খুঁজুন
, ,

চার প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

শিক্ষা ডেস্ক:
প্রকাশিত: বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ
চার প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

সরকারের তিনজন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ও একজন উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ (ইউএনও) ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ১৭ ডিসেম্বর দুদকের নওগাঁ সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক আল মামুন মামলাটি করেছেন। তবে এখনো তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়নি।

মামলার আসামিরা হলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) ও কালাই উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা টুকটুক তালুকদার, নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) ও কালাই উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাত আরা তিথি, নাটোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ও কালাই উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল হায়াত এবং কালাই উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা শামিমা আক্তার জাহান। তারা সবাই আইভিএ কমিটির সাবেক সভাপতি ছিলেন।

অন্য আসামিরা হলেন, ‘সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস (এসডিএস)’ এর নির্বাহী পরিচালক মোছা. আয়েশা আক্তার, ‘এসো গড়ি, সোনার বাংলা’র নির্বাহী পরিচালক গাউসুল আজম ও সাবেক উপজেলা প্রকল্প ব্যবস্থাপক মোখছেদ আলী; কালাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও ইন্ডিপেনডেন্ট ভেরিফিকেশন এজেন্সি (আইভিএ) কমিটির সাবেক সদস্য সচিব কাজী মো. মনোয়ারুল হাসান, কালাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ও আইভিএ কমিটির সাবেক সদস্য হাসান আলী, নাটোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও আইভিএ কমিটির সাবেক সদস্য নীলিমা জাহান, গোমস্তাপুর উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা ও আইভিএ কমিটির সাবেক সদস্য আনোয়ার আলী, কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও আইভিএ কমিটির সাবেক সদস্য অরুণ চন্দ্র রায় ও কালাই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ও আইভিএ কমিটির সাবেক সদস্য তৌহিদা মোহতামিম।

যে কারণে দায়ের করা হয় মামলাটি :

জানা যায়, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় প্রাথমিকে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি প্রকল্পে ১ হাজার ৩৫৬ জন শিক্ষার্থী দেখানো হলেও রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণে দুদকে পেয়েছে মাত্র ১১ জন। অথচ এই বিষয়ে কোনো আপত্তি না জানিয়ে ওই প্রকল্পের কার্যক্রম সন্তোষজনক বলে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।

এর মাধ্যমে সরকারের ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪৩২ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

২০২০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর এ সময়ের মধ্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) এর সাব-কম্পোনেন্ট ২.৫ প্রকল্পে এ ঘটনা ঘটেছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৮-১৪ বছর বয়সী ঝরে পড়া ও বিদ্যালয়ে ভর্তি না হওয়া শিক্ষার্থীদের যাচাই-বাছাই না করে, প্রকৃত ঝরে পড়া ও বিদ্যালয় বহির্ভূত শিক্ষার্থী না নিয়ে ১ হাজার ৬৫৭ জন ভুয়া ঝরে পড়া ও বিদ্যালয় বহির্ভূত শিক্ষার্থী উপস্থিত দেখানো হয়। তাদের নিয়ে ৫৫টি ভুয়া উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় (উপানুষ্ঠানিক শিখনকেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা দেখানো হয়। ভুয়া শিক্ষার্থীদের নামে বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে ভুয়া দলিল তৈরি করা হয়।

কত টাকা আত্মসাৎ?

প্রকল্পের চুক্তিপত্রের ৫ম অ্যাপেনডিক্স অনুসারে, ৫৫ টি শিক্ষণকেন্দ্রের জন্য বরাদ্দ প্রত্যেক শিক্ষকের বেতন ৫ হাজার টাকা হারে বার্ষিক ৩৩ লাখ টাকা, অর্থাৎ ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৪ বছরে মোট ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ৫৫টি শিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠাসহ অন্যান্য আনুষাঙ্গিক খরচাদি প্রতিটির জন্য ২২ হাজার ৬৯০ টাকা হারে মোট ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৯৫০ টাকা, ৫৫টি শিক্ষণকেন্দ্রে শিক্ষক ও অন্যান্যদের ট্রেনিংয়ের খরচাদি প্রতিটির জন্য ৬২ হাজার ৩৯২ টাকা হারে মোট ৩৪ লাখ ৩১ হাজার ৫৬০ টাকা, ৫৫টি শিক্ষণকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের পোশাকের খরচাদি প্রতিজন শিক্ষার্থীর জন্য ১ হাজার ৮০০ টাকা হারে মোট ২৯ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং স্কুল ব্যাগের খরচাদি প্রতিজন শিক্ষার্থীর জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা হারে মোট ১৯ লাখ ৮০ হাজার টাকাসহ উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় (উপানুষ্ঠানিক শিখনকেন্দ্র) রক্ষণাবেক্ষণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ব্যবস্থাপনা খরচাদি ও অন্যান্য খরচসহ ওই প্রকল্পের মোট ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৮৭ হাজার ৪৩২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

জানা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো (বিএনএফই) এর সঙ্গে বাস্তবায়ন সহায়ক সংস্থা/লিড এনজিও জয়পুরহাটের পাঁচবিবির সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসের (এসডিএস) একটি চুক্তিপত্র হয়। যার পঞ্চম অ্যাপেনডিক্স অনুযায়ী, কালাই উপজেলার ৭০টি উপানুষ্ঠানিক শিখনকেন্দ্রে ২ হাজার ৯৮ জন শিক্ষার্থীর যাবতীয় খরচাদির জন্য ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ৪ কোটি ৫০ লাখ ৫৮ হাজার ৮০০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাস্তবায়ন সহায়ক সংস্থা/লিড এনজিও চুক্তির আলোকে সব কাজ সম্পন্ন করবে বলে চুক্তিতে বলা হয়।

তবে সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট সার্ভিস (এসডিএস) তাদের কৌশলগত প্রয়োজনে নির্ধারিত অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা সম্পন্ন স্থানীয় একটি এনজিও ‘এসো গড়ি, সোনার বাংলা’কে সহযোগী সংস্থা হিসেবে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে। তাদেরকে ওই প্রকল্পের কালাই উপজেলার ৭০টি শিখনকেন্দ্রের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্নের দায়িত্ব দেয়।

মামলার বিবরণে বলা হয়েছে, আসামি আয়েশা আক্তার, গাউসুল আজম ও মোখছেদ আলী ১ হাজার ৬৫৭ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত থাকলেও অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য ওই শিক্ষার্থীদের নাম জরিপের তালিকায় দেখান। তারা ৫৫টি উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় (উপানুষ্ঠানিক শিক্ষনকেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা করেননি।

প্রথম ইন্ডিপেনডেন্ট ভেরিফিকেশন এজেন্সি কমিটির কাজী মো. মনোয়ারুল হাসান, টুকটুক তালুকদার, ডা. মো. হাসান আলী, নীলিমা জাহান ও মো. আনোয়ার আলী শুরু থেকেই দায়িত্বরত থেকে বিধিমালা অনুযায়ী উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় (উপানুষ্ঠানিক শিক্ষনকেন্দ্র) স্থাপনের তিন মাসের মধ্যে প্রতিটি উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়, শিক্ষক, সিএমসি সদস্য, শিক্ষা উপকরণ এবং ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের যথাযথ ভ্যালিডেশন করার কথা থাকলেও তারা তা করেননি। এছাড়া দায়িত্বে চরম অবহেলা, ভুয়া-অগ্রহণযোগ্য রেকর্ডপত্র তৈরিতে সহযোগিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের জরিপ তালিকায় ক্যাম্পেইন কমিটির সভাপতি অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ক্যাচমেন্ট এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের প্রত্যয়ন/এনওসি থাকা বাধ্যতামূলক থাকার পরও সভাপতির প্রত্যয়ন ব্যতীত-ই শিক্ষার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন ও ভ্যালিডেশন কার্যক্রমে কোনো আপত্তি না জানিয়ে ওই প্রকল্পের কার্যক্রম সন্তোষজনক মর্মে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।

জরিপের রেকর্ডপত্র পর্যালোচনায় দুদক জানায়, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ১ হাজার ৩৫৬ জন, অথচ রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণে, কালাই উপজেলায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থী মাত্র ১১ জন পাওয়া গেছে। এই বিষয়ে কোনো আপত্তি না জানিয়ে ওই প্রকল্পের কার্যক্রম সন্তোষজনক বলে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। পিইডিপি-৪ এর সাব কম্পোনেন্ট ২.৫ আউট অব চিলড্রেন এডুকেশন কার্যক্রমের শিখন কেন্দ্র মাঠ পর্যায়ে ভ্যালিডেশন ও কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট বা প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের প্রতিবেদন ছাড়া উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর যথাযথ কর্তৃপক্ষ কোনো বিলের অর্থ ছাড় অনুমোদন করেন না। অথচ তিনিসহ তাদের কমিটি এসব বিষয় যাচাই বাছাই ছাড়াই সমস্ত কার্যক্রম সন্তোষজনক বলে প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। এছাড়াও, পরবর্তী ইন্ডিপেনডেন্ট ভেরিফিকেশন এজেন্সি কমিটির জান্নাত আরা তিথি, আবুল হায়াত, শামিমা আক্তার জাহান, অরুণ চন্দ্র রায়, তৌহিদা মোহতামিম বিধিমালা অনুযায়ী, উপানুষ্ঠানিক প্রাথমিক বিদ্যালয় (উপানুষ্ঠানিক শিক্ষনকেন্দ্র) প্রতিটি উপানুষ্ঠানিক বিদ্যালয়, শিক্ষক, সিএমসি সদস্য, শিক্ষা উপকরণ এবং ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীদের যথাযথ ভ্যালিডেশন করার কথা থাকলেও তা ওই কমিটি করেনি। এছাড়া দায়িত্বে চরম অবহেলা, ভুয়া-অগ্রহণযোগ্য রেকর্ডপত্র তৈরিতে সহযোগিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন তারা।

 

তিন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও এক ইউএনও ইন্ডিপেনডেন্ট ভেরিফিকেশন এজেন্সি (আইভিএ) কমিটির সভাপতি ছিলেন। অভিযোগের বিষয়ে গত ১৫ ডিসেম্বর টুকটুক তালুকদার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার স্বাক্ষরে কোনো টাকা তো যায়নি। উপজেলায় মনিটরিং টিমে ছিলাম শুধু। দুদক তো আমাকে আসামি করার কথা নয়। সাক্ষী করেছে কিনা, ভালো করে দেখুন।’

শামিমা আক্তার জাহান বলেন, ‘কালাই উপজেলায় আমি যোগ দেওয়ার আগেই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমি ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর কালাইতে যোগ দিয়েছিলাম। আগের ইউএনও স্যারের রিপোর্ট অনুযায়ী আমি শুধু প্রকল্প সমাপনী প্রত্যয়ন প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছি। দুদক আমার কোনো বক্তব্য নেয়নি।’

জান্নাত আরা তিথি বলেন, ‘দুদকের মামলার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। দুদক বলতে পারবে কেন আমাকে আসামি করছে।’

অপর আসামি আবুল হায়াত কল রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

তথ্য সূত্র : দৈনিক শিক্ষা ডটকম

ইউসুফ ফকির হত্যার বিচার দাবিতে ফরিদপুরে মানববন্ধন, ডিসি-এসপিকে স্মারকলিপি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩৬ অপরাহ্ণ
ইউসুফ ফকির হত্যার বিচার দাবিতে ফরিদপুরে মানববন্ধন, ডিসি-এসপিকে স্মারকলিপি

ফরিদপুরে ব্যবসায়ী ইউসুফ ফকিরকে নির্মমভাবে নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল এবং স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেছেন চরাঞ্চলবাসী।

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে চরাঞ্চলবাসীর ব্যানারে আয়োজিত এ মানববন্ধনে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। তারা হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ইউসুফ ফকির হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। অপরাধীরা যদি দ্রুত আইনের আওতায় না আসে, তাহলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। তাই তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি না করে প্রকৃত ঘটনার রহস্য উদঘাটন এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এ সময় বক্তব্য দেন প্রফেসর আবদুত তাওয়াব, এবি সিদ্দিকী মিতুল, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ সেলিম, প্রিন্স আলী, মৃধা প্রিন্স আলী, নিহত ইউসুফ ফকিরের ভাই মোহাম্মদ নাজমুল বেপারী, স্ত্রী বেদানা বেগম এবং ছেলে শাহাদাত হোসেন।

নিহতের স্বজনরা আবেগঘন বক্তব্যে বলেন, ইউসুফ ফকিরকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

স্মারকলিপিতে ইউসুফ ফকির হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার সম্পন্ন এবং নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।

বিক্ষোভকারীরা বলেন, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটন কমে আসবে এবং সাধারণ মানুষের আইনের প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ১:৩৫ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে যুবকের যাবজ্জীবন

ফরিদপুরের সালথায় ৯ বছর বয়সী ৩য় শ্রেণির এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের দায়ে শওকত মিয়া (৩৮) নামে এক যুবককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সাথে তাকে ১ লক্ষ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

​বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ফরিদপুরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) আবুল বাসার আসামির উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার পর কড়া পুলিশ পাহারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে জেলা কারাগারে পাঠানো হয়।

​দণ্ডপ্রাপ্ত শওকত মিয়া ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের সিরাজ মিয়ার ছেলে।

মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের ২২ মে বিকেলে সালথা উপজেলার বড় বাংরাইল গ্রামের ৩য় শ্রেণিতে পড়ুয়া ৯ বছরের ওই শিশুটি বাড়ির পাশে নিজেদের শাক-সবজির (ডাটা) ক্ষেত দেখতে গিয়েছিল। এসময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা প্রতিবেশী শওকত মিয়া শিশুটিকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে পাশের একটি নির্জন পাটক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ করে।

​শিশুটির রক্তাক্ত ও মুমূর্ষু অবস্থা দেখে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দ্রুত ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ‘ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ (ওসিএসি)-এ ভর্তি করায়। ঘটনার পরদিনই নির্যাতিতা শিশুটির বাবা বাদী হয়ে সালথা থানায় শওকত মিয়াকে একমাত্র আসামি করে একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

​ঘটনা তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর সালথা থানা পুলিশ আসামি শওকত মিয়াকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় সাক্ষী গ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে দীর্ঘ ৬ বছর পর আদালত আজ এ রায় প্রদান করেন।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) অ্যাডভোকেট অর্চনা দাস বলেন, “একটি অবুঝ শিশুকে নির্যাতন করে যে নৃশংসতা চালানো হয়েছিল, আজকের এই রায়ের মাধ্যমে তার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। এই শাস্তি সমাজে অপরাধীদের মনে ভীতি সঞ্চার করবে এবং শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আমরা এ রায়ে অত্যন্ত সন্তুষ্ট।”

ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬, ৭:৫৯ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের নদী-খালজুড়ে ‘চায়না দুয়ারি’, নিশ্চিহ্নের পথে দেশীয় মাছ

ফরিদপুরের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে নিষিদ্ধ ‘চায়না দুয়ারি’র অবাধ ব্যবহার দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। জেলার সদর, সালথা, নগরকান্দা, বোয়ালমারী, সদরপুর, চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও আলফাডাঙ্গাসহ প্রায় সব উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাছ ধরার এই নিষিদ্ধ ফাঁদের বিস্তার ঘটেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকাশ্যে এসব চায়না দুয়ারি বসিয়ে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ নির্বিচারে শিকার করা হলেও মৎস্য বিভাগের দৃশ্যমান অভিযান খুব একটা চোখে পড়ে না। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, জেলার বিভিন্ন খাল, বিল ও নদীর শাখা-প্রশাখায় বাঁশ, জাল ও প্লাস্টিকের জাল দিয়ে তৈরি চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। পানির প্রবাহের মুখে এসব ফাঁদ স্থাপন করায় ছোট পোনা থেকে শুরু করে ডিমওয়ালা মা মাছ পর্যন্ত আটকা পড়ছে। এতে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা হৃদয় মোল্যা বলেন, “এ বছর মৎস্য বিভাগকে চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালাতে দেখিনি। নদী-খালে অসংখ্য চায়না দুয়ারি বসানো হয়েছে। এগুলো না সরালে কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় মাছ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।”

সালথা উপজেলার রহিম শেখ বলেন, “আগে বর্ষা মৌসুমে খাল-বিলে জাল ফেললেই নানা প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন চায়না দুয়ারির কারণে মাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।”

নগরকান্দা উপজেলার আব্দুল জলিলের ভাষ্য, “অনেক সময় প্রকাশ্যেই চায়না দুয়ারি বসানো হয়। স্থানীয় লোকজন জানালেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। নিয়মিত অভিযান হলে এভাবে কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করতে সাহস পেত না।”

বোয়ালমারী উপজেলার হায়দার মাতুব্বর বলেন, “চায়না দুয়ারি শুধু বড় মাছ নয়, ছোট পোনা পর্যন্ত ধরে ফেলে। এতে ভবিষ্যতে মাছের উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।”

ভাঙ্গা উপজেলার কায়সার খাঁন বলেন, “সরকার প্রতি বছর মাছের উৎপাদন বাড়াতে নানা উদ্যোগ নেয়। কিন্তু চায়না দুয়ারির মতো নিষিদ্ধ ফাঁদ বন্ধ করা না গেলে সেই উদ্যোগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।”

আলফাডাঙ্গা উপজেলার কেরামত আলী বলেন, “মৎস্য সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু অভিযান চালালেই হবে না, যারা বারবার এই ফাঁদ ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।”

চরভদ্রাসন উপজেলার প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকর্মী আবদুস সবুর কাজল বলেন, “চায়না দুয়ারি এখন ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলের জন্য নীরব দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। এই অবৈধ ফাঁদে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, এমনকি রেণুপোনা ও ডিমওয়ালা মা মাছও ধরা পড়ছে। ফলে দেশীয় মাছের প্রজনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, শুধু মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে নয়, নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে এ অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় আগামী প্রজন্ম দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতি শুধু বইয়ের পাতাতেই দেখতে পাবে।”

মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চায়না দুয়ারি এমন একটি স্থায়ী ফাঁদ, যা পানির প্রবাহের মুখে বসানো হয়। এতে বড় মাছের পাশাপাশি রেণুপোনা, কিশোর মাছ এবং ডিমওয়ালা মা মাছও আটকা পড়ে। ফলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই এই ধরনের ফাঁদ ব্যবহার নিষিদ্ধ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৎস্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ জাল ও ফাঁদ ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা, জেল অথবা উভয় ধরনের শাস্তির বিধান রয়েছে। তারপরও সহজে বেশি মাছ ধরার আশায় অনেকেই এই অবৈধ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।

ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “শুধু অভিযান চালিয়ে চায়না দুয়ারি নির্মূল করা সম্ভব নয়। প্রথমেই এসব চায়না দুয়ারি কোথায় তৈরি ও সরবরাহ হচ্ছে, সেই উৎস চিহ্নিত করে উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় মাঝে মধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু দুয়ারি জব্দ বা ধ্বংস করলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। গত পাঁচ বছরে ফরিদপুরে চায়না দুয়ারির ব্যবহার ভয়াবহভাবে বেড়েছে। দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগকে আরও কঠোর ও নিয়মিত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।”*

ফরিদপুরের সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য সাংবাদিক হাসানউজ্জামান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মৎস্যজীবী সংগঠন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি নিষিদ্ধ ফাঁদের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতাও গড়ে তুলতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত ও দৃশ্যমান অভিযান নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে ফরিদপুরের নদী-নালা ও খাল-বিলে আবারও দেশীয় মাছের প্রাচুর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। তাইতো, জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদকে রক্ষায় সরকারকে আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাসরিন জাহান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “আমরা চায়না দুয়ারির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে নিষিদ্ধ ফাঁদ অপসারণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এ অভিযান আরও জোরদার করা হবে। কেউ নিষিদ্ধ ফাঁদ ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”