খুঁজুন
মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ১২ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

‘নেতা বদলায়, পেটের কষ্ট বদলায় না’

জান্নাতুল তানভী
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৮:৫২ পূর্বাহ্ণ
‘নেতা বদলায়, পেটের কষ্ট বদলায় না’

“নদীতে সন্ধ্যা রাত্তিরে যে সময় বোট না আসতি পারে, সেই সময় ফাঁকে দুইজন চইলে যাই। যখন দেখি অনেক দূরে বোট আছে তখন দুটো ওঁচোল দিয়ে টুপ কইরে চইলে আসি। বাজারে ছেটে দিয়ে আসি, দুইশো, একশো যা হয় তাই দিয়ে চলি”- কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলার পশ্চিম চিলার এলাকার চপলা রানী মণ্ডল।

নদীতে নিষেধাজ্ঞার সময় কিভাবে সরকারি অভিযানকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে মাছ ধরেন, সেই কথাটিই বলছিলেন মিজ মণ্ডল। যে মাছ ধরেন, তা বাজারে বিক্রির জন্য নির্ধারিত স্থান ‘ছেট’ এ দেওয়ার কথা বলছিলেন তিনি।

মোংলার যে পাড়ায় তার ঘরে বসে কথা হচ্ছিলো, তার পাশ দিয়েই বয়ে গেছে পশুর নদী।

সুন্দরবনের ঢাংমারি নদী, পশুর নদী, ঘসিয়াখালী চ্যানেলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন মিজ মণ্ডলের মতো এখানকার প্রায় আড়াই হাজার বাসিন্দা।

কেবল চপলা রানী মণ্ডলই নয়, ক্লারা সরকারসহ আরো অনেক নারীই পুরুষদের সাথে মাছ ধরার জন্য নদীর লবনাক্ত পানিতে নামেন।

তবে, মাছ ধরাই তাদের মূল পেশা নয়, যখন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে, তখন সংসার চালানোর জন্য সুন্দরবনের কাঠ কুড়ানো, কাঁকড়া ধরা, মধু সংগ্রহের মতো নানাবিধ কাজও করেন তারা।

সুন্দরবন ও এর আশেপাশের নদীকে ঘিরে জীবিকা নির্বাহ করেন বলে এই বাসিন্দাদের সাধারণত বনজীবী হিসেবে অভিহিত করা হয়।

জীবিকা নির্বাহের জন্য একেক মৌসুমে একেক পেশা বেছে নেন তারা।

সোমবার দুপুরে যে সময় তাদের সাথে কথা হয়, তখন এই পাড়ায় দুই একজন বাদে আর কোনো পুরুষ সদস্যকে দেখা যায়নি।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাগেরহাটের চারটি আসনের মধ্যে এই এলাকাটি বাগেরহাট -৩ আসনের অন্তর্ভূক্ত।

এই আসনটি রামপাল ও মোংলা নিয়ে গঠিত।

এখানকার বাসিন্দাদের কাছে নির্বাচন মানে মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, তারা চান, খাওয়া-পড়ার নিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা।

ভোট মানে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চান চপলা রানী

যায় না, সেই সময় যার কার্ড থাকে তিনি সরকারের কাছ থেকে ৭১ কেজি চাল পান।

প্রতিবছর পহেলা নভেম্বর থেকে ৩০শে জুন আট মাস সাধারণত জাটকা ইলিশ ধরা বন্ধ থাকে।

সেসময় যেসব কার্ডধারী জেলেরা ইলিশ মাছ ধরেন, তারা চার মাস পর্যন্ত প্রতি মাসে এক মণ করে চাল পান।

এক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর নদীতে ইলিশ মাছ ধরে, এমন জেলেদের শ্রেণিভুক্ত করে সরকারি সাহায্য দিয়ে থাকে বলে জানান তারা।

তবে এমন কার্ডধারীর সংখ্যা এখানে খুবই কম বলে জানান ক্লারা সরকার।

এখানকার আড়াই হাজার পরিবারের প্রায় প্রত্যেকেই এই কার্ডের জন্য আবেদন করেছেন। কিন্তু কার্ড আর পাননি বলে জানান এখানকার অনেক বাসিন্দাই।

তাই কেবল মিজ মণ্ডলই নন ক্লারা সরকার, বুলি বেগম, কৃষ্ণা দাস, নমিতা রানীসহ প্রায় প্রত্যেকেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চান।

ক্লারা সরকার যেমনটা বলছিলেন, “আমরা আসলে রাজনীতি খুবই কম বুঝি। দরিদ্র এলাকার লোকজন আমরা বুঝি পেটনীতি। মা হিসেবে লজ্জিত যে ছেলে, মেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারি না।”

মিজ সরকার নদীতে বাগদা চিংড়ি ধরে জীবিকা উপার্জন করেন বলে জানান।

সরকারি ভিজিএফ কার্ড, রেশন কার্ড, জেলে কার্ড যাদের আছে, তারাই কেবল সাহায্য পেয়ে থাকেন বলে জানান তিনি।

তবে তার কোনো কার্ডই নেই উল্লেখ করেন মিজ সরকার।

এই নারীদের প্রত্যেকেই বলছেন, তারা ভোট দেবেন কিন্তু নতুন সরকারের কাছে দাবি স্থায়ী কর্মসংস্থান।

মিজ ক্লারার ভাষায়, “যাতে পরে আমি ছেলে, মেয়ের মুখে দুইটা অন্ন দিতে পারি। একটু পড়ালেখা করাইতে পারি।”

‘চিকিৎসার ব্যবস্থা ও ভালো রাস্তাঘাট চাই’

হিন্দু মুসলিম ও খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বসবাস এই গ্রামটিতে। পশুর নদীর কোলে দেখা যায় ভাঙা একটি ঘর যার বেশিরভাগ অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। সেটিই চপলা রানী মণ্ডলের শ্বশুর বাড়ি ছিল। কোনো কোনো বাড়ির পাশে নদীর কোল ঘেঁষে গোলপাতার গাছ রয়েছে।

সুন্দরবনের ঢাঙমারি নদী বা পশুর নদী যেটির কথাই বলি না কেন প্রাকৃতিক কারণেই এখানকার সব নদীর পানিই লবনাক্ত।

এই লবনাক্ত পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে নারীরা নানা শারীরিক সমস্যার মুখোমুখি হন। কিন্তু এসব সমস্যার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা পান না তারা।

মোংলার এই ইউনিয়নে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে কেবল প্রাথমিক চিকিৎসা করা যায় বলে জানান পশ্চিম চিলার একটি দোকানের কর্মী রমেশ দাস।

মি. দাস বলছিলেন, “জ্বর হলি পরে গেলে ওষুধ দেয়, আমগোর বড় কোনো রোগে তো কামে আহে না।”

এখানকার বনজীবীদের অনেকেই জানান, সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গেলে বা মাছ ধরার সময় কেউ যদি কখনো অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে তাকে এখানে এনে পর্যাপ্ত চিকিৎসা করা যায় না।

কৃষ্ণা দাসের স্বামী যেমন সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে স্ট্রোক করেন। কিন্তু কমিউনিটি হাসপাতালে নেই এমন জটিল চিকিৎসার সুযোগ।

ফলে শরীরের বামপাশ প্যারালাইজড হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।

খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী ক্লারা সরকার নারীদের শারীরিক সমস্যার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের মহিলাদের আসলে জরায়ুর সমস্যা হয়। লবনাক্ত পানির কারণে বন্ধ্যাত্বতা বেড়ে গেছে। শরীরে অনেক ধরনের চুলকানি আছে। এখন লবন পানি, প্রায় ঘরে ঘরে ডায়রিয়া হবে। ছেলেমেয়েরা অসুস্থ থাকবে।”

তাই নিজের ইউনিয়নে বা এলাকায় ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থা চান মিজ সরকার।

১২ই ফেব্রুয়ারি ভোট দেবেন কি না- এমন প্রশ্নে মিজ সরকার বলেন, নিজেদের অবস্থার পরিবর্তন হয় কিনা, তা দেখতে এবার ভোট দেবেন।

মিজ সরকারের কাছে নির্বাচনের অর্থ হলো সবাইকে নিয়ে সুন্দরভঅবে বসবাস করা, ছেলে-মেয়েদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, তাদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়া।

“ভোট দিলে যদি কাজের ব্যবস্থা হয়….. তো দিলাম” বলেন মিজ সরকার।

গত সোমবার মোংলা থেকে ফেরি পার হয়ে যতই সামনে এগোই, আমরা ততই এই এলাকার রাস্তা-ঘাটের করুণ দশা দেখতে পাই। পশ্চিম চিলা পর্যন্ত যাওয়ার একটা বিশাল পথের পুরো রাস্তায়ই মাটি খুঁড়ে রাখা, শেষ হয়নি সড়কের কাজ।

এমন পথগুলোতে যখন গাড়ি এগোচ্ছিলো, তখন অপর পাশ থেকে আসা যে কোন বাহনকে থেমে যেতে হচ্ছিলো। কারণ ভাঙা রাস্তার একপাশে ফেলে রাখা মাটি ও ইটের টুকরোর কারণে কেবল একটি গাড়িই পার হতে পারে।

নির্বাচনের মাধ্যমে মিজ সরকার মূলত এই ভাঙাচোরা সড়কের অবস্থারও পরিবর্তন চান।

নারীরা চান চলাচলের নিরাপত্তা

অনেক সময় কাজ না থাকলে সংসার চালাতে এখানকার বাসিন্দাদের ধার-দেনা করতে হয় বলে জানান বুলি বেগম। ফলে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তারা।

এই এলাকায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বুলি বেগম, ক্লারা সরকার, কৃষ্ণা দাস ও নমিতা রানী।

বুলি বেগম যেমনটা বলছিলেন, “হাসিনা নাইমা যাওয়ার পরের থেকে প্রথম প্রথম কয়দিন শোনা গেছে ওমুক জায়গায় মেয়ে নিয়ে গেছে, ওমুক জায়গায় ধর্ষণ হইছে, ওমুক জায়গায় মারিছে-ধরিছে। তারপর এখন কয় মাস (ইদানীং) শোনা যাচ্ছে না।”

রাজনৈতিকভাবে বেশ সচেতন মিজ বেগম চান, নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার এলে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। নারীদের চলাচলের নিরাপত্তা চান তিনি।

বুলি বেগম নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কার কথা বলেন, সেটির প্রমাণ মেলে ক্লারা সরকারের কথায়। যার নিজের ভাইয়ের মেয়ে নিখোঁজ।

তিনি জানান, ওই কিশোরী ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। সেন্ট পল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। এই সপ্তাহেরই শনিবার থেকে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

এই ঘটনায় থানায় জিডি ও মামলা করা হয়েছে বলে জানান মিজ সরকার।

“সে কোচিং এ যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বের হয়, তার সাথে কোচিং এর ব্যাগ ছিল। পরে জানতে পারি আমার ভাইয়ের মেয়েটা মালগাজীর একটা ছেলের সাথে চলে গেছে। তারপর থেকে বিভিন্নভাবে আমরা গ্রামের লোকজনসহ প্রেশার দিছি। জিডি করেছি থানায়, মামলা দিছি। কিন্তু এখনও আমরা মেয়েটা উদ্ধার করতে পারিনি” বলেন মিজ সরকার।

তাই ভোট দিয়ে সরকার পরিবর্তনের আশা করেন তিনি। নতুন সরকারের কাছে নারীদের চলাচলের নিরাপত্তা চান।

তবে মিজ সরকার জানান, ওই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকলেও ততটা তৎপর নয়।

তার ভাষায় পুলিশের ভূমিকা “খুবই দুর্বল।”

জেলে বিদ্যুৎ মণ্ডল বলছিলেন, প্রাকৃতিক দূর্যোগের সাথে অনেকটা বুদ্ধি খাটিয়েই টিকে থাকতে হয় তাদের।

মি. মণ্ডল জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি। তিনি বলছিলেন, “দুর্যোগটা যখন দ্রুত উঠে আসে, আমাদের উপকূলীয় এলাকায় কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় জলোচ্ছাসে প্লাবিত হয়। কোনো সাইক্লোন সেন্টার নাই যেখানে দুর্যোগের সময় দ্রুত অবস্থান নেবে।”

মি. মণ্ডল বলছেন, “ভোট আসে আর যায়। কেউই নজর দেয় না।”

তাই যেসব জেলেরা নদীতে মাছ ধরেন, তাদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট, বয়াসহ নিরাপত্তা সামগ্রী, অসুস্থ বা আহত বনজীবীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ব্যবস্থা, উপকূলীয় বেড়িবাঁধ চান মি. মণ্ডল।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনটিতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দলের সাতজন বৈধ প্রার্থী নির্বাচন করছেন।

বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন শেখ ফরিদুল ইসলাম এবং জামায়াতের প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ শেখ।

এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী বাগেরহাট-২ আসনের বিএনপির সাবেক এমপি এম এ এইচ সেলিম। দল থেকে তিনি বহিস্কার হয়েছেন।

সূত্র : বিবিসি বাংলা

‘যেখানে পাখির গান থামে না, ছায়া দেয় শত বছরের বটগাছ’

হারুন-অর-রশীদ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ৪:০৮ অপরাহ্ণ
‘যেখানে পাখির গান থামে না, ছায়া দেয় শত বছরের বটগাছ’

ফরিদপুরের সালথা উপজেলা-এর আটঘর ইউনিয়নের নিভৃত এক জনপদ খোয়াড় গ্রাম। ব্যস্ত শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, সবুজে ঘেরা এই গ্রাম যেন প্রকৃতির এক শান্ত আশ্রয়স্থল। গ্রামের প্রবেশমুখেই চোখে পড়ে শতবর্ষী এক বিশাল বটগাছ, যা শুধু একটি গাছ নয়—এলাকার মানুষের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর আবেগের জীবন্ত সাক্ষী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই বটগাছ যেন সময়ের নীরব গল্পকথক হয়ে আজও মাথা উঁচু করে আছে।

বটগাছটির বিশাল ডালপালা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ছাতার মতো। ঝুলে থাকা অসংখ্য শিকড় মাটির সঙ্গে মিশে তৈরি করেছে এক অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি নিজের হাতে যেন একটি জীবন্ত ভাস্কর্য তৈরি করেছে। গাছটির নিচে দাঁড়ালেই মন ভরে যায় শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাসে। দিনের প্রখর রোদেও এখানে পাওয়া যায় এক অন্যরকম প্রশান্তি।

ভোর হতেই বটগাছের চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে পাখির কলকাকলিতে। শালিক, দোয়েল, কোকিল আর নানা নাম না জানা পাখির ডাকে গ্রামের সকাল যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। গাছের ডালে ডালে পাখিদের ছোটাছুটি আর কিচিরমিচির শব্দ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অপার মুগ্ধতা তৈরি করে। সন্ধ্যা নামলে আবার পাখিরা ফিরে আসে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে। তখন পুরো পরিবেশজুড়ে তৈরি হয় এক অন্যরকম আবেগঘন দৃশ্য।

এই বটগাছ শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মাঠে কাজ করতে যাওয়া কৃষকরা দুপুরের ক্লান্ত সময়ে এসে বসেন গাছটির ছায়ায়। কেউ বিশ্রাম নেন, কেউ গল্পে মেতে ওঠেন, আবার কেউ একটু জিরিয়ে নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজে ফিরে যান। গ্রামের প্রবীণদের কাছেও এটি স্মৃতির এক অমূল্য জায়গা। অনেকে বলেন, ছোটবেলায় তারা এই গাছের নিচেই খেলাধুলা করেছেন, আড্ডা দিয়েছেন, এমনকি গ্রামের নানা সামাজিক বিচার-আচারও একসময় এই গাছতলাতেই বসত।

বর্ষাকালে বটগাছটির চারপাশ আরও মনোমুগ্ধকর হয়ে ওঠে। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া সবুজ পাতাগুলো তখন আরও সতেজ দেখায়। শীতের কুয়াশামাখা সকালেও গাছটি যেন রহস্যময় সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে থাকে গ্রামের বুকজুড়ে। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে নিবিড় সম্পর্ক, এই বটগাছ তারই এক উজ্জ্বল প্রতীক।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই শতবর্ষী বটগাছ খোয়াড় গ্রামের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে। তাই গাছটিকে ঘিরে রয়েছে মানুষের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় যখন গ্রামবাংলার অনেক পুরোনো নিদর্শন হারিয়ে যাচ্ছে, তখনও খোয়াড় গ্রামের এই বটগাছ অতীত ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রেখে নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের গল্প শোনাচ্ছে নীরবে।

লেখক: সংবাদকর্মী, ফরিদপুর।

ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা গরু চিনবেন যেভাবে?

লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ৮:৩৬ পূর্বাহ্ণ
ইনজেকশন দিয়ে মোটাতাজা করা গরু চিনবেন যেভাবে?

কোরবানির ঈদ এলেই দেশের পশুর হাটগুলোতে বেড়ে যায় গরু কেনাবেচার ব্যস্ততা। এই সময় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বেশি লাভের আশায় গরুকে স্টেরয়েড, হরমোন বা বিভিন্ন ক্ষতিকর ইনজেকশন দিয়ে অস্বাভাবিকভাবে মোটাতাজা করে।

বাইরে থেকে এমন গরু দেখতে আকর্ষণীয় মনে হলেও এর মাংস মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব গরুর মাংস খেলে লিভার ও কিডনির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, হাটে গিয়ে ইনজেকশন দেওয়া গরু চেনার কয়েকটি সহজ উপায় নিচে তুলে ধরা হলো—

১. আঙুল দিয়ে চাপ দিয়ে দেখুন

কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর শরীরে অনেক সময় অতিরিক্ত পানি জমে থাকে। এটি বোঝার সহজ উপায় হলো গরুর শরীরের মাংসল অংশে আঙুল দিয়ে চাপ দেওয়া। গরুর পিঠ বা রানের অংশে জোরে চাপ দিলে যদি জায়গাটি দেবে যায় এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সময় নেয়, তাহলে সেটি সন্দেহজনক হতে পারে। সুস্থ গরুর মাংস সাধারণত শক্ত ও টানটান থাকে। চাপ দিলে দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

২. আচরণ লক্ষ্য করুন

স্টেরয়েড বা হরমোন দেওয়া গরু অনেক সময় ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে তাদের আচরণেও অস্বাভাবিকতা দেখা যায়।

এ ধরনের গরু সাধারণত বেশি অলস থাকে, ঠিকভাবে হাঁটতে চায় না এবং অল্পতেই হাঁপিয়ে যায়। অনেক সময় মাথা নিচু করে ঝিমাতে দেখা যায়। চোখও ঘোলাটে বা ক্লান্ত দেখাতে পারে।

অন্যদিকে সুস্থ গরু তুলনামূলক চঞ্চল হয়। আশপাশে মানুষ দেখলে সাড়া দেয়, কান ও লেজ নেড়ে স্বাভাবিক আচরণ করে।

৩. অস্বাভাবিক ফোলা ও অতিরিক্ত লালা

ক্ষতিকর ওষুধ প্রয়োগের কারণে অনেক গরুর শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়। বিশেষ করে উরু, রান, থুতনি বা প্রস্রাবের রাস্তার আশপাশের অংশ অতিরিক্ত ফোলা দেখা যেতে পারে।

এ ছাড়া কিছু গরুর মুখ থেকে নিয়মিত লালা বা ফেনা পড়তে দেখা যায়, যা অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।

যে কারণে সতর্ক থাকা জরুরি?

প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা গরুর মাংস মানুষের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এমন পশু দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

গরু কেনার সময় যা করবেন

সম্ভব হলে অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা পরিচিত খামারিকে সঙ্গে নিন। গরুর দাঁত, চোখ ও হাঁটা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। পরিচিত ও বিশ্বস্ত খামার বা বিক্রেতার কাছ থেকে কেনার চেষ্টা করুন। কেনার আগে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট গরুর আচরণ পর্যবেক্ষণ করুন।

সূত্র : কালবেলা

সালথায় সংঘাত থামাতে সংবাদ সম্মেলন, সম্প্রীতি চান জাহিদ মাতুব্বর

ফরিদপুর প্রতিনিধি:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬, ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ
সালথায় সংঘাত থামাতে সংবাদ সম্মেলন, সম্প্রীতি চান জাহিদ মাতুব্বর

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বালিয়া ও গট্টি এলাকায় দীর্ঘদিনের বিরোধ, দাঙ্গা ও সংঘর্ষের পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়েছেন বালিয়া গ্রামের বাসিন্দা জাহিদ মাতুব্বর। তিনি এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, “আর কোনো কাইজ্জা-মারামারী নয়, সবাই মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস করুন।”

সোমবার (২৫ মে) বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার গট্টি এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে স্থানীয় সাংবাদিক, বিএনপির নেতাকর্মী ও তার সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন।

জাহিদ মাতুব্বর বলেন, তিনি ২০০১ সালে সাবেক মন্ত্রী মরহুম কেএম ওবায়দুর রহমানের নির্বাচনে কাজ করেছিলেন। পরে ২০০৭ সালে ইউরোপে চলে যান এবং দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার পর ২০১৮ সালে দেশে ফিরে ফরিদপুরে ব্যবসা শুরু করেন। তিনি দাবি করেন, কোনো সময়ই আওয়ামী লীগের কোনো পদে ছিলেন না, তবে নাগরিক হিসেবে ভোট দিয়েছেন।

তার অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাকে যুবলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত আখ্যা দিয়ে একাধিক মামলায় জড়িয়েছে। সম্প্রতি গট্টি এলাকায় আনোয়ার হোসেন ও রাজিব মাতুব্বরের ওপর হামলার ঘটনায়ও তাকে আসামি করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

জাহিদ মাতুব্বর বলেন, “ঘটনার দিন সকাল থেকেই আমি অসুস্থ ছিলাম এবং হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। টানা চারদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর ফরিদপুরে চলে যাই। অথচ আমাকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে।”

তিনি মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে হয়রানি থেকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, এলাকায় তার একটি সামাজিক ও পারিবারিক প্রভাব রয়েছে। গ্রামের মানুষ তাকে একটি পক্ষের প্রধান হিসেবে দেখলেও তিনি কোনো সংঘাত চান না। বরং এলাকার শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখতেই কাজ করতে চান।

এ সময় তিনি তার সমর্থক ও এলাকাবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, “আমাকে যারা ভালোবাসেন, তারা আর কোনো সংঘর্ষে জড়াবেন না। সবাই ধৈর্য ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করবেন—এটাই আমার অনুরোধ।”

রাজনৈতিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “শামা ওবায়েদ ইসলাম মরহুম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে। তিনি এলাকায় শান্তি চান। আমরাও তার নির্দেশনা মেনে চলবো। আগামী দিনেও শামা ওবায়েদ আপার পক্ষে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবো, ইনশাল্লাহ।”