওষুধের চিন্তা আর চিকিৎসার খরচের হিসাব তাকে তাড়া না করে।

হয়তো সমাজে এমন অনেক জাকির হোসেন আছেন, যারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে যান, অথচ নিজেদের কষ্টের কথা কাউকে জানান না। তাদের গল্প খুব কমই আলোয় আসে। কিন্তু এমন মানুষেরাই আমাদের সমাজের নীরব ভিত্তি। তাদের ত্যাগ, সততা আর আত্মসম্মান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা পদবি বা সম্পদে নয়, বরং নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতায়।

জাকির হোসেন এখনও প্রতিদিন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের দরজা খুলে দেন। হয়তো একদিন সেই দরজাই তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। কিন্তু তার আগে, একজন সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।

বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নুরুল ইসলাম নাহিদ, সালথা:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:০০ পূর্বাহ্ণ
বিয়ের দুই মাস পর মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রাণ হারাল সালথার শোয়াইব

নিজের অভাবী পরিবারকে স্বাবলম্বী করার জন্য বছর তিনেক আগে মালয়েশিয়ায় গিয়ে পাড়ি জমান মো. শোয়াইব বিশ্বাস (২৩) নামে এক যুবক। সেখানে গিয়ে দীর্ঘদিন একটি কোম্পানিতে কাজ করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে দেশে আসেন। দেশে এসে গত মাস দুয়েক আগে বিয়ে করেন।

তবে তার বিয়ের মেহেদীর রং শুকানোর আগেই জীবিকার তাগিদে ফের মালয়েশিয়ায় নিজের কর্মস্থলে গিয়ে চলে যান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস- কর্মস্থলে কাজ করার সময় মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তাঁর।

নিহত শোয়াইব বিশ্বাস ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া ইউনিয়নের মুরুটিয়া গ্রামের মো. শওকত বিশ্বাসের ছেলে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সেজো।

শনিবার (১০ জুলাই) সকালে শোয়াইবের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন তার ভগ্নিপতি মো. তুহিন হাসান। এদিকে শোয়াইয়ের খবরে শোকে স্তব্দ হয়েছে পরিবার। এমন অবস্থায় দেশে লাশ আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে চেয়েছেন সরকারের সহযোগিতা।

নিহতের পরিবার জানান, জীবিকার তাগিদে ২০২৩ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে একটি কম্পানিতে কাজ শুরু করেন শোয়াইব। সেখানে কাজ শেষে চলতি বছরের এপ্রিলে ছুটিতে বাড়িতে আসেন। বাড়ি আসার পর গত দুই মাস আগে বিয়ে করেন তিনি। এরপর ছুটি শেষে গত ১ জুলাই মালয়েশিয়া চলে যায়। দেশটির জহুরবারু এলাকায় একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানির অধীনে বোম্ব ক্রেনের সাহায্যে নির্মাণাধীন ভবনে ফায়ার ফাইটারের পাইপ লাগানোর কাজ শুরু করেন। শুক্রবার সকালে কাজ করাকালীন বোম্বক্রেন চাপায় নিহত হন তিনি।

নিহতের ভগ্নিপতি তুহিন হাসান বলেন, শুক্রবার দুপুরে মালয়েশিয়ার ওই কোম্পানির দায়িত্বরত এক বাংলাদেশী আমাকে ফোন করে নিহতের বিষয়টি জানান৷ তাছাড়া ওই বাংলাদেশী ছবি ও ভিডিও পাঠিয়েছে, তাতে নির্মমভাবে মৃত্যুর বিষয় ফুটে উঠেছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে তার লাশ ফেরত পাঠানোর জন্য তিন সপ্তাহের সময় চেয়েছেন। তবে লাশটি দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।

ফরিদপুর প্রবাসী কল্যাণ সেন্টারের সহকারী পরিচালক মো. আশিক সিদ্দিকী বলেন, নিহত ব্যক্তি কোনো কোম্পানির অধীনে কাজ করে থাকলে তাঁরা দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে লাশ পাঠাতে পারবে৷ সেখান থেকে কোনো সহযোগিতার না পেলে নিহতের পরিবার আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৈধ কর্মী হয়ে থাকলে আমরা লাশ আনার ক্ষেত্রে দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করব।

ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারি বরখাস্ত

পান্না বালা, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর সরকারি শিশু পরিবারের কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা, পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারি বরখাস্ত

ফরিদপুরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন সরকারি শিশু পরিবারে (বালিকা) ষষ্ঠ শ্রেণির এক কিশোরী (১৪) ২৭ সপ্তাহের অধিক অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে ফরিদপুর কোতয়ালী থানায়। এ মামলার একমাত্র আসামিকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

এদিকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য শিশু পরিবারের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে বরখাস্ত করা হয়েছে।গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪)। তিনি ওই শিশু পরিবার এলাকার একটি বাজারে দর্জির দোকানের মালিক।

এই ঘটনায় “দায়িত্ব অবহেলার অভিযোগে” ফরিদপুর সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ও শিশু নিবাসের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বাদী হয়ে গত ৬ জুলাই ফরিদপুর কোতয়ালী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, কিশোরীটি শহরের টেপাখোলা এলাকার একটি স্কুলে পড়ে। শিশু পরিবার থেকে স্কুলে যাতায়াত করার সুবাদে গত ৫ জানুয়ারি বিকেলে ওই এলাকার এক দর্জির দোকানের মালিক মো. ওয়াহিদ শেখ (৫৪) তাকে চকলেট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করে। এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই ব্যক্তি তাকে একাধিকবার ধর্ষণ করেছে।

এর ফলে শিশুটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে শারিরীক জটিলতার জন্য শিশুটিকে চিকিৎসকের কাছে গত ৬ জুলাই নেওয়া হয়। চিকিৎসক পরীক্ষার পর জানায় শিশুটি ২৭ সপ্তাহ ও দুই দিনের গর্ভাবস্থায় রয়েছে।

এ মামলার সূত্রে গত ৮ জুলাই পুলিশ সদর উপজেলার আদমপুর গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজ শেখের ছেলে ওয়াহিদ শেখকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।
এদিকে দায়িত্ব অবহেলার দায়ে গত ৮ জুলাই সমাজসেবা অধিদপ্তরের পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

বরখাস্ত হওয়া কর্মকর্তারা হলেন, সহকারী তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার ও আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীণ।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-সচিব ও পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ওই পাঁচ কর্মকর্তা ও কর্মচারিকে গত ৮ জুলাই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ এহিয়াতুজ্জামান বলেন, আদালতের নির্দেশে মেয়েটিকে সমাজসেবা বিভাগের অধীনে “নারী ও শিশু কিশোরী মহিলা হেফজতিদের আবাসন কেন্দ্র”- রাখা হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান জানান, মামলা দায়েরের পরপরই পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।