ফরিদপুরে পদ্মা নদীতে অবৈধ আড়াআড়ি বাঁধ অপসারণ
জীবিকার তাগিদে ভালো চাকরির আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফরিদপুরের সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারী উপজেলার ২৪ জন তরুণ। কিন্তু ২০২৩ সালে লিবিয়ায় যাওয়ার পর থেকে দীর্ঘ তিন বছর ধরে তারা নিখোঁজ। পরিবারের দাবি, মানবপাচারকারী দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে তারা বর্তমানে লিবিয়ার বিভিন্ন কারাগারে বন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। এখন সন্তানদের জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরে পাওয়ার আকুতি নিয়ে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় স্বজনরা।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, দালাল পারভেজ মোল্লা বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ওই ২৪ তরুণকে লিবিয়ায় পাঠান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের সঙ্গে তাদের সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন সালথা উপজেলার রিয়াজ মোল্লা, তুহিন সরদার, ফিরোজ মোল্লা, তানভীর মোল্লা, সালমান মোল্লা, মাঝারদিয়া ইউনিয়নের নওয়াপাড়া গ্রামের মো. হাচিবুল হাচান এবং ভাওয়াল ইউনিয়নের বারখাদিয়া গ্রামের রবিউল ইসলামসহ ২৪ জন।
সন্তানের জন্য কান্নাজড়িত কণ্ঠে হাচিবুলের মা বলেন, “তিন বছর ধরে আমার ছেলের কোনো খবর নেই। প্রতিদিন অপেক্ষা করি, হয়তো একবার ফোন দেবে। সরকারের কাছে হাতজোড় করে আকুতি জানাচ্ছি, আমার সন্তানকে জীবিত অবস্থায় দেশে ফিরিয়ে দিন।”
নিখোঁজ রবিউল ইসলামের বাবা নান্নু খান আক্ষেপ করে বলেন, “জমি বিক্রি ও ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। আজ আমার টাকা-পয়সাও শেষ, ছেলেরও কোনো খোঁজ নেই। আমরা শুধু আমাদের সন্তানকে ফেরত চাই।”
নিখোঁজদের ফেরাতে ‘পাচারের শিকার মানব উদ্ধার ও শিশু সুরক্ষা সংস্থা’র চেয়ারম্যান সৈয়দ খায়রুল আলম জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “২৪টি পরিবার আজ পুরোপুরি নিঃস্ব ও অসহায়। কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে দ্রুত তাদের পরিচয় যাচাই করে লিবিয়া থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।”
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। আবেদন পাওয়ার পর তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে এবং এ বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে।
ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মুহাম্মদ আল ফাহাদ জানান, মানবপাচারকারী দালাল চক্রের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত দালাল পারভেজ মোল্লার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে তার বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে নেশাগ্রস্ত জামাইয়ের নির্যাতন থেকে মেয়েকে মুক্ত করে দুধ দিয়ে গোসল করেছেন এক মা। মানত বা ওয়াদা রক্ষায় প্রকাশ্যে স্থানীয় একটি বাজারে ৫ কেজি দুধ দিয়ে গোসল করার এই খবর ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়নের বড় বাইখীর গ্রামের চৌরাস্তা বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১৪ বছর আগে উপজেলার বড় বাইখীর গ্রামের বৃদ্ধ মহাশিন মোল্লার (৭৪) মেয়ে মনিরা খাতুনের (৩০) সঙ্গে একই এলাকার সুমন শেখের (৩২) বিয়ে হয়। মনিরা খাতুনের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁর স্বামী নেশাগ্রস্ত হয়ে প্রতিদিন তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে আসছিলেন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত তিনি সংসারের ইতি টানতে বাধ্য হন। সম্প্রতি কাজী অফিসে গিয়ে কাবিন রেজিস্ট্রি বাতিলের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়ায় সুমনের সঙ্গে মনিরার বিচ্ছেদ ঘটে।
মেয়ের মা জুলেখা বেগম (৪৬) জানান, জামাইয়ের ক্রমাগত অত্যাচারে তাঁর মেয়ের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। মেয়েকে এই নির্যাতন থেকে মুক্ত করতে পারলে তিনি দুধ দিয়ে গোসল করবেন বলে ওয়াদা বা মানত করেছিলেন। সেই ওয়াদা রক্ষা করতেই শুক্রবার সকালে বাইখীর চৌরাস্তা বাজারে ৫ কেজি দুধ দিয়ে গোসল করেন তিনি।
তবে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সুমন শেখ। তাঁর দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে আনীত নির্যাতন ও নেশা করার অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
ফরিদপুর শহরের ব্যস্ততম সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথগুলোতে পথচারীদের ঘিরে ধরে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বেদেপল্লীর একদল নারীর বিরুদ্ধে। শহরের আলিপুর মোড়, ১১ তলা ভবন এলাকা, জনতা ব্যাংক মোড় ও চকবাজারসহ ব্যস্ত পয়েন্টগুলোতে দিনের পর দিন এমন ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, গ্রাম থেকে প্রয়োজনীয় কাজে শহরে আসা সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করেই মূলত চক্রটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কোনো পথচারী টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ঘিরে ধরে পথ আটকে দেওয়া হয়, এমনকি টানাহেঁচড়া করে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে টাকা দিয়ে সেখান থেকে রক্ষা পান।
সদর উপজেলার গ্রাম থেকে কাজে আসা ফাহিম শেখ বলেন, “শহরে ঢোকার পরই কয়েকজন নারী আমাকে ঘিরে ধরে টাকা দাবি করে। না দিলে ছাড়ছিল না। বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি, এখন বাড়ি ফেরার ভাড়া নিয়ে চিন্তায় পড়েছি।” একই অভিজ্ঞতার কথা জানান মমিন খারহাটের রুস্তম ব্যাপারী ও স্থানীয় বাসিন্দা রাহুল শেখ। রাহুল শেখ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেহেতু তারা নারী, প্রকাশ্যে এসব টানাহেঁচড়া করলে পুরুষের জন্য তা অত্যন্ত বিব্রতকর। বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে পার পেতে হয়।”
অভিযোগ রয়েছে, রাস্তার মোড়ে মোড়ে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের সামনেই এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলছে। এ বিষয়ে আলিপুর এলাকার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তা (টিএসআই) শেখ তুহিন বলেন, “আমাদের সামনেই সাধারণ মানুষকে টেনে-হিঁচড়ে টাকা আদায় করা হয়। আমি নিজে কয়েকবার নিষেধ করেছি, কিন্তু নিষেধ করলে তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। যে কারণে অনেক সময় আর কিছু বলা যায় না।”
তবে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন অভিযুক্ত বেদেপল্লীর নারীরা। মুন্সিবাজার এলাকার বেদেপল্লীর এক নারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে রাস্তায় নামতে হয়। আমাদের অন্য কোনো কাজের সুযোগ নেই। প্রশাসন যদি পুনর্বাসন বা বিকল্প কাজের ব্যবস্থা করে, তবে আমরা রাস্তায় এসে টাকা চাওয়া বন্ধ করে দেব।”
ঘটনাটিকে দুঃখজনক উল্লেখ করে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া জানান, মুন্সিবাজারের বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের সরকারি কোনো সহায়তার আওতায় আনা যায় কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যদিকে, ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, বিষয়টি এখন পর্যন্ত তার জানা ছিল না। তবে টহল টিমকে নির্দেশনা দেওয়া হবে এবং সত্যতা পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের দাবি, বেদে সম্প্রদায়ের জীবিকার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে দ্রুত বিকল্প কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক। একই সাথে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের পথচলা নির্বিঘ্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন
Array