খুঁজুন
, ,

ফরিদপুরে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়াল, মৃত্যু ২১

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬, ৪:১২ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে হাম আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়াল, মৃত্যু ২১

ফরিদপুরে হামের সংক্রমণ এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ৩৪ জন শিশু ভর্তি হয়েছেন। তবে একই সময়ে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৪৬ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৬ জুলাই পর্যন্ত জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৩ হাজার ৪’শত ৭ জন রোগী বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে হামের উপসর্গে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গে আক্রান্ত ৭৯ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই শিশু। আক্রান্তদের বেশিরভাগেরই জ্বর, সর্দি, কাশি এবং শরীরে লালচে দাগের মতো উপসর্গ দেখা যাচ্ছে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৩৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে ৪৬ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু।

তিনি বলেন, হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী শিশুদের হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুর জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া কিংবা শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে টিকাবঞ্চিত শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগের ঝুঁকি বেশি থাকে। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, এমনকি মৃত্যুর মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি, রোগী শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবা জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্রিয় রাখা হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে হামের সংক্রমণ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য বিভাগ সবাইকে অপ্রয়োজনে ভিড় এড়িয়ে চলা, আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রেখে পরিচর্যা করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এবং পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছে। একই সঙ্গে হামের কোনো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ
‘সেই দুরন্ত শৈশবের দিনগুলি’

মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় থাকে, যেগুলো পেরিয়ে যাওয়ার পরও কখনো সত্যিকার অর্থে হারিয়ে যায় না। বয়স বাড়ে, চুলে পাক ধরে, কাঁধে দায়িত্ব জমে, জীবনের হিসাব-নিকাশ জটিল হয়ে ওঠে—তবুও হঠাৎ কোনো বৃষ্টিভেজা দুপুর, কাঁচা আমের টক গন্ধ কিংবা দূরের কোনো মাঠে শিশুদের হৈচৈ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর আগের সেই দুরন্ত দিনগুলোতে। তখন মনে হয়, আহা! যদি আর একবার ফিরে পাওয়া যেত সেই শৈশব!

আমাদের শৈশব ছিল না মোবাইলের পর্দায় বন্দি। ছিল না সারাদিনের ব্যস্ততার অজুহাত। আমাদের পৃথিবী ছিল বিশাল—যদিও সেই পৃথিবীটা ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম, কয়েকটি মাটির রাস্তা, সবুজ ধানক্ষেত, বাঁশঝাড়, পুকুর আর বিকেলের খেলার মাঠ নিয়ে।

সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙত। কখনো মা রাগ করে বলতেন, “আর কত ঘুমাবি? স্কুলে যাবি না?” চোখ কচলাতে কচলাতে বিছানা থেকে উঠতাম। তাড়াহুড়ো করে মুখ ধুয়ে, কখনো অর্ধেক ভাত খেয়ে, বই-খাতা বগলে নিয়ে ছুটতাম স্কুলের দিকে। পথে দেখা হতো বন্ধুদের সঙ্গে। তারপর শুরু হতো দৌড় প্রতিযোগিতা—কে আগে স্কুলে পৌঁছাতে পারে!

কিন্তু স্কুলে যাওয়ার পথটা কখনোই শুধু স্কুলে যাওয়ার পথ ছিল না। রাস্তার পাশের গাছ থেকে কাঁচা আম পাড়ার পরিকল্পনা, কার পুকুরে আজ মাছ ধরতে নামা যাবে, বিকেলে কোথায় ক্রিকেট খেলা হবে—সব সিদ্ধান্ত হয়ে যেত সেই পথেই। কোনোদিন শিক্ষক দেখলে ভয়ে দৌড়ে ক্লাসে ঢুকতাম, আবার কোনোদিন বৃষ্টির কারণে স্কুল ছুটি হলে আনন্দে মনে হতো, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ আজ আমাদের হাতে এসে ধরা দিয়েছে।

বর্ষার দিনগুলো ছিল আরও অন্যরকম। আকাশ কালো হয়ে এলেই মন নেচে উঠত। বৃষ্টি নামলেই বই-খাতা ফেলে ছুটে যেতাম উঠানে। মা যতই বকুন, “বৃষ্টিতে ভিজিস না, জ্বর হবে”—আমাদের কে শোনে কার কথা! টিনের চাল থেকে ঝরে পড়া পানির নিচে দাঁড়িয়ে গোসল করা, কাদার মধ্যে ফুটবল খেলা, রাস্তার জমে থাকা পানিতে কাগজের নৌকা ভাসানো—এসবের মধ্যে যে আনন্দ ছিল, আজকের দামী বিনোদনেও তা খুঁজে পাওয়া যায় না।

শীতের সকালেও ছিল অন্যরকম উন্মাদনা। কুয়াশা ভেদ করে স্কুলে যাওয়া, খেজুরের রস খাওয়া, মাঠে শিশিরভেজা ঘাসের ওপর খালি পায়ে দৌড়ানো—সবকিছুই ছিল এক অদ্ভুত সুখে ভরা। কখনো কারও বাড়ির গাছ থেকে বরই পেড়ে পালিয়েছি, আবার ধরা পড়ে কান মলে ক্ষমাও চেয়েছি। সেই সময় অপরাধও ছিল নিষ্পাপ। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মায়ের বকুনি খেয়ে একটু কেঁদেছি, তারপর আবার ভাত খেয়ে সব ভুলে গেছি।

বিকেল ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় সময়। স্কুল থেকে ফিরে কোনোমতে বইখাতা ছুড়ে রেখে মাঠের দিকে ছুটতাম। কেউ ফুটবল নিয়ে আসত, কেউ ক্রিকেটের ব্যাট। বল না থাকলে মোজা গুটিয়ে বল বানানো হতো। ব্যাট না থাকলে গাছের ডালই যথেষ্ট ছিল। খেলার নিয়ম নিয়ে ঝগড়া হতো, কেউ আউট মানতে চাইত না, কেউ রাগ করে বাড়ি চলে যেত। কিন্তু একটু পরেই আবার তাকে ডাকতে যেতাম—“আয় রে, তুই না খেললে খেলা জমে না।”

সন্ধ্যা নামলে বাড়ি ফেরার সময় হতো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসত, পাখিরা গাছে ফিরত, আর মায়েদের ডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত—“কোথায় গেলি? বাড়ি আয়!” তবুও আমরা আরও পাঁচ মিনিট খেলার জন্য অনুরোধ করতাম। সেই পাঁচ মিনিট কখনো শেষ হতো না।

রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে আনন্দ যেন আরও বেড়ে যেত। উঠানে বসে গল্প, ভূতের ভয়, দাদী-নানীর মুখে রাজা-রানীর গল্প—সবকিছু মিলে অন্য এক পৃথিবী। কখনো জোনাকি পোকা ধরে হাতের মুঠোয় রাখতাম। তারপর আবার ছেড়ে দিতাম অন্ধকারে। জোনাকির ছোট্ট আলো দেখে মনে হতো, রাতের আকাশের তারাগুলো বুঝি মাটিতে নেমে এসেছে।

আজ অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। সেই গ্রামের পথ হয়তো বদলে গেছে। কাঁচা রাস্তা পাকা হয়েছে, খেলার মাঠে উঠেছে বাড়ি, পুকুর ভরাট হয়েছে। সেই বন্ধুরা কেউ চাকরি নিয়ে শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা না হলে মন খারাপ হতো, আজ তাদের সঙ্গে দেখা হয় বছরের পর বছর পর।

কখনো পুরোনো কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হলে আমরা হাসতে হাসতে বলি, “মনে আছে, সেদিন তুই গাছে উঠে আটকে গিয়েছিলি?” কিংবা “মনে আছে, বৃষ্টির মধ্যে খেলতে গিয়ে কাদায় পড়ে কী অবস্থা হয়েছিল?”

তারপর হঠাৎ করেই হাসির আড়ালে এক ধরনের নীরবতা নেমে আসে।

কারণ আমরা দুজনেই জানি—সেই দিনগুলো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।

শৈশব আসলে জীবনের এমন এক ঋতু, যেখানে হারানোর ভয় ছিল না, ভবিষ্যতের চিন্তা ছিল না, পকেটে টাকা না থাকলেও আনন্দের অভাব ছিল না। একটি বিকেল, কয়েকজন বন্ধু আর একটু খোলা মাঠ—এই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজ আমরা বড় হয়েছি। হাতে স্মার্টফোন, সামনে অসংখ্য সুযোগ, জীবনে অনেক দায়িত্ব। তবুও কখনো কখনো মন চায় সবকিছু ফেলে আবার সেই মাটির রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে। বৃষ্টিতে ভিজতে। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া করতে। মায়ের বকুনি খেতে। সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত মাঠে খেলতে।

কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর। সে কাউকে ফিরে যেতে দেয় না।

তবুও সেই দুরন্ত শৈশব আমাদের ভেতরে কোথাও রয়ে গেছে। পুরোনো কোনো গানের সুরে, বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে, কাঁচা আমের গন্ধে কিংবা গ্রামের পথের ধুলোর মধ্যে সে হঠাৎ জেগে ওঠে।

আর তখন বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে।

মনে হয়, দূরে কোথাও ছোট্ট একটি ছেলে এখনও দৌড়ে যাচ্ছে—খালি পায়ে, ধুলো উড়িয়ে, বন্ধুদের ডাকতে ডাকতে।

সেই ছেলেটি হয়তো আর কেউ নয়।

সেই ছেলেটি—আমি।

আর তার পেছনে পড়ে আছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে নির্ভার, সবচেয়ে দুরন্ত সময়–সেই শৈশব।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

‘নদীর পাড়ে শেষ অপেক্ষা’

শরীফ খান
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ
‘নদীর পাড়ে শেষ অপেক্ষা’

বৃদ্ধ লোকটি প্রতিদিন বিকেলে নদীর পাড়ে এসে বসতেন। হাতে থাকত একটি পুরোনো চিঠি। নদীর স্রোত বয়ে যেত, নৌকা আসত-যেত, পাখিরা ঘরে ফিরত—শুধু তিনি ফিরতেন না।

একদিন গ্রামের এক চা-ওয়ালা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“চাচা, প্রতিদিন এখানে একা বসে থাকেন কেন?”

বৃদ্ধ লোকটি নদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
“ছেলের অপেক্ষায়।”

“সে কি দূরে থাকে?”

লোকটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,

“অনেক দূরে। একদিন চিঠি লিখেছিল—‘বাবা, একদিন তোমার কাছে ফিরব।’ সেই দিনটার অপেক্ষায় আছি।”
চা-ওয়ালা আর কিছু বলল না।

দিন যায়, মাস যায়, বছর পেরিয়ে যায়। নদীর পানি বদলায়, পাড়ের গাছ বড় হয়, গ্রামের কত মানুষ আসে-যায়—শুধু বৃদ্ধ লোকটির অপেক্ষা বদলায় না।

এক শীতের সকালে নদীর পাড়ের বেঞ্চটি খালি পড়ে ছিল।

চা-ওয়ালা বৃদ্ধের ঘরে গিয়ে দেখল, টেবিলের ওপর সেই পুরোনো চিঠি। তার পাশে আরেকটি নতুন চিঠি—

“বাবা, ফিরতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে। তুমি যদি আর অপেক্ষা করো না, আমাকে ক্ষমা কোরো।”

চা-ওয়ালা চিঠিটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।

বিকেলে সে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখল, সূর্যটা ধীরে ধীরে নদীর বুকে ডুবে যাচ্ছে। বাতাসে কাশফুল দুলছে, দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।

বেঞ্চটি তখনও সেখানে।
শুধু মানুষটি নেই।

কখনো কখনো মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার অপেক্ষা থেকে যায়—নদীর স্রোতের মতো, নীরবে, অনন্তকাল।

লেখক: ফরিদপুর।

পানি নেই, তবু থামেনি ২০০ বছরের ঐতিহ্য: এক নৌকায় খেজুরতলার বাইচ

মিজানুর রহমান, সদরপুর:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
পানি নেই, তবু থামেনি ২০০ বছরের ঐতিহ্য: এক নৌকায় খেজুরতলার বাইচ

খালে পর্যাপ্ত পানি নেই, নেই প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় সারি সারি নৌকা। তবুও থেমে যায়নি প্রায় দুইশত বছরের ঐতিহ্য। ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার খেজুরতলা খালে দীর্ঘদিনের নৌকা বাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবার মাত্র একটি নৌকা নিয়েই আয়োজন করা হয়েছে বাইচের।

বুধবার (২০ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়নের খেজুরতলা খালে অনুষ্ঠিত হয় এই ব্যতিক্রমী আয়োজন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় দুইশত বছর ধরে প্রতি বছর ১ ভাদ্র এ খালে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা এ আয়োজন এখনো স্থানীয় মানুষের আবেগ ও উৎসবের অংশ।

স্থানীয়রা জানান, একসময় নৌকা বাইচকে কেন্দ্র করে খেজুরতলা খাল ও আশপাশের এলাকায় বসত উৎসবের আমেজ। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন ধরনের বড় বড় নৌকা নিয়ে আসতেন মাঝি ও প্রতিযোগীরা। বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের হুঙ্কার আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে উঠত পুরো খালপাড়। দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ উপভোগ করতেন নৌকার পাল্লা।

তবে এবার খালে পানির তীব্র সংকট দেখা দেওয়ায় প্রতিযোগিতামূলকভাবে একাধিক নৌকা নিয়ে বাইচ আয়োজন সম্ভব হয়নি। তারপরও দীর্ঘদিনের এই ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, সে জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নৌকা দিয়ে বাইচের আয়োজন করেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রতিযোগিতা না থাকলেও মানুষের আগ্রহে কোনো কমতি ছিল না। অনুষ্ঠানস্থলের প্রায় ৫০০ মিটার এলাকাজুড়ে নানা বয়সী মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। নারী, পুরুষ ও শিশুরা খালের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে নৌকার চলাচল উপভোগ করেন। কেউ কেউ আবার ছোট নৌকায় চড়ে খালের পানিতে ভেসে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজনের সাক্ষী হন।

নৌকা বাইচকে ঘিরে খালের দুই পাড়ে বসে শত শত অস্থায়ী দোকান। খেলনা, মিষ্টি, ঝালমুড়ি, চটপটি, খাবার ও কাপড়সহ নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। ফলে প্রতিযোগিতামূলক বাইচ না হলেও মানুষের উপস্থিতি ও কেনাকাটায় জমজমাট হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

খেজুরতলা গ্রামের বাসিন্দা হুমায়ূন কবির (৬৫) বলেন, “খেজুরতলার নৌকা বাইচ এ অঞ্চলের প্রায় দুইশত বছরের ঐতিহ্য। একসময় দূর-দূরান্ত থেকে বড় বড় নৌকা আসত। বাদ্যযন্ত্রের তালে মাঝিদের বৈঠার ছন্দ আর দর্শকদের উচ্ছ্বাসে খালপাড় মুখর থাকত। সময়ের সঙ্গে সেই জৌলুস কিছুটা কমেছে।”

আয়োজক কমিটির সভাপতি ও চরবিষ্ণুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, খালে পানি কম থাকায় এবার প্রতিযোগিতামূলক নৌকা বাইচ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। তবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে একটি নৌকা দিয়ে হলেও আয়োজনটি করা হয়েছে। আগামীতে খালে পর্যাপ্ত পানি থাকলে আরও বড় পরিসরে আয়োজনের চেষ্টা করা হবে।

আয়োজক কমিটির সদস্য মাওলানা রাশেদ হোসেন বলেন, “এবার একটি নৌকা থাকলেও মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মানুষের এই ভালোবাসাই আমাদের আশা জোগাচ্ছে যে, ভবিষ্যতে আবারও আগের মতো জাঁকজমকপূর্ণ নৌকা বাইচ আয়োজন করা সম্ভব হবে।”

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, খেজুরতলার দুইশত বছরের এই ঐতিহ্য রক্ষায় খালটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নেবে।