খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

শেষ চিঠি

রোমিও অনুব্রত
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৭ জুন, ২০২৫, ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
শেষ চিঠি

নিরুদ্দেশের কবিতা লেখা সহজ কাজ নয়। এসেনিনকে তাই করতে হয়। এমন নয় যে কবিতা লেখার ঠিকানা তার নেই। বরং একটা নয়…কয়েকটা আছে। এই যেমন ধরা যাক সোফিয়ার কথা। গত তিন মাস হল তার থেকে ১৬ বছরের বড় সোফিয়ার সাথে তার খুব গভীরতা হয়েছে। দুজনেই দুজনের কুয়োর ভিতর যখন তখন একজন আরেকজনকে নামিয়ে নিচ্ছে। কাল রাতেও প্রেম গলিয়ে অনেক আনন্দ করেছে তারা। এসেনিন শক্ত করে সোফিয়াকে নিজের সাথে চেপে ধরে বলেছে, “তোমার ভিতরে মাথা গুঁজে দম বন্ধ হয়ে মরে যেতে ইচ্ছে করে। কিংবা ধরো, কাঁটা না বেছে একটা লাল গোলাপ পুঁতে দিলাম”! এসব কথার মানে বোঝে না সোফিয়া। এসেনিন নিজেও হয়ত বোঝে না। কিন্তু এইসব কথা খুব শীতে আগুনের আঁচের মতোই ভালো লাগে সোফিয়ার কাছে।

এখন দুপুর বারোটা। সিগারেটের ধোঁয়ায় ঘরটা কেমন ঘোলাটে হয়ে আছে। জানালার পাশের সোফাটায় বসে আছে সোফিয়া। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছুড়ে দিচ্ছে এসেনিনের দিকে। তার দিকে ভেসে আসতে থাকা একেকটা ধোঁয়ার বৃত্তের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে এসেনিন। সে বৃত্তের ওপাশে দেখতে পাচ্ছে দুপুরবেলা হঠাৎ লক আউট হওয়া কোনো কারখানা আর সেখান থেকে বের হয়ে আসতে থাকা শ্রমিকদের ঢল। ড্রেন দিয়ে ভেসে যাচ্ছে পোড়া মবিলের কালো স্রোত। একটা মরা বেড়ালের বাচ্চা সেখানে ডুবছে-ভাসছে, ডুবছে-ভাসছে.. একটা ছেলে শ্রমিকদের উল্টো দিকে ড্রেনের পাশ দিয়ে হাটছে। একটা মোড় ঘুরতেই থামতে হলো। একটা লাশ! ভেজা জামা। উপুড় হয়ে পড়ে আছে। হাতদুটো পিছমোড়া করে দড়ি দিয়ে বাঁধা। একপাশে মাথা কাত হয়ে আছে। চোখ দুটো একটু আগে উপরে ফেলা হয়েছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা। ছেলেটা দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশে উপড়ানো চোখদুটো খুঁজছে তার দৃষ্টি। নেই! কিন্তু কোথায়.. আর শ্রমিকেরা ওদিকেই-বা চলে যাচ্ছে কেন! তাদের তো এই লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করার কথা.. কই… একটা মানুষও তো…

বিহ্বল চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকা এসেনিনকে জিজ্ঞেস করল সোফিয়া, কী ভাবছো এত বলো তো?

-ভাবছি কারখানার ড্রেন দিয়ে যে আলকাতরা ভেসে যায়, তা নিয়ে একটা ছবি আঁকব। একটা মেয়ের মুখ। ধরো সিসিফির মুখ।

-নামটা এখন না বললে কী হতো না!

-সিসিফি তোমার থেকেও বেশি নখরামো জানত। আমি ঘুমের ভিতরে এখনও ওর আঁচড়ের গন্ধ পাই..

-স্টপ ইট!!

-ওকে। আমার না খিদে পেয়েছে!

-দেখো তুমি দশটা মেয়ের সাথে শুতে পারো। কিন্তু আমাকেই বেশি ভালোবাসতে হবে! বাসতেই হবে..

-বাসি তো! সাত দিন হলো একটা লাইনও লিখতে পারিনি। সব যে তোমার ভিতর গলিয়ে দিয়েছি।

-আমারও খুব খিদে লেগেছে। জানো, খালি পেটে সেক্স করলে বেশি এনজয় করা যায়।

-ও। কী খাবে?

-তোমায় খাবো। আসো, আসো বলছি!

-আমি আর কতদূর আসতে পারি বলো!

সোফিয়া দুই হাত প্রসারিত করে বলল, এই যে.. এতদূর

এসেনিন উঠে বিছানায় সোফিয়ার পাশে এসে বসলো। সোফিয়া তার কাঁধের দিকে মাথা ঝুকিয়ে অনুনয়ের সুরে বলল, কই..

এসেনিনের ঠোঁটের কাছে সোফিয়ার ঠোঁট। অন্তত সাত-আটজন পুরুষের পিপাসা মিটিয়েছে তার ঠোঁট। তাও নিজের তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। ঠোঁট এগিয়ে দেওয়ার সময় চোখের ভাষা সেইরকমই আদিম। কোনো রমণীর প্রথম দিকের কামনার মতো।

একটা ব্যাপার সোফিয়ার সাথে মেলে না এসেনিনের। কামনার খেলায় সোফিয়া একেবারেই সময় নেয় না। কিন্তু এসেনিনের ভালো লাগতো যদি চুমু খাওয়ার সময়গুলোতে শুধু ওর মুখের দিকেই সারাজীবন তাকিয়ে থাকা যেত।

চুমু খাওয়ার ফাঁকে জানালার দিকে চোখ পড়ে যায় এসেনিনের। একটা ছোট্ট রবিন এসে বসেছে। জানালার কাচের ওপাশে। কী সুন্দর রঙ! মা খুব পাখি পছন্দ করে। কতটা পছন্দ করে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। প্রতিদিন মায়ের বারান্দায় বিকেল ৫টায় পাখিরা খাবার খেতে আসে। একদম ঘড়ির কাঁটা দেখে। দেখার মতো একটা দৃশ্য। সেই ছোটবেলা থেকে এমনভাবেই চলে আসছে। পাখিরা এসে খাবার না পেয়ে ফিরে যাবে এইজন্য মা কোনোদিন বাইরে কোথাও যায়নি। মা একা থাকে। গম কিনতে গেলেও তো সেই আট ক্রোশ পথ হেঁটে শহরে পৌঁছাতে হয়। কাকে পাঠায়! কী অদ্ভুত.. তারপরও কিছু থেমে থাকে না।

-ওহ তুমি না! শুধু অন্যমনস্ক হয়ে যাও, এটা খোলো। দেখি আমি..

কণ্ঠস্বরে বিরক্তির সুর থাকলেও সোফিয়া এখন ভীষণ আসক্ত। এসেনিনও জানলা থেকে মন টেনে নিলো। নাহ, এই মেয়েটাকে নিয়ে পারা যায় না। উফ.. অবশ্য সোফিয়ার শরীরের বাসি এই গন্ধটা সত্যিই মাদকতায় ভরা। এমনকি থেলাসেমিয়া রোগীও উঠে বসতে বাধ্য। এসেনিন এবার মন বসাতে পারলো। সেও ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে, আঃ.. মুহূর্তের আচ্ছন্নতা এসেনিনকে একবার মহাশূন্যে আর একবার পাতালে নিয়ে যাচ্ছে। সোফিয়াও সম্পূর্ণ বিকারগ্রস্ত। কিন্তু এইসব লুণ্ঠনের মাঝখানেও এসেনিনের চোখ বারবার মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। সে হঠাৎ সোফিয়ার মাথা ঠেলে সরিয়ে ঝপ করে শুয়ে পড়লো। বললো, প্লিজ থামো.. আই কান্ট টেক দিস নাউ..

সোফিয়া অবাক হলো না। এসেনিন সবসময় খামখেয়ালি করে। কিন্তু তাই বলে এরকম একটা মুহূর্তে! সোফিয়া খুব বিরক্ত হলো।

-কী হয়েছে আমায় একবার বলবে!! (সোফিয়া একটু জোরেই কথাটা বলতে বাধ্য হলো)

-কিছু না। তুমি যেতে পারো!

-হোয়াট!! আর ইউ ক্রেজি!

-দূর হও। তোমাকে আর ভালো লাগছে না।

-এক্সিউজ মি! হোয়াট দা হেল আর ইউ ফাকিং এবাউট..

-গো আই সে। আই সে গো! (কথাটা চেঁচিয়ে বলে উঠল এসেনিন।)

কেঁপে উঠেছিল সোফিয়া। নিজেকে কোনোরকমে সামলে নিয়ে দ্রুত বিছানা থেকে লাফ দিয়ে নেমে বাথরুমে ঢুকলো সে। এসেনিন চিৎ হয়ে শুয়ে রইলো। তার কাছে মনে হচ্ছে ঘরটা কেমন দুলছে। ইস ঘরটা কী তবে সত্যি ভেসে উঠলো আকাশে! কই.. জানালার দিকে তাকালো সে। নাহ, বাইরে ঝড়ো হাওয়া বইছে। সে নেমে এসে জানালার কাচ উঠিয়ে দিলো। কী অদ্ভুত ঠাণ্ডা বাতাস! সে আবারও জানালার পাশে তার প্রিয় জায়গায়টায় বসলো। ওপাশের দেয়ালে পিকাসোর বয় উইথ দা পাইপের প্রিন্টটা দুলছে। একটা সিগারেট ধরালো সে। দেয়ালে হেলান দিয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ছেলেটার মুখ একেবারে আনসিরোর মতো। আনসিরোর মতো ভালো ছেলে পৃথিবীতে একবারই জন্ম নেয়। এসেনিনের হঠাৎ নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হয়। আনসিরোর মতো বন্ধু পেয়েছিল। একবার দুই বন্ধুতে মিলে একটা নতুন জায়গায় গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। পথ খুঁজে পাওয়ার কোনো আগ্রহ নেই দুজনের। অথচ একটা জায়গায় পৌঁছানো খুব জরুরি। এক আত্মীয়কে কিছু টাকা দিয়ে আসতে হবে। সেখানে একজন খুব অসুস্থ। টাকা হাতে পেলে তারা দুধ পাউরুটি কিনবে, ওষুধ কিনবে। অথচ পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শেষে অনেক ঘুরে তারা সেখানে গেলো। গিয়ে দেখে সেই আত্মীয়দের অবস্থা খুব খারাপ। ঘরে পানি পর্যন্ত নেই। একজন ব্যথায় কাতরাচ্ছে। দুই বন্ধু মিলে তাদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। বাজার করে দিলো। সবকিছু শেষে তারা ফিরে এলো। ফিরে আসার পর দেখা গেলো যে টাকা তারা দেওয়ার কথা ভেবেছিল তার চারগুণ টাকা খরচ করে ফিরেছে তারা। কিন্তু এত টাকা তো তাদের কাছে থাকার কথা না। পরে বোঝা গেলো আনসিরো তার সঞ্চিত সব টাকা সেখানে খরচ করে এসেছে। অথচ তার সাথের বন্ধুটিও ব্যাপারটি বুঝতে পারেনি তখন। এই হলো আনসিরো। আহা আনসিরোর মুখটা কেমন বাতাসে দুলছে।

এই সময় সোফিয়া বাথরুম থেকে বের হয়ে এলো। বোঝাই যাচ্ছে এতক্ষণ সে কাঁদছিল। সে কোনোরকমে তার ব্যাগটা গুছিয়ে নিলো। ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও সে চোখ মুছছিল..

এসেনিনের মনে হলো সে একটা সিনেমা দেখছে। সোফিয়া চলে গেছে। তবু মনে হচ্ছে সে আছে। বিছানায় উপুড় হয়ে বুকে বালিশ চাপা দিয়ে কাঁদছে।

এসেনিন হঠাৎ পাগলের মতো কাগজ কলম খুঁজতে থাকলো। সোফিয়া এনে রেখেছিল। কোথাও না কোথাও আছে। শেষে পাওয়া গেলো। পোশাকহীন অবস্থাতেই এসেনিন টেবিলে লিখতে বসে। সে তার মায়ের কাছে একটা চিঠি লিখতে চায়। এখনই…

প্রিয় মা,
আমি এত মাতাল হয়ে যাইনি যে তোমার সাথে দেখা না করেই মরে যাবো। দেখো একদিন সকাল বেলা তুমি জানালার কাছে বসেই দূর থেকে আমায় দেখতে পাবে। তোমার অনেক আনন্দ হবে মা! আমি কিন্তু তোমার জন্য কিছুই আনতে পারবো না। কারণ আমার মনে থাকবে না ।

মা, আমি স্বপ্নের ভিতরে বেঁচে আছি। বিশ্বাস কর। কেউ করে না। কেউ যেন আমায় একটা বেলচা ধরিয়ে দিয়ে কোনো বনের মধ্যে ছেড়ে দিয়েছে। আমি মাটি খুঁড়ি। আমি চাই না। আমি খুঁড়ি। মাঝে মাঝে মনে হয় খুঁড়তে খুঁড়তে আমি একটা সুড়ঙ্গ দিয়ে পৃথিবীর অন্য পাশে চলে যাবো আর মহাশূন্যে গিয়ে পড়বো। আমি হারিয়ে গেছি মা! মা, আমি হারিয়ে গেছি !!

তোমায় বলা হয়নি, এখন আমি একটা হোটেলে থাকি। জানো, আমি মাঝে মাঝেই বাইরে থেকে ফিরে অন্যের ঘরে ঢুকে পড়ি। তুমি কি হাসছো মা? দেখি! আসলে আমি একা থাকি না। আমার সাথে সোফিয়াও থাকে। আমরা বিয়ে করেছি। কেন যে মানুষ বিয়ে করে! শুধুই বাচ্চার জন্য, শুধুই সঙ্গমের জন্য। মানুষের কী একটুও লজ্জাবোধ নেই! মা জানো, আমার এখন সবথেকে বেশি রাগ হয় দেয়ালের উপর। সব দেয়ালগুলি যদি শুইয়ে দেওয়া যেতো। আমার নিজেকে সাপের মতো মনে হয়। দেখো তো কী নিয়ে কথা বলছিলাম, কী সব বলছি! আচ্ছা তোমায় সোফিয়ার কথা বলি। সে এখন বিছানার উপর উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কোনো পোশাক নেই। এই দৃশ্যটা আমার কী যে ভালো লাগে। মা নগ্ন মেয়েদের কাছে পৃথিবীর ঋণ কবে শেষ হবে!

মা তুমি কি জানো ম্যাজিক মাশরুম কি? খুব নেশা হয় মা। তোমাকেও একদিন দেবো। তুমিও কি ডানা মেলে আকাশে উড়তে চাও না?

আমার কোনো কাজ নেই। কী করি বলো। হোটেলের পাশ দিয়ে একটা রেললাইন চলে গেছে। আমি রেললাইনের উপর শুয়ে থাকি। বিছানায় আমার ঘুম আসে না মা। সবাই ভাবে আমি উন্মাদ। আমি হাসি। তুমি বল তোমার ছেলের থেকে ভালো কবিতা এই পৃথিবীতে আর কেউ লিখতে পারে! কিন্তু কতদিন আমি লিখি না মা। আমার শরীরে সবাই লিখে যাচ্ছে। আমি পারি না। অন্যের কলমের আঘাতে আমার শরীর ক্ষত-বিক্ষত। আমার শরীরে রক্ত নেই মা। শুধু কালি। ক্ষত থেকে শুধু কালি ঝরে পড়ছে। আমি মারা যাচ্ছি মা। কী যে শান্তি। আবার কবে তোমায় লিখতে পারবো মা? আবার কবে…

ইতি
তোমার সবচেয়ে প্রিয় ছেলে

গল্পসুত্র : এসেনিন একজন রুশ কবি । ক্ষনজন্মা । আত্মহত্যা করেছিলেন । তার বিখ্যাত কবিতা Goodbye My Friend কলম না পেয়ে লিখেছিলেন নিজের রক্ত দিয়ে । মাকে খুব ভালবাসতেন । গল্পে যে চিঠিটা আছে তার প্রথম লাইন সত্যিই তিনি তার মাকে লিখেছিলেন।

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা