খুঁজুন
, ,

‘নেতা বদলায়, পেটের কষ্ট বদলায় না’

জান্নাতুল তানভী
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
‘নেতা বদলায়, পেটের কষ্ট বদলায় না’

“নদীতে সন্ধ্যা রাত্তিরে যে সময় বোট না আসতি পারে, সেই সময় ফাঁকে দুইজন চইলে যাই। যখন দেখি অনেক দূরে বোট আছে তখন দুটো ওঁচোল দিয়ে টুপ কইরে চইলে আসি। বাজারে ছেটে দিয়ে আসি, দুইশো, একশো যা হয় তাই দিয়ে চলি”- কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার পশ্চিম চিলার এলাকার চপলা রানী মণ্ডল।

নদীতে নিষেধাজ্ঞার সময় কিভাবে সরকারি অভিযানকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাছ ধরেন, সেই কথাটিই বলছিলেন মিজ মণ্ডল। যে মাছ ধরেন, তা বাজারে বিক্রির জন্য নির্ধারিত স্থান ‘ছেট’ এ দেওয়ার কথা বলছিলেন তিনি।

মোংলার যে পাড়ায় তার ঘরে বসে কথা হচ্ছিলো, তার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পশুর নদী।

সুন্দরবনের ঢাংমারি নদী, পশুর নদী, ঘসিয়াখালী চ্যানেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন মিজ মণ্ডলের মতো এখানকার প্রায় আড়াই হাজার বাসিন্দা।

কেবল চপলা রানী মণ্ডলই নয়, ক্লারা সরকারসহ আরো অনেক নারীই পুরুষদের সাথে মাছ ধরার জন্য নদীর লবনাক্ত পানিতে নামেন।

তবে, মাছ ধরাই তাদের মূল পেশা নয়, যখন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে, তখন সংসার চালানোর জন্য সুন্দরবনের কাঠ কুড়ানো, কাঁকড়া ধরা, মধু সংগ্রহের মতো নানাবিধ কাজও করেন তারা।

সুন্দরবন ও এর আশেপাশের নদীকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেন বলে এই বাসিন্দাদের সাধারণত বনজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয়।

জীবিকা নির্বাহের জন্য একেক মৌসুমে একেক পেশা বেছে নেন তারা।

সোমবার দুপুরে যে সময় তাদের সাথে কথা হয়, তখন এই পাড়ায় দুই একজন বাদে আর কোনো পুরুষ সদস্যকে দেখা যায়নি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে এই এলাকাটি বাগেরহাট -৩ আসনের অন্তর্ভূক্ত।

এই আসনটি রামপাল ও মোংলা নিয়ে গঠিত।

এখানকার বাসিন্দাদের কাছে নির্বাচন মানে মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, তারা চান, খাওয়া-পড়ার নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা।

ভোট মানে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চান চপলা রানী

যায় না, সেই সময় যার কার্ড থাকে তিনি সরকারের কাছ থেকে ৭১ কেজি চাল পান।

প্রতিবছর পহেলা নভেম্বর থেকে ৩০শে জুন আট মাস সাধারণত জাটকা ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে।

সেসময় যেসব কার্ডধারী জেলেরা ইলিশ মাছ ধরেন, তারা চার মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে এক মণ করে চাল পান।

এক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর নদীতে ইলিশ মাছ ধরে, এমন জেলেদের শ্রেণিভুক্ত করে সরকারি সাহায্য দিয়ে থাকে বলে জানান তারা।

তবে এমন কার্ডধারীর সংখ্যা এখানে খুবই কম বলে জানান ক্লারা সরকার।

এখানকার আড়াই হাজার পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেই এই কার্ডের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু কার্ড আর পাননি বলে জানান এখানকার অনেক বাসিন্দাই।

তাই কেবল মিজ মণ্ডলই নন ক্লারা সরকার, বুলি বেগম, কৃষ্ণা দাস, নমিতা রানীসহ প্রায় প্রত্যেকেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চান।

ক্লারা সরকার যেমনটা বলছিলেন, “আমরা আসলে রাজনীতি খুবই কম বুঝি। দরিদ্র এলাকার লোকজন আমরা বুঝি পেটনীতি। মা হিসেবে লজ্জিত যে ছেলে, মেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারি না।”

মিজ সরকার নদীতে বাগদা চিংড়ি ধরে জীবিকা উপার্জন করেন বলে জানান।

সরকারি ভিজিএফ কার্ড, রেশন কার্ড, জেলে কার্ড যাদের আছে, তারাই কেবল সাহায্য পেয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।

তবে তার কোনো কার্ডই নেই উল্লেখ করেন মিজ সরকার।

এই নারীদের প্রত্যেকেই বলছেন, তারা ভোট দেবেন কিন্তু নতুন সরকারের কাছে দাবি স্থায়ী কর্মসংস্থান।

মিজ ক্লারার ভাষায়, “যাতে পরে আমি ছেলে, মেয়ের মুখে দুইটা অন্ন দিতে পারি। একটু পড়ালেখা করাইতে পারি।”

‘চিকিৎসার ব্যবস্থা ও ভালো রাস্তাঘাট চাই’

হিন্দু মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বসবাস এই গ্রামটিতে। পশুর নদীর কোলে দেখা যায় ভাঙা একটি ঘর যার বেশিরভাগ অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সেটিই চপলা রানী মণ্ডলের শ্বশুর বাড়ি ছিল। কোনো কোনো বাড়ির পাশে নদীর কোল ঘেঁষে গোলপাতার গাছ রয়েছে।

সুন্দরবনের ঢাঙমারি নদী বা পশুর নদী যেটির কথাই বলি না কেন প্রাকৃতিক কারণেই এখানকার সব নদীর পানিই লবনাক্ত।

এই লবনাক্ত পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে নারীরা নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন। কিন্তু এসব সমস্যার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা পান না তারা।

মোংলার এই ইউনিয়নে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা করা যায় বলে জানান পশ্চিম চিলার একটি দোকানের কর্মী রমেশ দাস।

মি. দাস বলছিলেন, “জ্বর হলি পরে গেলে ওষুধ দেয়, আমগোর বড় কোনো রোগে তো কামে আহে না।”

এখানকার বনজীবীদের অনেকেই জানান, সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গেলে বা মাছ ধরার সময় কেউ যদি কখনো অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তাকে এখানে এনে পর্যাপ্ত চিকিৎসা করা যায় না।

কৃষ্ণা দাসের স্বামী যেমন সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে স্ট্রোক করেন। কিন্তু কমিউনিটি হাসপাতালে নেই এমন জটিল চিকিৎসার সুযোগ।

ফলে শরীরের বামপাশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ক্লারা সরকার নারীদের শারীরিক সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের মহিলাদের আসলে জরায়ুর সমস্যা হয়। লবনাক্ত পানির কারণে বন্ধ্যাত্বতা বেড়ে গেছে। শরীরে অনেক ধরনের চুলকানি আছে। এখন লবন পানি, প্রায় ঘরে ঘরে ডায়রিয়া হবে। ছেলেমেয়েরা অসুস্থ থাকবে।”

তাই নিজের ইউনিয়নে বা এলাকায় ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা চান মিজ সরকার।

১২ই ফেব্রুয়ারি ভোট দেবেন কি না- এমন প্রশ্নে মিজ সরকার বলেন, নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন হয় কিনা, তা দেখতে এবার ভোট দেবেন।

মিজ সরকারের কাছে নির্বাচনের অর্থ হলো সবাইকে নিয়ে সুন্দরভঅবে বসবাস করা, ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, তাদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়া।

“ভোট দিলে যদি কাজের ব্যবস্থা হয়….. তো দিলাম” বলেন মিজ সরকার।

গত সোমবার মোংলা থেকে ফেরি পার হয়ে যতই সামনে এগোই, আমরা ততই এই এলাকার রাস্তা-ঘাটের করুণ দশা দেখতে পাই। পশ্চিম চিলা পর্যন্ত যাওয়ার একটা বিশাল পথের পুরো রাস্তায়ই মাটি খুঁড়ে রাখা, শেষ হয়নি সড়কের কাজ।

এমন পথগুলোতে যখন গাড়ি এগোচ্ছিলো, তখন অপর পাশ থেকে আসা যে কোন বাহনকে থেমে যেতে হচ্ছিলো। কারণ ভাঙা রাস্তার একপাশে ফেলে রাখা মাটি ও ইটের টুকরোর কারণে কেবল একটি গাড়িই পার হতে পারে।

নির্বাচনের মাধ্যমে মিজ সরকার মূলত এই ভাঙাচোরা সড়কের অবস্থারও পরিবর্তন চান।

নারীরা চান চলাচলের নিরাপত্তা

অনেক সময় কাজ না থাকলে সংসার চালাতে এখানকার বাসিন্দাদের ধার-দেনা করতে হয় বলে জানান বুলি বেগম। ফলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তারা।

এই এলাকায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বুলি বেগম, ক্লারা সরকার, কৃষ্ণা দাস ও নমিতা রানী।

বুলি বেগম যেমনটা বলছিলেন, “হাসিনা নাইমা যাওয়ার পরের থেকে প্রথম প্রথম কয়দিন শোনা গেছে ওমুক জায়গায় মেয়ে নিয়ে গেছে, ওমুক জায়গায় ধর্ষণ হইছে, ওমুক জায়গায় মারিছে-ধরিছে। তারপর এখন কয় মাস (ইদানীং) শোনা যাচ্ছে না।”

রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন মিজ বেগম চান, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এলে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। নারীদের চলাচলের নিরাপত্তা চান তিনি।

বুলি বেগম নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কার কথা বলেন, সেটির প্রমাণ মেলে ক্লারা সরকারের কথায়। যার নিজের ভাইয়ের মেয়ে নিখোঁজ।

তিনি জানান, ওই কিশোরী ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। সেন্ট পল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। এই সপ্তাহেরই শনিবার থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই ঘটনায় থানায় জিডি ও মামলা করা হয়েছে বলে জানান মিজ সরকার।

“সে কোচিং এ যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়, তার সাথে কোচিং এর ব্যাগ ছিল। পরে জানতে পারি আমার ভাইয়ের মেয়েটা মালগাজীর একটা ছেলের সাথে চলে গেছে। তারপর থেকে বিভিন্নভাবে আমরা গ্রামের লোকজনসহ প্রেশার দিছি। জিডি করেছি থানায়, মামলা দিছি। কিন্তু এখনও আমরা মেয়েটা উদ্ধার করতে পারিনি” বলেন মিজ সরকার।

তাই ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তনের আশা করেন তিনি। নতুন সরকারের কাছে নারীদের চলাচলের নিরাপত্তা চান।

তবে মিজ সরকার জানান, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকলেও ততটা তৎপর নয়।

তার ভাষায় পুলিশের ভূমিকা “খুবই দুর্বল।”

জেলে বিদ্যুৎ মণ্ডল বলছিলেন, প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে অনেকটা বুদ্ধি খাটিয়েই টিকে থাকতে হয় তাদের।

মি. মণ্ডল জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি। তিনি বলছিলেন, “দুর্যোগটা যখন দ্রুত উঠে আসে, আমাদের উপকূলীয় এলাকায় কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় জলোচ্ছাসে প্লাবিত হয়। কোনো সাইক্লোন সেন্টার নাই যেখানে দুর্যোগের সময় দ্রুত অবস্থান নেবে।”

মি. মণ্ডল বলছেন, “ভোট আসে আর যায়। কেউই নজর দেয় না।”

তাই যেসব জেলেরা নদীতে মাছ ধরেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট, বয়াসহ নিরাপত্তা সামগ্রী, অসুস্থ বা আহত বনজীবীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ চান মি. মণ্ডল।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সাতজন বৈধ প্রার্থী নির্বাচন করছেন।

বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ।

এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বাগেরহাট-২ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম। দল থেকে তিনি বহিস্কার হয়েছেন।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

ফরিদপুরে কমেছে হামের গতি, ২৪ ঘণ্টায় নেই নতুন রোগী

মানিক কুমার দাস, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৪:৫৯ অপরাহ্ণ
ফরিদপুরে কমেছে হামের গতি, ২৪ ঘণ্টায় নেই নতুন রোগী

ফরিদপুর জেলায় গত ২৪ ঘণ্টায় (১০ জুলাই সকাল ৮টা থেকে ১১ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত) নতুন কোনো সন্দেহভাজন হাম (মিজলস) রোগী শনাক্ত হয়নি। একই সময়ে হামে নতুন কোনো মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেনি। দীর্ঘদিন ধরে চলমান হাম পরিস্থিতির মধ্যে এটি জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর হলেও শিশুদের টিকাদান ও সতর্কতা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ জুলাই সকাল ৮টা পর্যন্ত ফরিদপুরে মোট ৩ হাজার ৫২৪ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ সময়ে হামে আক্রান্ত হয়ে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ১০ জনের শরীরে হাম রোগের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।

এছাড়া চিকিৎসাসেবা নেওয়া রোগীদের মধ্যে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ৯৯৭ জন এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২ হাজার ৪০৩ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।

এদিকে, বর্তমানে ফরিদপুর জেনারেল হাসপাতালে ২৭ জন এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪৪ জনসহ মোট ৭১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় কোনো নতুন রোগী ভর্তি হননি এবং কোনো রোগীকে ছাড়পত্রও দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

চিকিৎসারা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশির মাধ্যমে সহজেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারেন। সাধারণত জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে র‌্যাশ হামের প্রধান উপসর্গ। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে এ রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান বলেন, “গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত না হওয়া অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে এতে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। অভিভাবকদের অবশ্যই শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলা টিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জ্বর, শরীরে লালচে র‌্যাশ বা হামের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।”

ফরিদপুরের মধুখালী প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি এমপি হেলেন জেরিন খানের

মধুখালী প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৭ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুরের মধুখালী প্রেস ক্লাবের উন্নয়নে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি এমপি হেলেন জেরিন খানের

ফরিদপুরের মধুখালী প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান।

শুক্রবার (১০ জুলাই) রাত ৮টায় মধুখালী প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রেস ক্লাবের সভাপতি মনিরুজ্জামান মৃধা (মন্নু)।

সভা সঞ্চালনা করেন প্রেসক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হোসেন পলাশ এবং সহ-সভাপতি মো. মতিয়ার রহমান মিয়া।

সভার শুরুতে প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে স্বাগত বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মো. মেহেদী হোসেন পলাশ। তিনি তাঁর বক্তব্যে প্রেস ক্লাবে যাতায়াতের রাস্তা নির্মাণ এবং প্রেস ক্লাবের সার্বিক উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার দাবি জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য হেলেন জেরিন খান বলেন, “আমি নিজে রাস্তার অবস্থা দেখেছি। রাস্তা নির্মাণে যা যা প্রয়োজন, তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। পাশাপাশি মধুখালী প্রেস ক্লাবের উন্নয়নেও আমি কাজ করব।”

এ সময় উপস্থিত ছিলেন- মধুখালী প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ সতেজ, মো. হায়দার আলী মোল্লা, মো. আব্দুল আলিম মানিক, মো. ইয়াসিন বিশ্বাস, মো. মোক্তার হোসেন, মো. তারিকুল ইসলাম এনামুল, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান, দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি কে এম রাকিবুল ইসলাম রিপনসহ প্রেস ক্লাবের সদস্যবৃন্দ এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর:
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৯:৫০ পূর্বাহ্ণ
ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নীরব প্রহরী জাকির, ৩৭ বছর পরও টাকার অভাবে ধুকছে চিকিৎসা

ফরিদপুর প্রেসক্লাবের নতুন ভবনের করিডোরে প্রতিদিনের মতোই ধীর পায়ে হাঁটেন মো. জাকির হোসেন। কারও হাতে এক কাপ চা তুলে দেন, কারও জন্য দরজা খুলে দেন, আবার কখনো কোনো সাংবাদিকের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র গুছিয়ে দেন, চা খাওয়ান। সংবাদ শিরোনামে যাদের নাম উঠে আসে, তাদের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটির নাম খুব কম মানুষই জানেন। অথচ এই প্রেসক্লাবের প্রতিটি ইট, প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি কক্ষ যেন তার জীবনেরই অংশ।

মো. জাকির হোসেনের জন্ম ১৯৭৯ সালের ২৯ মে, ফরিদপুর শহরের মধ্য আলীপুর মহল্লায়। বাবা শেখ আব্দুর রহমান ছিলেন একজন নাইটগার্ড। অল্প আয়ের সেই চাকরিতে সংসার চলত কষ্টে। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী। সংসারের টানাপোড়েনের মধ্যেই বড় হয়েছেন জাকির। ফরিদপুরের বাখুন্ডা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু দারিদ্র্য তার বই-খাতা কেড়ে নেয়। জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে স্কুলের বেঞ্চ ছেড়ে জীবিকার পথে নামতে বাধ্য করে।

মাত্র দশ বছর বয়সে, ১৯৮৯ সালে, তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তমিজউদ্দীন তাজের হাত ধরে ফরিদপুর প্রেসক্লাবে পিয়ন হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেই যে শুরু, তারপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে তিন দশক। সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, প্রেসক্লাবের ভবন বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি জাকিরের দায়িত্ববোধ।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অসংখ্য সাংবাদিকের উত্থান-পতন দেখেছেন। অনেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দায়িত্ব নিতে দেখেছেন, আবার তাদের চিরবিদায়ও প্রত্যক্ষ করেছেন। সভাপতি সৈয়দ ইমামুল আজম আব্দুর রব, শেখ মো. দেলোয়ার হোসেন, জগদীশ চন্দ্র ঘোষ, আব্দুল আলী শিকদার—আজ তারা আর নেই। সাধারণ সম্পাদক মন্টু দাস গোপী, ইউসুফ রেজা মন্টু, আ.জ.ম. আমীর আলী, আলী আশরাফ মো. শোয়াইব ও আরিফ ইসলামও চলে গেছেন না ফেরার দেশে। আরও কত সদস্য, কত পরিচিত মুখ—এক এক করে হারিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।

এসব কথা বলতে বলতে জাকিরের কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুতে। তিনি বলেন, “এই প্রেসক্লাবটাই আমার জীবন। এখানে আমার যৌবন কেটেছে, হাসি-কান্না কেটেছে। প্রতিটি দেয়ালে আমার স্মৃতি লেগে আছে।”

জাকিরের ব্যক্তিগত জীবনও সংগ্রামের গল্পে ভরা। স্ত্রী লিপি বেগম একজন গৃহিণী। অল্প আয়ে সংসার সামলাতে গিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের কাছে নতুন চ্যালেঞ্জ। এক ছেলে ও এক মেয়েকে মানুষ করেছেন অক্লান্ত পরিশ্রমে। ছেলে আজিম হোসেন ২০২৪ সালে ফরিদপুরের সরকারি ইয়াছিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে জীবিকার তাগিদে হামিম গ্রুপের একটি গার্মেন্টসে চাকরি নিয়েছেন। মেয়ে মোসা. হাফছার বিয়ে হয়েছে কাপড় তৈরির মেশিনচালক আরিফের সঙ্গে। নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন জাকির।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর যেন তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং কোমরের হাড় ক্ষয়ের মতো জটিল রোগে ভুগছেন তিনি। প্রতিদিন ওষুধ কিনতেই খরচ হয় ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এই সামান্য টাকাও অনেক সময় জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার আশায় মানুষের সহায়তায় ছয়-সাতবার ভারতে গিয়েছেন। কিছুদিন সুস্থ থাকলেও আবার ফিরে এসেছে অসুস্থতা। প্রয়োজন উন্নত চিকিৎসা, কিন্তু অর্থের অভাবে সেই চিকিৎসা এখন অধরাই রয়ে গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এত কষ্টের মধ্যেও তিনি কখনো কারও দরজায় গিয়ে হাত পাতেননি। নিজের অভাবকে হাসিমুখে আড়াল করে প্রতিদিন যথাসময়ে কর্মস্থলে হাজির হন। যারা তাকে চেনেন, তারা জানেন—জাকিরের মুখে অভিযোগের চেয়ে কৃতজ্ঞতার কথাই বেশি শোনা যায়।

২০২৬ সালের মে মাসে মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরও একা হয়ে গেছেন তিনি। সংসারের দায়িত্ব, ওষুধের খরচ, পুরোনো দেনা—সব মিলিয়ে জীবন যেন আরও ভারী হয়েছে। তবুও দায়িত্ব পালনে তার কোনো ক্লান্তি নেই। কেউ প্রেসক্লাবে এলে এখনও আগের মতোই আন্তরিক হাসিতে অভ্যর্থনা জানান তিনি।

জাকির হোসেন কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। তিনি সংবাদপত্রের প্রথম পাতার মানুষও নন। কিন্তু সংবাদ তৈরির পেছনে যারা নিরলস শ্রম দিয়ে যান, তাদের একজন তিনি। সাংবাদিকদের ব্যস্ততার ভিড়ে হয়তো অনেকেই তাকে খেয়াল করেন না, কিন্তু প্রেসক্লাবের প্রতিটি দিন, প্রতিটি আয়োজন, প্রতিটি ব্যস্ত মুহূর্তে তার নীরব উপস্থিতি অপরিহার্য।

একটি প্রতিষ্ঠানে টানা প্রায় ৩৭ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা শুধু চাকরি নয়, এটি এক ধরনের ভালোবাসা, এক ধরনের আত্মনিবেদন। সেই ভালোবাসার মূল্য কি শুধু একটি সামান্য বেতন? একজন মানুষ, যিনি জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উৎসর্গ করেছেন, অসুস্থতার সময়ে কি তার পাশে দাঁড়ানো সমাজের দায়িত্ব নয়?

আজও জাকির হোসেনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন খুব সাধারণ—আরও একবার ভালো চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ হয়ে বাঁচতে চান। তিনি বিলাসী জীবন চান না, বড় কোনো বাড়ি বা গাড়িও চান না। শুধু চান একটু স্বস্তিতে বেঁচে থাকার সুযোগ, যাতে প্রতিদিনের ওষুধের চিন্তা আর চিকিৎসার খরচের হিসাব তাকে তাড়া না করে।

হয়তো সমাজে এমন অনেক জাকির হোসেন আছেন, যারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে যান, অথচ নিজেদের কষ্টের কথা কাউকে জানান না। তাদের গল্প খুব কমই আলোয় আসে। কিন্তু এমন মানুষেরাই আমাদের সমাজের নীরব ভিত্তি। তাদের ত্যাগ, সততা আর আত্মসম্মান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা পদবি বা সম্পদে নয়, বরং নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতায়।

জাকির হোসেন এখনও প্রতিদিন ফরিদপুর প্রেসক্লাবের দরজা খুলে দেন। হয়তো একদিন সেই দরজাই তার দীর্ঘ কর্মজীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে। কিন্তু তার আগে, একজন সংগ্রামী মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এটাই হতে পারে আমাদের সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।