ভাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বিরুদ্ধে মানববন্ধন-বিক্ষোভ
ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের বাখুন্ডা আদর্শ গ্রামে শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী আইরিন আক্তার বীনা (ডাকনাম কবিতা) ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সোমবার (০৪ মে) সকাল ১১টার দিকে ফরিদপুর প্রেসক্লাবের সামনে ১১ নম্বর গেরদা ইউনিয়নবাসী এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করেন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মানুষ মানুষের জন্য-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মো. জাহিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন অ্যাডভোকেট মেহেরুন্নেসা স্বপ্না, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফরিদপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক কাজি রিয়াজ, মুখ্য সমন্বয়ক জেবা তাহসিন, গেরদা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মো. জাকারিয়া, যুবনেতা জুবায়ের হোসেন, যুবদল নেতা কাকন মিয়া, মানবতার কল্যাণে ফরিদপুর সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ সিয়াম, যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল চৌধুরী, এস এম রফিকুল ইসলাম এবং ফরিদপুর সদর থানা বিএনপির সহ-সভাপতি হাজ্জাজ বিন ইউসুফসহ আরও অনেকে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, “ছয় বছরের নিষ্পাপ শিশু কবিতার ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড মানবতার জন্য লজ্জাজনক। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তি—ফাঁসি নিশ্চিত করতে হবে।”
নিহত শিশুর মা তাহমিনা বেগম ও বাবা বাঁকা মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের মেয়ের হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তারা বলেন, “আমরা আমাদের সন্তানের বিচার চাই। যেন আর কোনো মা-বাবাকে এভাবে সন্তান হারাতে না হয়।”
বক্তারা আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে মাদক ও অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে শিশু ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, দ্রুত বিচার না হলে আরও কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। একই সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের দাবি জানান তারা।
ফরিদপুরের সালথায় কাগদী মুরুটিয়া আলহাজ্ব মো. আব্দুল মজিদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মামুন শরিফের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে ক্লাস বর্জন করেছে শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (০৪ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে স্কুল মাঠ প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করে। এতে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দীন ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন এবং শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে দেন।
বিক্ষোভকালে শিক্ষার্থীরা প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে স্লোগান দেয়। এ সময় পুরো স্কুল এলাকায় উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম করে আসছেন এবং তাদের ন্যায্য দাবিগুলো উপেক্ষা করছেন। তারা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালন করে।
তবে স্থানীয়রা জানান, শিক্ষকদের মধ্যে বিরোধের জেরে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছেন একপক্ষ। তাছাড়া তেমন কোনো অনিয়ম দেখা যায় না।
কাগদী মুরুটিয়া আলহাজ্ব মো. আব্দুল মজিদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মামুন শরিফ বলেন, অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টি সম্পন্ন ভুয়া ও ভিত্তিহীন। আমার সাথে শিক্ষার্থীদের একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। ইউএন স্যারের উদ্যোগে ঘটনাটি মিমাংসা হয়েছে।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. দবির উদ্দীন বলেন, প্রতিষ্ঠানের হিসাব-নিকাশে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী স্থানীয়দের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছিল। আমরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেছি। প্রধান শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে হিসাব গ্রহণ করে তা যাচাই করা হবে। আশা করি দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রাম্য মোড়লের দীর্ঘদিনের বিরোধ ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। হামলা-পাল্টা হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে একের পর এক গ্রাম অশান্ত হয়ে উঠছে। এতে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর জখম হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন।
সম্প্রতি গট্টি ইউনিয়নের বালিয়া গট্টি বাজার, আড়য়াকান্দী ও মিরের গট্টি এলাকায় টানা সংঘর্ষে জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সর্বশেষ সোমবার (৪ মে) সকালে মিরের গট্টি গ্রামে হামলা চালিয়ে অন্তত ২০-২৫টি বসতবাড়ি ভাঙচুর ও কয়েকটিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গট্টি ইউনিয়নে প্রভাব বিস্তার ও এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আড়ুয়াকান্দী গ্রামের ইউপি সদস্য নুরু মাতুব্বর এবং বালিয়া গট্টি গ্রামের জাহিদ মাতুব্বরের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। এলাকায় তারা দুইজনই প্রভাবশালী গ্রাম্য মোড়ল হিসেবে পরিচিত।
একসময় দু’জনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও গত ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর তারা বিএনপিতে যোগ দেন। এরপর থেকেই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠেন তারা। এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে অন্তত ১০টির বেশি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, রোববার (৩ মে) দুপুরে নুরু মাতুব্বরের সমর্থক আনোয়ার শেখকে মারধর করলে পাল্টা জাহিদ মাতুব্বরের সমর্থক রেজাউলকে পিটিয়ে আহত করা হয়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার সকালে জাহিদ সমর্থকরা নুরু মাতুব্বরের ছেলে রাজিব মাতুব্বরকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে ক্ষুব্ধ হয়ে নুরু সমর্থকরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে জাহিদের সমর্থকদের বাড়িতে হামলা চালায়। এতে অন্তত ২০-২৫টি বসতবাড়ি ভাঙচুর এবং কয়েকটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, এই দুই মোড়লের দ্বন্দ্বে জিম্মি হয়ে পড়েছে গট্টি, বালিয়া, আড়ুয়াকান্দী, মিরের গট্টি ও কানৈড় গ্রামের সাধারণ মানুষ। দলাদলিতে না জড়ালে এলাকায় টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে। চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি ও সহিংসতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক ও চাকরিজীবী জানান, গ্রাম্য দল না করলে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এই সংঘর্ষকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন তারা।
এ বিষয়ে নুরু মাতুব্বর অভিযোগ করে বলেন, তার সমর্থকদের ওপর বারবার হামলা হলেও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
অন্যদিকে জাহিদ মাতুব্বর দাবি করেন, তিনি বর্তমানে অসুস্থ এবং এসব সংঘর্ষ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চান।
সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. বাবলুর রহমান খান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. দবির উদ্দীন জানান, সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে।
এদিকে স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটতে পারে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি ভিত্তিতে প্রশাসনের আরও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন তারা।
আপনার মতামত লিখুন
Array