ফরিদপুর পৌরসভার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পুরোনো পাইপলাইনের কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শহরবাসী। শহরের বিভিন্ন মহল্লায় নিয়মিত পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। কোথাও পানি খুব কম আসছে, আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একেবারেই পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে সম্প্রতি বিদ্যুতের তার চুরির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় পানি সরবরাহ পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, ১৯৮০-এর দশকে ফরিদপুর পৌরসভার উদ্যোগে শহরজুড়ে পানি সরবরাহের জন্য লোহার পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও সেই পাইপলাইন এখনো পরিবর্তন করা হয়নি। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে পাইপের ভেতরে জং ও আয়রনের স্তর জমে পাইপগুলো সংকীর্ণ হয়ে গেছে। ফলে পানি প্রবাহ কমে গিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
শহরের গুহলক্ষীপুর এলাকার বাসিন্দা জাকির হোসেন বলেন, “প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় পানির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময় ট্যাংকে পর্যাপ্ত পানি ওঠে না। বাধ্য হয়ে মোটর চালিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।”
ঝিলটুলী এলাকার গৃহিণী সেলিনা বেগম বলেন, “কয়েকদিন ধরে পানি খুব কম আসছে। রান্না, কাপড় ধোয়া ও অন্যান্য গৃহস্থালি কাজে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে বেশি দুর্ভোগে আছি।”
টেপাখোলা এলাকার ব্যবসায়ী আব্দুল কাদের বলেন, “পানি না থাকলে দোকান ও বাসার দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়। পৌরসভার উচিত দ্রুত সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা।”
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক তার ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম চুরির ঘটনা বেড়েছে। এর ফলে পানি উত্তোলন কেন্দ্রগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হলে গভীর নলকূপ ও পাম্প চালানো সম্ভব না হওয়ায় পানি সরবরাহও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া পানি সরবাহের জন্য ১৯৮০ দশকের পাইপ এখন জং ধরে ও আয়রণ পড়ে পানিপথ সংকীর্ণ হয়ে গেছে, এতে অনেক এলাকায় পানি দিতে সমস্যা হচ্ছে ও কম পানি যাচ্ছে। তবে, বরাদ্দ না থাকায় পাইপগুলো পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছেনা।
ফরিদপুুর সচেতন নাগরিক কমিটির সদস্য হাসানউজ্জামান বলেন, ‘নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত পুরোনো পাইপলাইন পরিবর্তন, পানি উত্তোলন কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক তার চুরি রোধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপও জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘অনেক নাগরিক আছেন নিয়মিত পানির বিল দিচ্ছেন কিন্তু একেবারেই তারা পানি পাচ্ছেন না এমন অভিযোগও রয়েছে। পানির সরবরাহের ব্যাপারে জানতে চাইলেও পৌরসভার পক্ষ থেকে তাদের সদুত্তর দিচ্ছেনা। এটা দুঃখজনক। আমরা বলবো, অতিদ্রুত এ সমস্যার সমাধানে পৌরসভাকে উদ্যোগী হতে।’
তিনি আরও বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়নি। অনেক এলাকায় নতুন সংযোগ দেওয়া হলেও পুরোনো অবকাঠামোর ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে গ্রীষ্মকাল কিংবা বিদ্যুৎ সমস্যার সময় সংকট আরও প্রকট হয়ে ওঠে।’
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা বলেন, ‘ফরিদপুরবাসী দীর্ঘদিন ধরে পৌরসভার সরবরাহ করা পানীয় জলের সমস্যার মধ্যে রয়েছে। পানির লাইনগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা না করায় ময়লা আবর্জনা পানির সাথে প্রভাবিত হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধানের জন্য দ্রুত পৌরসভাকে উদ্যোগ নিতে হবে। নাগরিক সুবিধার নিশ্চিত করতে এবং একটি এ গ্রেডের পৌরসভার আধুনিক সুবিধা ক্ষেত্রে এর কোন বিকল্প নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘পরিতাপের বিষয় পৌর কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ ব্যাপারে এক ধরনের উদাসীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরা আশা করি পৌরসভা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে এবং পৌরবাসীকে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্তি দেবে।’
এব্যাপারে ফরিদপুর পৌরসভার প্রশাসক মো. ইলিয়াছুর রহমানের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় ও সরকারি সফরে চীনে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে ফরিদপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হোসাইন মোহাম্মদ হাই জকী বলেন, “১৯৮০-এর দশকে স্থাপিত লোহার পাইপগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে জং ধরে ভেতরে সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এতে অনেক এলাকায় পানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। পুরোনো পাইপ পরিবর্তন করা জরুরি হলেও বড় বাজেটের অভাবে এখনো তা সম্ভব হয়নি। তবে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পাওয়া গেলে ধাপে ধাপে নতুন পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সম্প্রতি শহরে বৈদ্যুতিক তার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম চুরির ঘটনা বেড়েছে। এর প্রভাব পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়ছে। এছাড়া কোনো এলাকায় পাইপলাইনের মেরামত কাজ চললে সাময়িকভাবে পানি সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়। তারপরও আমাদের কর্মীরা আন্তরিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যাচ্ছে।”
শহরে বৈদ্যুতিক তার ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম চুরির ঘটনা বেড়ে গেছে বলে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্যের ব্যাপারে ফরিদপুরের কোতয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘চুরি রোধে রাতে ও দিনে আমাদের পুলিশের মোবাইল টিম ২৪ ঘণ্টা কাজ করছে। এছাড়া চুরি বন্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানান পুলিশের এ কর্মকর্তা।’
দীর্ঘদিনের এই সমস্যা সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে ফরিদপুর শহরের পানি সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
আপনার মতামত লিখুন
Array