আধুনিক করপোরেট সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ল্যাপটপের স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা আর চেয়ারে বসে থাকা। আমরা কাজ শেষ করার তাড়নায় হয়তো ভুলে যাই যে, আমাদের শরীর এই স্থবিরতার জন্য তৈরি হয়নি।
ভারতের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ‘লঞ্জিভিটি মেডিসিন’ বিশেষজ্ঞ ডা. সঞ্জয় ভোজরাজ দীর্ঘ ২০ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আপনার হৃদযন্ত্র আধুনিক কর্মদিবসকে মোটেও পছন্দ করে না।’
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ, গভীর রাতে ইমেইল চেক করা এবং অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস আমাদের হৃদরোগের ঝুঁকিকে এক ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। হৃদরোগ কোনো একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার ফল নয়, বরং এটি আমাদের ভুল জীবনযাপনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব। তবে আশার কথা হলো, ছোট ছোট কিছু দৈনিক অভ্যাসের মাধ্যমেই এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। ডা. সঞ্জয় ভোজরাজ এবং ডা. পাল্লেটি শিবা কার্তিক রেড্ডির পরামর্শ অনুযায়ী সুস্থ থাকার ৮টি কার্যকরী উপায় নিচে আলোচনা করা হলো।
১. দিনের শুরু হোক প্রাকৃতিক আলোয়
সকালে ঘুম থেকে উঠেই স্মার্টফোনের নীল আলোয় ডুব দেবেন না। ডা. ভোজরাজের মতে, ‘আপনার মস্তিষ্কে ফোন প্রবেশের আগেই চোখের সামনে দিনের আলো বা সূর্যের আলো আসতে দিন।’ এই অভ্যাসটি শরীরের ‘সার্কাডিয়ান রিদম’ বা অভ্যন্তরীণ ঘড়ি ঠিক রাখতে সাহায্য করে, যা সরাসরি রক্তচাপ এবং হরমোনের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে।
২. প্রোটিন সমৃদ্ধ সকালের নাস্তা
সকালের নাস্তাটি কেবল নামমাত্র না করে বরং প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার যেমন: ডিম, দই বা প্রোটিন স্মুদি দিয়ে করুন।এটি সারাদিন আপনার রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল রাখতে এবং স্নায়ুতন্ত্রকে সচল রাখতে সাহায্য করে।
৩. খাবারের পর সামান্য হাঁটা
অফিসে দীর্ঘক্ষণ কাজ করার পর শরীরে যে স্থবিরতা বা ‘ডেস্ক-চেয়ার কোমা’ তৈরি হয়, তা কাটাতে দুপুরের খাবারের পর অন্তত ১০ মিনিট হাঁটুন। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা (গ্লুকোজ মেটাবলিজম) নিয়ন্ত্রণে জাদুর মতো কাজ করে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়ায়।
৪. সন্ধ্যায় হালকা শরীরচর্চা
সারাদিন বসে থাকার ক্লান্তি কাটাতে সন্ধ্যায় খুব ভারী ব্যায়ামের প্রয়োজন নেই। যোগব্যায়াম, হালকা ওয়েট ট্রেনিং বা স্রেফ শিশুদের সাথে খেলাধুলা করার মতো সাধারণ শারীরিক কাজগুলো হৃদযন্ত্রের জন্য দারুণ কার্যকর হতে পারে।
৫. ডিজিটাল ডিটক্স ও আলোক নিয়ন্ত্রণ
রাতের খাবারের পর ঘরের উজ্জ্বল আলো কমিয়ে দিন এবং ল্যাপটপ বা ফোনের ব্যবহার বন্ধ করুন। ঘুমের আগে ফোন বা ইন্টারনেটের অতিরিক্ত উত্তেজনা মস্তিষ্ককে শান্ত হতে দেয় না, যা পরোক্ষভাবে হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
৬. ঘুমকে ভাবুন ‘হৃদযন্ত্রের ঔষধ’
পর্যাপ্ত ঘুম কেবল বিশ্রামের জন্য নয়, বরং এটি কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় ঔষধ। ডা. ভোজরাজের মতে, নিয়মিত গভীর ঘুম হৃদযন্ত্রের টিস্যু মেরামত এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৭. রুটিনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস গড়ে তুলুন। এই ধারাবাহিকতা শরীরে প্রদাহ কমাতে এবং ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে, যা দীর্ঘমেয়াদী হৃদরোগ প্রতিরোধ করে।
৮. মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিকতা
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে মানসিক প্রশান্তি অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম বা প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানো এবং সামাজিক মেলামেশা করুন। মনে রাখবেন, হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা কেবল জিম বা ডায়েটের বিষয় নয়, বরং এটি আপনার প্রতিদিনের জীবনযাত্রার প্রতিফলন।
বিশেষজ্ঞের শেষ কথা
হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে খুব বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন ছোট ছোট অভ্যাসগুলোর প্রতি সংবেদনশীল হওয়া। ডা. রেড্ডির মতে, হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্যকে আলাদা কোনো লক্ষ্য হিসেবে না দেখে একে প্রতিদিনের রুটিনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
আপনার মতামত লিখুন
Array