খুঁজুন
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১২ বৈশাখ, ১৪৩৩

মধুখালীতে সিজারের ১০ দিন পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ধামাচাপার অভিযোগ

মো. ইনামুল খন্দকার, মধুখালী:
প্রকাশিত: রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬, ৯:১৬ অপরাহ্ণ
মধুখালীতে সিজারের ১০ দিন পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে প্রসূতির মৃত্যু, ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ধামাচাপার অভিযোগ

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলায় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের ১০ দিন পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে সুমাইয়া বেগম (২০) নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মধুখালীতে অবস্থিত সানজিদা ক্লিনিকের মালিকপক্ষ ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ স্বজনদের।

জানা যায়, গত বছরের ২২ ডিসেম্বর মধুখালীর সানজিদা ক্লিনিকে ডা. মঈনুল হোসেন শাহিন সুমাইয়া বেগমের সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন। অস্ত্রোপচারের পর কয়েকদিন সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও ১০ দিন পর হঠাৎ করে তার অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

নিহত সুমাইয়া বেগম মধুখালীর মধুরাপুর গ্রামের বাসিন্দা। তার বাবা মৃত মুরাদ মৃধা এবং স্বামী রহমতুল্লাহ, যিনি বর্তমানে বরিশালে বসবাস করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই মৃত্যুর ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করে বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রসূতির মা শিরিনা বেগম সাংবাদিকদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সিজারের ১০ দিন পর হঠাৎ করে আমার মেয়ের প্রচুর রক্ত বের হতে থাকে। আমি এ বিষয়ে কথা বলতে নিষেধ পেয়েছি, কিন্তু আমার মন মানছে না। সত্যটা বলতেই হবে।”

তিনি আরও জানান, সানজিদা ক্লিনিকের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে ফরিদপুর ডায়াবেটিকস হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে ডাক্তার না থাকায় সুমাইয়াকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। “মটরের পানির মতো রক্ত বের হচ্ছিল,” বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান শিরিনা বেগম।

চিকিৎসকরা তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দিলে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার প্রস্তুতির সময়ই সুমাইয়া মারা যান। শিরিনা বেগম বলেন, “রক্তক্ষরণ শুরু হওয়ার চার ঘণ্টার মধ্যেই আমার মেয়েটা মারা গেল। এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না।”

এ বিষয়ে সানজিদা ক্লিনিকের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমাদের ক্লিনিক থেকে রোগীকে সুস্থ অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে কী হয়েছে, তা আমাদের জানা নেই।”

অন্যদিকে, সিজার পরিচালনাকারী চিকিৎসক ডা. মঈনুল হোসেন শাহিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

এ ঘটনায় এলাকায় চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৩:৫০ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে ৫ প্রাণহানির পরও নিরাপত্তাহীন কাফুরা রেলক্রসিং, নেই গেট-গেটম্যান—ঝুঁকিতে মানুষ

ফরিদপুর সদর উপজেলার গেরদা ইউনিয়নের কাফুরা রেলক্রসিংটি দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই রেলক্রসিংয়ে নেই কোনো লেভেল ক্রসিং গেট, নেই গেটম্যান—ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করছেন পথচারী ও যানবাহন চালকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহুবার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি এই কাফুরা রেলক্রসিংয়েই ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় ট্রেন ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষে ৫ জন নিহত হন। আহত হন আরও কয়েকজন, যাদের তাৎক্ষণিকভাবে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকাগামী একটি ট্রেন রেলগেট অতিক্রম করার সময় একটি মাইক্রোবাস হঠাৎ লাইনের ওপর উঠে পড়লে এ সংঘর্ষ ঘটে। ট্রেনের ধাক্কায় মাইক্রোবাসটি প্রায় ৫০ গজ দূরে ছিটকে গিয়ে পাশের একটি পুকুরে পড়ে যায়।

দুর্ঘটনার সময় সেখানে কোনো গেট বা গেটম্যান না থাকাই বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে। এরপর স্থানীয়দের ক্ষোভের মুখে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাফুরা রেলক্রসিংয়ে এখনো নেই কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ট্রেন আসার সময় সতর্কবার্তা বা ব্যারিয়ার না থাকায় হঠাৎ করেই যানবাহন লাইনে উঠে পড়ছে, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ওহিদুল ফকির বলেন, “প্রতিদিনই ভয় নিয়ে রাস্তা পার হতে হয়। ট্রেন কখন আসবে, কোনো ধারণা থাকে না। দ্রুত এখানে গেটম্যান নিয়োগ জরুরি।”

অটোরিকশা চালক হামিদ শরীফ বলেন, “হঠাৎ ট্রেন চলে এলে দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক সময় অল্পের জন্য বেঁচে যাই।”

এলাকার চা দোকানদার হেলাল বেপারি জানান, “ট্রেন এলে আমরা নিজেরাই রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করি।”

ঝালমুড়ি বিক্রেতা রফিক মোল্যা বলেন, “এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এত মানুষ মারা গেলেও কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই।”

চটপটি বিক্রেতা মো. হায়দার মন্ডল বলেন, “প্রতিদিন হাজার হাজার যানবাহন চলাচল করে এই রাস্তা দিয়ে। ঝুঁকি থাকলেও যেন কারো নজর নেই—এটা খুবই দুঃখজনক।”

এ বিষয়ে ফরিদপুর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার প্রহলাদ বিশ্বাস ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে জানান, “গেটম্যান নিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আওতাধীন।”

এ ব্যাপারে রেলওয়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মাহাবুব হাসান ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, এ ব্যাপারে পাকশীতে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনও এর কোনো সমাধান মিলেনি।

রেলওয়ের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা মোসা. হাসিনা খাতুন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “এটি সম্ভবত অননুমোদিত রেলগেট হওয়ায় গেটম্যান নেই। তবে বিষয়টি যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

এদিকে, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেশকাতুল জান্নাত রাবেয়া ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, বিষয়টি আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি। আমরা এলাকাবাসী ও ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুতই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সোহরাব হোসেন ‘ফরিদপুর প্রতিদিন‘-কে বলেন, “জননিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাইতো সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে শ্রীঘ্রই সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”

যে বটগাছ জানে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
যে বটগাছ জানে আমার হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা

গ্রামের বটের ছায়ায় বসে থাকা হারানো শৈশব
বিকেলের আলোটা আজও ঠিক আগের মতোই নরম হয়ে আসে। হালকা সোনালি রোদ ধানের ক্ষেতে পড়ে যেন একরাশ স্মৃতি ঝলমল করে ওঠে।

গ্রামের সেই পুরোনো বটগাছটা—যার শেকড়গুলো মাটিতে নেমে এসে যেন আরেকটা পৃথিবী তৈরি করেছে—আজও দাঁড়িয়ে আছে ঠিক আগের মতোই। শুধু বদলে গেছে সময়, বদলে গেছে মানুষ, আর হারিয়ে গেছে এক টুকরো শৈশব।

রফিক আজ অনেক বছর পর গ্রামে ফিরেছে। শহরের ব্যস্ততা, চাকরি, সংসার—সব মিলিয়ে সে যেন ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধ। কিন্তু আজ হঠাৎ করেই মনে হলো, একবার ফিরে দেখা দরকার। সেই জায়গাগুলোকে, যেগুলো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলোকে আগলে রেখেছিল।

বটগাছটার নিচে এসে দাঁড়াতেই বুকের ভেতর কেমন একটা হাহাকার উঠে গেল। কতদিন, কত বছর পরে সে এখানে এসেছে! অথচ জায়গাটা যেন ঠিক আগের মতোই আছে—শুধু নেই সেই মানুষগুলো, নেই সেই হাসির শব্দ।

ছোটবেলায় এই বটগাছটার নিচেই ছিল তাদের আস্তানা। বিকেল হলেই সে, বাবু, করিম, লিপি—সবাই একসাথে জড়ো হতো এখানে। কখনও গোল্লাছুট, কখনও কাবাডি, আবার কখনও শুধু গল্প আর হাসাহাসি। সময় যেন তখন থেমে থাকতো তাদের জন্য।

রফিক ধীরে ধীরে গাছটার একপাশে বসে পড়ল। হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল গাছের খসখসে গা। মনে হলো, গাছটা যেন তাকে চিনে ফেলেছে। যেন বলছে—“এতদিন কোথায় ছিলি?”

হঠাৎ করেই তার মনে পড়ল এক বিকেলের কথা।
সেদিন আকাশে মেঘ ছিল, হালকা বাতাস বইছিল। তারা সবাই মিলে লুকোচুরি খেলছিল। রফিক লুকিয়ে ছিল বটগাছের পেছনে। তখন লিপি এসে বলেছিল— “এই, তুই এখানে! আমি তোকে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না।”

রফিক তখন মুচকি হেসে বলেছিল— “তুই খুঁজে পাবি না, আমি খুব ভালো লুকাই।”
লিপি হেসে বলেছিল— “বড় হয়ে তুই নিশ্চয়ই গুপ্তচর হবি!”

সেই হাসির শব্দটা আজও যেন বাতাসে ভাসে। কিন্তু লিপি এখন কোথায়? কেমন আছে? হয়তো সংসার নিয়ে ব্যস্ত, হয়তো এই গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেছে।

রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শৈশবের বন্ধুরা একে একে হারিয়ে গেছে জীবনের স্রোতে। কেউ শহরে, কেউ বিদেশে, কেউ বা এই পৃথিবী ছেড়েই চলে গেছে। শুধু এই বটগাছটা রয়ে গেছে, সব স্মৃতি আগলে রেখে।
তার চোখের কোণে জল এসে গেল। সে চুপচাপ বসে রইল।

হঠাৎ দূর থেকে একটা বাচ্চার হাসির শব্দ ভেসে এলো। সে তাকিয়ে দেখল—কয়েকটা ছোট ছেলে-মেয়ে খেলছে ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে একসময় তারা খেলত।

একটা ছোট ছেলে দৌড়ে এসে গাছটার পাশে দাঁড়াল, ঠিক যেভাবে রফিক দাঁড়াত ছোটবেলায়। ছেলেটা হাসতে হাসতে বলল— “ধরতে পারবি না!”
এই দৃশ্যটা দেখে রফিকের বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। সময় বদলায়, মানুষ বদলায়, কিন্তু শৈশব—সে তো একই থাকে, শুধু মানুষ বদলে যায়।
সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।

“তোমরা কী খেলছো?”—সে জিজ্ঞেস করল।
একটা মেয়ে উত্তর দিল— “লুকোচুরি!”
রফিক হেসে বলল— “আমরাও এই গাছটার নিচে এই খেলাটাই খেলতাম।”

ছেলেমেয়েগুলো অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। যেন তারা বুঝতে পারছে না—এই মানুষটা কীভাবে তাদের মতোই একসময় এখানে খেলেছে।
একটা ছেলে বলল— “আপনি এখানে থাকতেন?”
রফিক মাথা নেড়ে বলল— “হ্যাঁ, অনেক দিন আগে।”

ছেলেটা বলল— “তাহলে আপনি আমাদের সাথে খেলবেন?”

প্রশ্নটা শুনে রফিক একটু থমকে গেল। কত বছর হয়ে গেছে সে এমন করে খেলেনি! কিন্তু আজ কেন যেন মনে হলো—আবার একবার ফিরে যাওয়া যাক সেই সময়ে।

সে মুচকি হেসে বলল— “খেলব।”
খেলা শুরু হলো। রফিক দৌড়াচ্ছে, লুকাচ্ছে, হাসছে—ঠিক যেমনটা করত ছোটবেলায়। কিছুক্ষণ জন্য সে ভুলেই গেল যে সে এখন বড় হয়ে গেছে, তার দায়িত্ব আছে, তার বাস্তবতা আছে।
সেই মুহূর্তে সে শুধু একজন শিশু—একজন হারানো শৈশব ফিরে পাওয়া মানুষ।

খেলা শেষ হওয়ার পর সে হাঁপাতে হাঁপাতে বটগাছটার নিচে বসে পড়ল। ছেলেমেয়েগুলোও তার পাশে এসে বসলো।
একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করল— “আপনি আবার আসবেন?”

রফিক একটু চুপ করে থেকে বলল— “হ্যাঁ, আসব।”
কিন্তু সে জানে—জীবনের ব্যস্ততা তাকে আবার টেনে নিয়ে যাবে। হয়তো আবার অনেক বছর কেটে যাবে।

তবুও সে একটা প্রতিজ্ঞা করল—এই জায়গাটা, এই বটগাছটা, এই স্মৃতিগুলো—সে আর ভুলে যাবে না।
সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছে। আকাশ লাল হয়ে উঠেছে। পাখিরা বাসায় ফিরছে।
রফিক উঠে দাঁড়াল। একবার শেষবারের মতো গাছটার দিকে তাকাল।

তার মনে হলো—এই গাছটা শুধু একটা গাছ নয়। এটা তার শৈশব, তার স্মৃতি, তার হারানো সময়।
সে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করল। পেছনে পড়ে রইল বটগাছটা—কিন্তু তার ভেতরে থেকে গেল এক টুকরো শৈশব।

হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হলো—শৈশব কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেটা কোথাও না কোথাও থেকে যায়—একটা গাছের ছায়ায়, একটা বিকেলের রোদে, বা কোনো পুরোনো হাসির শব্দে।
আর যখনই মানুষ একটু থেমে ফিরে তাকায়—সেই শৈশব আবার ফিরে আসে, খুব নীরবে, খুব গভীরভাবে।

রফিকের চোখে তখন আর জল নেই। আছে একরাশ শান্তি।
কারণ সে জানে—তার হারানো শৈশব পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
সে এখনো বসে আছে—গ্রামের বটের ছায়ায়। 🌿

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর

লোডশেডিং চলবে আরও কতদিন?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ
লোডশেডিং চলবে আরও কতদিন?

“গরমের মধ্যে যন্ত্রণায় আছি- গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যায়, একবার গেলে দেড়-দুই ঘণ্টার কমে আসে না।”

একথা বলছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকার বাসিন্দা নয়ন বড়ুয়া। তার দাবি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে।

এই অবস্থা দেশের বেশিরভাগ এলাকায়। দিনে-রাতে নিয়ম করে শহর এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে সাত থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানাচ্ছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা।

“এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে এমনিতেই তীব্র গরম, আর সাথে কারেন্ট (বিদ্যুৎ) নাই, সব মিলিয়ে খুবই বাজে অবস্থা,” বলেন নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দার বাসিন্দা পলাশ তালুকদার।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে লোডশেডিং একটু একটু করে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট শুরু হয়েছে আরও আগে থেকেই।

কিন্তু গত তিনদিনে গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে বলেই তথ্য মিলছে।

মূলত গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় গত বুধ ও বৃহস্পতিবার দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হয়েছে।

এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

যদিও দুটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিউ চালু এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক হলে সপ্তাহখানেকের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী।

“আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদের যা সাপ্লাই করতো তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে। বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে,” বলেন তিনি।

এলাকাভিত্তিক লোডশেডিংয়ে চিত্র

“সকাল থেকে দুইবার বিদ্যুৎ যায় অন্তত আধা ঘণ্টা করে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনবার যায় আরও আধা ঘণ্টা করে। আর সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত তিন থেকে চারবার যায় অন্তত এক ঘণ্টা করে,” চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে গেল তিনদিন এভাবেই লোডশেডিং চলছে বলে জানান স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী মোহাম্মদ আসাদ।

ওই জেলার গ্রামাঞ্চলে আরও আগে থেকেই লোডশেডিং শুরু হয়েছে বলে বিবিসি বাংলাকে জানান তিনি।

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে তীব্র লোডশেডিংয়ের বিরূপ প্রভাব পড়েছে যশোর জেলার কৃষি কাজে।

স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী বুলবুল শহীদ খান বলেন, “তেলের দাম বাড়ানোর পর থেকেই যশোরের অধিকাংশ ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। কৃষকরা তেল পাচ্ছে না, বিদ্যুৎও ভোগাচ্ছে।”

গ্রাম-শহর নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি এলাকায় কম-বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। যার কারণ হিসেবে চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন ঘাটতির কথা বলছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির সবশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৬৪৭ মেগাওয়াট। যার বিপরীতে ওই দিন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ পরিমাণ ১৪ হাজার ৪৬৭ মেগাওয়াট।

অর্থাৎ সরবরাহ ঘাটতি থাকায় সারাদেশে লোডশেডিং দিতে হয়েছে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি।

চাহিদা এবং সরবরাহের হিসেবে বৃহস্পতিবারও তিন হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি লোডশেডিংয়ের তথ্য জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

বাংলাদেশ পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির অঞ্চল ভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জোনে সবথেকে বেশি ছয় হাজার ১৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৪৫০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।

খুলনা জোনে এক হাজার ৯৭৭ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৩৮০ মেগাওয়াট, চট্টগ্রামে এক হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৫০ মেগাওয়াট, রাজশাহী জোনে এক হাজার ৮০৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২৮০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া কুমিল্লা জোনে এক হাজার ৫৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ২২০ মেগাওয়াট, ময়মনসিংহে এক হাজার ৭০ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৮০ মেগাওয়াট, সিলেটে ৫৭৬ মেগাওয়াটের বিপরীতে ১০০ মেগাওয়াট, বরিশালে ৪৬৮ মেগাওয়াটের বিপরীতে ৬০ মেগাওয়াট এবং রংপুরে এক হাজার দুই মেগাওয়াটের বিপরীতে ১৬৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি কেন?

জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে ধাপে ধাপে লোডশেডিং বেড়েছে। গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি আর একাধিক পাওয়ার প্লান্টের ইউনিটে কারিগরি জটিলতা তৈরি হওয়ায় সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাগজেকলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট।

কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে একদিকে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গেও ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের।

তাহলে এতো উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বিদ্যুৎ নিয়ে এই বেহাল দশা কেন?

বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত গ্যাস ও কয়লা নির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে।

এছাড়া আদানির একটি বিদ্যুৎ ইউনিটে কারিগরি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সব মিলিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা।

“আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জ্বালানির চিন্তা না করে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ।

যারা ফলে যখনই জ্বালানির ঘাটতি হয়েছে তখনই বিদ্যুৎ নিয়ে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন।

“আপনার গাড়ি আছে কিন্তু গাড়ি চালানোর তেল নেই, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের বর্তমান অবস্থা ঠিক এমন,” বলেন তিনি।

লোডশেডিং চলবে কতদিন

তীব্র গরমে লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। শিল্প উৎপাদন এবং কৃষি উৎপাদনেও এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

আর তাই বিদ্যুৎ নিয়ে এমন পরিস্থিতি আরও কতদিন চলবে এই প্রশ্নই এখন ঘুরেফিরে সামনে আসছে।

পরিস্থিতি পুরো ঠিক না হলেও খুব শিগগিরই সহনীয় পর্যায়ে আসবে বলেই মনে করছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

তারা বলছে, ২৬শে এপ্রিল থেকে আদানি পাওয়ারের আমদানিৃকত বিদ্যুৎ আবারো পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের আইপিপি প্ল্যান্ট থেকে ৬৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৮শে এপ্রিল থেকে স্বাভাবিক হতে পারে।

“২৮শে এপ্রিল থেকে প্রায় তেরশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমরা পাবো, যাতে সংকট খানিকটা কমবে। এছাড়া জ্বালানি সংকটে আরএনপিএন এর বন্ধ ইউনিটটি চালু হলে সব মিলিয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হবে,” বলে জানান যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা।

এক সপ্তাহের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে বলে মনে করেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

তিনি বলছেন, “আদানি পাওয়ার প্ল্যান্ট আমাদেরকে যা সাপ্লাই করতো তাদের একটি ইউনিটে সমস্যা হওয়ায় এখন অর্ধেক দিতে পারছে, বাঁশখালির এসএস পাওয়ারের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তাদের সবার সঙ্গে আমরা কথা বলেছি, আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি চলমান থাকলে এবং বাংলাদেশে জ্বালানি সংকটের এই প্রেক্ষাপট ঠিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং সহ্য করেই চলতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেন বলছেন, প্রায় ছয় থেকে সাত হাজার মেগাওয়াটের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো সচল করে এই মুহূর্তে লোডশেডিং কমানো সম্ভব।

কিন্তু এক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম যত বাড়বে সেটি বহন করা বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় কঠিন বলেই মনে করেন মি. হোসেন।

তিনি বলছেন, “বর্তমানে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে এই খাতে। এবার হয়তো সেটা ৬০ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ফার্নেস অয়েল নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে চাইলেই বাড়তি উৎপাদন করা যাবে না।”

সূত্র : বিবিসি বাংলা