নগরকান্দায় সাংবাদিকের ওপর হামলা: পাল্টাপাল্টি অভিযোগে রহস্য, ‘হামলা নাটক’ নিয়ে তোলপাড়
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলায় এক সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। হামলার অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং ‘হামলা নাটক’ তৈরির অভিযোগে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজে তীব্র ক্ষোভ ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে। দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুললেও ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
ঘটনাটি ঘটেছে গত মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরকান্দা বাজার এলাকায়। হামলার শিকার হিসেবে পরিচিত মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বাবু (৪৯) নিজেকে দৈনিক যুগান্তরের নগরকান্দা উপজেলা প্রতিনিধি দাবি করেছেন। অপরদিকে অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. লিয়াকত আলীর নাম। তবে ঘটনার পরপরই তিনি পাল্টা অভিযোগ এনে নিজেকেও হামলার শিকার দাবি করেছেন। এতে পুরো ঘটনাটি জটিল আকার ধারণ করেছে।
ঘটনাস্থলে কী ঘটেছিল:
মিজানুর রহমান বাবুর দেওয়া অভিযোগ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টার দিকে তিনি নগরকান্দা বাজারে শাহিন মিয়ার চায়ের দোকানে বসে ছিলেন। এ সময় পূর্বের একটি বিরোধ ও ফেসবুকে লেখালেখির জের ধরে লিয়াকত আলী সেখানে এসে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে তিনি একটি কাঠের বাটাম দিয়ে মিজান বাবুর মাথায় আঘাত করার চেষ্টা করেন।
আত্মরক্ষার জন্য হাত দিয়ে প্রতিহত করতে গেলে তার বাঁম হাতের বাহুতে গুরুতর আঘাত লাগে। এতে তিনি রক্তাক্ত জখম হন। এছাড়া ডান হাত ও পিঠেও আঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় অভিযুক্ত লিয়াকত আলী উপস্থিত লোকজনকে হুমকি দেন—ঘটনার বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিলে তাকে প্রাণনাশ করা হবে।
পরে আহত অবস্থায় মিজান বাবুকে নগরকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসা শেষে তিনি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানান এবং পরবর্তীতে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
পাল্টা অভিযোগে ভিন্ন চিত্র:
ঘটনার কিছুক্ষণ পরই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে থানায় পাল্টা অভিযোগ দেন লিয়াকত আলী। তার অভিযোগে বলা হয়, একই সময় ও স্থানে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মিজান বাবু তাকে হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন।
তিনি দাবি করেন, মিজান বাবু তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে কোমরে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করেন। এতে তার শরীরে রক্ত জমাটসহ জখম হয়। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। এ সময় মিজান বাবু প্রকাশ্যে তাকে হত্যার হুমকিও দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে তাকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় এবং চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সামাজিকভাবে বিষয়টি মীমাংসার আশায় অভিযোগ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
‘হামলা নাটক’ সাজানোর অভিযোগ:
তবে ঘটনাটি এখানেই থেমে থাকেনি। স্থানীয় সাংবাদিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের একটি অংশ দাবি করেছেন, হামলার ঘটনার পর পরিস্থিতি ভিন্নখাতে নিতে পরিকল্পিতভাবে ‘হামলা নাটক’ সাজানো হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, লিয়াকত আলী নিজের প্রভাব খাটিয়ে থানায় পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন এবং হাসপাতালে প্রভাব বিস্তার করে নিজের নামে একটি ‘ভুয়া মেডিকেল প্রেসক্রিপশন’ সংগ্রহ করেন, যাতে তাকে আহত দেখানো যায়। অথচ তার শরীরে দৃশ্যমান কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখাতে পারেননি বলে দাবি করেছেন কয়েকজন সাংবাদিক।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “ঘটনার সময় আমরা আশেপাশেই ছিলাম। মিজান বাবুই হামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু পরে ঘটনাটি ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করা হচ্ছে।”
সাংবাদিক সমাজে ক্ষোভ:
এ ঘটনায় ফরিদপুর জেলা ও নগরকান্দা উপজেলার সাংবাদিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কয়েকজন সাংবাদিক অভিযোগ করেন, লিয়াকত আলী ও তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি শফিকুল ইসলাম মন্টু প্রকৃতপক্ষে সাংবাদিকতার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত নন।
তাদের দাবি, তারা কৌশলে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে তারা অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একপেশে প্রচারণা চালিয়ে মূলধারার সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছেন।
একজন স্থানীয় সাংবাদিক বলেন, “এরা সুযোগসন্ধানী। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তাদের পক্ষেই কাজ করেন। এখন আবার নিজেদের বিএনপির রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।”
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ:
স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কিছু নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন অভিযুক্তরা। সেই সময় তাদের সঙ্গে তোলা বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা নতুন করে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
এখন তারা নিজেদের একটি বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিয়ে স্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠ দাবি করছেন এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মূলধারার সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেন তারা।
অভিযুক্তের বক্তব্য:
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন মো. লিয়াকত আলী। তিনি বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। আমি নিজেও একজন সাংবাদিক এবং একটি প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক। নিয়মিত লেখালেখি করি।”
তিনি দাবি করেন, “মিজান বাবুই আমার ওপর হামলা করেছে। আমাকে হাতুড়ি দিয়ে মারধর করেছে। তাই আমি থানায় অভিযোগ করেছি এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি।”
তবে তার শরীরে আঘাতের দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন দেখাতে পারেননি—এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
পুলিশের অবস্থান:
এ বিষয়ে নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানী আজাদ জানান, উভয় পক্ষের কাছ থেকে দুটি পৃথক অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।
তিনি বলেন, “ঘটনার সঠিক তথ্য উদঘাটনে তদন্ত চলছে। ইতোমধ্যে বিজ্ঞ আদালতে তদন্তের জন্য আবেদন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এব্যাপারে ফরিদপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের প্রত্যাশা:
ঘটনাটি নিয়ে নগরকান্দা উপজেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা-সমালোচনা চলছে। একই ঘটনায় দুই বিপরীতধর্মী অভিযোগ এবং ‘নাটক সাজানোর’ অভিযোগে মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশাকে বিতর্কিত করার যে অপচেষ্টা চলছে, তা বন্ধে সংশ্লিষ্টদের কঠোর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
তদন্তে নজর সবার:
পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এবং ‘ভুয়া চিকিৎসা সনদ’ ইস্যু—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন একটি আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের মধ্যে এ ঘটনার প্রভাব বেশি পড়েছে।
এখন সবার দৃষ্টি পুলিশের তদন্তের দিকে। তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেটিই নির্ধারণ করবে—আসলেই কে হামলার শিকার, আর কে বা কারা ‘হামলা নাটক’ সাজানোর চেষ্টা করছে।

আপনার মতামত লিখুন
Array