খুঁজুন
, ,

রাজনৈতিক আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ

জব্বার আল নাঈম
প্রকাশিত: সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫, ১২:৪৮ অপরাহ্ণ
রাজনৈতিক আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ

জাতীয় নির্বাচন যতই সন্নিকটে আসছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ততই ঘনীভূত হচ্ছে। সরকারের উপদেষ্টাদের কয়েকজন সেফ এক্সিট খুঁজছেন বলে মন্তব্য করেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। পক্ষে-বিপক্ষে এই আলোচনা এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। যদি তা সত্যি হয়, অন্যায় কাজের সঙ্গে তাদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে নিশ্চয়ই? এমনটা হলে এক্সিট খোঁজা স্বাভাবিক।

অথচ ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে এই ক্যাবিনেটের প্রতি আস্থা রেখেছিল বাংলাদেশের জনগণ, অভ্যুত্থানকারী ছাত্র-জনতা। এক্সিটের মূল কারণ শুধু কি দুর্নীতি! সম্ভবত এখানে অন্য অনেক কারণ বিরাজমান। জুলাই সনদের স্বাক্ষর বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং পিআর প্রসঙ্গে গণভোটের কাঠামো তৈরির উদ্যোগই মূলত নির্বাচনকে ঝুঁকিতে ফেলার আশঙ্কা তৈরি করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক্সিট নতুন কিছু নয়।

১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীরা বিদেশের মাটিতে এক্সিট নিয়েছিল। সম্ভবত সেটিই ছিল প্রথম বড় রাজনৈতিক এক্সিট, যেখানে দায়বদ্ধতার বদলে দেখা গিয়েছিল দায় এড়ানোর সংস্কৃতি। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পরও অনেকে সামরিক ও রাজনৈতিক বলয়ে নিরাপদ ছিল। ২০০৮ সালের পর ফখরুদ্দীন ও মইন ইউ আহমেদের নেতৃত্বাধীন সরকারও নির্বাচন সম্পন্ন করেই এক্সিট নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে, যেন তাদের ভূমিকার কোনো দায়ই ছিল না।

সম্প্রতি শেখ হাসিনাও জুলাই আন্দোলনের মুখে সামরিক প্রহরায় এক্সিট নিয়েছেন। এসব আদতে রাজনৈতিক ব্যর্থতার মুখে নৈতিক পশ্চাদপসরণ ছাড়া কিছু নয়। বিপরীতে, তারেক রহমানের ক্ষেত্রে ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে, এই এক্সিটটি মূলত ছিল চিকিৎসা নেওয়া ছাড়াও অনিচ্ছায় রাজনৈতিক নির্বাসন। পরবর্তী সময়ে সেই তারেক রহমান মঞ্চে ফিরে বাংলাদেশ ও বিএনপির রাজনীতিকে নতুন পথে দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন দায় গ্রহণের নতুন এক ইতিহাস।

০২.

বর্তমান উপদেষ্টাদের অবস্থানও কি সেই ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে যাচ্ছে। উপদেষ্টাদের প্রধান দায়িত্ব ছিল জুলাই সনদের স্বাক্ষর বাস্তবায়ন, যেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল জনগণের অংশগ্রহণমূলক শাসন, দায়বদ্ধ প্রশাসন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যাচ্ছে, বাস্তবায়নের ইচ্ছার চেয়ে ভয়ই তাঁদের বেশি গ্রাস করছে। শুধু দুর্নীতি নয়, নির্বাচন পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও বাস্তবায়ন নিয়েও ভয়। পিআর পদ্ধতিতে সংসদের আসন ভাগ হবে প্রতিটি দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। অর্থাৎ কোনো একক দল বা জোট পুরো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারবে না। পিআর পদ্ধতিতে বড় দলগুলোর আধিপত্য ভেঙে যায়, ছোট দল ও বিকল্প নেতৃত্বের জন্য খুলে যায় নতুন দরজা। ফলে পিআর মানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, এমনকি অস্তিত্ব সংকটও, আদতে এই পদ্ধতি হঠাৎ করে সংকটই তৈরি করবে। বাংলাদেশ এই মুহূর্তে আরেকটি সরকার পতনের ধকল সহ্য করতে পারবে না। সেই আশঙ্কা থেকেই কেউ কেউ চাইছেন পুরনো পদ্ধতিতে নির্বাচনব্যবস্থার বাস্তবায়ন। তাই বর্তমান এক্সিটপ্রবণতা কেবল প্রশাসনিক ক্লান্তি নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা, ভীতির প্রকাশও।

এদিকে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায়। এই সনদ জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্রচিন্তার এক ঐতিহাসিক দলিল। রাষ্ট্র হবে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক; কোনো সরকার বা প্রশাসন ক্ষমতার একচ্ছত্র মালিক নয়। আজ সেই অঙ্গীকারই ঝুলে আছে প্রশাসনিক কাগজে। সনদ বাস্তবায়নের পথে দাঁড়িয়ে আছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, বিদেশি প্রভাব আর রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কৌশল। অথচ জনগণ অপেক্ষা করছে, কবে তারা সত্যিকার অর্থে নিজের হাতে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পাবে।

০৩.

পিআর বাস্তবায়নের আগে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ এসেছে নতুনভাবে। নির্বাচনের আগে আরেকটি নির্বাচন, যেন নতুন সংকট ঘনীভূত! এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে গণভোট হয়েছে দুইবার—প্রথমটি ১৯৭৭ সালে, দ্বিতীয়টি ১৯৮৫ সালে, যদিও আগের গণভোটের সঙ্গে বর্তমান গণভোটে অমিল অনেক। দীর্ঘ চার দশক পর আবারও যখন গণভোটের আলাপ উঠছে, তখন তা কেবল পিআর পদ্ধতির বৈধতা নয়, রাষ্ট্রচিন্তার দিকনির্দেশনা, শক্তি, হিম্মত জানানোর সক্ষমতাও। ব্যর্থ হলে অনুমিত আগামী দিনের জন্য পিআর পদ্ধতি চিরতরে কবরে শায়িত হবে, সেই সঙ্গে রাষ্ট্র পড়বে গভীর সংকটে। এ জন্য দায়ী থাকবে অতি উত্সুক ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চাওয়া দলটিই।

গণভোট মানে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ। কিন্তু ইতিহাস বলে, গণভোট যতটা গণতান্ত্রিক সম্ভাবনা তৈরি করে, ততটাই সহজে তা রাজনৈতিক প্রহসনেও পরিণত হতে পারে। তাই আসন্ন গণভোটের সাফল্য নির্ভর করবে মূলত জনগণের চাহিদা ও আস্থার ওপর। এটি সত্যিকার অর্থে জনগণের মতামত প্রতিফলিত করলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে; বিপরীতে যদি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের হাতিয়ার হয়, তাহলে এক্সিটের ধারাবাহিকতা আবারও ফিরে আসবে।

আজকের বাংলাদেশ এক ভয়ংকর সন্ধিক্ষণে। উপদেষ্টারা চাইলে এখনই ইতিহাসের দায় নিতে পারেন—যৌক্তিক ও কাঙ্ক্ষিত জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত গ্রহণ, পিআর পদ্ধতি নির্বাচিত সরকারের অধীনে পরীক্ষামূলকভাবে দেখা হবে, বাস্তবায়নের এই আশ্বাস। নয়তো রিস্কি সময়ে রিস্কি এক্সপেরিমেন্টের অর্থ রাষ্ট্রকে বাঘের মুখে ফেলা।

আবার উপদেষ্টারা যদি সেফ এক্সিট বেছে নেন, তাহলে ইতিহাস তাঁদেরও সেই একই অন্ধকার অধ্যায়ে লিখে রাখবে, যেখানে দায়ের চেয়ে ভয়, নৈতিকতার চেয়ে স্বার্থই বড় হয়ে দাঁড়ায়। জুলাই সনদ বলতে চায়, রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, প্রশাসন তাদের প্রতিনিধি। এখন সময় এসেছে সেই কথাটিকে বাস্তব রূপান্তরের। এক্সিট নয়, প্রয়োজন উপস্থিতি; পলায়ন নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি; নীরবতা নয়, প্রয়োজন জনগণের কণ্ঠস্বর টিকিয়ে রাখার প্রবল ইচ্ছশক্তি; নয়তো বারবার গণ-অভ্যুত্থান প্রাসঙ্গিক হবে। গণতন্ত্র পালিয়ে বাঁচে না, জবাব দিয়েই টিকে থাকে। আর আজকের বাংলাদেশকে হাঁটতে হবে দায় গ্রহণের, সাহসের ও সত্যের পথে।

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ১:৩৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরের মধুখালীতে গাঁজাসহ আটক নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ১০০ গ্রাম গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হওয়া নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে। মৃত যুবকের নাম মো. ইমতিয়াজ আহমেদ প্রান্ত (২৮)। তিনি মধুখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোন্দারদিয়া এলাকার মৃত ইসকেন্দার হায়দারের ছেলে।

জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তথ্যমতে, শনিবার (২০ জুন) দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে মধুখালী পৌরসভার গোন্দারদিয়া এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় মাদক বিক্রির অভিযোগে প্রান্তকে আটক করা হয়। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।

জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলমগীর হোসেন জানান, আটকের ঘণ্টা খানেক পর প্রান্ত হঠাৎ শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দ্রুত তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (২১ জুন) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. শিকদার আফ্রিদি রিজভী বলেন, হাসপাতালে আনার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ও সিটিস্কানে দেখা যায়, প্রান্ত ব্রেনস্ট্রোকের শিকার হয়েছেন। তার মাথায় বড় ধরনের রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন বা নির্যাতনের আলামত পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলার পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযানের সময় প্রান্তকে গাঁজাসহ আটক করা হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, তিনি ব্রেনস্ট্রোকজনিত কারণে মারা গেছেন। তারপরও মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।”

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রান্তের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় পূর্বেও মাদক-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্ত কমিটির অনুসন্ধান শেষ হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জেলায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। মাদক নিয়ন্ত্রণে এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।

ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর ও আবু নাসের হোসাইন, সালথা:
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:৩২ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ, বদলে যেতে পারে কৃষির চিত্র

কৃষিপ্রধান জেলা ফরিদপুরে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছেন এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা। প্রচলিত ধান, পাট, গম কিংবা সবজি চাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ শুরু হয়েছে ফরিদপুরের সালথা উপজেলায়। উপজেলার যদুনন্দী ইউনিয়নের যদুনন্দী গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির ৮ বিঘা জমিতে আনারসের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।

স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফরিদপুর অঞ্চলে এ ধরনের বৃহৎ পরিসরের আনারস চাষ আগে দেখা যায়নি। ফলে মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিকল্প ও লাভজনক ফলচাষের পথ উন্মুক্ত হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যদুনন্দী গ্রামের দুটি পৃথক প্লটে বিস্তীর্ণ জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রোপণ করা হয়েছে হাজার হাজার আনারসের চারা। পরিচ্ছন্ন ও সুপরিকল্পিত বাগানজুড়ে চলছে নিয়মিত পরিচর্যা। দূর থেকে দেখলে সবুজের সমারোহে ভরা বাগানটি যে কারও দৃষ্টি কাড়ে। ইতোমধ্যে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে কৃষকরা বাগান পরিদর্শনে আসছেন এবং আনারস চাষের খুঁটিনাটি বিষয়ে জানার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।

জানা গেছে, মিলন ফকির দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও কৃষিপণ্য চাষের সঙ্গে যুক্ত। নতুন কিছু করার চিন্তা থেকেই দুই বছর আগে তিনি বাড়ির ছাদে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি আনারস গাছ লাগান। আশাতীত ফলন ও সফলতা তাকে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষে উদ্বুদ্ধ করে। এরপর তিনি পরিকল্পিতভাবে আনারস চাষের জন্য জমি নির্বাচন করেন এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন।

চলতি বছরে তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর অঞ্চল থেকে ক্যালেন্ডার ও জলডুগু জাতের প্রায় ৮০ হাজার আনারসের চারা সংগ্রহ করেন। পরবর্তীতে ৮ বিঘা জমিতে এসব চারা রোপণ করা হয়। বর্তমানে বাগানের গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে এবং আগামী বছর থেকে ফলন পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা মিলন ফকির বলেন, “প্রথমে শখের বসে বাড়ির ছাদে কয়েকটি আনারস গাছ লাগিয়েছিলাম। গাছে ভালো ফল আসার পর আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখন মনে হলো, বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা সম্ভব। সেই চিন্তা থেকেই এবার বড় পরিসরে চাষ শুরু করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “চারা সংগ্রহ, জমি প্রস্তুত, সেচ ব্যবস্থা, সার, শ্রমিক ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় ১৬ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হলে আগামী বছর ফল সংগ্রহ করা যাবে। তখন প্রায় ৮০ লাখ টাকার আনারস বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।”

মিলন ফকির জানান, শুধু ফল বিক্রিই নয়, ভবিষ্যতে আনারসের উন্নত জাতের চারা উৎপাদন ও বিক্রিরও পরিকল্পনা রয়েছে তার। এতে একদিকে যেমন অতিরিক্ত আয় হবে, অন্যদিকে স্থানীয় কৃষকরাও সহজে মানসম্পন্ন চারা সংগ্রহ করতে পারবেন।

তিনি বলেন, “আমার এই উদ্যোগ সফল হলে এলাকার অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেলে আগামীতে আরও বড় পরিসরে আনারসের আবাদ সম্প্রসারণ করবো।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সালথা এলাকায় এর আগে কখনো এভাবে বাণিজ্যিক আকারে আনারস চাষ হতে দেখা যায়নি। ফলে বাগানটি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও অনেক বেশি।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, “আমরা সাধারণত ধান, পাট ও সবজি চাষ করি। আনারস চাষের কথা কখনো ভাবিনি। মিলন ফকিরের বাগান দেখে মনে হচ্ছে এটি লাভজনক হতে পারে। ফলন ভালো হলে আমরাও এ ধরনের ফলচাষে আগ্রহী হবো।”

আরেক কৃষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাগানটি দেখতে খুব সুন্দর। প্রতিদিন অনেক মানুষ দেখতে আসছে। সফল হলে এটি এলাকার কৃষকদের জন্য নতুন দৃষ্টান্ত হবে।”

কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আনারস একটি লাভজনক ফল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ব্যাপকভাবে আনারসের চাষ হয়। বর্তমানে বাজারে আনারসের চাহিদা বাড়ছে এবং ফলটি পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ভিটামিন সি, ম্যাঙ্গানিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও হজম সহায়ক উপাদান। ফলে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছে আনারসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, “সালথা উপজেলায় প্রথমবারের মতো ৮ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করা হয়েছে। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ। কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে কৃষিতে বহুমুখীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লাভজনক ফল ও ফসলের আবাদ বৃদ্ধি পেলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। মিলন ফকিরের এই উদ্যোগ সফল হলে জেলার অন্য কৃষকরাও উৎসাহিত হবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।”

ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. রইচ উদ্দিন বলেন, “ফরিদপুরে বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমাদের জেলায় সাধারণত ধান, পাট, গম ও বিভিন্ন সবজি চাষের প্রচলন বেশি থাকলেও কৃষিতে বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে নতুন নতুন ফল ও ফসলের আবাদ সম্প্রসারণ অত্যন্ত প্রয়োজন। মিলন ফকিরের মতো উদ্যোক্তারা নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছেন।”

তিনি আরও বলেন, “প্রাথমিকভাবে আমরা বাগানের অবস্থা সন্তোষজনক দেখেছি এবং কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যদি ফলন ও বাজারজাতকরণ সফল হয়, তাহলে ফরিদপুরের অনেক কৃষক আনারস চাষে আগ্রহী হবেন। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জেলার কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আমরা আশাবাদী।”

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জলবায়ু ও মাটির উপযোগিতা বিবেচনায় ফরিদপুর অঞ্চলেও আনারস চাষের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সঠিক পরিচর্যা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতা অব্যাহত থাকলে এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হতে পারে।

প্রচলিত ফসলের বাইরে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার সন্ধানে মিলন ফকিরের এই সাহসী পদক্ষেপ ইতোমধ্যেই কৃষকদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তার স্বপ্ন সফল হলে শুধু একজন উদ্যোক্তার আর্থিক উন্নয়নই নয়, বরং ফরিদপুরে আনারস চাষের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে যোগ হবে নতুন সম্ভাবনা, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান এবং কৃষকদের জন্য উন্মুক্ত হবে আয়ের নতুন দিগন্ত।

কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: রবিবার, ২১ জুন, ২০২৬, ৭:১৪ পূর্বাহ্ণ
কমলা নাকি কলা, রক্তে শর্করার জন্য কোনটি বেশি ভালো?

সুস্থ থাকতে ফলের কোনো বিকল্প নেই। তবে যখন প্রশ্ন আসে রক্তে শর্করার বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের, তখন অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান যে কোন ফলটি বেছে নেবেন। বিশেষ করে জনপ্রিয় দুটি ফল কমলা এবং কলার মধ্যে কোনটি ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বা যারা চিনি নিয়ে সচেতন তাদের জন্য বেশি উপকারী, তা নিয়ে বিতর্ক অনেক দিনের।

যদিও উভয় ফলেই প্রাকৃতিক চিনি থাকে, কিন্তু পুষ্টিগত গঠন এবং গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের (জিআই) পার্থক্যের কারণে শরীরের রক্তে শর্করার মাত্রায় এদের প্রভাব ভিন্ন হয়।

আজকের ফিচারে আমরা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে খুঁজে দেখব, আপনার শরীরের জন্য এই দুটি ফলের মধ্যে কোনটি বেশি নিরাপদ এবং কীভাবে খেলে আপনার শর্করা থাকবে নিয়ন্ত্রণে।

গ্লাইসেমিক ইনডেক্সে কে এগিয়ে?

রক্তে শর্করার ব্যবস্থাপনায় কমলার পাল্লা কিছুটা ভারী বলে মনে করা হয়। কারণ কমলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) মাত্র ৩৫, যা বেশ কম। অন্যদিকে, একটি পাকা কলার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স সাধারণত ৪৮ এর কাছাকাছি থাকে। যেহেতু কমলার জিআই কম, তাই এটি রক্তে শর্করার মাত্রা কলার তুলনায় ধীরে বৃদ্ধি করে।

পুষ্টির তুলনা: একনজরে

একটি মাঝারি আকারের কলা (১১৮ গ্রাম) এবং একটি মাঝারি কমলার (১৩১ গ্রাম) পুষ্টিগুণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:

ক্যালরি: কলায় থাকে ১০৫ ক্যালরি, যেখানে কমলায় থাকে মাত্র ৬১.৬ ক্যালরি।

কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা: কলায় শর্করার পরিমাণ ২৬.৯ গ্রাম, অন্যদিকে কমলায় তা ১৫.৫ গ্রাম।

ভিটামিন সি: কমলায় প্রায় ৬৯ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে (দৈনিক চাহিদার ৭৭%), যা কলার (১০.৩ মিলিগ্রাম) তুলনায় অনেক বেশি। শর্করার পরিমাণ কম এবং ভিটামিন সি-এর আধিক্যের কারণে কমলা রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় কিছুটা বেশি সুবিধাজনক।

কলার গুণাগুণ: পাকা নাকি আধাপাকা?

কলা খাওয়ার ক্ষেত্রে এর পরিপক্কতা বা কতটা পেকেছে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কম পাকা বা কিছুটা সবুজ কলায় ‘রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ’ নামক এক ধরণের কার্বোহাইড্রেট থাকে, যা সহজে হজম হয় না এবং রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরণের স্টার্চ ইনসুলিন সংবেদনশীলতা বাড়াতেও সাহায্য করতে পারে। তবে কলা যত বেশি পাকে, তার জিআই তত বাড়তে থাকে এবং তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দিতে পারে।

কমলার বিশেষ বৈশিষ্ট্য

কমলায় থাকা সাইট্রাস পেকটিন নামক দ্রবণীয় ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয় এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার শোষণ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া এতে থাকা হেস্পেরিডিন এবং নারিঞ্জিনের মতো ফ্ল্যাভোনয়েডগুলি অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়।

রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রেখে ফল খাওয়ার কিছু কৌশল

আপনি কলা বা কমলা যা-ই পছন্দ করুন না কেন, রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে নিচের নিয়মগুলো মেনে চলতে পারেন:

১. আস্ত ফল খান, রস নয়: ফলের রস করলে এর প্রয়োজনীয় ফাইবার নষ্ট হয়ে যায়, ফলে তা দ্রুত রক্তে শর্করা বাড়িয়ে দেয়। তাই সব সময় আস্ত ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।

২. প্রোটিন বা স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের সাথে খান: ফলের সাথে কিছু বাদাম, গ্রিক ইয়োগার্ট বা পনির মিশিয়ে খেলে হজম ধীর হয় এবং সুগার স্পাইক বা শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধি কমে।

৩. পরিমিত মাত্রা: ফল যত উপকারীই হোক না কেন, পরিমাণে বেশি খেলে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই সব সময় পরিমিত পরিমাণে খাওয়ার অভ্যাস করুন।

৪. কলা কিনুন কিছুটা কাঁচা: ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে খুব বেশি পাকা কলার চেয়ে কিছুটা কম পাকা বা শক্ত কলা বেছে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষকথা

কমলা এবং কলা উভয়ই স্বাস্থ্যকর ডায়েটের অংশ হতে পারে। তবে যাদের রক্তে শর্করার সমস্যা আছে, তাদের জন্য কম শর্করার কারণে কমলা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নিয়ম মেনে পরিমিত পরিমাণে কলা খাওয়াও সম্পূর্ণ নিরাপদ।

তথ্যসূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ