খুঁজুন
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ২৩ বৈশাখ, ১৪৩৩

বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষকের পদত্যাগ ও সমস্যা থেকে উত্তরণ

মো. হাফিজুর রহমান শিকদার
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১০:০২ পূর্বাহ্ণ
বিপ্লব-পরবর্তী শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষকের পদত্যাগ ও সমস্যা থেকে উত্তরণ

পৃথিবীতে কিছু ব্যর্থতার মূল্য হয় অনেক চড়া। বিগত সরকারের দেড়যুগ ধরে ব্যর্থ শাসনের মূল্য বেশ চড়া দামে দিতে হচ্ছে দেশকে। প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিকীকরণ করে প্রশাসনিক কাঠামো একেবারে ভেঙে দিয়েছে। যার ফল মারাত্মকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে শিক্ষাঙ্গনে।

বিগত সরকারের পতনের পর দেশের আনাচ-কানাচ থেকে নানা অপ্রীতিকর সংবাদ আসছে। কোথাও স্কুলের প্রধান শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো হচ্ছে, কোথাও শিক্ষকের বাড়িঘর ভেঙে ফেলা হচ্ছে কিংবা কোথাও প্রতিবাদী জনতার ভয়ে শিক্ষক পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এতে যেমন অপরাধী শিক্ষকের নাম আসছে তেমনি নিরপরাধ কিংবা নিরপেক্ষ শিক্ষকও পদলোভী অন্য শিক্ষকের ইন্ধনে আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা রাষ্ট্রের জন্য মোটেও সুখকর কোনো সংবাদ নয়। স্বাধীনতার দুই দশক পর অর্থাৎ ১৯৯০-৯১ সালের দিকে শিক্ষার প্রতি যে অবহেলার সূচনা হয়েছিল বিগত সরকারের ১৫ বছরের শাসনামলে তার পূর্ণতা ছাপিয়ে দেশকে এক শিক্ষাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করার চক্রান্তে লিপ্ত ছিল একটি মহল।

উল্লেখ্য, বিগত প্রায় সব গণতান্ত্রিক সরকারই শিক্ষক সমাজকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কমবেশি ব্যবহার করেছে। দলীয় শিক্ষককে দিয়েছে পদোন্নতি আর প্রত্যাশিত পদায়ন। কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে কাজ না করলে প্রমোশন, পদায়নসহ অন্যান্য বৈধ সুবিধা থেকেও স্থানভেদে বঞ্চিত হতে হতো। ফলে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা হলো ক্রমক্ষয়িষ্ণু, ছিল না কোনো অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কিংবা দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা। এক ধরনের শঙ্কার মধ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিতে হতো। অসাদুপায় অবলম্বনের দায়ে কোনো শিক্ষার্থীকে শাস্তি দিলে কিংবা পরীক্ষার উত্তরপত্রে নম্বর কম দিলে শিক্ষক এক ধরনের অপমান-অপদস্তের ভয়ে থাকতেন। এসব ক্ষেত্রে শিক্ষকের প্রতি সরকারের আচরণ ছিল এক ধরনের বিমাতাসুলভ। যে কারণে পড়ালেখা শেষ করে চাকরিপ্রার্থীরা এই অনিরাপদ পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে দিন দিন। মেধাবীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আর ক্ষমতার পেছনে ছুটছে। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের অন্যতম প্রধান ভিকটিম শিক্ষকরা।

সম্রাট আওরঙ্গজেব একদিন দেখেন তার ছেলে শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছে। এসব দেখেই শিক্ষকের কাছে অনুযোগ করলেন, ছেলে কেন হাত দিয়ে পা ধুইয়ে দিল না অর্থাৎ শিক্ষকের অসম্মান হয়েছে। গত বছর এক শিক্ষক ছাত্রের চুল বড় থাকায় বেত্রাঘাত করায় শিক্ষককে জেলে যেতে হয়েছিল। সম্প্রতি বহু স্কুলের প্রধান শিক্ষক কিংবা কলেজের অধ্যক্ষকে জোর করে পদত্যাগ করিয়েছে ক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা। কোথাও পদলোভী তাদেরই সহকর্মীদের ইন্ধনে কিছু শিক্ষার্থী এ কাজটি সমাধা করেছে।

দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের পর হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে স্বৈরাচারের পতন হয় ৫ আগস্ট। এর পর পরই বৈষম্য নিরসনে ছাত্র-জনতা দেশের শিক্ষাঙ্গনে হাত দেন। বিগত সরকারের সঙ্গে কোনোরূপ সম্পর্ক ছিল কিংবা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছে প্রকাশ্যে এমন শিক্ষকদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে দিতে ছাত্র-জনতা অনেকটা জোরাজুরি করেছেন। বেশকিছু প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে একপ্রকার অপমান করে শিক্ষক, প্রধানশিক্ষক এবং অধ্যক্ষদের পদত্যাগ করিয়েছে। ফলে দেশের শিক্ষাঙ্গনে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।

গত ৪ সেপ্টেম্বর পদত্যাগের ক্রমাগত চাপে ‘হৃদরোগে আক্রান্ত’ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন কিশোরগঞ্জ শহরের আতরজান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক। কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজের অধ্যক্ষকে টেনেহিঁচড়ে চেয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ার কিংবা বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষকে জোর করে পদত্যাগ করানোর ভিডিও সারা দেশবাসী দেখেছে, হয়েছে মর্মাহত।

এখন স্বাভাবিক প্রশ্ন আসতে পারে, শিক্ষকদের বেলায় শিক্ষার্থীরা এত মারমুখী হচ্ছে কেন। এর অন্যতম কারণ হলো- শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের খুব কাছ থেকে দেখে। তারা দেখে কিছু শিক্ষক কিভাবে কোনো দলের হয়ে দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি চাপে রাজনৈতিক দলের হয়ে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতা এই শিক্ষকদের নিশ্চিত করতে হয়। মন্ত্রণালয় থেকে অফিসিয়াল নির্দেশনা দেওয়া হলেও শিক্ষার্থীরা তাদের ক্ষোভ ঝাড়ে তাদের সন্নিকটে থাকা শিক্ষকদের উপর। এর মধ্যে কিছু শিক্ষক ব্যক্তিগত স্বার্থে দলীয় পরিচয়ে নানা সুবিধা নিতে অতিউৎসাহী হয়ে ভিন্ন মতের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের হেয়প্রতিপন্ন করেছে, করেছে নানা হয়রানি। কিছু শিক্ষকের আচরণ ছিল দলীয় কর্মীদের মতো যেগুলো একেবারেই অনুচিত এবং বাংলাদেশ সার্ভিস রুলের (বিএসআর) বিরোধী। যে কারণে সারা দেশে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

গত ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি কোনো শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য না করার আহ্বান জানিয়েছেন। এটি বেশ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিগত সরকারকে টিকিয়ে রাখতে যারা ফ্রন্টলাইনে থেকে গণতন্ত্র ও জনবিরোধী কাজগুলোকে সমর্থন দিয়েছে তাদের কারও মধ্যে শিক্ষক সমাজ নেই। অথচ শিক্ষকরাই বেশি জনরোষের শিকার হচ্ছেন। এটা নিয়ে সরকারকে ভাবতে হবে।

দেশের শিক্ষার এহেন করুণ অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য কিছু বিষয়ে সংশোধন আনা জরুরি। শিক্ষক একটি জাতির দর্পণ। প্রথমত, একাডেমিক পারপাসে তিনি সংশ্লিষ্ট যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। তা যদি বিদ্যমান সরকারের কোনো নীতি কিংবা সিস্টেমের বিরুদ্ধে হয় তবুও। কিন্তু এর ফলে এই শিক্ষককে কোনো শাস্তির সম্মুখীন করা যাবে না। শিক্ষার্থীকে কোনো বিষয়ে সঠিক শিক্ষা দিতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করতে হবে। ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক, কোনো তথ্য-উপাত্ত কিংবা তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপনে বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা ভয়ের সঙ্গে পাঠদান করলে শিক্ষার্থী সঠিক কিছু শিখবে না, অন্ধকার কেটে আলো আসবে না। ফলে শিক্ষার সঠিক উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।

দ্বিতীয়ত, কোনটি সরকারের সমালোচনা, কোনটি গৃহীত সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা আর কোনটি দেশদ্রোহিতা এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করা জরুরি। সাবেক স্বৈরশাসক এসব টুলস ব্যবহার করে শিক্ষার্থীকে প্রকৃত শিক্ষার্জন, জ্ঞানলাভ থেকে যেমনি বঞ্চিত করেছিল, তেমনি শিক্ষককে সঠিক কথা বলা থেকেও বিরত রাখতে সফল হয়েছিল। সৃষ্টি করেছিল এক ভয়ের সংস্কৃতি।

তৃতীয়ত, দলীয় রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বন্ধকরণ। দেশে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুটি ধারা। একটি রাজস্বভুক্ত এবং অন্যটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়। স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের জন্য রাজনীতি করার সুযোগ থাকলেও রাজস্বভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধি-২৫ এর উপবিধি-১ অনুসারে সরকারি কর্মচারী রাজনীতি এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। যেমন বলা আছে- “কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা রাজনৈতিক দলের কোনো অঙ্গ সংগঠনের সদস্য হইতে অথবা অন্য কোনোভাবে উহার সহিত যুক্ত হইতে পারিবেন না, অথবা বাংলাদেশ বা বিদেশে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে বা কোনো প্রকারেই সহায়তা করতে পারবেন না।”

বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পদত্যাগে বাধ্য করার পেছনে এই একটি দ্বি-মুখী নীতি অন্যতম। শিক্ষার্থীরা দেখছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছে, ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করেছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে কিন্তু সরকারি স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসার শিক্ষকরা তাদের পাশে দাঁড়ায়নি। যে কারণে একটি ক্ষোভ কাজ করেছে। এর সমাধান হতে পারে, শিক্ষকদের দেশের নানা ইস্যুতে কথা বলার স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষক কোনো দলের হতে পারে না। একজন শিক্ষক দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে জ্ঞানদান করেন। তিনি যদি কথাই বলতে না পারেন তবে জ্ঞানদান একপেশে হবে যার ফলে প্রকৃত জ্ঞানলাভে ব্যর্থ হবে শিক্ষার্থীরা। রাষ্ট্র পিছিয়ে পড়বে।

কিছু শিক্ষক দলীয় কর্মীর মতো আচরণ করেছে এবং ভিন্নমতের শিক্ষকদের অপমান-অপদস্ত এবং ন্যায্য প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করেছে। ফলে বঞ্চিত সহকর্মী এবং প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। কিন্তু এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার এবং শিক্ষক সমাজের আরও সচেতন হওয়া দরকার। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য শিক্ষার দায়িত্ব শিক্ষকদের হাতেই থাকা উচিত।

ভবিষ্যতে কোনো দলীয় সরকার যেন জাতির বিবেক এই শিক্ষক সমাজকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে সেদিকে বর্তমান সরকারের নজর দেওয়া দরকার। সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেসব সংস্কার কমিশন গঠন করেছে সেখানে শিক্ষা সংস্কার কমিশন স্থান পায়নি, অথচ এটি সর্বপ্রথমে দরকার ছিল। শিক্ষার প্রশাসনিক এবং সাংবিধানিক সংস্কার করে বিষয়টির একটি স্থায়ীরূপ দিতে না পারলে ২০২৪-েএর ছাত্র-জনতার বিপ্লব, হাজারো শহীদের রক্ত বৃথা যাবে।

মো. হাফিজুর রহমান শিকদার প্রভাষক (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), বরিশাল সরকারি মহিলা কলেজ

সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ
সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ভাঙ্গার প্রবাসী যুবকের মৃত্যু, ঈদের আগেই নিভে গেল স্বপ্ন

সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার শাওন মির্জা নামে এক প্রবাসী যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তিনি ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের নওপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং সাবেক পুলিশ সদস্য মরহুম জাহিদ মির্জার একমাত্র ছেলে।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (০৩ মে) রাতে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে মোটরসাইকেল চালানোর সময় দুর্ঘটনার শিকার হন শাওন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে তাকে একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়।

শাওন মির্জা তিন বোনের মধ্যে একমাত্র ভাই ছিলেন। জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে কর্মরত ছিলেন তিনি। আসন্ন পবিত্র ঈদুল আযহা উপলক্ষে তার দেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
তার আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের মাঝে চলছে শোকের মাতম।

এদিকে, নিহতের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পরিবার ও স্থানীয়রা।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভাঙ্গা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার জহুরুল হক মিঠু।

ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

আব্দুল মান্নান মুন্নু, ভাঙ্গা:
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:২৫ পূর্বাহ্ণ
ভাঙ্গায় দুই অটোরিকশা সংঘর্ষে আহত যুবকের মৃত্যু

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় দুই অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে গুরুতর আহত শাহ আলম ফকির (৩৫) অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

দুর্ঘটনার তিনদিন পর মঙ্গলবার (৫ মে) রাত ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

নিহত শাহ আলম ফকির ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের আজিমনগর গ্রামের বাসিন্দা এবং মৃত আব্দুর রব ফকিরের ছেলে। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২ মে রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে আজিমনগর বাজার এলাকায় দুইটি অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে অন্তত পাঁচজন যাত্রী আহত হন। আহতদের মধ্যে শাহ আলমের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় প্রথমে তাকে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

তিনদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে আহাজারি, স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।

এ বিষয়ে ভাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি পুলিশ অবগত রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ৬ মে, ২০২৬, ৭:০৯ পূর্বাহ্ণ
পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে কী ভাবছে বাংলাদেশের দলগুলো?

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে।

বিশেষ করে প্রায় দেড় দশক পর মমতা ব্যানার্জীর রাজ্যের ক্ষমতা থেকে বিদায় এবং প্রথমবারের মতো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসার প্রভাব কেমন হবে তা নিয়ে কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।

একই সঙ্গে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ইস্যু ও পুশ-ইন কিংবা পুশ ব্যাক ইস্যুর মতো দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে এখন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ভূমিকা কেমন হবে- তা নিয়েও আলোচনা, কৌতূহল ও উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন দলের মধ্যে।

নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার বাংলাদেশ নিয়ে করা বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ আছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। পাশাপাশি বাংলাদেশি তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা আরও বেড়ে যায় কি-না সেই উদ্বেগও আছে অনেকের মধ্যে।

কোনো কোনো দল বলছে, নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতাদের কেউ কেউ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু মন্তব্য করেছেন যেগুলো তাদের মতে দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর।

বাংলাদেশ সরকারের দিক থেকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না।

ওদিকে পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে বড় ব্যবধানে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজয়ী হয়েছে বিজেপি। এমনকি বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী।

দলগুলো যা বলছে

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সাথে সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, যা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

এর আগে থেকেই বাংলাদেশের কিছু রাজনৈতিক দল সবসময়ই ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব তৈরির অভিযোগ করে আসছে।

এমনকি শেখ হাসিনা সরকার বিরুদ্ধে আন্দোলনেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’-এমন শ্লোগানও শোনা গেছে ঢাকার রাস্তায়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিভিন্ন ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের আরও অবনতি হয় এবং এর জের ধরে ভারতে বাংলাদেশ মিশনে হামলার ঘটনাও ঘটেছিল ।

ভারতের পণ্য বয়কটের ডাক, ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে হামলা, বাংলাদেশে ভারতের ভিসা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা তুলে নেওয়া , ভারতে বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলতে না যাওয়া- এমন অনেক ঘটনায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে।

যদিও বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য উভয় দেশের সরকারের দিক থেকেই দৃশ্যমান চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করে এসেছেন।

ওই সফরের আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “এটা হচ্ছে একটা নিউ সম্পর্ক বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড ইন্ডিয়া”।

এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক ছিল বলে মনে করা হলেও ওই সময়ে তিস্তা নদীর পানি ইস্যুটির সমাধান করা যায়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর অবস্থানের কারণে। তিনি প্রকাশ্যেই এর বিরোধিতা করেছিলেন।

আবার এবারের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে ভারতের বেশ কয়েকজন বিজেপি নেতা বাংলাদেশ সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন সেগুলোও এদেশে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে বলে অনেকে মনে করেন।

এমন প্রেক্ষাপটে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফল কোন দিকে যায় সেদিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোরও দৃষ্টি ছিল।

“নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে,” বলছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ।

তিনি বলেন, “আমরা আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিলাম। নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারানোর জন্য বিজেপি অগণতান্ত্রিক চেষ্টা করছে এমন অভিযোগ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেই আমরা দেখেছি। ভোটার তালিকাকে টার্গেট করে তারা যা করেছে সেটিকেও গণতান্ত্রিক মনে হয়নি”।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না।

“তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো”।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে”।

তবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়ার যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে।

“তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে।

“বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নিবে,” বলেছেন তিনি।

ওদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারে যেই থাকুক না কেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানে বাংলাদেশে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, যেই সরকার আসুক না কেন বা থাকুক না কেন, তাদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে।

“ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে,” বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

সূত্র : বিবিসি বাংলা