তারাবি নামাজ: কত রাকাত, কীভাবে পড়বেন ও কী দোয়া করবেন?
ইবাদতের বসন্তকাল পবিত্র রমজান। এ মাসে রহমতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। হাদিস শরিফে এসেছে, রমজান মাস শুরু হলেই রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়। (মুসলিম : ১০৭৯/২)
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে , রমজান মাসের শুভাগমন উপলক্ষে জান্নাতের দরজাসমুহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। আর শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (বোখারি : ১৮৯৯, মুসলিম : ১০৭৯/১)
রমজানে প্রতিটি আমলের অনেক গুণ বেশি ছওয়াব পাওয়া যায়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘রমজানের ওমরা হজ সমতুল্য।’ (তিরমিজি : ৯৩৯ ও আবু দাউদ : ১৯৮৬)
অন্য এক বর্ণনায় (যা সনদের দিক থেকে দুর্বল) বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, রমজান মাসে যে ব্যক্তি একটি নফল আদায় করল সে যেন অন্য মাসে একটি ফরজ আদায় করল। আর যে এ মাসে একটি ফরজ আদায় করল সে যেন অন্য মাসে সত্তরটি ফরজ আদায় করল। (শুআবুল ঈমান : ৩/৩০৫-৩০৬)
অর্থাৎ, এ মাসে নফল আদায় করলে অন্য মাসের ফরজের ন্যায় ছওয়াব হয়। আর এ মাসের এক ফরজে অন্য মাসের ৭০ ফরজের সমান ছওয়াব পাওয়া যায়।
রমজানে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা ব্যাপকভাবে যেসব ইবাদত করে থাকেন, তার একটি হলো তারাবি নামাজ। এই নামাজের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে তারাবি পড়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও পরকালের আশায় রমজানের রাতে তারাবির সালাত আদায় করবে, তার অতীতের পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (নাসায়ি : ২২০৫)
তারাবিকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের মসজিদগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। ফরিদপুর প্রতিদিনের পাঠকদের সুবিধার্থে তারাবি নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া ও মোনাজাত তুলে ধরা হলো।
তারাবি নামাজ পড়ার নিয়ম
রমজানে প্রতিদিন এশার ফরজ নামাজ পড়ার পরে বিতিরের আগে তারাবি নামাজ পড়তে হয়। তারাবি নামাজ দুই রাকাত করে পড়া হয়। প্রত্যেক দুই রাকাতের পর সালাম ফেরানো হয়। এভাবে চার রাকাত পড়ার পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া হয়। এসময় বিভিন্ন তাসবিহ পড়া উত্তম।
তারাবি নামাজের নিয়ত
ইসলামে নিয়ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কাজ বা ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হলে তা সঠিক নিয়তের সঙ্গে করতে হয়। নিয়ত ছাড়া কোনো ইবাদত পূর্ণাঙ্গ হয় না, কারণ ইবাদতের মূল শর্তই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের ইচ্ছা। তাই তারাবি নামাজের জন্যও নিয়ত করা হয়। নিয়ত মনে মনে বাংলাতেও করা যায়।
আমাদের দেশের প্রচলিত তারাবির আরবি নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ للهِ تَعَالَى رَكْعَتَى صَلَوةِ التَّرَاوِيْحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللهِ تَعَالَى مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيْفَةِ اللهُ اَكْبَرْ
বাংলা উচ্চারণ : নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি তায়ালা, রাকাআতাই সালাতিত তারাবি সুন্নাতু রাসুলিল্লাহি তায়ালা, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কা’বাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।
অর্থ : আমি কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তারাবি সুন্নত নামাজের নিয়ত করছি, আল্লাহু আকবার।
রাজধানীর জামিয়া ইকরার ফাজিল মুফতি ইয়াহইয়া শহিদ কালবেলাকে বলেন, তারাবি নামাজের নিয়ত আরবিতে করা আবশ্যক বা বাধ্যতামূলক নয়। বাংলাতেও এভাবে নিয়ত করা যাবে যে, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারাবির দুই রাকাত নামাজ কেবলামুখী হয়ে (জামাত হলে- এ ইমামের পেছনে) পড়ছি- (اَللهُ اَكْبَر) আল্লাহু আকবার। উল্লেখ্য, নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা জরুরী নয়, তবে উত্তম।
তারাবি নামাজের দোয়া
তারাবি নামাজে প্রতি চার রাকাত পর বিশ্রাম নেওয়া হয়। এ সময় একটি দোয়া পড়ার প্রচলন রয়েছে আমাদের দেশে। প্রায় সব মসজিদের মুসল্লিরা এই দোয়াটি পড়ে থাকেন।
দোয়াটি হলো
سُبْحانَ ذِي الْمُلْكِ وَالْمَلَكُوتِ سُبْحانَ ذِي الْعِزَّةِ وَالْعَظْمَةِ وَالْهَيْبَةِ وَالْقُدْرَةِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْجَبَرُوْتِ سُبْحَانَ الْمَلِكِ الْحَيِّ الَّذِيْ لَا يَنَامُ وَلَا يَمُوْتُ اَبَدًا اَبَدَ سُبُّوْحٌ قُدُّوْسٌ رَبُّنا وَرَبُّ المْلائِكَةِ وَالرُّوْحِ
বাংলা উচ্চারণ : সুবহানা জিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুবহানা জিল ইয্যাতি ওয়াল আজমাতি ওয়াল হায়বাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিব্রিয়ায়ি ওয়াল জাবারুতি। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা ইয়ানামু ওয়া লা ইয়ামুত আবাদান আবাদ; সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালায়িকাতি ওয়ার রূহ।
মুফতি ইয়াহইয়া শহিদ বলেন, মনে রাখতে হবে, তারাবি নামাজ বিশুদ্ধ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এই দোয়ার কোনও সম্পর্ক নেই। এই দোয়া না পড়লে তারাবি নামাজ হবে না, কোনওভাবেই এমন মনে করা যাবে না। মূলত এ দোয়ার সঙ্গে তারাবি নামাজ হওয়া কিংবা না হওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।
তিনি বলেন, এ সময় কোরআন-হাদিসে বর্ণিত যেকোনো দোয়াই পড়া যাবে। ফক্বিহ আলেমদের মতে, তারাবি নামাজে চার রাকাত পর বিশ্রামের সময়টিতে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া, তওবা,-ইসতেগফারগুলো পড়াই উত্তম।
তারাবি নামাজ শেষে মোনাজাত
প্রতিদিন তারাবি নামাজ শেষে দেশের মসজিদগুলোতে একটি দোয়া পড়ে মোনাজাতের প্রচলন রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই দেশব্যাপী মসজিদগুলোতে প্রচলিত এই দোয়াটি হলো-
اَللَهُمَّ اِنَّا نَسْئَالُكَ الْجَنَّةَ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ يَا خَالِقَ الْجَنَّةَ وَالنَّارِ- بِرَحْمَتِكَ يَاعَزِيْزُ يَا غَفَّارُ يَا كَرِيْمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيْمُ يَاجَبَّارُ يَاخَالِقُ يَابَارُّ اَللَّهُمَّ اَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ- بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّحِمِيْنَ
বাংলা উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনাননার। ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান নার, বিরাহমাতিকা ইয়া আজিজু ইয়া গাফফার, ইয়া কারিমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহিমু ইয়া জাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বার্রু। আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান নার, ইয়া মুজিরু, ইয়া মুজিরু, ইয়া মুজির- বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
উল্লেখ্য, আমাদের সমাজে অনেকে মনে করেন তারাবি নামাজ সঠিক নিয়মে আদায়ের জন্য নামাজ শেষে এই দোয়াটি পড়া আবশ্যক। এমন ধারণা বা বিশ্বাস মোটেও ঠিক নয়। তাই দোয়াটি পড়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, তারাবি নামাজ হওয়া বা না হওয়ার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন তারাবি নামাজের প্রতি চার রাকাত পর পর পড়া দোয়াটির সঙ্গে তারাবি বিশুদ্ধ হওয়ার কোনও সম্পর্ক নেই।

আপনার মতামত লিখুন
Array