খুঁজুন
, ,

বিলুপ্তির পথে ৪’শ বছরের পুরনো ফরিদপুরের বাইশ রশি জমিদার বাড়ি

অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৩ জুন, ২০২৫, ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
বিলুপ্তির পথে ৪’শ বছরের পুরনো ফরিদপুরের বাইশ রশি জমিদার বাড়ি

বৃহত্তর ফরিদপুরের দর্শনীয় স্থান সমূহের মধ্যে ৪’শ বছরের পুরনো বাইশরশি জমিদার বাড়ির নাম ইতিহাসের এক অন্যতম নিদর্শন। ফরিদপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৮কিলোমিটার দূরত্বে বর্তমান সদরপুর উপজেলার মধ্যে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বাইশরশি জমিদার বাড়ি। এককালে প্রভাবশালী বাইশরশি জমিদাররা ফরিদপুর-বরিশালসহ ২২টি পরগনার বা জোত মহলের অধিপতি ছিলেন। জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি তখনকার দিনে বাইশরশির বাড়িটির প্রায় ৫০ একর জমি নিয়ে কয়েকটি বাগানবাড়ি, পুকুর, পূজামন্ডপ ও দ্বিতলা বিশিষ্ট ছোট-বড় ১৪টি দালান কোঠা দিয়ে ঢেলে সাঁজিয়ে ছিলেন।

জানা গেছে, ১৭’শ শতাব্দির গোড়াপত্তনে এককালের লবণ ব্যবসায়ী সাহা পরিবার বিপুল অর্থসম্পত্তির মালিক হয়ে কয়েকটি জমিদারি পরগনা কিনে জমিদারি প্রথার গোড়া পত্তন শুরু করে। ১৮শ শতক থেকে ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাগের আগে পর্যন্ত জমিদার পরিবারটি অনেক ধন-সম্পত্তির মালিক হন ও ২২টি জমিদারি পরগনা ক্রয় করে বিশাল জমিদার হিসেবে ভারতবর্ষে খ্যাতি লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ও হিন্দুস্থান দুইটি রাষ্ট্র হওয়ার পর ১৯৪৭ থেকে ১৯৬২ সাল জমিদারি প্রথা থাকার আগ পর্যন্ত জমিদাররা কলকাতা বসে জমিদারি দেখাশুনা করত। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর জমিদার সুকুমার রায় বাহাদুর ছাড়া সবাই কলকাতা চলে যায়। ৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীনের পর সুকুমার বাবু ওই রাজ প্রসাদে আত্মহত্যা করেন। এরপর বাড়িটির আর কোন অভিভাবক না থাকায় পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবে গন্য হয়ে যায়।

বর্তমানে প্রায় ৩০একর জমির ওপর জমিদার বাড়িটির অবস্থান হলেও চারপাশের অনেক জমি ভূমিদস্যুরা দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে ৫টি শান বাঁধানো পুকুর, বিশাল বাগানবাড়ি ও ছোটবড় চৌদ্দটি কারুকার্য খচিত দালান-কোঠা জমিদারদের কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রতিনিয়ত চুরি হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান দরজা-জানালা, লোহার কারুকার্য খচিত ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাড়িটির সামনের অংশে বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস রয়েছে।

বাইশরশি জমিদার বাবুরা যেভাবে আলোচিত হয়ে আছেন। কথিত আছে, উদ্ধর চন্দ্র সাহা লবনের ব্যবসা করতেন। লবন বিক্রয় করার জন্য যাবার সময় নদী ভাঙ্গনে কবলিত কোন এক পড়বাড়ীর ধ্বংসাবশেষ হতে বেশ কিছু গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করেন। এভাবে অর্থ প্রাপ্তির পর তিনি বাইশরশিতে বিশাল জোদ্দারী ক্রয় এবং জমিদারী প্রতিষ্ঠা করে পরবর্তীতে বাবু রঘুরাম সাহার পুত্র উদ্ধর চন্দ্র সাহা ১৮২৪ইং সালে সম্ভবত লর্ড ক্লাইভের সময় বাইশরশি জমিদার উদ্ধর চন্দ্র সাহা বরিশালের কালিয়ায় জোদ্দারী ক্রয় করেন।

উদ্ধর চন্দ্র সাহার পুত্র হরে কৃষ্ণ সাহা জমিদারীর হাল ধরেন এবং তিনি বরিশালের বাউফলের জমিদারী ক্রয় করেণ এবং প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। হরে কৃষ্ণ সাহার তিন পুত্রের মধ্যে রাম জয় সাহা জমিদারীর ভার গ্রহণ করেন। এ সময়ে বাবুরা ইংরেজদের কাছ থেকে সাহা উপাধির পরিবর্তে রায় চৌধুরী উপাধী লাভ করেন। রাম জয় রায়ের দুই পুত্র বৈকুন্ঠ রায় ও নীল কন্ঠ রায় জমিদারী ভাগাভাগি করেন এবং বৈকুণ্ঠ রায়ের অংশকে বড় হিস্যা ও নীল কণ্ঠ রায়ের অংশকে ছোট হিস্যা বলা হতো। বৈকুণ্ঠ রায়ের কোন সন্তান না থাকায় তিনি মহিম চন্দ্র রায়কে পৌষ্য পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। মহিম চন্দ্র রায় প্রতাপ শালী ছিলেন। তারও কোন সন্তান না থাকায় তিনি কলকাতা হতে মহেন্দ্র নারায়ন রায় চৌধুরীকে পৌষ্য পুত্র হিসেবে সংগ্রহ করেন। উল্লেখ মহিম চন্দ্র রায় বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। মহেন্দ্র নারায়ন রায় বাহাদুর সাধু প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি তার পৌষ্য মাতার মহিম চন্দ্র রায় বাহাদুরের স্ত্রী শিব সুন্দরী চৌধুরানী নামে ১৯১৪ সালে ‘‘বাইশরশি শিব সুন্দরী একাডেমী’’ প্রতিষ্ঠা করেন। এ সমেয় মহেন্দ্র নারায়ন চৌধুরীর বয়স ছিল মাত্র ২০/২২ বছর।

নীল কণ্ঠ রায় বাহাদুরের পুত্র রাজেন্দ্র বাবু ও দেবেন্দ্রবাবু। রাজেন্দ্র বাবুর কোন সন্তান ছিলনা। তিনি রমেশ বাবুকে পৌষ্য গ্রহণ করেন। দেবেন্দ্র বাবুর ছেলে দক্ষিণা রঞ্জন বাবু।

দক্ষিণা রঞ্জন বাবু রাগী ও উগ্র প্রকৃতির লোক ছিলেন। দক্ষিণা বাবুর কোন সন্তান না থাকায় তিনি দিলীপ বাবুকে পৌষ্য সন্তান হিসাবে গ্রহণ করেন। ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে দুই হিস্যার মধ্যে হিংসা-বিবাদের কারণ ঘটায় উভয় হিস্যা মামলা মোকদ্দমায় জড়িত হয়ে পড়েন এবং তা চূড়ান্ত রূপ ধারণ করলে তখন ফরিদপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাহেবের হস্তক্ষেপে বিবাদের মিমাংশা ঘটে। অতঃপর দক্ষিনা বাবু তার পিতৃব্য বা জেঠার নামে ফরিদপুরের অম্বিকা চরণ মজুমদার বাবুর সহায়তায় ‘‘রাজেন্দ্র কলেজ’’ স্থাপন করেন।

এছাড়া বর্তমান ফরিদপুরের পুরাতন সরকারী হাসপাতালের একটা অংশ এখনও বাবুদের নামে বর্তমান আছে। মহেন্দ্র বাবু নগর কান্দায় নীজের নামে (মহেন্দ্র নারায়ন একাডেমী) নামের একটি উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

জমিদারদের প্রধান আয়ের উৎস্য ছিল ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা। খাজনা বা কর আদায় করার জন্য নায়েব নিযুক্ত করা হতো। অবাধ্য প্রজাকে শায়েস্তা করার জন্য লাঠিয়াল বাহীনি ব্যবহার করা হতো। এ জন্য নিজস্ব বড় লাঠিয়াল বাহিনী সুরক্ষিত ভাবে রাখা হতো। অপরাধ অনুসারে এই প্রজাদেরকে অত্যাচার করা হতো। অত্যাচারের ফলে কারও মৃত্যু হলে মৃত দেহ বাড়ীর পিছনে সু-গভীর অন্ধকুপে নিক্ষেপ করা হতো।

আরও লোক মুখে শোনা যায়, মুসলমান বা হিন্দুরা বাবুদের বাড়ীর সামনে দিয়ে জুতা পায়ে, ছাতা মাথায় দিয়ে যাতায়াত নিষেধ ছিল। বাবুদের চারটি পুকুরের মধ্যে নাট মন্দিরের সামনের পুকুরটি পানীয় জলের জন্য নির্ধারিত ছিল। ঐ পুকুরে কেহ পা ভেজাতে পরতো না। বেচু নামে এক মুসলমান প্রজা অজ্ঞাতবশতঃ ঐ পুকুরে পা ধোয়ার অপরাধে তাকে বেদম প্রহার ও দাড়ী উৎপাটন করা হয়। ফলে তা নিয়ে মামলা হলে বাবুদের এক পাই জরিমানা হয়। মানিক দহের বড় মিয়া আব্দুল বাবুদের বশ্যতা স্বীকার না করার জন্য বাবুরা তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। বড় মিয়া আব্দুল উপায়ন্তর না দেখে শিবসুন্দরী চৌধুরানীকে মা ডাকেন। পরে শিব সুন্দরী চৌধুরানীর হস্তক্ষেপে বড় মিয়া আব্দুলকে মামলা হতে অব্যাহতি দেয়া হয়। মিয়াদের পরিবারের লোকজন সেই সময় থেকে বর্তমান বাইশরশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাজকর্ম করতেন।

বাইশরশি শিবসুন্দরী একাডেমীর বর্তমান খেলার মাঠ বাবুদের চিত্তবিনোদনের জন্য বাগানবাড়ী ছিল এবং তারা ঐ বাগান বাড়ীতে যেমন খুশি তেমন ভাবে বিভিন্ন রকমের আনন্দ ফূর্তি করতো। জমিদার বাড়ীটি ৩০একরের উর্ধ্বে ছিল।

১৯৫০ সালে জমিদারী প্রথা লোপ ও প্রজাস্বত্তর আইন প্রনয়ন হবার পর সুকুমারবাবু অর্থহীন এবং বিত্তহীন হয়ে পড়লে তিনি জমিদারী হারিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসায় লোকশান ও বাড়ীর দাসী কর্তৃক সঞ্চিত স্বর্ণ খন্ডাদী চুরি হওয়ায় ও দাসীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কের কারণে দাসী গর্ভবতী হলে ঘটনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় উপায়ন্তর না পেয়ে সুকুমারবাবু নিজে বন্দুকের গুলীতে আত্মহত্যা করেন।

উল্লেখ্য যে, সুকুমার বাবু ১৯৩৪-১৯৪৬ পর্যন্ত সদরপুর উপজেলার সদরপুর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর পর জমিদার পরিবারের সদস্যরা কলিকাতা চলে যান এবং অমরেশ বাবু দিনাজপুর চলে যান। এভাবেই বাইশরশি জমিদারদের জমিদারীর পতন ঘটে। বর্তমানে জমিদার বাড়ীর অধিকাংশ জমি বিশ্ব জাকের মঞ্জিলের দখলে রয়েছে। অবশিষ্ট ভবন ও স্থাপনা অযত্নে ও অবহেলা পড়ে আছে। সরকারি ভাবে সংরক্ষণের কোন উদ্যোগ নাই।

সদরপুর এর বাইশরশি জমিদারের অধীনে থাকা আরেকটি জমিদারী শাসনামল অঞ্চল সম্পর্কে আরও জানা যায়, এ অঞ্চলের দু শতাধিক বছর পূর্বের সাক্ষী বর্তমান পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা সদরে অবস্থিত ঐতিহাসিক নির্দশন জমিদার মহেন্দ্ররায় চৌধুরী ও রাজেন্দ্র রায় চৌধুরীর কাঁছারী বাড়ি। বর্তমানে উপজেলা ভূমি অফিস হিসাবে পরিচিতি।

জনশ্রুতি হচ্ছে, ১৮’শ শতকের কথা। ফরিদপুর জেলার সদরপুর বাইশরশি থেকে দক্ষিণারঞ্জন রায় বাণিজ্য জন্য চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যে যায়। চতুর্দশ শতাব্দীতে গৌড়ের সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ শাসনামলে বরিশাল, ফরিদপুর ও খুলনার কিছু অংশ নিয়ে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য ছিল। মেঘনার অববাহিকা বর্তমান ভোলা ও বাউফলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রমত্তা তেঁতুলিয়া নদীর পশ্চিম পাড়ে বাউফলের নাজিরপুর ইউনিয়নের কচুয়া নামক স্থানে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের রাজধানী ছিল। চন্দ্রদ্বীপ তেঁতুলিয়া নদীতে গয়না পারি দিয়ে বাণিজ্য জন্য চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যে আসে।

ব্রিটিশদের থেকে অত্র এলাকায় জমি ক্রয় করে রায় চৌধারিত্ব উপাদি লাভ করে। দক্ষিণারঞ্জন রায়ের দুই ছেলে মহেন্দ্র রায় বড়ো হিস্যাই, রাজেন্দ্র রায় ছোট হিস্যাই হিসাবে সে এলাকায় স্বীকৃতি পায়। চন্দ্রদ্বীপ রাজ্য এলাকা বাউফলে জমিদারীত্ব আরম্ভ করে। জমিদারিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে মহেন্দ্র রায় ও রাজেন্দ্র রায় সদরপুরের বাইশরশি থেকে বিভিন্ন পেশার লোক নিয়ে যেত এবং বসতির জন্য অনুমতি দিয়ে থাকে। প্রজাদের মাধ্যমে অত্র এলাকায় কাঁছারী থেকে প্রজাদের মাধ্যমে খাঁজনা গ্রহণ করে। প্রতিবছর প্রজাদের মাধ্যমে খাঁজনা গ্রহণ এবং দুর্গাপূজাসহ হিন্দুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ফরিদপুর বাইশরশি থেকে গয়নাযোগে এলাকায় আগমন করতেন। থাকতে মাস ব্যাপী খাস কামরায়ে। খাস কামরায় স্থাপত্য গড়ে তোলে।

স্থাপত্য দুটি বাউফল মৌজার ১ নং খাস খতিয়ানের জে এল নং ৮৭ দাগ নং ১১২০ও ১১২১ তে ১১.৯৭ একর জমির উপর অবস্থিত। অধিকাংশ অফিস ঘরই জমিদারী এ স্টেটের পুরাতন দালানে অবস্থিত। উপজেলা সদর প্রধান সড়ক দক্ষিণ পাশে ২২ একর জমির উপর মহেন্দ্র রাজেন্দ্র রায়ের জমিদার বাড়ি। স্থাপত্য দুটি দেড় ইঞ্চি পাকা ইটের তৈরি প্রায় দেড় ফুট পুরো দেয়াল। চিনেমাটি প্লেষ্টার দিয়ে ছাদ তৈরি লোহার আড়া। ভিতরে ৪টি কক্ষ। সামনে জোড়া বাধা ৬ টি গম্মুজ। এটি হচ্ছে দক্ষিণ ভিটে। দক্ষিণ ভিটে দালান সামনে বসার জায়গা রয়েছে বসার সাথে দুটি হাতির স্থাপনা। পশ্চিম পাশে রয়েছে অনুরূপ আরেকটি দালান। তিন কক্ষবিশিষ্ট। ৪০ ফুট উচু স্থাপত্য দালানটি উপরে রয়েছে টিনের ছাউনি। আড়া গুলো হচ্ছে বড় গাছের চিড়াই গাছ।

জমিদারের স্থাপত্য দুটি সামনে রয়েছে টিনের ৮চালা বিশিষ্ট উচু নাটঘর। নাট ঘরে বসে যাত্রা-পালাসহ নাটকহতো। কাঁছারি বাড়ীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠান কে কেন্দ্র করে জমিদার বাড়ীতে হতো নানা অনুষ্ঠান। বিশেষ করে দুর্গাপুজা উপলক্ষ্যে মাস ব্যাপী যাত্রা অনুষ্ঠান হয়েছিল। দেওয়া হতো মহিষ ও পাঠা বলী। মাসব্যাপী যাত্রার রিহার্সেল দেওয়া হতো। দু ঘরের সামনে বসে জমিদার তার পরিবার নিয়ে এ অনুষ্ঠান উপভোগ করেতন।

ওই সময় যাত্রা পালার মধ্যে ছিল অকালের দেশ, বাঙ্গালী রক্ততিলক, সমাজের বই, কাঞ্চন মালা, বাঙ্গালী বিচারক, সোহরাফ রুস্তম,দর্পহারী, এজিদ ও জয়নাল উদ্ধার, বঙ্গেরবর্গী প্রভৃতি। অনুষ্ঠিত যাত্রাপালায় এলাকার বাইরে থেকে আসা যাত্রাপালা দলের পাশাপাশি স্থানীয় ভাবে যারা অংশ গ্রহণ করতে তার মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে, মাখম সাহা, মনোরঞ্জন শীল, রাজস্বর রায়, অনন্ত ঘোষ, মেঘনাথ ঘোষ, চিত্র রঞ্জন সাহা, বিনোদ বিহারী সাহা। কাঁছারী বাড়ি নিরাপত্তার্থে চার পাশে রয়েছে উচু দেয়াল। প্রাচীর রয়েছে প্রাচীর পূর্বপাশে বতর্মান প্রবেশপথ ইটের তোরণ, উত্তর পাশে রির্জাভ ঘাটে গেট পশ্চিম পাশে ঘেট রয়েছে। ইটের র্নিমান প্রাচীর ১০ ইঞ্চি প্রসস্ত উচু হচ্ছে ৯ ফুট। স্থাপত্য দুটি সংলগ্ন রয়েছে ২টি পুকুর। জমিদার বাড়ীর উত্তর পাশে পুকুরটি পানি ছিল রিজার্ভ। রিজার্ভ পুকুরের দক্ষিণ পাশে বাধাই করা ঘাট। রিজার্ভ পুকুরের পানি কেউ ব্যবহার করতে না। ভুলক্রমে কেউ পানি পান করতে গেলেও পা পুকুরে পানিকে ভিজাতে না। এ পুকুরে পানি রিজার্ভ রাখার জন্য ছিল আলাদা পাহারাদার। পশ্চিম পাশে বড়ো একটি পুকুর। যা ছিল সবার জন্য উম্মুক্ত। আরো জনশ্রুতি হচ্ছে, জমিদারের কঠোর শাসন থাকলে তাদের জমিদারিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে।

১৮৬৭ খ্রিঃ কলকাতা গেজেটে পটুয়াখালী মহকুমাধীন বাউফলকে থানা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং ১৮৭৪ খ্রিঃ পুলিশ ষ্টেশন স্থাপন করে থানা হিসেবে বাউফলে কার্যক্রম শুরু করা হয়। পূর্ব পশ্চিম পাকিস্তান শাসন আমল। মধ্য স্বত্বলোপ পায়। সরকার সমস্ত জমিদারিত্ব একোয়ার করে নেয়। জমিদার মহেন্দ্র রায় ও রাজেন্দ্র রায় দেশ ছেড়ে চলে যায়। সরকার ১নং খতিয়ানভুক্ত করে বর্তমানে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা ভূমি অফিস কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

দু’শ বছরের পুরানো এই জমিদারী স্থাপনার ঐতিহ্য কে সংরক্ষণ করা গেলে ফরিদপুরের সদরপুরের বাইশরশি জমিদার বাড়িকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্রের উজ্জ্বল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যেতো।

সংরক্ষণ না থাকায় আজ ভগ্নদশায় ধ্বংসস্তুপের মধ্যে কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাওয়ায় তার সৌন্দর্য্য নষ্ট হচ্ছে। সরকার একটু নজর দিলে হতে পারে দেশের মধ্যে অন্যতম পর্যটক কেন্দ্র। সরকারি ভাবে সংরক্ষণ ও স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় প্রতিনিয়ত বাড়ির মূল্যবান সামগ্রী চুরি হয়ে যাচ্ছে। দ্বিতল ভবনের ছাদ নিরাপত্তাদ্বয় কাঠের আড়া গুলো কেটে নেওয়ার ফলে কয়েকটি রুমের ছাদ ধসে পড়েছে ইতোমধ্যে। এছাড়াও বাড়িটির অন্যান্য কক্ষে লোহার দরজা,জানালা,গ্রীল ও চুরি হয়ে যাচ্ছে। বেশীরভাগ চুরির ঘটনা রাতে হচ্ছে বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছেন।

এবিষয়ে সদরপুরের সন্তান তৌকির আহম্মেদ বলেন, এখন সময় এসেছে আমাদের এই ইতিহাসের অংশ টুকুকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার তাই আমরা সদরপুর বাসী এই জমিদার বাড়ি টি সংরক্ষণের জন্য প্রশাসনের কাছে জোরালো দাবি জানাচ্ছি। এই জমিদার বাড়ি টি সংস্কার করলে জমিদার বাড়িটি হতে পারে অত্র সদরপুর উপজেলার দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন কেন্দ্র। রক্ষা পেত ঐতিহ্যবাহী জমিদার বাড়িটি ও একটি ইতিহাস।

নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙার আহ্বান, ফরিদপুরে দিনব্যাপী কর্মশালা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ১০:২৪ অপরাহ্ণ
নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙার আহ্বান, ফরিদপুরে দিনব্যাপী কর্মশালা

নারীর মানসিক স্বাস্থ্যকে সুস্থ পরিবার ও মানবিক সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি উল্লেখ করে বক্তারা বলেছেন, মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত না হলে ব্যক্তি, পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজ—সবক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, কুসংস্কার দূর করা এবং সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বুধবার (২২ জুলাই) ফরিদপুর শহরের একটি রেস্টুরেন্টের কনফারেন্স রুমে ফাউন্ডেশন ফর উইমেন পসিবিলিটিজ-এর সহযোগিতায় নারী উন্নয়ন সংস্থা ‘নন্দিতা সুরক্ষা’ আয়োজিত “Women’s Mental Health: Awareness, Empathy and Practical Actions” শীর্ষক দিনব্যাপী সচেতনতামূলক কর্মশালায় এসব কথা বলেন বক্তারা।

নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক সুস্থতা রক্ষায় সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ গড়ে তোলা এবং প্রাথমিক মানসিক সহায়তা (Psychological First Aid) বিষয়ে ধারণা দেওয়ার লক্ষ্যেই এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
কর্মশালায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মজীবী নারী, তরুণ-তরুণী, যুব অ্যাক্টিভিস্ট, স্বেচ্ছাসেবক, নারী অধিকারকর্মী এবং সামাজিক উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধিসহ মোট ২৫ জন অংশগ্রহণ করেন।

রিসোর্স পারসন হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোসামাজিক সুস্থতা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহাপারা আলম। তিনি নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বর্তমান বাস্তবতা, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ, বার্নআউট, বিষণ্নতার কারণ, প্রাথমিক লক্ষণ এবং এসব পরিস্থিতিতে সহমর্মিতাপূর্ণ আচরণ ও প্রাথমিক মানসিক সহায়তার গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।

তিনি বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক ট্যাবু, ভুল ধারণা এবং সচেতনতার অভাবের কারণে অনেক নারী সময়মতো প্রয়োজনীয় সহায়তা নিতে পারেন না। ফলে অনেক সমস্যা দীর্ঘমেয়াদি আকার ধারণ করে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে মানসিক স্বাস্থ্যবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনে পেশাদার সহায়তা গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, আত্মযত্ন (Self-care), সহমর্মিতাপূর্ণ যোগাযোগ এবং প্রয়োজন হলে নিরাপদ রেফারেল ব্যবস্থার মাধ্যমে অনেক মানসিক সংকট প্রাথমিক পর্যায়েই মোকাবিলা করা সম্ভব।

অংশগ্রহণমূলক এ কর্মশালায় বিশেষজ্ঞের উপস্থাপনার পাশাপাশি দলীয় আলোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময়, কেস স্টাডি বিশ্লেষণ এবং প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান। একই সঙ্গে নিজ নিজ কর্মক্ষেত্র ও কমিউনিটিতে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, ইতিবাচক বার্তা প্রচার এবং সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানানো হয়।

সমাপনী অনুষ্ঠানে বেনিফিসিয়ারিজ ফ্রেন্ডশিপ ফোরাম (বিএফএফ)-এর নির্বাহী পরিচালক এ. এন. এম. ফজলুল হাদী সাব্বির বলেন, “নারীর শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানসিকভাবে সুস্থ নারীই একটি সুস্থ পরিবার এবং উন্নত সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও সমাজের সকলকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”

আয়োজক প্রতিষ্ঠান নন্দিতা সুরক্ষা-র নির্বাহী পরিচালক তাহিয়াতুল জান্নাত রেমি বলেন, “নারীর মানসিক স্বাস্থ্য একটি মৌলিক অধিকার। পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। নন্দিতা সুরক্ষা নারী ও তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।”

কর্মশালা শেষে অংশগ্রহণকারীরা জানান, নারীর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজে এখনও নানা ভুল ধারণা ও সংকোচ রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ শুধু সচেতনতা বাড়ায় না, বরং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা গ্রহণের মানসিকতাও তৈরি করে। তাদের মতে, এমন কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করা হলে সমাজে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সালথায় বেকারিতে অগ্নিকাণ্ড, আগুনে পুড়ল ময়দা-চিনি ও তিন মোটরসাইকেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ৫:২৫ অপরাহ্ণ
সালথায় বেকারিতে অগ্নিকাণ্ড, আগুনে পুড়ল ময়দা-চিনি ও তিন মোটরসাইকেল

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার রসুলপুর বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একটি বেকারি, তিনটি মোটরসাইকেল এবং বিপুল পরিমাণ খাদ্যসামগ্রী পুড়ে গেছে।

বুধবার (২২ জুলাই) ভোর ৫ টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় প্রাথমিকভাবে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে সৌভাগ্যবশত এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা আহতের ঘটনা ঘটেনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের রসুলপুর বাজারে সেলিম মাতুব্বরের মালিকানাধীন আল্লাহরদান বেকারি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো বেকারিতে ছড়িয়ে পড়ে। ভোরের নীরবতায় আগুনের লেলিহান শিখা দেখে স্থানীয়রা দ্রুত ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করেন এবং একই সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেন।

খবর পেয়ে সালথা ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৭টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার ফলে আশপাশের দোকান ও স্থাপনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

অগ্নিকাণ্ডে বেকারির ভেতরে থাকা দুটি অ্যাপাচি মোটরসাইকেল, একটি রানার মোটরসাইকেল, প্রায় ২০ বস্তা ময়দা, ২৫ বস্তা চিনি, বেকারি তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং পুরো টিনশেড ঘর পুড়ে যায়। এতে মালিকের প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

সালথা উপজেলা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আব্দুল জলিল ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘কে জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, বেকারির চুলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে তদন্ত শেষে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

এদিকে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বেকারি মালিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ভোরে আগুন লাগার কারণে বড় ধরনের প্রাণহানির ঘটনা না ঘটলেও ক্ষতিগ্রস্ত বেকারিটি এলাকার অন্যতম পরিচিত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর আর্থিক ক্ষতি বেশ বড়। দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হলে বেকারির কার্যক্রম আবারও স্বাভাবিকভাবে চালু করা সম্ভব হবে।

অল্প বয়সী নারীরা কেন বয়স্ক পুরুষের প্রেমে পড়ে?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬, ২:২১ অপরাহ্ণ
অল্প বয়সী নারীরা কেন বয়স্ক পুরুষের প্রেমে পড়ে?

প্রেম বা ভালোবাসার ক্ষেত্রে বয়স সবসময় নির্ধারক নয়। মানুষের অনুভূতি, পছন্দ কিংবা মানসিক সংযোগ অনেক সময় বয়সের সীমা অতিক্রম করে যায়। যদিও অধিকাংশ সম্পর্কেই দুই সঙ্গীর বয়স কাছাকাছি থাকে, তবুও বাস্তবে এমন অনেক সম্পর্ক দেখা যায় যেখানে নারীর বয়স তুলনামূলক কম এবং পুরুষের বয়স বেশি। কেন এমনটা ঘটে এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে।

সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সময়ে বয়সে বড় পুরুষদের প্রতি অনেক নারীর আকর্ষণের মূল কারণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়; বরং মানসিক পরিপক্বতা, দায়িত্বশীলতা, স্থিরতা এবং পারস্পরিক সম্মানবোধ। আধুনিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই বিষয়গুলোই এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

মানসিক পরিপক্বতা তৈরি করে আস্থা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়, যা তার চিন্তাভাবনা ও আচরণে পরিপক্বতা আনে। বয়সে বড় পুরুষরা সাধারণত আবেগ নিয়ন্ত্রণে বেশি দক্ষ হন এবং ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অযথা উত্তেজিত হওয়ার পরিবর্তে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করেন। ফলে সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি বা অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।

বাস্তবভিত্তিক সম্পর্কের প্রতি ঝোঁক

পরিণত বয়সের অনেক পুরুষ সম্পর্ককে কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করেন। তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ককে গুরুত্ব দেন। সম্পর্কে কোনো সমস্যা তৈরি হলে তা এড়িয়ে না গিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করার প্রবণতাও তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

সিদ্ধান্ত গ্রহণে থাকে আত্মবিশ্বাস

জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা বয়সে বড় অনেক পুরুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। কর্মজীবন, পারিবারিক দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত বিষয়ে তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কমাতে সাহায্য করে। এই স্থিরতা অনেক নারীর কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা থাকে স্পষ্ট

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার গুরুত্ব অনেক। বয়সে বড় অনেক পুরুষের ক্যারিয়ার, পরিবার এবং ব্যক্তিগত লক্ষ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকে। ফলে সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কম দেখা যায় এবং সঙ্গীর মধ্যেও নিরাপত্তার অনুভূতি তৈরি হতে পারে।

বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা

জীবনের নানা অভিজ্ঞতা একজন মানুষকে নতুন পরিবেশ ও ভিন্ন মতের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়। অনেক পরিণত বয়সের পুরুষ এই অভিযোজন ক্ষমতার কারণে বিভিন্ন সামাজিক বা পারিবারিক পরিস্থিতিতে সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন। অনেক নারী এই গুণটিকেও ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করেন।

পারস্পরিক সম্মান ও সহানুভূতির গুরুত্ব

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, বয়সে বড় অনেক পুরুষ সম্পর্কে সঙ্গীর মতামতকে গুরুত্ব দেন, ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করেন এবং প্রয়োজন হলে সমঝোতার পথও বেছে নেন। এই ধরনের আচরণ সম্পর্ককে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘস্থায়ী করতে ভূমিকা রাখতে পারে।

বদলে গেছে সম্পর্কের ধারণা

একসময় ধারণা ছিল, বয়সে বড় পুরুষের প্রতি নারীদের আকর্ষণের প্রধান কারণ আর্থিক নিরাপত্তা। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। এখন অনেক নারী এমন একজন সঙ্গীকে গুরুত্ব দেন, যিনি দায়িত্বশীল, আবেগ বোঝেন, খোলামেলা যোগাযোগে বিশ্বাসী এবং সম্পর্কের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পরিণত বয়সের অনেক পুরুষ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক গড়তে বেশি আগ্রহী হন। তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং দায়িত্ববোধকে সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেন।

বয়স নয়, সম্পর্কের ভিত্তি বোঝাপড়া

তবে বিশেষজ্ঞরা এটিও স্পষ্ট করে বলছেন, শুধু বয়স বেশি হলেই কেউ আদর্শ জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠেন না। একইভাবে কম বয়স মানেই অপরিপক্ব এমন ধারণাও সঠিক নয়। একটি সম্পর্কের সফলতা নির্ভর করে ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, যোগাযোগের দক্ষতা এবং বোঝাপড়ার ওপর।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে বয়সের পার্থক্য থাকতেই পারে। তবে সুস্থ ও দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে তখনই, যখন দুইজন মানুষ একে অপরকে সম্মান করেন, বিশ্বাস করেন এবং মানসিকভাবে একসঙ্গে পথ চলতে প্রস্তুত থাকেন।